ঢাকা, বুধবার 18 January 2017, ৫ মাঘ ১৪২৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

যত বড় অপরাধী হোক দায়মুক্তি পাবে না -প্রধান বিচারপতি

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধান বিচারপতি বলেছেন, অপরাধী যত বড় হোক না কেন সে দায়মুক্তি পাবে না। চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলার প্রভাবশালী আসামী র‌্যাবের কতিপয় কর্মকর্তা লোমহর্ষ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যা জাতিকে স্তম্ভিত করেছে। সুপ্রিম কোর্টের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের ফলে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয়। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ওই মামলার বিচার নিষ্পত্তি করায় দেশের জনগণের আস্থা বিচার বিভাগের প্রতি আরও বেড়েছে।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা এসব কথা বলেছেন। দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২০১৪ সালের ১১ মে সাত খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ ওই আদেশ দেন। ওই আদেশের পর র‌্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং নৌ-বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানাকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। গত সোমবার এ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ত্রুটিপূর্ণ ও সেকেলে আইনের ফলে মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। দেশের নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত মামলার ভারে জর্জরিত। বিগত দুই বছরে মামলা নিষ্পত্তি বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে ৩০ লক্ষাধিক মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এ বিশাল কর্মযজ্ঞের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা অনেক কম।

২০১৪ ও ২০১৫ সালে মামলা নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, এ দুই বছরে দেশের সব আদালতে ২৭ লাখ ৬০ হাজার ২৪০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে দেশের সব আদালতে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৮টি। বিগত দুই বছরে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪০২টি।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের সব আদালতে চলমান মামলাজট নিরসন ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সময় সময় সার্কুলার ইস্যু করায় প্রত্যাশিত মামলার চেয়ে অধিক মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে।

জনসংখ্যা এবং মামলার সংখ্যা অনুপাতে বিচারক নিয়োগ দেয়া এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে আপিল বিভাগে আটজন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৮৯জন বিচারক রয়েছেন। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের মধ্যে তিনজন বিচারক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারিক দায়িত্ব পালন করছেন। তিনজন বিচারক গুরুতর অসুস্থ। ফলে বেঞ্চ গঠনের সময় আমাকে হিমশিম খেতে হয়। চলতি বছর সাতজন বিচারক অবসর গ্রহণ করবেন। ফলে বেঞ্চ গঠন আরও প্রকট হবে।

নি¤œ আদালতের বিচারকের পরিসংখ্যানের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, নি¤œ আদালতের বিচারকের অনুমোদিত পদ সংখ্যা এক হাজার ৬৫৫টি। এরমধ্যে ৩৮৭টি পদ শূন্য রয়েছে। অবশিষ্ট এক হাজার ২৬৮জন বিচারক দিয়ে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন ২৭ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করা অসম্ভব। বিদ্যমান বিচারকের সংখ্যা কমপক্ষে দ্বিগুণ বাড়লে মামলা দায়ের এবং নিষ্পত্তির মধ্যে ব্যবধান বহুলাংশে কমে আসবে বলে তিনি দৃঢ় বিশ্বাস করেন।

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা উল্লেখ করে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, মিডিয়া রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গ হিসেবে অবদান রেখে আসছে। সমাজের অসঙ্গতি দূরীকরণে সংবাদপত্র এবং সমাজ বিনির্মাণে সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমের ভূমিকা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। সংবাদপত্র প্রতিনিয়ত অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে আসছে।

বিচার বিভাগ ও সাংবাদিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক অত্যাবশ্যক উল্লেখ করে বাণীতে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন সাংবাদিকরা। এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করতে হবে যে, মিডিয়া বিচার বিভাগ-এর বিভিন্ন কার্যক্রম বিষয়ে সময়োপযোগী সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে নিরন্তর সহযোগিতা করে বিচার বিভাগের উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজ দ্রুত সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের সংবাদপত্র, সাংবাদিক, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে আন্তরিক সাধুবাদ জানান।

মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে বিচারক ও আইনজীবীদের যৌথ প্রচেষ্টা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনজীবীদের সহযোগিতা ছাড়া দ্রুত বিচার সম্ভব নয়। তবে দুঃখজনক যে, কিছু কিছু আইনজীবী অযথা মুলতবি দরখাস্ত এবং বিবিধ কারণ উল্লেখপূর্বক অপ্রয়োজনীয় দরখাস্ত দাখিল করে। ফলে বিচার কার্যত বিলম্বিত হয়। তাছাড়া সামান্য বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। এর ফলে মূল মামলার বিচারকার্যক্রম অস্বাভাবিকভাবে বিলম্বিত হয়। 

গত বছর ১৭ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অবসরের পরে রায় লেখাকে সংবিধানপরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করেন। ওই বাণীতে তিনি বলেন, কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘদিন সময় ধরে রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধানপরিপন্থি।

অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি’ বলার ব্যাখ্যায় প্রধান বিচারপতি তার বাণীতে বলেন, কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ