ঢাকা, বুধবার 18 January 2017, ৫ মাঘ ১৪২৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৬৫% কৃষিজমির উর্বরাশক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম ॥ অর্ধেক মাত্রাতিরিক্ত এসিডিক

সাদেকুর রহমান : বর্তমানে দেশের ৬৫ শতাংশ কৃষিজমির উর্বরাশক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। চাষযোগ্য প্রায় কোনো জমিতেই নেই প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন। জৈব পদার্থের অভাব রয়েছে, এমন জমির পরিমাণও ছাড়িয়ে গেছে ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে প্রায় অর্ধেক আবাদি জমি মাত্রাতিরিক্ত এসিডিক। বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরডিআই) সূত্রে এমন উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে।

মাটির উর্বরা শক্তি হারানোর কারণ হিসেবে জমির অপরিকল্পিত বহুমুখী ব্যবহার, চাষাবাদে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং কৃষকের সচেতনতার অভাবকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি কৃষি খাতে উন্নত প্রযুক্তি ও উপকরণের অসম ব্যবহার, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিজমির টপ সয়েল ইটভাটায় ব্যবহার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ছাড়াও সার্বিকভাবে ভূমি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবও এতে প্রভাব ফেলছে। ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে খাদ্য উৎপাদনেও। 

 এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটি পরীক্ষায় মাটির জৈব উপাদান সংক্রান্ত এ তথ্য পাওয়া গেলেও বর্তমান ফসল উৎপাদান প্রক্রিয়া পরিচর্যা এবং চাষাবাদ পদ্ধতির আওতায় মাটিতে অবস্থানরত অনুজীবের পরিবর্তিত অবস্থা এবং মাটির অনুপুষ্টি সংক্রান্ত তথ্য উদঘাটনের জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দেশের অধিকাংশ জমির মাটিতে এ দুটো উপাদানের ঘাটতি দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. আমীরুল ইসলামের মতে, আমাদের দেশের মাটির বর্তমান স্বাস্থ্য নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি আছে। অনেকেই বলেন, আমাদের মাটি অত্যন্ত উর্বর। যে কোনো ফসল ও গাছ-গাছালি এ মাটিতে রোপণ করলে তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে এবং ফলফলাদি দিতে থাকে। এ কথাটি এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর বাস্তবসম্মত নয়। যে মাটি প্রতি বছর বন্যা প্লাবিত হয় সে মাটি ছাড়া অন্য সব মাটি এরই মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সারা দেশের মাটির প্রায় ৭০ শতাংশতেই মাটির প্রধান জীবনী শক্তি জৈব উপাদানের পরিমাণ ১ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে এসেছে, যা থাকা উচিত কম পক্ষে ২ শতাংশ ।

বিএসআরডিআই’র গবেষণা থেকে জানা যায়, উর্বরশক্তি ধরে রাখতে জমিতে নাইট্রোজেন ও জৈব উপাদানের পাশাপাশি ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম থাকতে হবে প্রয়োজনীয় মাত্রায়। কিন্তু দেশের প্রায় ৯৬ লাখ হেক্টর জমিতে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন নেই। জৈব উপাদানের ঘাটতিতে রয়েছে ৩৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর অর্থ্যাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ জমি। ফসফরাসের অভাব রয়েছে ৩৭ লাখ হেক্টর ও পটাশিয়ামের ২৭ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে; যা মোট কৃষিজমির ৩৮ দশমিক ৬ ও ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ছাড়া সালফারের অভাব রয়েছে ৩৩ লাখ ১০ হাজার, ২৪ লাখ ৯০ হাজার হেক্টরে বোরণ ও জিংকের ঘাটতি রয়েছে ২৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে। 

উর্বরা শক্তি কমে যাওয়ার কারণে মাটির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)। ‘ল্যান্ড সুইট্যাবলিটি এসেসমেন্ট এন্ড জোনিং ফর মেজর ক্রপস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় জমিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সাতটি বিষয় উঠে এসেছে। মাটির প্রবেশভেদ্য, গভীরতা, পর্যাপ্ত আর্দ্রতা ধরে রাখার সক্ষমতা, পুষ্টিকর পরিপোষকের প্রাপ্যতা, বিক্রিয়া, উপরিভাগের সামঞ্জস্য ও আচরণ সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে ১২টি ফসল কোন অঞ্চলে উপযোগী হবে, তা নির্ধারণ হয়েছে এ গবেষণায়।

সঙ্গতকারণেই জমির উর্বরা শক্তি ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের যেকোনো এলাকায় অধিকাংশ ফসল ফলানো সম্ভব। কিন্তু বাড়তি খাদ্যচাহিদা মেটাতে ও কৃষিজমি কমে যাওয়ার কারণে একই জমিতে অধিক ফসল ফলাতে হচ্ছে। এতে মাটির উর্বরাশক্তি কমছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে শস্য অঞ্চল পদ্ধতি চালু করতে হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, উর্বরা শক্তি ছাড়াও জমির অন্যান্য গুণাগুণ পরিবর্তনের কারণে উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ জেলার জমি আমন, গম, মুগ ও আলু চাষের উপযোগী হলেও বোরো ধান ও মসুর ডালের জন্য উপযোগী নয়। এ ছাড়া দক্ষিণের জেলাগুলোর জমি বোরো, আমন, আউশ ধানের উপযোগী হলেও ভুট্টা, গম, মুগ ডালের জন্য কম উপযোগী। অন্যদিকে আখ ও পেঁয়াজ-রসুন উৎপাদনে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল এবং রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও ময়মনসিংহ বেশি উপযোগী। মরিচ উৎপাদনে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এবং বাদাম উৎপাদনে উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ জেলা ও মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা সবচেয়ে উপযোগী।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেও এর সত্যতা মিলেছে। উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, নওগাঁ ও রংপুরের কৃষকরা জমির উর্বরা শক্তির পরিবর্তন নিজেরাও দেখতে পাচ্ছেন। বোরো আবাদে ১০ বছর আগের তুলনায় এখন তাদের প্রায় দ্বিগুণ সেচ দিতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমন ও আলু চাষে বেশি মনোযোগী হতে হচ্ছে তাদের। 

এসআরডিআই’র আরেক গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে দেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৭ লাখ ৫১ হাজার ৯৩৭ হেক্টর। এর মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত এসিডিক জমির পরিমাণ ৩৭ লাখ হেক্টর। ওসব জমিতে পিএইচের মাত্রা ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫। আর পিএইচের মাত্রা ৪ দশমিক ৫-এর কম রয়েছে এমন জমির পরিমাণ আড়াই লাখ হেক্টর। এই জমি আরো বেশি এসিডিক। মাটিতে মাত্রাতিরিক্ত এসিডের কারণে ফসল উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, দু’দশক আগেও দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে উন্নত মানের ডাল উৎপাদন হতো। কিন্তু অস্বাভাবিক এসিডের কারণে বর্তমানে সেখানে আগের মতো ডালের ফলন হচ্ছে না। আবাদি জমির মাটিতে পিএইচের স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৩ পর্যন্ত। কিন্তু মাত্রা তার চেয়ে কম হলে ওই মাটিকে মাত্রাতিরিক্ত এসিডিক হিসেবে ধরা হয়। আর বেশি হলে ধরা হয় ক্ষারযুক্ত। মাটির উভয় অবস্থায়ই কৃষি উৎপাদনের অনুকূল নয়। 

সূত্র জানায়, আবাদি জমি অতিমাত্রায় এসিডিক হলে টিএসপি সার ব্যবহারেও কোনো কাজে আসে না। ফলে দেশে এখন যেভাবে টিএসপি সার ব্যবহার করা হচ্ছে তার কোনো কার্যকারিতা থাকছে না। এক্ষেত্রে চুন প্রয়োগের মাধ্যমে এসিডের মাত্রা কমিয়ে আনা যেতে পারে। আবার এসিডের মাত্রা বেশি হলে পটাসিয়াম দরকারি হলেও অজ্ঞতা কিংবা অসচেতনতার কারণে যেসব জমিতে পিএইচের মাত্রা কম তাতেও পটাসিয়াম ব্যবহার করা হচ্ছে। এসিডিক মাটিতে ক্ষারীয় উপাদান যেমন ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি দেখা যায়। এ কারণে ফসলের ফলন কমে যায়। তীব্র এসিডিক মাটিতে বোরন ও মলিবডেনামের ঘাটতির কারণেও মারাত্মক শস্যহানি ঘটতে পারে। তাছাড়া অধিক এসিডিক মাটিতে ব্যাকটেরিয়া কর্তৃক নাইট্রিফিকেশন ও সিমবায়োসিসের মাধ্যমে নাইট্রোজেন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে উপকারী অণুজীবের কার্যাবলি ব্যাহত হওয়ায় ফসল উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি ছত্রাকের বৃদ্ধি দ্রুত হওয়ার কারণেও রোগের বিস্তার ঘটে। ফসলের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রতি গাছ সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তাছাড়া সমস্যা দেখা দেয় বীজের ক্ষেত্রেও। অধিক এসিডিক জমিতে অঙ্কুরিত চারা ও শিকড়ের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বর্ধনশীল শিকড়ের ওপর এসিডের ক্রিয়ার প্রভাবে শিকড়ের বিস্তার মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায়। 

এদিকে ভূমি অবক্ষয় ও জমির উর্বরা শক্তি হারানোর কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাপ করেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। ‘বাংলাদেশে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক গবেষণায় ভূমি অবক্ষয়ে আর্থিক ক্ষতি দেখানো হয়েছে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় জমির উর্বরা শক্তি ধরে রাখতে সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহার বাড়ানো, জমি চাষে রোটেশন ও মিশ্র চাষ পদ্ধতি অনুসরণ এবং কৃষি উপকরণ ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সরকারকে জরুরিভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় খাদ্য উৎপাদনে একটা বড় ধাক্কা লাগবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। সরকারিভাবে জৈব সারের কারখানা স্থাপন এবং মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার জন্য দেশব্যাপী ল্যাবরেটরি স্থাপনে এখনই নজর দিতে হবে। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে সব মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বিআইডিএস বলছে, কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতি ১ দশমিক ৭ শতাংশ হলে স্বাভাবিক ধরা হয়। কিন্তু উঁচু ভূমিতে এর পরিমাণ গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। জমি থেকে শুধু বেশি বেশি ফসল ফলানো নয়, জৈব গুণাগুণ রক্ষায়ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কৃষকদের রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে ব্যাপক কর্মসূচি নিতে হবে। এ ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অন্যান্য কার্যকরী সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনাও জরুরিভাবে করা দরকার।

জমির উর্বরাশক্তি হ্রাসে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিকে প্রধানভাবে দায়ী করে বিজেআরআই’র সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. আমীরুল ইসলাম বলেন, ধান গাছ কেবল ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি গভীর থেকে পুষ্টি উপাদান আহরণ করতে পারে। ধানের শিকড় এর চেয়ে গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। দীর্ঘ দিন একই জমিতে ধানের আবাদ হতে থাকলে মাটির ৬-৭ ইঞ্চি নিচ দিয়ে একটি কঠিন আবরণ তৈরি হয়, যা ভেদ করে মাটির পুষ্টি উপাদান উপরে উঠে আসতে পারে না। উদ্বিগ্ন এই কৃষিবিদ বলেন, দেশের অধিকাংশ জমির মাটিতে অনুজীব ও অনুপুষ্টির ঘাটতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ সংক্রান্ত বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য দরকার। 

এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, কৃষি জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মাটির সুস্বাস্থ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে শস্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বর্তমানে ফসল চাষ করা হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১২শ’ কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ব্লক পর্যায়ের চার হাজার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এবং ৫০ হাজার জন কৃষককে বিভিন্ন মেয়াদে ভূমি ও মৃত্তিকা সম্পদ ব্যবহার নির্দেশিকা ব্যবহার, মাটির নমুনা সংগ্রহ, মাটির উর্বরতার ভিত্তিতে সুষম সার ব্যবহার, সরজমিনে ভেজাল সার সনাক্তকরণ, লবণাক্ত ও পাহাড়ি ভূমি ব্যবস্থাপনায় জৈব সার তৈরি ও মাটির উর্বরতামান বৃদ্ধিতে সহায়ক বিভিন্ন বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ