ঢাকা, বুধবার 18 January 2017, ৫ মাঘ ১৪২৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পাখির ভুবনে

-জাহীদ খসরু

ডিম থেকে পুরো পাখি
পাখির বংশ রক্ষার প্রধান উপকরণ ডিম। ডিম থেকেই জন্ম নেয় পাখির বাচ্চা, তারপর পুরো পাখি। নীড় তৈরি করার পর পাখি সেখানে ডিম পাড়ে। পাখির আকার ও আকৃতি অনুসারে তাদের ডিমের প্রকারভেদ দেখা যায়। বড় পাখির বড় ডিম হয় আর ছোটদের হয় ছোট ডিম। উটপাখির ডিম প্রায় সাড়ে ছয় ইঞ্চি লম্বা এবং ওজন প্রায় দেড় কেজি। আবার ক্ষুদ্রতম পাখি হার্র্মিংবার্ডের ডিম একটি মটর দানার মত। আধ ইঞ্চিরও কম। কিউই পাখির ডিমের আকার ও আকৃতি বিস্ময়কর। দেহের প্রায় চার ভাগ আকারের ডিম পাড়ে এরা। ওজন প্রায় অর্ধ কেজি এবং বর্ণ সবুজ।
ডিমের মধ্যে থাকে নতুন পাখি সৃষ্টির উপাদান। তাছাড়া ডিমের মধ্যে যে খাদ্য আছে, তাই খেয়ে ডিম ফুটে বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত বাচ্চারা বেঁচে থাকে। কিছু জাতের বাচ্চা ডিম থেকে বের হওয়ার সময়ই গায়ে পালক দেখা যায়। এ ধরনের পাখির ডিম আকারে বড় হয়। আর যে পাখির ডিম ফুটে বের হওয়ার সময় বাচ্চাদের দেহে পালক দেখা যায় না, তাদের ডিম আকারে ছোট হয়।
অনেক পাখির ডিমের খোসায় রঙের বৈচিত্র্য দেখা যায়। ডিমগুলো দেখতে হয় মূল্যবান পাথরের মতো সুন্দর। নীল, বেগুনী, সবুজ, গোলাপী, হলদে, সাদা রঙের ডিমগুলো দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এমন অনেক পাখির ডিম আছে, যেগুলোর উপর চার পাঁচ রকম রঙ দেখা যায়। আবার কতগুলো ডিমের উপর আঁকাবাঁকা রকমারি দাগ দেখা যায়।
ভাল করে খেয়াল করলে দেখা যায়, ডিমের একটি দিক একটু ছুঁচালো। পাখির পেট থেকে ডিম বের হওয়ার সময় ছুঁচালো দিকটাই আগে বের হয়। ডিমের ছুঁচালো আগা অন্য দিকের চাইতে শক্ত হয়। মেয়ে পাখি ডিম পাড়বার সময় ডিমের ছুঁচালো আগা যদি কোন শক্ত জায়গার উপর পড়ে, তাহলেও ভাঙবার সম্ভাবনা থাকে কম। ছুঁচালো মুখ ডিম সহজে গড়িয়ে পড়তে পারে না। সামুদ্রিক পাখিরা খাড়া পাহাড়ের গায়ে সামান্য খাঁজকাটা জায়গার উপর ডিম পেড়ে রাখে। এদের ডিমের গড়ন একদিকে বেশ ছুঁচালো ধরনের হওয়ায় সেখান থেকে সেগুলো সহজে গড়িয়ে পড়ে নষ্ট হয় না। প্লোভার, টার্ন প্রভৃতি যেসব পাখি নদীতটে বাসা বানায় তাদের ডিম আড়াল করে রাখার জন্য কোন সহজ উপায় নেই। এরকম ক্ষেত্রে ডিমের রঙই হয় তার রক্ষক। ডিমের রঙ মাটি, বালি, পাথরের সাথে এমন সুন্দরভাবে মিশে যায় যে, অন্য প্রাণীর চোখ থেকে প্রায়ই তা এড়িয়ে যায়। ইংরেজিতে এই ব্যাপারটাকে বলা হয় ক্যামুফ্ল্যাজ (Camouflage)।
ডাঙার অধিকাংশ পাখি চার থেকে ছটি ডিম পাড়ে। বে-হোয়াইট পাখি একবারে প্রায় পনেরটি ডিম পাড়ে। হাঁসও অধিকসংখ্যক ডিম দেয়। কিন্তু হামিংবার্ড মাত্র দুটো ডিম পাড়ে। অ্যালবাট্রস দুবছরে ডিম পাড়ে মাত্র একটি।
প্যাঁচা, মাছরাঙ্গা, বাঁশপাতি প্রভৃতি পাখির ডিমের রঙ সাদা এবং গোলাকার। পানকৌড়ির ডিম হয় নীলচে সবুজ এবং লম্বাটে। গায়ের ডিমের বর্ণ সবজে-নীল এবং লম্বাটে গড়নের। লাটিমের মত দেখতে তাল চোঁচ, হট্টিমা এবং জলপিপির ডিম। টুনটুনির নীলচে ডিমের উপর থাকে লাল ফুটকি। ছাতারের ডিম হয় আকাশী-নীল রঙের। ময়ুরের ডিম ফ্যাকাশে হলুদ। তিতিরের ডিম ফিকে সবুজ মেশানো বাদামী বা খয়েরী বর্ণের। কালো কাস্তেচেরার ডিম হয় ফিকে সবুজ এবং তাতে বাদামী রঙের ছিট থাকে। কসাই পাখির ডিমের রঙ হয় ফিকে সবুজাভ সাদা এবং তাতে বেগুনী ও বাদামী ফুটকি থাকে। বেনে বউয়ের ডিম হয় গোলাপী-সাদা এবং তার উপর কালো ও লালচে বাদামি ছিট থাকে। ময়না পাখির ডিমের রঙ গাঢ় নীল এবং তাতে কোন রকম দাগ নেই। কাকের ডিম দেখতে অনেকটা কোকিলের ডিমের মতো ফিকে নীলচে সবুজ এবং তাতে বাদামী দাগ ও ছিট থাকে। চাতকের ডিমের রঙ ফিকে গোলাপী আভাযুক্ত সাদা, তাতে বাদামী-বেগুনীর ছোপ দেখা যায়।
ডিম পাড়া শেষ হলে শুরু হয় তা দেবার পালা। বুনো রাজহাঁস এবং কয়েক রকমের হাঁস কখনো কখনো নিজেদের বুক ও পেটের উপরের পালক তুলে বিছিয়ে দেয়। এভাবে ওরা আশ্চর্য রকম নরম গদি তৈরি করে ডিমগুলো রাখার জন্য। বুক ও পেটের পালক তুলে ফেলায় আর একটি সুবিধা হয়। পালক কমে যাওয়ার দরুন ডিমগুলো চামড়ার সরাসরি স্পর্শ পায়। তাতে গরম হয় বেশি। ফলে ডিম ভাল করে ফোটে। তবে সব পাখির বেলায় এই ব্যাপার দেখা যায় না।
পাখিরা সাধারণতঃ এক. দুই কিংবা তিন দিন অন্তর একটি ডিম দেয়। সব ডিম পাড়া শেষ না হলে ডিমে তা দিতে বসে না। কিন্তু গোল প্যাঁচার বেলায় এই নিয়মটি খাটে না। এরা শেষ ডিমটি পাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। এই জাতের প্যাঁচা আটটি পর্যন্ত ডিম পাড়ে। প্রথম ডিমটি পাড়ার পর থেকেই এরা তা দিতে শুরু করে। অবশেষে বাচ্চা ফুটে যখন বের হয় তখন দেখা যায় যে, বয়সে ও আকারে তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়ে গেছে।
এমন পাখিও আছে যারা ডিমে কখনো তা দেয় না। ডিম ফোটানোর জন্য তারা প্রাকৃতিক উত্তাপকে কাজে লাগায়। পূর্ব অস্ট্রেলিয়াতে মালি ফাউল নামে এক জাতের পাখি দেখা যায়। এরা ঘাস, লতা-পাতা এবং আবর্জনা জঙ্গলের কোন এক জায়গায় স্তূপ করে রাখে। তার মধ্যে মেয়ে পাখিটি ডিম পেড়ে ভাল করে ঢেকে দেয়। উদ্ভিজ আবর্জনা পঁচতে শুরু করলে তার মধ্যে রাসায়নিক ক্রিয়ার ফলে প্রাকৃতিক উত্তাপ সৃষ্টি হয়। বয়স্ক ম্যালি ফাউল আবর্জনার স্তূপের উত্তাপ কোন পর্যায়ে রয়েছে মাঝে মাঝে ঠোঁট ডুবিয়ে পরীক্ষা করে দেখে এবং ডিমগুলো ঠিকমতো উত্তাপ পাওয়ার জন্য নেড়ে চেড়ে দেয়। তাপমাত্রার সমতা বজায় রাখার তদারকি করাই বয়স্ক ম্যালি ফাউলগুলোর কাজ। এই প্রাকৃতিক উত্তাপের সাহায্যেই একদিন ডিম ফুটে ম্যালি ফাউলের বাচ্চা বেরিয়ে আসে।
পাখির দেহের পর্যাপ্ত উষ্ণতায় ডিমের ভেতর ধীরে ধীরে প্রাণের সঞ্চার হয় এবং বাচ্চা জন্ম নেয়। প্রতিটি বাচ্চা ডিমের মধ্যে বড় হওয়ার সাথে সাথে খোলসের গায়ে অনবরত ঠোকর মারতে থাকে এবং সে কারণে খোলস ভেঙে যায়। ছোট বাচ্চাদের বেলায় অবশ্য কাজটি বড় কঠিন। অনেক জাতের বাচ্চা পাখিকে একটি বিশেষ হাতিয়ার দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার নাম ডিম দাঁত। এই দাঁত শক্ত ও তীক্ষ্ণ এবং উপরের চোয়ালের আদায় বসানো থাকে। ডিমের খোসা ফাটানোর জন্য এই দাঁতটি খুব কাজে লাগে। কাজ শেষ হবার পর বাচ্চা যখন বাইরে বেরিয়ে আসে, তকন এই দাঁতটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
সব পাখির বাচ্চাই ডিম থেকে ফুটে বেরুবার পর একইভাবে পালকে ঢাকা থাকে না। কোন কোন পাখির বাচ্চার সারা গা যেন পালকে পুরোটা ঢাকা থাকে। এরা ডিম থেকে বেরিয়েই মায়ের সাথে ঘোরাফেরা শুরু করে এবং খুঁটে খুঁটে খাবার খেতে পারে। মোরগ, তিতির, এমু, উটপাখি, ক্যাসোয়ারী প্রভৃতি এই ধরনের পাখি।
আবার অনেক পাখি শৈশবের প্রাথমিক অবস্থায় বড় অসহায় থাকে। মা-বাবার সাহায্য না পেলে এরা বাঁচতে পারে না। প্রথম অবস্থায় এদের চোখ ফোটে না এবং দেহে পালক থাকে না। মা-বাবা সেবা যত্ন করে, প্রয়োজনীয় আহার জুগিয়ে এদের বড় করে তোলে। ঈগল, চিল, বক, সারস, টিয়া, কাক, চড়ুই, মাছরাঙা, দোয়েল, পায়রা, শকুন, প্যাঁচা এই জাতীয় পাখি।
ছোট ছোট বাচ্চা পাখিরা অপেক্ষা করে থাকে কখন মা-বাবা ফিরবে ঠোঁটে করে খাবার নিয়ে। এ সময় পেটে থাকে এদের প্রচণ্ড ক্ষুধা। খাবার নিয়ে বাচ্চাদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। সবাই চায় আগে  এবং বেশি খেতে।
বাচ্চারা নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি, ঠোঁকরা-ঠুঁকরি করে মাঝে মধ্যে বাসা থেকে পড়ে গিয়ে বড় ঝামেলা বাধায়। মা-বাবাদের তখন এদের নিয়ে চিন্তার শেষ থাকে না। বয়স্ক পাখিরা সকল রকম বিপদ থেকে অবুঝ বাচ্চাদের রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে।
ধীরে ধীরে বাচ্চাদের দেহে পালক গজালে এবং দেহের আকার বড় হলে এরা উড়তে শেখে। প্রথমে এ ডাল থেকে ও ডালে। তারপর ডাল থেকে মাটিতে। মাটি থেকে আবার ডালে। তারপর নীড়ের চার পাশটা এক চক্কর ঘুরে দেখা। মা-বাবা এ সময়টাতে উড়ার সকল কলা-কৌশল পরম যত্নে শেখাতে থাকে। তারা বাচ্চাদের শেখায় কেমন করে খাবার জোগাড় করতে হবে, বিপদের সময় শত্রুর হাত থেকে কিভাবে উড়ে নিজেকে নিরাপদে রাখতে হবে। ধীরে ধীরে উড়তে শিখে। কিছুদিন পর বাচ্চা পাখিরা একদিন নির্ভয়ে মুক্ত আকাশে মেলে দেয় ডানা। স্বাবলম্বী এখন তারা খাবার আর আশ্রয়ের জন্য মা-বাবার সাহায্যের প্রয়োজন আর তাদের নেই। নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজে নেয় তারা। ডিম ফুটে বের হওয়া অসহায় ছোট বাচ্চাগুলো এখন পুরোপুরি পাখিতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পাখি
ছোট্ট সুন্দর পাখি হামিংবার্ড।
আপেডিফর্মেস বর্গের পাখি।
হামিংবার্ডের প্রায় ৩১৯টি প্রজাতি আছে। এদের বেশিরভাগকে দেখা যায় উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। এদের মধ্যে আকৃতির দিক দিয়ে সবচেয়ে ছোট প্রজাতিটি হচ্ছে কিউবার ‘বী হামিংবার্ড’। এদের বৈজ্ঞানিক নাম Mellisuga Helenae এবং এদের আয়তন মাত্র পাঁচ সেন্টিমিটারের মতো। এদের ওজন দুই গ্রামেরও কম। এই ‘বী হামিংবার্ড’ই হচ্ছে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পাখি। এরা এত ছোট যে, এদের ওজন একটি খামের চিঠির চাইতেও কম।
হামিংবার্ডের সবচেয়ে বড় প্রজাতিটি হচ্ছে অ্যান্ডেস অঞ্চলের ‘প্যাটাগোনা জিগাস’। এদের আকৃতি প্রায় একুশ সেন্টিমিনার এবং ওজন প্রায় বিশ গ্রামের মতো। তবে দেহের অর্ধেকটাই হচ্ছে লেজ।
হামিংবার্ডের সব প্রজাতিরই প্রধান খাদ্য হচ্ছে মধু। এরা মধু আহরণের জন্য এক ফুল থেকে আরেক ফুলে ঘুরে বেড়ায়। পদ্ম, ডেলফিনিয়াম, হানি-সাকল কলাম্বাইন এবং সিলভিয়া ফুলের মধু এদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। ফুলের পাঁপড়িতে ছোট-খাট পোকামাকড় থাকে। হামিংবার্ড ফুলের মধুর সাথে এদেরও উদরস্থ করতে পছন্দ করে।
হামিংবার্ডের সাথে ‘সুইফ্ট’ পাখির বেশ সাদৃশ্য দেখা যায়। হামিংবার্ডের শরীর ও ডানা ‘সুইফ্ট’ পাখিদের মতই খাটো এবং শরীর উড়ার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই জন্যই এরা বেশিরভাগ সময় উড়ে বেড়ায়। এদের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এদের পায়ের গড়ন শামাশ্রায়ী পাখিদের মতো নয়। বরং পা দু’টি লুপ্ত প্রায় অঙ্গ।
মধু খাওয়ার সময় হামিংবার্ড কখনই ফুলের উপরে বসে না। ফুলের নিকটবর্তী হয়ে খুব দ্রুত পাখা ঝাঁটপাতে থাকে। ছোট প্রজাতির হামিংবার্ড প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮০ বার পর্যন্ত পাখা ঝাঁপটাতে পারে। কিন্তু বড় প্রজাতির পাখিগুলো সেকেন্ডে ২০ থেকে ২৫ বার পাখা ঝাঁপ্টায়।
হামিংবার্ড ফুলের মধু আহরণের সময় এক জায়গায় শূন্যে ভেসে থাকার জন্য উপরে নিচে পাখা-ঝাঁপটাতে থাকে। কিন্তু উড়বার সময় অন্য কৌশলে পাখা ঝাঁপটায়। কোথাও না বসে ক্রমাগত পাখা ঝাঁপটাতে হামিংবার্ডের যথেষ্ট শক্তির প্রয়োজন হয়। এই শক্তি অর্জনের জন্য এরা প্রতি পনের/কুড়ি মিনিট পর পরই খাদ্য গ্রহণ করে।
হামিংবার্ডের দ্রুত পাখা সঞ্চালনের জন্য মৌমাছির মতো একটা গুণ গুণ শব্দ শোনা যায়। সে কারণেই এদের নাম হয়েছে হামিংবার্ড।
হামিংবার্ডের মধু আহরণের কৌশলটা বেশ চমৎকার। এরা মধু খাওয়ার সময় ফুলের কাছে এসে ভিতরে লম্বা ঠোঁট ঢুকিয়ে দেয়। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন প্রতিটি ফুলের সামনে পাখিটি মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হামিংবার্ড ঠোঁট দিয়ে মধু একেবারেই গিলে ফেলে না। এ জন্য ওদের ঠোঁটে আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। লম্বা ঠোঁটের ভিতর সূতার মতো সরু বেশ দীর্ঘ একটা জিব থাকে। এই জিবটি ফাঁপা। হামিংবার্ড জিবটিকে ঠোঁটের বাইরে ঠেলে দিতে থাকে। মধু খাওয়ার সময় এরা ঠোঁটটিকে মধুর কাছে নিয়ে ফাঁপা জিবটাকে প্রসারিত করে অল্প একটু মধু টেনে নেয়। তারপর তা জিবের ফাঁপা জায়গার মধ্য দিয়ে গলার ভিতরে চালান করে দেয়। সাথে সাথে মধুও পেটের অভ্যন্তরে চলে যায়। ক্রিশ চল্লিশবার জিব বার করে মধু টেনে নিলে এদের পেট ভরে যায়। আবার কোন কোন প্রজাতির হামিংবার্ডের জিবের ডগা ব্রাশের মতো বিশেষ কৌশল সম্পন্ন হয়। এ রকম জিবের সাহায্যে শধু, পরাগরেণু এবং কীটপতঙ্গ এরা দ্রুত মুখের মধ্যে চালান করে দেয়।
হার্মিবার্ড উড়ার বেলায় দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে। ওদের ওজন খুব কম। তবুও প্রতিকূল বাতাসের বিরুদ্ধে ৫০ থেকে ৬০ মাইল বেগে উড়তে পারে। এরা যেমন সামনের দিকে সহজে উড়তে পারে, তেমনিভাবে পাশে, পিছনে, উপরে এবং নীচে উড়তে সক্ষম। উড়ন্ত অবস্থায় ততক্ষণ খুশী একই জায়গায় স্থির হয়েও থাকতে পারে।
পদ্মরাগ মণির মতো লাল (Puby-throted) গলা বিশিষ্ট হামিংবার্ড উড়ার বেলায় সবচেয়ে বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে। এরা শীতকালে ঠা-ার হাত থেকে বাঁচার জন্য এবং প্রচুর খাদ্যের সন্ধানে দেশান্তরী হয়ে থাকে। এই জাতীয় হামিংবার্ড শীতের শুরুতে শরীরে মেদ সঞ্চয় করে বিরতিহীনভাবে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে দেশান্তরী হয়। এরা না খেয়ে একটানা উড়ে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরবর্তী পূর্ব-উত্তর আমেরিকাতে পৌঁছায়। আবার ‘রূফাস হামিংবার্ড’ শীতের সময় উত্তর-পশ্চিম আলাস্কা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের শেষে রকি পবর্তমালার ১২,০০০ ফুট উঁচু দিয়ে মেক্সিকোতে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ পথ যাত্রার আগে এরাদেহে প্রচুরমেদ সঞ্চয় করে নেয়। এই জমা করা চর্বি যাত্রার সময় দেহের প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়। যাত্রা শেষ হওয়ার আগে এরা কোন খাদ্য গ্রহণ করে না।
হামিংবার্ড মোটেও সামাজিক পাখি নয়। এরা দল বেঁধে মিলে মিলে থাকা পছন্দ করে না। পুরুষ পাখিগুলো খুব ঝগড়াটে এবং হিংসুটে। যথেষ্ট খাদ্যের জোগাড় থাকলেও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ঝাঁটি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নিজের এলাকায় অন্য কোন পাখি ঘেষলে তাকে পুরুষ পাখি মোটেও বরদাশত করতে পারে না। ঝগড়া-ঝাঁটি করে তাকে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু প্রজাতির হামিংবার্ড বেশ চমৎকার শিশ দিতে পারে। পুরুষ পাখিরা শিষ দিয়ে মেয়ে পাখিগুলিকে আকর্ষণ করে। হামিংবার্ডের স্ত্রী এবং পুরুষ পাখিগুলোর আকার এবং বর্ণ সাধারণত ভিন্নধর্মী হয়ে থাকে। পুরুষ পাখিগুলো দেখতে বেশি সুন্দর হয়ে থাকে। স্ত্রী হামিংবার্ড ছোট আকারের বাসা তৈরি করে তাতে একটি বা দু’টি ডিম পাড়ে। হামিংবার্ড সাধারণত বাসা তেরির জন্য গাছের আঁশ, শুকনো লতা-পাতা মস, লাইকেন, মাকড়শার জাল প্রভৃতি উপকরণ ব্যবহার করে। এদের ছোট আকারের বাসাগুলো দেখতে বেশ সুন্দর এবং মজবুত।
এই বাসাগুলো সাধারণত নির্জন স্থানে গাছের দুই ডালের মাঝখানে পাতার আড়ালে ঝুলানো অবস্থায় থাকে। স্ত্রী পাখি দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটায়। বাচ্চা জন্ম নেয়ার পর প্রায় চার সপ্তাহ পর্যন্ত এরা মায়ের আশ্রয়ে থাকে। এ সময় বাসার বাইরে থেকে মা পাখি পেট ভরে মধু ও কীট পতঙ্গ আহার করে ফিরে আসে এবং নিজের পাকস্থলী থেকে অর্ধহজম খাদ্য উগড়ে বাচ্চার পাকস্থলীতে চালান করে দেয়। বাচ্চা বড় হলে ধীরে ধীরে নিজের খাদ্য নিজেই খুঁজে নিতে শিখে।
৩১৯ প্রজাতির হামিংবার্ডের প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কারো ঠোঁট লম্বা, কারো লেজ লম্বা, কোন কোন প্রজাতির পালকের বাহার দেখরে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। রংধনুর সাতটি রঙের ছোঁয়া থাকে যেন এদের দেহে।
হামিংবার্ড উদ্ভিদের একটি অন্যতম বন্ধু পাখি। এরা মধু আহরণের জন্য এক ফুল থেকে অন্য ফুলে যাওয়ার সময় ফুরের পরাগ রেণু স্থানান্তরিত করে। গাছপালার বংশ বিস্তারের বেলায় হামিংবার্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভিদ তার ফুলের মধু বিলিয়ে হামিংবার্ডকে তার প্রতিদান দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ