ঢাকা, বুধবার 18 January 2017, ৫ মাঘ ১৪২৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি পরিদর্শনে ৩ দেশের রাষ্ট্রদূত ॥ অবস্থা দেখে আবেগাক্রান্ত

উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা : মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ঘুরে দেখলেন তিন দেশের রাষ্ট্রদূত। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত মেরেট লুনডেমো, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত হ্যানে ফুগল এস্কেয়ার ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূত জোহান ফ্রিসেল কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে এনজিও প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করে রোহিঙ্গাদের সার্বিক পরিস্থিতি ও পরিবেশ জানতে চান। 

এসময় ক্যাম্প ইনচার্জ মোঃ শামশুদ্দোজ্জা নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত বিবরণী তুলে ধরেন। পরে তিন দেশের রাষ্ট্রদূত কুতুপালং বনভূমির পাহাড়ে ঝুপড়ি বেঁধে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা বস্তি ঘুরে দেখেন। এসময় তারা রোহিঙ্গাদের সংকট সমস্যা ও জীবনজীবিকা সম্পর্কে জানতে চান এবং রোহিঙ্গাদের সাথে সরাসরি কথা বলেন। তিন দেশের রাষ্ট্রদূতের উদ্ধৃতি দিয়ে ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, তিন দেশের রাষ্ট্রদূত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর দমন নিপীড়নের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন এবং এখানে তারা কোন সমস্যায় আছে কিনা তাও খোঁজখবর নিয়েছেন। তিন দেশের রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল ঝুপড়িগুলো প্রত্যক্ষ করে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। 

এর আগে গত সোমবার তিন দেশের রাষ্ট্রদূত টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী শিবির, লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবির ও সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের সেনা তা-বে বর্বরতা শিকার হয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া জাদিমুরা রোহিঙ্গা বস্তি পরিদর্শন করেন। কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি পরিদর্শনকালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল, সহকারী পুলিশ সুপার (ডিএসবি) কাজী হুমায়ুন রশিদ ও উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের উপস্থিত ছিলেন।

প্রচণ্ড শীতে বিপন্ন অবস্থা : গত কয়েকদিন ধরে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে। তাপমাত্রা হঠাৎ করে নিচে নেমে যাওয়ার কারণে তীব্র শীতে কাহিল হয়ে পড়েছে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। বিশেষ করে উখিয়ার কুতুপালং বস্তিতে পলিথিনের ঝুপড়িতে বসবাসরত বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা শীতবস্ত্রের অভাবে ঠাণ্ডাজনিতে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গতকাল সোমবার সকালে কুতুপালং বস্তিঘুরে এমনটি চিত্র দেখা যায়। 

কুতুপালং বস্তি ব্যবস্থাপনা কমিটির সেক্রেটারি মোহাম্মদ নুর জানায়, গত ১১ নবেম্বর থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত প্রায় ২৭ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করে কুতুপালং বস্তির আশে পাশে প্রায় শতাধিক একরের মত বনভূমিতে ঝুপড়ি বেঁধে আশ্রয় নিয়েছে। এদের থাকা খাওয়ার কিছু নেই বললেই চলে। গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে তিনটি সেনা ছাউনিতে সশস্ত্র বিদ্রোহী হামলায় ৯ জন সেনা সদস্য ও ৬ জন বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার ঘটনায় বিদ্রোহী তল্লাশির নামে বর্মী সেনারা রোহিঙ্গাদের উপর দমন নিপীড়ন, ধর্ষণ, আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়ায় এসব রোহিঙ্গারা সবর্স্ব হারিয়ে এক কাপড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। 

৬৫ বছর বয়সী বয়োবৃদ্ধ মহিলা আমিনা খাতুন জানায়, তার ছেলে আহমদ নবী(২৮) কে মগ সেনারা কোথায় নিয়ে গেছে জানি না। চোখের সামনে ছেলের বউ মরিয়মকে ধর্ষণ করেছে। দুই নাতি সায়েরা (৬), আব্বাস (৩) ও ছেলের বউকে নিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছি। স্থানীয় দান খয়রাতের টাকায় কোনরকম ঝুপড়ি বাঁধতে পারলেও কাপড় চোপড় না থাকায় প্রচণ্ড শীতে সারা রাত ঘুমাতে পারছি না। ঠাণ্ডায় নাতি দুটির গায়ে জ্বর এসেছে। পাশেই বসা বস্তির আরেক বয়োবৃদ্ধ ছমিরা খাতুন (৫৮) জানায়, শীত নিবারনের কাপড় চোপড় নেই। আগুন জ্বেলে শীত নিবারণের খড়খুড়ো পর্যন্ত না থাকায় সন্ধ্যা হলে ভয় লাগে। কি করে সারারাত কাটাবো? এভাবে প্রতিটি ঝুপড়িতে রোহিঙ্গা মহিলাদের আহাজারি ও শীত কষ্টের করুণ আর্তি জানা গেছে। 

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ফয়সাল আনোয়ার জানান, এখানে নতুন পুরাতনসহ প্রায় অর্ধলক্ষ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এমএসএফ হল্যান্ড পরিচালিত হাসপাতালটি একার পক্ষে এতো রোহিঙ্গা নারী-শিশুর চিকিৎসা দেয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। যাদের টাকা পয়সা আছে তারা গ্রাম্য ডাক্তার থেকে চিকিৎসা নিলেও অধিকাংশ বয়োবৃদ্ধ ও শিশু বিনা চিকিৎসায় ঝুপড়িতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমদ জানান, এখানে ব্যক্তি বা কোন সংস্থা নিজ উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণের কোন সুযোগ নেই। যে কারণে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা শীতবস্ত্রসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাঈন উদ্দিন জানান, জেলা প্রশাসকের ত্রাণ শাখায় যে সমস্ত অনুদান জমা পড়েছে সেগুলো সরকারিভাবে বিতরণ করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ