ঢাকা, রোববার 15 January 2017, ২ মাঘ ১৪২৩, ১৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন বিভাগকে ম্যানেজ করে সুন্দরবনে আবারও পোনা ধরার হিড়িক

খুলনা অফিস: নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলতি মওসুমে সুন্দরবনে নিষিদ্ধ পারসে পোনা ধরা হচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে এ কাজে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগসহ অন্যান্য বাহিনীর বিরুদ্ধে। কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও আশাশুনি উপজেলার একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ ব্যবসার সাথে জড়িত। এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে বনদস্যু সিন্ডিকেট। তাদের মাধ্যমে বনদস্যুদের খাবারসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য পৌঁছানো হয়। পারসে পোনা আহরনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাঈদ আলী।
বনবিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, পারসের পোনা আনা নেয়ার নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবসায়ীদের নিকট বিবেচিত হচ্ছে শিবসা নদী। সুন্দরবনের বঙ্গবন্ধু চর, আলোর কোল, দুবলার চর, নেরালী, কালার মাথা, মজ্জতের গোড়া, মানিকখালী, নীলবাড়ি, নারকেলবাড়িয়া, টিয়ের চর ও হিরণ পয়েন্ট নীল কোমল অভয়ারণ্য এলাকা, কালিরচর, মালঞ্চ, রায়মঙ্গল, বাইর মান্দার বাড়ি এলাকা থেকে নেট জাল দিয়ে ধরা হয় এসব পোনা। পারসে পোনা ধরার অধিকাংশ এলাকাই অভয়ারণ্য হিসেবে বিবেচিত। গহীন বনের এসব এলাকা থেকে পোনা আহরণ করে ট্রলারের মাধ্যমে আসে শিবসা নদীতে। সেখান থেকে নলিয়ান ফরেস্ট অফিসের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় পাইকগাছা মোকামে। পাইকগাছা ব্রীজের নিচে দক্ষিণ পাশে প্রকাশ্যে বেচাকেনা হয় এসব পোনা। এ মোকামটি নিয়ন্ত্রণ করেন লিটন নামে এক মৎস্য ব্যবসায়ী। এছাড়াও কোবাদক ফরেস্ট অফিসের সামনে দিয়ে আড়পাঙ্গাসী এলাকা হয়ে শ্যামনগরের ঝাপালিয়া বাজারেও বিক্রি হয় পোনা। এক কেজি পোনার দাম ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা। একটি ট্রলার এক টিপে কমপক্ষে ৩ মন পোনা বাহন করে। প্রতিটি ট্রলার মাসে এধরনের টিপ দেয় ৪টি। প্রায় ২০টি ট্রলার মাসব্যাপী এ কাজ করে থাকে। নেট জাল দিয়ে পোনা ধরার কারণে নষ্ট হয় লাখ লাখ প্রজাতির জলজ প্রাণী।
বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউটের (পাইকগাছা লোনাপানি গবেষণা কেন্দ্র) দেয়া তথ্য মতে, একটি পারসে/চিংড়ির পোনা আহরণের বিপরীতে ১১৯ চিংড়ি, ৩১২ জুপ্লাঙ্কটন ও ৩১ টি সাদা প্রজাতির মাছের পোনা ধ্বংস হয়। এতসব ক্ষতি স্বীকার করেও স্বার্থান্বেষী মহল পারসে পোনা আহরণের কাজটি করছে। জানা গেছে, পাইকগাছা, কয়রা ও আশাশুনি এলাকার ১২ মহাজন পারসে পোনা আহরণের কাজে নিয়োজিত। এরমধ্যে কয়রা উপজেলার ৩নং কয়রা গ্রামের রজব, জাহিদুল ইসলাম, জামাল হোসেন, ফারুক হোসেন, বেদকাশী ইউনিয়নের তাজমিনুর, আমিরুল, মালেক, ৪ নং কয়রা গ্রামের আলাউদ্দিন, ২ নং কয়রা গ্রামের মোজাম, আমজাদ, মুজিবর ও পাইগাছার গড়ইখালী এলাকার ওমর আলী ও কামরুল ইসলাম। পোনা আহরণের এ মওসুমে মহাজনদের মাধ্যমে বনদস্যুদের সরবরাহ করা হয় অর্থ, খাবার ও নিত্যপণ্য। আর কাজের প্রধান সমন্বয়ক হচ্ছে কয়রার বেদকাশী ইউনিয়নের আমিরুল ইসলাম ও কয়রা ইউনিয়নের রজব গাজী। বন বিভাগের সূত্রটি আরও জানিয়েছে, সুন্দরবনে বর্তমানে ট্রলার চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এরপরও পারসে পোনা ধরার কাজে ট্রলার ব্যবহৃত হলেও বনবিভাগসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অদৃশ্য কারণে নীরব। পোনা ধরে মোকাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৬ ধাপ পার হতে হয়। এরমধ্যে রয়েছে ফরেস্ট বিভাগ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, র‌্যাব, স্মার্ট পেট্রোল টিম ও স্থানীয় থানা পুলিশ। তবে গত দু’মাসে এসব দপ্তরের হাতে দু’টি ট্রলার ছাড়া আর কোন পারসে পোনার কোন ট্রলার ধরা পড়েনি। জানা গেছে, সুন্দরবনে পোনা ধরার আগেই এসব দপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজ করা হয়। তবে পারসে পোনা আহরণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগীয় কর্মকর্তা সাঈদ আলী। তিনি বলেন, পারসে পোনা আহরণ চলছে বিষয়টি আমার জানা আছে। কিন্তু এই চেয়ারে বসে সব বিষয়ে নজর দেয়া সম্ভব নয়। এ কাজে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টিও স্বীকার করে তিনি বলেন, বিভিন্ন সুযোগ নিয়ে মহাজনদের সুবিধা দেয়া হয় আমি জানি। তবে এসব প্রতিরোধ করার বিষয়ে তিনি সচেষ্ট বলে দাবি করেন।তবে অর্থ নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে নলিয়ান রেঞ্জ অফিসের রেঞ্জার মো. শোয়েব খান বলেন, পারসে পোনার জেলেরা চুপিসারে বনের ভেতর দিয়ে পোনা আনা নেয়া করে। আমাদের সজাগ দৃষ্টি থাকে এদিকে। খবর পেলেই আমরা তাদের আটক করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ