ঢাকা, বুধবার 18 January 2017, ৫ মাঘ ১৪২৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মুক্ত মতামত বন্ধ হলে মানুষ বাঁচবে কিভাবে?

জিবলু রহমান : ॥ ২ ॥
৩৩ জন বিশেষ গ্রেডে, ১০ জন পরামর্শক: বাসসে বিশেষ গ্রেডে কর্মরত আছেন ৩৩ সাংবাদিক-কর্মকর্তা, যাঁদের অধিকাংশই এই পদের জন্য যোগ্য নন। জনবলকাঠামোর বাইরে বাসসে সংবাদ পরামর্শক নেওয়া হয়েছে ১০ জন। তাঁদের প্রত্যেককে মাসে ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়। এঁদের মধ্যে এমন কয়েকজন অখ্যাত পরামর্শক আছেন, যাঁদের এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা নেই।
 সরকার পরিবর্তনের পর পরই বাসসে বঞ্চনা ও হয়রানির আওয়াজ ওঠে। তবে এর সত্যতা যেমন আছে, তেমনি আছে রাজনৈতিক অজুহাত কাজে লাগিয়ে ফায়দা নেয়ার।
১৩১তম সভার প্রস্তাবে ৭৯ জন সাংবাদিক-কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ার অন্যতম যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এঁদের অনেকেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়েছেন। ওই তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩৩ জন সাংবাদিকের মধ্যে ১৪ জনই জোট সরকারের সময়ে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জনবলকাঠামোর বাইরে থাকার অজুহাতে ৩৪ জন সাংবাদিক-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করে। এরপর তারা নিজ দলের ৭০ জন সাংবাদিক-কর্মচারীকে পুনর্বাসন করে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি আমলে চাকরিচ্যুতরা আদালতের নির্দেশে পুনর্বহাল হন। ফলে বেশ কয়েকজন অবসরে গেলেও জনবলকাঠামোর চেয়ে প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক-কর্মচারী অতিরিক্ত হয়ে পড়েন। নতুন জনবলকাঠামো পাস হওয়ার আগেই আরও প্রায় ৬০ জন সাংবাদিক-কর্মচারীকে নিয়োগ দেয়া হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে বাসসের অনিয়ম তদন্ত করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জোট সরকারের সময়ে দলীয় বিবেচনায় বিভিন্ন পদে নিয়োগ পাওয়াদের বেশির ভাগই অফিসে না গিয়ে এবং কাজ না করেই বেতন-ভাতা ভোগ করত। ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বাসসে এক আনাও অগ্রগতি হয়নি, বরং মানের অবনতি ঘটেছে।’ (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ১৩ নবেম্বর ২০১৪)
৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ধানমন্ডিতে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র কার্যালয়ে মেঘমালা সম্মেলন কক্ষে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় পুরস্কার প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গহওর রিজভী বলেছিলেন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোনো দেশের গণতন্ত্র ও সরকার চলতে পারে না। গণমাধ্যম হচ্ছে গণতন্ত্রের ভিত্তি। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে অনেক পর্যবেক্ষক এসে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার প্রশংসা করে। কিন্তু আমি জানি, এখানে অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। এর মধ্য দিয়েও সাংবাদিকতা এগিয়ে যাচ্ছে।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিআইবি’র বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ড. আকবর আলি খান। ‘গণমাধ্যম ও সুশাসন’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একুশে টেলিভিশনের এডিটর-ইন-চিফ ও প্রধান নির্বাহী মনজুরুল আহসান বুলবুল। আলোচনায় অংশ নেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, এমআরডিআই’র নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুল প্রমুখ।
প্রধান অতিথি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধুমাত্র সরকারের দিক থেকেই বাধাগ্রস্থ হয় না। এক্ষেত্রে সম্পাদকদের ওপর মিডিয়ার কর্পোরেট মালিকদের খবরদারির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার সময় এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গণমাধ্যমকে বাধা দিয়ে সংবাদ দমন করা যায় না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এখন সামাজিক গণমাধ্যম অনেক শক্তিশালী। সংবাদকে আটকে রাখার সুযোগ নেই। গওহর রিজভী আরো বলেন, এখন আর সরকার গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে চাপ দেয় না। ৪০ বছর আগে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমের জন্য সিরিয়াস বিষয় ছিল। কেননা তখন শুধু সরকারি বিজ্ঞাপন আসত। কিন্তু এখন সেই অবস্থা নেই।
ড. আকবর আলি খান বলেন, অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের যে অর্জন তা গর্ব করার মতো। বিশেষ করে বিশ্বে সুশাসনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচের দিকে হলেও এদেশের গণমাধ্যমের অর্জন প্রশংসনীয়। সরকারের পক্ষ থেকে টিআইবি’র সমালোচনা প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, টিআইবি সরকারের শত্রু নয় বন্ধু। সব সরকারই টিআইবিকে প্রতিপক্ষ মনে করে, এটা ঠিক নয়। সাবেক এই মন্ত্রীপরিষদ সচিব আরো বলেন, টিআইবি’র কোনো প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকলে তাদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু টিআইবি বন্ধ করে দেয়ার মতো হুঁশিয়ারি আসাটা ঠিক নয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনেক চ্যালেঞ্জ থাকার পরও আমাদের দেশের গণমাধ্যম ঝুঁকি নিয়ে ভালো কাজ করে যাচ্ছে। এই মাধ্যম সরকারের সহযোগী ও সহযোদ্ধা হিসেবেই কাজ করে থাকে। গণমাধ্যম যেমন সরকারের ইতিবাচক তথ্য প্রচার করবে, তেমনি সরকারের সমালোচনাও করবে। এই সমালোচনা সরকারকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করতে হবে। (সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম ৬ ডিসেম্বর ২০১৫)
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়েস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৪ সালে প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। সেটির নাম ছিল ‘নিউজ রিপোর্ট’। এরপর পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র তাদের অনলাইন সংস্করণ চালু করে। তবে সত্যিকারের অনলাইন সংবাদের ক্ষেত্র হিসেবে পরিণত হয় ‘সাউথপোর্ট রিপোর্টার’। এটি ২০০০ সালে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত হয়। সেই তুলনায় বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের যাত্রা কিছুটা পরে। তবে বাংলাদেশ খুব বেশি পিছিয়ে নেই।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন সাংবাদিকতা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সব ধরনের মিডিয়ার পরিসংখ্যান থাকলেও অনলাইন মিডিয়ার কোনো পরিসংখ্যান নেই কারো কাছেই।
বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতা অর্ধযুগ পার না করলেও দেশে ছোট-বড় অন্তত ৪ হাজার অনলাইন নিউজ-পোর্টাল রয়েছে বলে মনে করছেন সাংবাদিকরা। সরকার অনলাইন নীতিমালা অনুযায়ী তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত ফরমে দেশে সবকটি অনলাইন পত্রিকা ও নিউজ পোর্টালকে নিবন্ধন করে অনুমোদনের জন্য নির্দেশনা দিলে ১৭১৭টি অনলাইন ও নিউজ পোর্টাল আবেদন করে। আবেদনগুলো এখনো যাচাই-বাছাই চলছে।
সে সঙ্গে সংবাদপত্রের লিঙ্কিং সাইটও রয়েছে অগুনতি। বিভিন্ন সাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে অন্তত সাত-আটশ অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি জেলা সদর থেকে এমনকি উপজেলা সদর থেকেও প্রকাশ করা হচ্ছে অনলাইন সংবাদপত্র। এগুলোর বেশিরভাগই নিয়মিত আপডেট করা হয় না। এমনকি অনেকগুলোতে যোগাযোগেরও নেই কোনো ঠিকানা। ছবি ও তথ্যের যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে সেসব সাইটে। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও বাংলাদেশীদের মালিকানায় বাংলা-ইংরেজি ভাষায় অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। অবশ্য এসব সংবাদপত্রকে কতোটা সংবাদপত্র বলা যায় তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা।
২০০৫ সালের প্রথম দিকে যাত্রা শুরু করে বিডিনিউজ। ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর পুরোপুরি কাজ শুরু করে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম। শীর্ষ নিউজ ডটকম তার পথচলা শুরু করে ২০০৯ সালের ১৭ আগস্ট। ২০১১ সালের ২২ আগস্ট প্রথমবারের মতো শীর্ষনিউজ ডটকম বন্ধ করে দেয়া হয়। ৪ আগস্ট ২০১৬ ফের দ্বিতীয় দফায় ব্লক করা হলো দেশের জনপ্রিয় এই অনলাইন নিউজ পোর্টালটি।
দেশে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপ্তির ফলে ওয়েবসাইট তৈরির ব্যয় অনেক কমে গেছে। সাধারণ মানের একটি সাইট মাত্র তিন-চার হাজার টাকায়ও তৈরি করা যায়। অনেকক্ষেত্রে তারও কম লাগে। এর ফলে ঢাকাসহ সারা দেশে অনলাইন মিডিয়ার ব্যাপক প্রসার ঘটছে। কিন্তু দেখা গেছে, একেকজন কম্পিউটার অপারেটরও একটি সাইট তৈরি করে ‘সম্পাদক’ বনে গেছেন। মূলত কোনো ধরনের আয় না থাকলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন বাবদ ‘চাঁদা’ই তাদের মূল আয়। সেই সঙ্গে গুগল অ্যাডসেন্সসহ এ ধরনের বিজ্ঞাপনের আশায় অনেকেই নিউজ পোর্টাল বানাচ্ছেন। আর নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন সাংবাদিক হিসেবে। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবাদিক হিসেবে নিচ্ছেন বিশেষ সুবিধা।
বিভিন্ন এলাকার নামে এমনকি ব্যক্তির নামেও অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশ করা হচ্ছে। রয়েছে অদ্ভুত নামও। ‘ছবি কথা বলে’, ‘শেষের খবর’, ‘বাঘা নিউজ’, ‘বাউফল নিউজ’, ‘সাভারনিউজ’, ‘আলোকিত জীবন’, ‘ভালো খবর’, ‘গাংনী নিউজ’, ‘ঈশ্বরদীডটকম’-এ ধরনের অসংখ্য তথাকথিত নিউজপোর্টাল রয়েছে অনলাইনে। এসব সাইট অনেকসময়ই বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশন না করায় পাঠকরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন।
যারা অনলাইন মিডিয়াতে কাজ করেন তারা মোবাইলে মেসেজ বা সাথে থাকা ল্যাপটপে নিউজ টাইপ করতে ব্যস্ত, ভিজিটর বাড়াতে হবেনা! না হলে অ্যাড আসবে কোথা থেকে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেকে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাজে পরিচয় দেয়ার লোভ থেকেই অনলাইন মিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে। এদের কেউ কেউ সাংবাদিকতার নামে দুর্নীতিও করছে। এর ফলে পুরো সাংবাদিক-সমাজের ওপর কলঙ্ক আসছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
এটা সত্য সাদাকে কালো আর কালোকে সাদা এতোটাই বানানো হচ্ছে, যেটা অনলাইন মিডিয়া বানাচ্ছে সেইটা বোধকরি অতীতে কোনো জাদুকরও করে দেখাতে পারেনি। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে হয়তো মিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা একেবারেই থাকবেনা আর দর্শক, টিআরপি-ভিজিটর, পাঠক হয়তো পুরোটাই মুখ ফিরিয়ে নিবে গণতান্ত্রিক হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত এই অংশ থেকে। ক্যামেরা আগে ছিলো মানুষের বন্ধু আর দিনে দিনে সেটাই মানুষের শত্রু হয়ে যাচ্ছে।
কোনো নীতিমালা না থাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে অনলাইন সংবাদপত্র। এর ফলে সাংবাদিকতার নামে চলছে যথেচ্ছাচার। ‘সাংবাদিক’ হিসেবে করা হচ্ছে ‘ক্ষমতা’র অপব্যবহার। পত্রিকাগুলোর বেশিরভাগই চলছে ‘কপি-পেস্ট’ করে।
বিভিন্ন সময় নানা ধরনের গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে কিছু অনলাইন মিডিয়া। সে সঙ্গে সৃষ্টি করছে নানা ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যারও। বিশেষ করে নিজেদের ‘এলেক্সা’ রেটিং বাড়ানোর জন্য ‘যা-তা’ সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। সেসব সংবাদের কোনো সূত্রও উল্লেখ থাকছে না। ভিজিটর বাড়ানোর জন্য সেলিব্রিটিদের রগরগে কাহিনী আর ছবিতে ভরপুর হচ্ছে সেসব কথিত মিডিয়ার পাতা।
কেউ কেউ মনে করেন অনলাইন মিডিয়ার বিষয়ে কোনো নীতিমালার প্রয়োজন নেই। এ প্রসঙ্গে মিডিয়া ও উন্নয়নকর্র্মী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর এক নিবন্ধে বলেন, ‘....তথ্য মন্ত্রণালয় সহযোগিতার ভূমিকা পালন না করে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। তাদের এই উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য নয়। মন্ত্রণালয় অনলাইন সংবাদপত্রের জন্য নীতিমালা, লাইসেন্স ফি, নবায়ন ফি, রেগুলেটরি কমিটি করার পাঁয়তারা করছে। তথ্য মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে কিছু টাকা রোজগারের ফন্দি এঁটেছে বলেই আমাদের ধারণা। অনলাইন সংবাদপত্র যুবক বা ডেসটিনির মতো জাঁকালো ব্যবসা নয় যে তথ্য মন্ত্রণালয় এর থেকে ফি নেবে।
অনলাইন সংবাদপত্রের একটি নীতিমালা তৈরির জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২০১২ সালের মাঝামাঝি ওই কমিটি গঠনের পর একটি খসড়া নীতিমালাও প্রণীত হয়। কিন্তু ‘অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট’দের নানান বাদ-প্রতিবাদের বিপরীতে কিছুটা শৈথিল্য আসে নীতিমালা প্রণয়নে। এরপর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তা আরো পিছিয়ে যায়। তবে নতুন সরকার গঠনের পর এ বিষয়ে আবারো কাজ শুরু করে তথ্য মন্ত্রণালয়।
কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় তথ্য অধিদপ্তর থেকে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড নিতে অনেক অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আবার অনেকে পেশাদার সাংবাদিক না হয়েও অনলাইন পত্রিকাটির শুধু ট্রেড লাইসেন্স ও ইন-কর্পোরেশন সার্টিফিকেটের জোরে পেয়ে যাচ্ছেন অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড।
এমনও সংবাদপত্র রয়েছে যেটির কর্মীসংখ্যা মাত্র একজন! আবার তারও একাধিক ‘সংবাদপত্র’ রয়েছে। মূলত অন্যসব পত্রিকা থেকে নিউজ কপি করেই সেসব অনলাইন পত্রিকা চালানো হয়। অনেক অনলাইন সংবাদপত্রেরই প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। যারা আছেন তারাও ঠিকমতো বেতনভাতা পান না। তাই অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে অনেকক্ষেত্রেই তারা সাংবাদিক পরিচয়টির অপব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনলাইন নীতিমালা বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা সংশ্লিষ্টদের না জানিয়ে হঠাৎ করেই ৪ আগষ্ট ২০১৬ সরকারি নির্দেশে বাংলাদেশে ৩৫টি অনলাইন দৈনিক ও নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এসব গণমাধ্যম বন্ধ করতে সংবাদপত্র ও অনলাইন নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।
অনলাইন নীতিমালা ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের জন্য যথাযথভাবে আবেদনও করে রেখেছেন। কিন্তু তাদের আবেদন গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করেই হঠাৎ করে এই অনলাইন দৈনিকগুলো বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি। শীর্ষনিউজ, দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক দিনকাল আরটিনিউজ ২৪, হককথা, আমরা বিএনপি, রিয়েল-টাইম নিউজ, বিনেশন২৪, নেশন নিউজ বিডি, ভোরের আলাপ, বাংলাপোস্ট ২৪, ডেইলি টাইমস ২৪, মাইনিউজ বিডি, লাইভ খবর, রিখান, নেচারের ডাক, সিলেট ভয়েস ২৪, সময় বাংলা, প্রথম-নিউজ, বাংলা লেটেস্ট নিউজ, বিডি মনিটর, বিডিআপডেট নিউজ ২৪, নিউজ ডেইলি২৪ বিডি, অন্যজগত ২৪, দেশ-বিডি, ক্রাইমবিডিনিউজ ২৪, নতুন সকাল, শীর্ষখবর, সারাবাংলা, পার্স টুডে, উইকলি সোনারবাংলা, ২৪ বাংলানিউজ ব্লগ পোর্টাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বিটিআরসির নির্দেশে ইন্টারনেট গেটওয়েগুলো ওয়েবলিংক আটকে দেয়ায় বাংলাদেশে অনলাইন ৩৫টি নিউজ পোর্টাল দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া আরও ৩৩টি ওয়েবসাইট বাংলাদেশে বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যার বেশিরভাগই অনলাইন নিউজ পোর্টাল। বিটিআরসি চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছেন, সরকারের নির্দেশে শীর্ষনিউজ বিডি ডটকম বন্ধ করা হয়েছে। তবে কী কারণে বন্ধ করা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
অনলাইনগুলো বন্ধ করে দেয়ায় পাঠক ও সাংবাদিক কর্মচারীরাও বিপাকে পড়েছে। অনলাইন নীতিমালা অনুসরণ না করা হলেও সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে বিটিআরটি ৩৫টি অনলাইন বন্ধ করে দিয়েছে। তবে হঠাৎ করেই অনলাইন পত্রিকাগুলো বন্ধ করে দেয়ার বিষয়ে কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি। এমনকি সরকারি তথ্য বিবরণী বা বিটিআরসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও জানানো হয়নি।
শীর্ষনিউজ কর্তৃপক্ষ মনে করেন, ‘এটা সংবাদমাধ্যমের উপর বড় ধরনের খড়গহস্ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করার অপপ্রয়াস। অবিলম্বে এ ধরনের অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড থেকে সরে আসার জন্য শীর্ষনিউজ কর্তৃপক্ষ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
আমার দেশ অনলাইন ডটকম, শীর্ষনিউজবিডি ডটকম, দিনকাল অনলাইন ডটনেটসহ ৩৫টি নিউজ পোর্টাল বন্ধের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)’র নেতারা। বিএফইউজে সভাপতি শওকত মাহমুদ ও মহাসচিব এম আবদুল্লাহ এবং ডিইউজে সভাপতি আবদুল হাই শিকদার ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান এক যুক্ত বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এই পদক্ষেপ মুক্ত গণমাধ্যম ও ভিন্নমতের প্রতি সরকারের চরম অসহিষ্ণু মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। বিবৃতিতে সাংবাদিক নেতারা বলেন, দৃশ্যত কোন কারণ ছাড়াই এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কোন রকম যোগাযোগ বা নোটিশ ব্যতীত আকস্মিকভাবে পাঠকপ্রিয় অনলাইন পোর্টালসহ ৩৫টি সংবাদভিত্তিক সাইট বন্ধ করে দেয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও ঘৃণ্য পদক্ষেপ। বন্ধ করে দেয়ার আগে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন রকম অভিযোগ আনা হয়নি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেয়া হয়নি। এমন পদক্ষেপ সংবাদ মাধ্যমগুলোর অগণিত পাঠককে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত সংবাদকর্মীদের বেকারত্বের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিবৃতিতে সাংবাদিক নেতারা অবিলম্বে সকল বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মুক্ত গণমাধ্যমবিরোধী সরকারি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দল মত নির্বিশেষে সকল বিবেকবান সাংবাদিককে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।
৩৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, কোন কারণ দর্শানো ছাড়াই সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রায় ৩৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করার বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়েছে। এ ঘটনার দ্বারা আবারো প্রমাণিত হলো সরকার ভিন্নমত ও সমালোচনাকে কোনভাবেই সহ্য করতে পারছে না। অথচ এ সব অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সরকারকে সহযোগিতা করছে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ