ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 January 2017, ৬ মাঘ ১৪২৩, ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সৈয়দপুরে গুল কারখানায় শিশু-কিশোররা ক্যান্সারের আশঙ্কা নিয়ে বেড়ে উঠছে

সৈয়দপুর (নীলফামারী) : জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুল ফ্যাক্টরিতে গুলের কোটায় গুল ভরছে শিশু-কিশোর ও কিশোরীরা

সৈয়দপুর (নীলফামারী)  সংবাদদাতা : ছোট্ট শিশু ইতি। বয়স জোর তিন বছর। মা রীনা বেগমের সাথে (২৫) এই বয়সে কাজ করেন একটি গুল ফ্যাক্টরিতে। এক বছর বয়স থেকে ইতি মায়ের সঙ্গে এ ফ্যাক্টরিতে যাতায়াত করে। কৌটায় গুল ভরা, লেবেল আটকানোর কাজে মায়ের সঙ্গে থেকে সেও শিখে ফেলেছে। এখন পুরোদস্তর মায়ের সহযোগী।
রীনা বেগম জানান, স্বামী রহমত আলী দিনমজুরের কাজ করে। স্বামীর আয়ে পাঁচজনের সংসার চলে না। দু’বেলা দু’মুঠো মুখের অন্ন যোগাতে গুল ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন তিন বছর ধরে। চুক্তিতে কাজ করে দৈনিক ১শ’ টাকা থেকে ১শ’ ৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। নিজের আয় আর স্বামীর আয় মিলে কোন রকমে সংসার চালান। শিশু ইতির কাজ করা বিষয়ে মা রীনা জানান, প্রথম অবস্থায় সে (ইতি) গুলের ঝাঁঝ সহ্য করতে না পেরে বমি করে ফেলতো। আস্তে আস্তে সয়ে গেছে, এখন আর তেমন অসুবিধা হয় না।
গুল ফ্যাক্টরিতে কাজ করা শিশু আকাশ (৭) ও কিশোরী পিংকীর (১৫) সাথে কথা হয়। এরা আপন ভাই-বোন। এরা ৮ বছর ধরে গুল ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। সারাদিন কাজ করে যা আয় হয় সবটুকু বাবা- মায়ের হাতে তুলে দেয়। সংসার ও জীবন- জীবিকার তাগিদে এসব শিশুসহ অনেক নারী শ্রমিক কাজ করছেন এখানকার গুল ফ্যাক্টরিগুলোতে।
 সৈয়দপুরে ছোট-বড় মিলে ৩০টির বেশি গুল ফ্যাক্টরি আছে। তবে বড় গুল ফ্যাক্টরি রয়েছে ৫টি। এগুলো হলো তারেক, খালেদ, শাকিব, ওয়ান স্টার ও নিউ স্টার গুল ফ্যাক্টরি। প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করে এসব ফ্যাক্টরিতে। শ্রমিকদের শতকরা ৯০ ভাগই নারী ও শিশু। অত্যন্ত সস্তায় মেলে এসব শ্রমিকের শ্রম। ফ্যাক্টরিগুলোতে শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে মালিকদের নেই কোন পরিকল্পনা। অল্প আয়ের মানুষ বসবাস করে এমন আবাসিক এলাকায় গুল ফ্যাক্টরিগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। কোন প্রকার নিয়মনীতি মানেন না ফ্যাক্টরি মালিকরা। প্রশাসনও এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। আবাসিক এলাকা থেকে গুল ফ্যাক্টরিগুলো সরিয়ে নেয়ার এলাকাবাসীর দাবি বরাবরই থেকেছে উপেক্ষিত।
গুল ফ্যাক্টরিতে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ে কথা হয় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বিএমএ সৈয়দপুর শাখার সভাপতি ডা. শেখ নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো গুল ফ্যাক্টরি। তামাক পণ্যের ফ্যাক্টরিতে কর্মরত শ্রমিকদের ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে নারী ও কিশোরী শ্রমিকরা বিয়ের পর যে সন্তান জন্ম দেবে তা জন্ম নেবে ক্যান্সার আক্রান্তের আশঙ্কা নিয়ে। আর যেসব শিশু গুল ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে তারা ক্যান্সার আক্রান্তের আশঙ্কা নিয়ে বেড়ে উঠছে। এজন্য কাজ করার সময় শ্রমিকদের হাতে গ্লোভস, পায়ে গাম বুট, নাকে উন্নতমানের মাস্ক এবং অ্যাপ্রোন পড়তে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তামাক পণ্যের ফ্যাক্টরির ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তাঁর মতে, দেশের প্রচলিত শ্রম আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় তামাক ফ্যাক্টরিগুলোতে নারী ও শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।
গুল ফ্যাক্টরির মালিকরা জানান, সমাজ বাস্তবতার কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নারী ও মিশু শ্রমিকদের কাজে নিতে হয়। ফ্যাক্টরিগুলোতে শিশু ও কিশোর- কিশোরী শ্রমিক দিনহাজিরা কাজ করেন বলে জানান তারা। সৈয়দপুর পৌরসভার মেয়র অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন সরকার জানান, পৌর এলাকা থেকে বিশেষ করে আবাসিক এলাকা থেকে গুল ও তামাক পণ্যের কারখানাগুলো সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত অচিরেই বাস্তবায়ন করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ