ঢাকা, শনিবার 14 January 2017, ১ মাঘ ১৪২৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নির্বাচনের বিকল্প চিন্তা করার সুযোগ নেই

গণতন্ত্র উত্তরণ ইংরেজি হলো Crossing or passing over democracy. গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন। জন সম্মতির ভিত্তিতেই গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় শাসন ব্যবস্থা হলো গণতন্ত্র। জনগণের শাসন হলো গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্র হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত। জবাবদিহিতা ও জনগণের অংশগ্রহণ সুশাসনের অন্যতম শর্ত। রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে ব্রিটেনে সংসদীয় গণতন্ত্র অত্যন্ত সফলভাবে এগিয়ে গেছে। তবে চর্চার অভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এটি তেমনভাবে সফল হতে পারেনি। আর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে- আমরা গণতন্ত্র পার হয়ে পড়েছি অর্থাৎ যেন গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেছি। বর্তমান সরকার সংসদে কিংবা প্রশাসনে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বা আচার আচরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সুশাসনের বদলে দলীয় চন্ডিনীতি, লুন্ঠনবৃত্তি ও দলীয়করণের ভয়ংকর থাবা বিস্তার করে কলংকিত বাকশাল দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তিতে লিপ্ত।
রাজনীতি হলো রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কিত বিষয়াদি। গণতন্ত্রে বিরোধী মত থাকবে এবং সরকারের সংশোধনমূলক সমালোচনা করাই বিরোধী দলের মৌলিক কাজ। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতাসীনরা যে কোনো মূল্যে জনমত তাদের পক্ষে নিতে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান বহুদূরে বলেই মনে হচ্ছে। কারণ ০৫ জানুয়ারিতে বিএনপি কালো পতাকা উড়িয়ে গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। আওয়ামী লীগ তা প্রতিহত করার জন্য ঢাকাসহ সারাদেশে লাঠিপেটা করছে বিএনপি নেতা-কর্মীদের। আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ পালন করছে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস। ২০১৪ সালের ০৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি সহ নিবন্ধিত ৩০টি রাজনৈতিক দল। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে সরকার গঠন করে দলটি। এরপর থেকে এ দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ বলে আখ্যা দিয়ে কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। আর জনগণ বিনা ভোটে নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে ঠাট্টা মসকরাও করছে বিভিন্ন স্থানে। যেমন- মানিকগঞ্জ জেলার যে এলাকা থেকে গায়িকা মমতাজ বেগম সংসদ সদস্য হয়েছেন-সেখানকার এক রসিক লোক এলাকায় এম.পি’র গাড়ী দেখে গেয়ে উঠল ‘‘বিনা ভোটে এম.পি হয়ে/এম.পি যখন গাড়ী নিয়ে/আমরার বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যায়, চলে যায়/বুকটা জ্বলে যায়।’’এমনি আরো অনেক কথা আছে।
গত ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন জনগণকে গণতন্ত্রের চর্চার একটু ক্ষীণআভা দেখালেও ২৮ ডিসেম্বর-এর জেলা পরিষদের মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচন জনগণকে চরমভাবে হতাশ করেছে-যা করেছিল স্বাধীনতার পূর্বের আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে।
চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন গণতন্ত্র রক্ষায় লাঠি নিয়ে তৈরি আছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। গণতন্ত্র রক্ষা দিবসের সমাবেশে একথা বলায় প্রমাণ করে এদেশে গণতন্ত্র উত্তরণ ঘটেছে।
১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে জামায়াত নির্বাচন করেছিল আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের সাথে। ১৯৯১ সালে জামায়াত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করেছে। ১৯৯৬ সালে ৩০০ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করেছে। এমনকি জোটবদ্ধ নির্বাচনের সময়ও ২০০১ সালে জামায়াত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করেছে। এখন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে কেউ নির্বাচন করতে পারবে না। এটা গণতন্ত্র উত্তরণেরই একটি আলামত।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমি প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে একটি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে দেখলাম নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য ছাত্রলীগ ও ছাত্র শিবির নেতা-কর্মীরা একত্রে এসেছে নির্বাচন ভন্ডুল করার জন্য। এটাতো আওয়ামী লীগের নেতাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছিল। এখন কেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন যে, ছাত্রলীগে শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে! এটা তো তাদেরই রাজনীতির ফসল।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন যে নির্বাচন হয় সেখানে জামায়াতের আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন যে, জামায়াতকে জনগণ সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিলে এদেশ পরিচালনার জন্য জামায়াতের একটি জেলার জনশক্তিই যথেষ্ট। এজন্যই তো আওয়ামী লীগের মাথা ব্যথা জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি-কে নিয়ে নয়।
এ.কে.এম নাজির আহমদ এর লেখা উপ-মহাদেশের দুইশত বছরের রাজনীতির খন্ডচিত্র বইয়ের ২১ পৃষ্ঠায় ১৯৪৫-১৯৪৬ সালের নির্বাচনের কথা উল্লেখ রয়েছে। যেখানে মুসলিম লীগের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা রয়েছে এবং বাংলার মুসলিমদের জন্য ১১৯টি আসনের মধ্যে ১১৩টি আসনই মুসলিম লীগ লাভ করেছিল। আর এ নির্বাচনের ফলেই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ৭০’ এর নির্বাচনের ফলে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন হয়। সুতরাং নির্বাচনের বিকল্প চিন্তা করার কোন সুবিধাই নেই।
খ্যাতনামা বাম চিন্তাবিদ বদর উদ্দিন ওমর এক নিবন্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিবস্ত্র চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। যা দৈনিক আজকের কাগজের ৬ এপ্রিল ১৯৯৬ খ্রিঃ প্রকাশিত হয়েছে। তা হলো : গণতান্ত্রিক দলের স্বৈরতন্ত্র চরিত্র পরিগ্রহ এবং স্বৈরতন্ত্র দলের গণতান্ত্রিক চরিত্র পরিগ্রহ করার কারণ এদের মৌলিক চরিত্রই হলো স্বৈরতন্ত্রী। ক্ষমতাসীন হওয়ার সুযোগ না পেয়ে এরা হয় গণতন্ত্রী। সে সুযোগ পেয়ে হয় এরা স্বৈরতন্ত্রী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর কোন ব্যতিক্রম আজ পর্যন্ত হয়নি।  উন্নয়ন মেলা চলছে সারাদেশে। উন্নয়নের জোয়াবে ভাসছে বাংলাদেশ। গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটেছে বলেই এখন দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে-যা বহিয়েছিলেন স্বাধীনতার পূর্বে আইয়ুব সরকার। ১৯৭১ সনের ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। এখন বর্তমান সরকার প্রতি গ্রামে দূর্গ গড়ার টার্গেট পূর্ণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু দূর্গ গড়ার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য উপজেলার PIO (Project Implimentation officer) জমি নির্বাচন করে প্রাক্কলন তৈরী করছেন যা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।     
-আবু মুনির

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ