ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 January 2017, ৬ মাঘ ১৪২৩, ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হাফিজের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ায় জয়ের খরা কাটালো পাকিস্তান

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘ এক যুগ পর জয়ের খরা কাটলো পাকিস্তানের। মেলবোর্নে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৬ উইকেটে জয় পেল পাকিস্তান। সর্বশেষ তাদের জয়টি ছিল ২০০৫ সালে। প্রফেসর খ্যাত মোহাম্মদ হাফিজের নেতৃত্বেই অস্ট্রেলিয়া বধ করলো এই এশিয়ান পরাশক্তি। নিয়মিত অধিনায়ক আজহার আলীর ইনজুরির কারণে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে নেতৃত্ব এসে পড়ে মোহাম্মদ হাফিজের ওপর। ৬ উইকেটে পাওয়া জয়ে ব্যাট হাতে সর্বোচ্চ ৭২ রান করে ম্যাচ সেরাও হয়েছেন তিনি। দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২২০ রানে বেঁধে ফেলার পরই জয়ের স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছিল পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মনে। ২২১ রানের টার্গেটটাকে কখনো চোখ রাঙাতে না দিয়ে জয় উদযাপন করেই মাঠ ছেড়েছেন তারা। জয় উদযাপনে আহামরি কিছু হয়তো ছিল না, তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসা এই জয় প্রশান্তি বয়ে দিয়েছে পাকিস্তানকে, সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায়।
জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শারজিল খানকে সঙ্গে নিয়ে উদ্বোধনী জুটিতে ৬৮ রান সংগ্রহ করেন হাফিজ। শারজিল ২৯ রান করে ফিরলে বাবর আজম নিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে গড়েন ৭২ রানের জুটি হাজিফ। দলীয় ১৪০ রানে বাবর আজম (৩৪) অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের দ্বিতীয় শিকার হন। দুই রানের ব্যবধানে ফিরে যান মোহাম্মদ হাফিজও (৭২)। তবে ততক্ষণে পাকিস্তান পেয়ে গেছে জয়ের ভিত্তি। শোয়েব মালিকের ৪২ রানে বাকী ৭৯ রানের পথটা পাড়ি দিতে কোনো কষ্টই হয়নি পাকিস্তানের। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে পুরো ১০ ওভার বল করেছেন হাফিজ। ৪৫ রান দিয়ে যদিও কোন উইকেটের দেখা পাননি। অধিনায়ক হিসেবে মোহাম্মদ হাফিজের এটিই ছিল প্রথম ওয়ানডে। এর আগে টি- টোয়েন্টির নিয়মিত অধিনায়ক থাকাকালীন দেশকে ২৯ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে জয় পেয়েছেন ১৭ ম্যাচে, হেরেছেন ১১টিতে (একটি ম্যাচ পরিত্যাক্ত)। ২০১২ সালে একটি টেস্ট ম্যাচেও অধিনায়কত্ব করেছিলেন, যে ম্যাচে পরাজিত হয় পাকিস্তান। তবে ভারপ্রাপ্ত ওয়ানডেতে অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নেমে মোহাম্মদ হাফিজ দেশের বড় কীর্তিই এনে দিলেন যেন।
অস্ট্রেলিয়া সফরে পাকিস্তানের কিকেটারদের খুব বাজে সময় পার হচ্ছিল। হেরেই চলেছিল। এর মধ্যে দেশে টেস্ট খেলুড়ে কোন দলের খেলার খবরে অনেকেই সেই হারার বিষয়টি ভুলেই গিয়েছে। সেই সাথে তাদের আরও একটি সংবাদ উৎসবের প্রেরণা যুগিয়েছে। সেটি হলো ‘প্রফেসর’ খ্যাত হাফিজের প্রত্যাবর্তন। মিসবাহ্-উল হক, শহীদ আফ্রিদির পর মোহাম্মদ হাফিজকেই ভাবা হতো পাকিস্তান ক্রিকেটের পরবর্তী কাণ্ডারী। টি-২০র নেতৃত্ব পাওয়ার পর সময়ের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সে পথেই হাঁটছিলেন। কিন্তু অবৈধ বোলিং এ্যাকশনে ও ব্যাট হাতে ফর্মহীনতায় সব কেমন এলমেলো হয়ে যায়। এ্যাকশন শুধরে প্রায় ছয় মাস পর আবার ফিরলেন হাফিজ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে চলমান ওয়ানডে সিরিজের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ৩৬ বছর বয়সী এই তারকা। বোলিং এ্যাকশনে আইসিসির বৈধতা পাওয়ার পাশাপাশি এ সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে চমৎকার পারফর্মেন্স দেখিয়ে নির্বাচকদের নজর কেড়েছেন। যেখানে আজহার আলীর নেতৃত্বে লড়ার কথা সফরকারী পাকিস্তানীদের। কিন্তু দলপতির ইনজুরির কারণে দায়িত্ব পড়ে অভরাউন্ডার হাফিজের উপর।
মিসবাহ্-উল হকের দল এর আগে তিন টেস্টের সিরিজে ‘হোয়াইটওয়াশ’ হয়। ওয়ানডেতে কেমন হবে সেটি দেখার অপেক্ষায় সবাই। নবেম্বরে পর্যবেক্ষণের পর আইসিসির ছাড়পত্র পাওয়া হাফিজ ইতোমধ্যেই ঘরোয়া ক্রিকেটে অফস্পিন বোলিং করেছেন। ডিপার্টমেন্টাল ওয়ানডে কাপে ২৪৮ রান করেছেন, নিয়েছেন ১১ উইকেট। ওয়ানডে দলে সুযোগ পেয়ে হাফিজ বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বল করতে পারিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে যেহেতু মাত্র একমাস বোলিং করছি তাই এটা আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি নিজেকে একজন ব্যাটসম্যানই বিবেচনা করি, যে প্রয়োজনে বোলিংও করতে পারে। এটাও জানি, কোন ম্যাচের সেরা একাদশে সুযোগ পেলে দল আমার বোলিংয়ের ওপরও নির্ভর করবে। তবে সে চাপ সামাল দিতে সক্ষম।’ পাকিস্তানের হয়ে ৯ টেস্ট ও ১১ ওয়ানডে সেঞ্চুরি করা ছাড়াও তিন ফরমেট মিলিয়ে ২২৭ উইকেট শিকার করা হাফিজ গত আগস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে খারাপ করার পর দল থেকে বাদ পড়েন। এই সময় কেবল ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলছিলেন। কারণ অনেক আগেই শ্রীলঙ্কা সফরে টেস্ট ম্যাচে বোলিং এ্যাকশন অবৈধ হয়। গত বছরের জুনে ১ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে আইসিসি। এবার পুরোপুরি এ্যাকশন শুধরে ফিরে এলেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) এক কর্তা জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত টিম ম্যানেজমেন্ট শেষদিকে হাফিজকে দলভুক্ত করার জন্য বলেছে এবং নির্বাচকরা সেই অনুরোধে সাড়া দিয়েছে। ওয়ানডে সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া রওনা হওয়ার আগে হাফিজ বলেছেন, চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত তিনি।
বিরতির পর ফিরে এসেই নিজের জাত চেনালেন হাফিজ। দায়িত্ব পেয়েই দলকে জয় উপহার দিয়েছেন। শুধু দায়িত্বই পালন করেনি নি, জয়ের দায়িত্বটাও যেন নিজ কাঁধে তুলে নিলেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়ানডেতে পাকিস্তান ক্রিকেট দল জিততে জানে? এটা অনেকেই ভুলেই গিয়েছিল। তবে পরিসংখ্যান বলছে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাকিস্তান দল সর্বশেষ ওয়ানডে জিতেছিল ২০০৫ সালে। এরপর জয় যেন ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয় এশিয়ান দলটির কাছে। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে মোহাম্মদ হাফিজের সাথে মোহাম্মদ আমিরেরও নৈপুণ্যও ছিল দেখার মত। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ম্যাথু হেইডেন তখন ওপেন করতেন। মিডল অর্ডারে ছিলেন সেই ঝাঁকড়া চুলের অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস। আর আবদুল রাজ্জাক তখনো পাকিস্তান দলের গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডার। মোহাম্মদ ইউসুফের নাম তখনো ‘ইউহানা’। ২০০৫ সালে সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল পাকিস্তান। তখন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ছিলেন রিকি পন্টিং। এর ১২ বছর পর আবার জিতল পাকিস্তান। মেলবোর্নে ৬ উইকেটে ম্যাচ জিতে সিরিজও ১-১ করে ফেলল।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গত ১২ বছরে কোনো জয় পায়নি পাকিস্তান। তারাই কি না সিডনিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিয়েছিল গত রোববার। নিয়মিত অধিনায়ক আজহার আলী অনুপস্থিতিতে যেন পাকিস্তানিদের জন্য ভাগ্য নিয়েই হাজির হন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজ। পার্থে সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতেও ইনজুরির কারণে খেলতে না পারার সম্ভাবনা রয়েছে আজহার আলীর। তার পরিবর্তে অধিনায়ক হাফিজই। পার্থেও কী তবে জিতে যাবে পাকিস্তান? পার্থে তারা ওই ম্যাচ জিতলেই র‌্যাংকিংয়ে এক ধাপ উত্তরণ ঘটবে পাকিস্তানের। বাংলাদেশকে আট নম্বরে ঠেলে দিয়ে উঠে যাবে র‌্যাংকিংয়ের সাত নম্বরে। পার্থে তারা যদি পাকিস্তানকে হারাতে পারে, তাহলে রেটিং পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়াবে ৯২। এখন তাদের পয়েন্ট রয়েছে ৯০। বাংলাদেশের পয়েন্ট হলো ৯১। অথ্যাৎ পার্থে জিতলে ১ পয়েন্ট বেড়ে যাবে পাকিস্তানিদের। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট ছিল ৯৫। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার কারণে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ রেটিং পয়েন্ট হারায় বাংলাদেশ। ৯৫ থেকে কমে পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ৯১-এ। প্রায় দেড় বছর আগেই ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে র‌্যাংকিংয়ের আট নম্বরে উঠে এসেছিল বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ উঠে এসেছিল আরও ১ ধাপ উপরে। অর্থাৎ, সাত নম্বরে। যার ফলে বাংলাদেশ এ বছর ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য সরাসরি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। ২০১৯ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে বাংলাদেশকে চলতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে সেরা আটের মধ্যে থাকতে হবে। অন্যথায় বাছাই পর্ব খেলেই তবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে নাম লেখাতে হবে টাইগার বাহিনীকে। ৮৬ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে ৯ নম্বরে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ