ঢাকা, বুধবার 18 January 2017, ৫ মাঘ ১৪২৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৩ দিনের উচ্ছেদ অভিযান গুলিস্তানে

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর গুলিস্তান ও আশপাশ এলাকার ফুটপাতে তৃতীয় দিনের মতো হকারদের বসতে দেয়নি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু হকার ফুটপাতে দোকান নিয়ে বসতে শুরু করে। দুপুরের দিকে অভিযান চালিয়ে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খান মো. নাজমুস শোয়েব। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মামুন সরদার, ডিএসসিসির কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্যরা হাজির ছিলেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খান মো. নাজমুস শোয়েব বলেন, ‘হকার উচ্ছেদের আজ তৃতীয় দিন। নির্দেশনা উপেক্ষা করে যেসব হকার গুলিস্তান ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ফুটপাতে নির্ধারিত সময়ের আগেই দোকান নিয়ে বসেছিলেন, তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘হকাররা কৌশল অবলম্বন করেছেন। তারা টুকরিতে মালামাল নিয়ে বসছেন। অভিযানের খবর পেলেই তারা সটকে পড়েন। এই উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। দিনের বেলায় জনসাধারণের চলাচলের জন্য ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা হবে।’

গতকাল গুলিস্তান ঘুরে দেখা যায়, সকালে হকাররা ফুটপাতে টুকরি এমনকি চৌকিতেও দোকান নিয়ে বসে পড়েন স্থানীয় লাইনম্যান ও টহল / পেট্রোল পুলিশের সমঝোতায়। এ সময় লাইনম্যানরা পুলিশের কতিপয় সদস্যকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। এক প্রকার সমঝোতার ভিত্তিতেই লাইনম্যানরা এসে ফুটপাতে বিক্ষিপ্তভাবে বসে পড়া হকারদের বলতে শোনা যায় “কিছু বাড়িয়ে দিতে হবে”। ফলে পূর্বে দখলমুক্তকরা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সামনের ফুটপাত, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সামনে, বায়তুল মোকাররমের পশ্চিম পাশে, জিপিওর সামনে হকাররা তাদের পসরা নিয়ে বসেন। এছাড়া হকার উচ্ছেদ হলেও তাদের দখল উচ্ছেদ না হওয়ায় অস্থায়ী স্থাপনাসহ রাতের আলো জ্বালার ব্যবস্থাগুলোও অক্ষত থাকে। তারা ওঁৎ পেতে ছিল কখন আসবে বসে পড়ার মোক্ষম সময়। আবার কখন চলে আসে আভিযানিক দল, এই আশংকাও ছিল তাদের অবয়বে। কোথাও দেখা গেছে, যে সব পুলিশের সহায়তায় হকারদেরকে ফুটপাত থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদেরই কতিপয় সদস্য ফের হকারদেরকে বসতে প্ররোচনা দিচ্ছে ।

এ দিকে, গতকাল ডিএসসিসির পক্ষ থেকে তাদের ফুটপাতে থাকা জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে বলা হলেও নির্দেশ উপেক্ষা করে অনেক হকার দোকান খুলে রাখেন। দুপুর ১২টার দিকে ডিএসসিসি উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। এ সময় হকাররা দোকানের মালামাল নিয়ে সরে গেলে তাদের রেখে যাওয়া চৌকি, বাক্স, টিনের ছাউনি ইত্যাদি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়।

গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়ায় ব্যবসায়ী শিপন রায় বলেন, ‘২০ বছর ধরে আমরা এ জায়গায় ফুটপাতে ব্যবসা করছি। বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখন কী করে খাব ?’

এ দিকে, পুনর্বাসনের উদ্যোগ না নিয়েই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বাণিজ্যিক এলাকা থেকে হকার উচ্ছেদে অভিযান চালানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশ করেছে হকারদের বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে হকারদের ১৬ সংগঠনের জোট ‘হকার সমন্বয় পরিষদ’ এর এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে হকারদের জন্য পুনর্বাসন নীতিমালা তৈরির দাবি জানানো হয়েছে।

গত দুই দিনে গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টনসহ আশপাশের এলাকায় সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের প্রতিবাদ জানিয়ে পরিষদের সমন্বয়ক আবুল হোসেন বলেন, মেয়র সাঈদ খোকন ‘তুঘলকি পদক্ষেপ’ নিয়েছেন। “এর ফল ভালো হবে না। আপনার পিতাও এই নগরের মেয়র ছিলেন। তিনি কখনও হকারদের উচ্ছেদ করেননি। আশা করি আপনিও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেবেন না।”

গত ১১ জানুয়ারি নগর ভবনে এক বৈঠক শেষে মেয়র সাঈদ খোকন ঘোষণা দেন, রোববার থেকে সাপ্তাহিক কোনো কর্মদিবসে আর গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় দিনের বেলায় ফুটপাতে হকার বসতে দেয়া হবে না। হকাররা দোকান নিয়ে বসতে পারবে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পরে। তবে ছুটির দিনে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। এরপর রবি ও সোমবার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, দৈনিক বাংলা মোড়, মতিঝিল, দিলকুশা ও পল্টন এলাকায় চালানো হয় হকার উচ্ছেদ অভিযান।

সোমবার উচ্ছেদের পর হকারদের একটি দল মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দিয়ে আসে। পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ না করা, হকারদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া, চাঁদাবাজি বন্ধ করা, হকারদের উপর ‘দমন-পীড়ন’ বন্ধ এবং প্রকৃত হকারদের তালিকা করে পরিচয়পত্র দেয়াসহ ১০ দফা দাবির কথা সেখানে তুলে ধরেন তারা।

অন্যদিকে নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে মেয়র সোমবার বলেন, জনগণের চলাচল নির্বিঘœ করতে করপোরেশেন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

গতকালের সমাবেশে মেয়রের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে হকার সমন্বয় পরিষদের নেতা আবুল হোসেন বলেন, “প্রধানমন্ত্রী হকারদের উচ্ছেদ করতে বলেননি। প্রধানমন্ত্রী একনেক বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার আলোকে ব্যবস্থা নিন।” মেয়র একা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী (বিদেশ থেকে) ফিরে আসুন, স্থানীয় সংসদ সদস্যও বিদেশে আছেন। তারা আইন প্রণেতা।... আপনার হকার উচ্ছেদের এ সিদ্ধান্ত অমানবিক।” সুইজারল্যান্ড সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তার সঙ্গে দেখা করে হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে স্মারকলিপি দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয় সমাবেশে।

কর্মসূচির এক পর্যায়ে হকার সমিতির নেতা নুরুল ইসলাম বলেন, গুলিস্তান এলাকায় তালিকাভুক্ত হকারের সংখ্যা ১৬ শ’। বাকিরা হকার নয়। হকারদের একাধিক সংগঠন থাকাও তাদের দুর্দশার একটি কারণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার এ বক্তব্যের পর হকারদের একটি অংশ তাকে মারতে উদ্যত হলে অন্য নেতারা নুরুল ইসলামকে সমাবেশস্থল থেকে সরিয়ে দেন।

বাংলাদেশ জাতীয় হকার্স ইউনিয়নও গতকাল বেলা ১১টার দিকে পল্টনের মুক্তিভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে। দৈনিক বাংলা, দিলকুশা, রাজউক এভিনিউ, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, জিরো পয়েন্ট হয়ে পল্টনে এসে শেষ হয় তাদের মিছিল। 

মিছিল শেষে সমাবেশে হকার্স ইউনিয়ন নেতা হযরত আলী অভিযোগ করেন, সোমবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সঙ্গে বৈঠকে হকার উচ্ছেদ না করতে অনুরোধ জানানো হলেও মেয়র তা শোনেননি।

উচ্ছেদের কারণে হকাররা কেউ ভালো নেই, আর হকাররা ভালো না থাকলে মেয়রও ‘ভালো থাকবেন না’ বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি। “মেয়র সাহেব, আপনি আমাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। আমাদেরকে না খাইয়ে রাখলে, আমাদের অনাহারে রাখলে আমরা কাউকে ভালো থাকতে দেব না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা ফুটপাতে দোকান করতে না পারব ততক্ষণ আমরা ঘরে ফিরে যাব না।”

হকারদের পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন এ সমাবেশের বক্তারা। কাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় পল্টনের মুক্তি ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সমাবেশে বক্তারা জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ