ঢাকা, শনিবার 14 January 2017, ১ মাঘ ১৪২৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অপহৃত শিক্ষার্থীর খোঁজ মেলেনি ১৬ মাসেও ॥ উল্টো মামলায় হয়রানি

স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ছাত্র মো. আসিফ ইমরানের (১৯)  খোঁজ মেলেনি ১৬ মাসেও। এ ঘটনায় অপহরণের মামলা করে তার বাবা উল্টো প্রতারণার মামলায় পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিখোঁজ ইমরান ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তার বাবা মো. লুৎফর রহমান আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের সাবেক ব্যবস্থাপক (প্রশিক্ষণ)।
লুৎফর বলছেন, ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টম্বর ইমরানকে তাদের উত্তরার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় কয়েকজন বন্ধু। এরপর আর তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ঘটনার সময় স্ত্রীকে নিয়ে হজে ছিলেন জানিয়ে লুৎফর রহমান বলেন, দেশে ফিরে খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারেন তার ছেলেকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে। পরে তিনি অপহরণের মামলা করলে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে ইমরানের কোনো খোঁজ তারা দিতে পারেনি।
ওই মামলার তদন্ত দেখভালের দায়িত্বে থাকা সিআইডির বিশেষ সুপার রেজাউল হায়দার জানান, ইমরান যখন নিখোঁজ হন, সে সময় নারায়ণগঞ্জে এক তরুণের লাশ পাওয়া যায়। অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তার লাশ দাফন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। ওই তরুণই ইমরান কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য ইমরানের বাবা-মায়ের ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান রেজাউল।
এতদিনেও ছেলের সন্ধান না পেয়ে হতাশ লুৎফর সম্প্রতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যালয়ে এসে মামলার কাগজপত্র দেখান। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ৪ সেপ্টেম্বর স্ত্রীসহ হজ করতে সৌদি আরব যান, ফেরেন ১৮ অক্টোবর। সৌদি আরবে থাকার সময় ৭ সেপ্টেম্বর আমি জানতে পারি ইমরানকে তার বন্ধু আদর, আকাশ, শুভ, মনোয়ার, বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে সে আর ফিরে আসেনি।
এ ঘটনায় ইমরানের বোন নাজিয়া তামান্না হৃদি ৯ অক্টোবর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি জিডি করেন। পরে হজ থেকে ফিরে ইমরানের ওই বন্ধুদের নামে অপহরণের মামলা করেন লুৎফর। তিনি বলেন, এরপর থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি আসছিল। পরে প্রায় এক বছর পর আমার বিরুদ্ধে একটি ২৫ লাখ টাকার প্রতারণার মিথ্যা মামলা করে। গোলাম মোস্তফা আদর নামে ইমরানের ওই বন্ধুদের একজন ২০১৫ সালের ২৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে একটি চিঠি পাঠান বলে জানান তিনি। চিঠিতে লিখেছে, নারায়ণগঞ্জে যাওয়া পর ইমরান ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আলমগীর ইসলামের কাছে যায়। এরপর আর তার খোঁজ মেলেনি।
এ ব্যাপারে সাবেক কাউন্সিলর আলমগীরের কাছে ইমরানের খোঁজ চাইলে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। আলমগীর বিভিন্ন সময় তার অবৈধ দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত হওয়ার প্রস্তাব দিত। ইমরান নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তার বন্ধু আদরকে সন্দেহের চোখে দেখা লুৎফর মনে করেন, আদর নিজেকে ‘বাঁচানোর কৌশল’ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের এসপিকে ওই চিঠি লিখেছিলেন।
অপহরণের পর গুমের’ অভিযোগে লুৎফর যে মামলা করেন, তাতে আদর ছাড়াও তার বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালু, মো. শাকিল এবং নারায়ণগঞ্জের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলমগীরকে আসামি করা হয়। ওই মামলার প্রায় এক বছর পর প্রধান আসামি আদর জামিনে ছাড়া পেয়ে গত বছর ১৮ অক্টোবর আদালতে ২৫ লাখ টাকার প্রতারণার মামলা করেন লুৎফরের বিরুদ্ধে। ব্যবসায়িক লেনদেনের কথা বলে টাকা নেওয়ার পর সময়মতো তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় মামলায়। লুৎফর বলেন, মামলায় টাকা লেনদের যে সময় বলা হয়েছে তখন আমি সস্ত্রীক হজ পালন করছি, তাছাড়া যে চুক্তিনামায় আমার স্বাক্ষর দেখানো হচ্ছে সেটা জাল, ইতোমধ্যে সিআইডি এটা তদন্ত করছে। শুধু প্রতারণার মামলা নয়, আদরের বাবা গোলাম মোহাম্মদকে আমি হুমকি দিয়েছি- এররকম মিথ্যা অভিযোগ করেছে বংশাল থানায়। ওই থানার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গোলাম মোহাম্মদের করা ওই হুমকির অভিযোগের কোনো সত্যতা তারা তদন্তে পাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যে অভিযোগ করেছে তার বিরুদ্ধেই উল্টো মামলা করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
লুৎফর রহমান অভিযোগ করেন, আমার ছেলেকে কৌশলে বাসা থেকে ডেকে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যায়। সেখানে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অবৈধ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে গুম করা হয়। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আদরের বাবা গোলাম মোহাম্মদ ছেলেকে পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা চায়। এ ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি আরও পাঁচজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পায় বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছ্নে।
এরা হলেন ইমরানের পরিচিত ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির সাবেক ছাত্র চৌধুরী সাফা রাফসানজানি আকাশ, যে গাড়ি ভাড়া করে ইমরানকে নারায়ণগঞ্জ নেওয়া হয়েছিল তার চালক মনোয়ার, ইমরান নিখোঁজ হওয়ার পর যার কাছে মোবাইল পাওয়া গেছে সেই মুদি দোকানদার শুভ পোদ্দার, সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলমগীরের বড় ভাইয়ের ছেলে রিয়াজুল ইসলাম প্রীতম এবং হত্যা-ডাকাতিসহ কয়েকটি মামলার আসামি লেমন। এই পাঁচজনসহ মোট নয়জনকে অপহরণ মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সিআইডি কর্মকর্তা রেজাউল জানান। তিনি বলেন, তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। ইমরানকে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। যে লাশ ইমরানের মতো দেখতে বলে ধারণা করা হচ্ছে তার নমুনা সংগ্রহ করার পর ইমরানের বাবা-মা নমুনা নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। ফলাফলের অপেক্ষায় আছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ