ঢাকা, বুধবার 18 January 2017, ৫ মাঘ ১৪২৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড়

অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধি ও সংস্থার পক্ষ থেকে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ বিনিয়োগ বাড়ার এবং চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলেও বাস্তবে কোনো ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চলছে প্রচণ্ড অচলাবস্থা। মঙ্গলবার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে এখন অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ এক লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়ে আছে, কোনো কাজেই লাগছে না। শুধু তা-ই নয়, রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, গত বছর ২০১৬ সালে পরিস্থিতি কিছুটা ইতিবাচক মনে হলেও ব্যাংকগুলো তাদের মোট আমানতের মাত্র ৬৯ শতাংশ টাকা বিনিয়োগ করতে পেরেছে। অর্থাৎ কোনো ব্যাংকের সংগৃহীত আমানত যদি ১০০ টাকা হয়ে থাকে তাহলে ব্যাংকটি বিনিয়োগ করতে পেরেছে মাত্র ৬৯ টাকা।
এভাবে দেশী-বিদেশী সব ব্যাংকেই অলস টাকার পাহাড় তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সব মিলিয়ে এই অলস টাকার পরিমাণ ছয় হাজার সাতশ’ কোটি টাকা। উদ্যোক্তা না পাওয়া যাওয়ায় বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না বলে ব্যাংকগুলো এক লাখ ৩৮ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা নাম মাত্র সুদে সরকারি বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে রেখেছে। কিন্তু এসবের সুদ আমানতের সুদের হারের চাইতে অনেক কম। বিনিয়োগ বোর্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টটিতে জানানো হয়েছে, বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক পরিবেশ অতীতের তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও এবং দেশের অর্থনীতির পরিধি বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ছে না। ঋণ নিতে ও বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসছেন না শিল্প উদ্যোক্তারা। ফলে ব্যাংকগুলোও ঋণ দিতে পারছে না। বিগত প্রায় তিন বছরে ব্যাংকগুলোতে ঋণ বেড়েছে মাত্র নয় শতাংশের মতো, যাকে মোটেও উল্লেখযোগ্য বলা যায় না।
এদিকে বিনিয়োগ না বাড়ার কারণ হিসেবে প্রয়োজনীয় জমির অভাব এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়ার মতো অবকাঠামোগত কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা জানিয়েছেন তথ্যাভিজ্ঞরা। অনেকে শিল্প-কারখানা নির্মাণ করে এবং উৎপাদনের জন্য যন্ত্রপাতি বসিয়েও কাজ শুরু করতে পারছেন না। কারণ, হয় তারা গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ পাচ্ছেন না অথবা পেলেও সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করার জন্য যথেষ্ট সময় পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। পাওয়া যাচ্ছে না গ্যাসও। এরই পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে শত শত আবেদন সরকারের কাছে পড়ে আছে। সংযোগ পেলেই এসব কারখানায় উৎপাদন শুরু হতে পারে। কিন্তু মূলত ঘুষ-দুর্নীতির কারণে আবেদনকারীরা সংযোগ পাচ্ছেন না। তাছাড়া বিদ্যুতের ক্রমাগত বেড়ে চলা মূল্যের কারণেও অনেকে বিনিয়োগের সাহস পাচ্ছেন না।
 তথ্যাভিজ্ঞরা একেও বিনিয়োগ না বাড়ার একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই কারণে আবার কর্মসংস্থান বা চাকরিরও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। মাস কয়েক আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশক্তি জরিপ রিপোর্টে জানা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে দেশে মাত্র ছয় লাখ লোক চাকরি পেয়েছে। অথচ এর আগের এক দশক ধরে বছরে গড়ে ১৩ লাখের বেশি লোকের চাকরি হয়েছে। চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার পেছনেও বিনিয়োগের স্থবিরতাই প্রধান কারণ বলে জানিয়েছেন তথ্যাভিজ্ঞরা। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই বিনিয়োগ পরিস্থিতি আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, ২০১৪ সালে যখন বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হঠাৎ ঋণাত্মক বা নেতিবাচক হতে শুরু করেছিল ক্ষমতাসীনরা তখন রাজনৈতিক সহিংসতাকে কারণ হিসেবে দায়ী করেছিলেন। কিন্তু গত প্রায় তিন বছরে সে অবস্থায় যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিনিয়োগ না বাড়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, কারণ আসলে সরকারের নেতিবাচক নীতি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর দুর্নীতি। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দেয়াসহ অবকাঠামোগত সকল অসুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর ব্যবস্থা নেয়া গেলে দেশী শুধু নয়, বিদেশী বিনিয়োগও বাড়তে পারে। বলা দরকার, দেশে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় এবং বিদেশে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা চলতে থাকায় বিদেশী শিল্প উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সাহস পাচ্ছেন না। তার ওপর রয়েছে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়া থেকে উৎপাদন অব্যাহত রাখা পর্যন্ত সমগ্র প্রক্রিয়ায় নানামুখী সমস্যা। অর্থাৎ রাজনৈতিক কোনো আন্দোলন কিংবা কথিত সহিংসতা বা অনিশ্চয়তার কারণে নয়, বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী আসলে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ঘুষ-দুর্নীতি।
আমরা মনে করি, বিনিয়োগকেন্দ্রিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হলে দীর্ঘমেয়াদী ও সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা চালানো দরকার। একথা বুঝতে হবে যে, বিদ্যমান বিনিয়োগ সংকটের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য ও কৃতিত্বের দাবিই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। আর এভাবে চলতে থাকলে যে কোনো সময় দেশকে বিপর্যয়ের কবলে পড়তে হতে পারে। সুতরাং বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য তৎপর হওয়া দরকার জরুরি ভিত্তিতে। এ উদ্দেশ্যে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দেয়া ও সরবরাহ অব্যাহত রাখাসহ অবকাঠামোগত সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। সেই সাথে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোরও ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ বোর্ডও তৎপর হয়ে উঠবে, যাতে সকলের মিলিত চেষ্টায় বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে উন্নতি ঘটতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ