ঢাকা, শুক্রবার 20 January 2017, ৭ মাঘ ১৪২৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নজিবর রহমানের কথাসাহিত্য

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান : প্রথম সার্থক বাঙালি মুসলিম কথাসাহিত্যিক হিসাবে মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ (জন্ম ২২ জানুয়ারী ১৮৬০, মৃত্যু ১৮ অক্টোবর ১৯২৫) বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী। প্রথম জীবনে তিনি প্রবন্ধ রচনায় প্রবৃত্ত হন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি প্রবন্ধ রচনা শুরু করেন ও সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে প্রকাশিত তাঁর দু’টি প্রবন্ধ গ্রন্থ হলোÑ ‘সাহিত্য প্রসঙ্গ’ (১৯০৪) ও ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’ (১৯০৫)। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এ দু’টি গ্রন্থই বাজেয়াপ্ত হয়। এরপর কিছুদিন তাঁর কোন গ্রন্থাদি প্রকাশিত হয়নি। এ সময় তিনি হয়তো সাহিত্যচর্চার সুযোগ পাননি। সাহিত্যচর্চার জন্য যে নিরিবিলি পরিবেশ ও মানসিক স্বস্তি প্রয়োজন, শিক্ষকতা পেশায় ব্যস্ততা, সামাজিক-রাজনৈতিক নানা টানাপড়নের ফলে সাহিত্যচর্চার উপযোগী পরিবেশ ও সুযোগ হয়তো তাঁর ছিল না। ১৯১১ সাল থেকে তাঁর সাহিত্যচর্চার দ্বিতীয় পর্বের শুরু। এ সময় রচিত তাঁর সব গ্রন্থই গল্প বা উপন্যাস জাতীয়। মূলত এসব রচনাবলীর জন্যই বাংলা সাহিত্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। বিশেষত তাঁর ‘আনোয়ারা’ ও অন্যান্য উপন্যাসসমূহ অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
নজিবর রহমানের গল্প-উপন্যাসের তালিকা: ‘আনোয়ারা’, নজিবর রহমানের প্রথম ও সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস। রচনাকাল ১৯১১-১৪, প্রথম প্রকাশ ১৯১৪ সালে, ‘চাঁদতারা বা হাসন-গঙ্গা বাহমণি’, নজিবর রহমানের একমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস। রচনাকালের দিক দিয়ে এটি তাঁর চতুর্থ গ্রন্থ এবং দ্বিতীয় উপন্যাস, কিন্তু প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩২৩ (ইংরাজি ১৯১৭) সালে, ‘পরিণাম’ (১৯১৮), পারিবারিক ও সামাজিক উপন্যাস, ‘প্রেমের সমাধি’ (১৯১৯), সামাজিক উপন্যাস। আনোয়ারা’র পরিশিষ্টরূপে রচিত, তবে স্বতন্ত্র উপন্যাস হিসাবে গণ্য, ‘গরীবের মেয়ে’ (১৯২৩), একটি আত্মজীবনীমূলক সামাজিক উপন্যাস, ‘মেহের-উন্নিসা’ (১৯২৩), সামাজিক উপন্যাস, ‘দুনিয়া আর চাইনা’ (১৯২৩), গল্প-সংকলন, ‘নামাজের ফল’, সামাজিক-ধর্মীয় উপন্যাস, ‘বেহেস্তের ফুল’, ধর্মীয় উপন্যাস, ‘দুনিয়া কেন চাই না’, উপন্যাস ও ‘রমণীর বেহেস্ত’, পারিবারিক উপন্যাস।
এছাড়াও নজিবর রহমান কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন কিন্তু এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় না। দু’টি তথ্য থেকে এ সম্পর্কে কিছুটা অবগত হওয়া যায়। বাংলা ১৩২৩ সালে প্রকাশিত হাসন-গঙ্গা বাহমণি উপন্যাসের প্রথম সংস্করণের পরিশিষ্টে প্রদত্ত একটি বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘পারসী কী পহেলী কেতাব’-এর সুচারু ব্যাখ্যা। ছাত্রগণের বিশেষ সাহায্যকারী, প্রত্যেক শব্দের, বাক্যের ও পঙ্ক্তির বিশদ ব্যাখ্যা সরল বাংলা ভাষায় লিখিত।...’ সম্ভবত তিনি রাজশাহী মাদ্রাসায় শিক্ষকতার সময় ছাত্রদের প্রয়োজনীয়তার বিষয় উপলব্ধি করে এ ধরনের পুস্তক রচনা করে থাকবেন। অবশ্য একথাও সত্য যে, সেকালে মাদ্রাসা ছাড়া সাধারণ শিক্ষা-ব্যবস্থায়ও আরবি ফারসি ভাষা শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ছিল এবং তিনি একজন পেশাদার কৃতি শিক্ষক হিসাবে এ জাতীয় পাঠ্যগ্রন্থ রচনা করা তাঁর পক্ষে একান্তই স্বাভাবিক।
এ সম্পর্কিত প্রাপ্ত দ্বিতীয় তথ্যটি হলো: নজিবর রহমানের মৃত্যুর পর কলকাতার সাপ্তাহিক সোলতান (নব পর্যায়)-এর ৯ই কার্তিক, শুক্রবার, ১৩৩০ তারিখের সংখ্যায় যে ‘শোক-সংবাদ’ ছাপা হয়, তার একস্থানে উল্লেখ করা হয় যে, ‘ইনি একজন প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক ছিলেন। ইহার রচিত ‘বিলাতী বর্জ্জন রহস্য’, ‘আনোয়ারা’, ‘হাসন-গঙ্গা বাহমণি’, ‘গরীবের মেয়ে’ ও মুসলমান সমাজের কতিপয় পাঠ্য পুস্তক রহিয়াছে।’ উদ্ধৃত সংবাদ থেকে তাঁর রচিত পাঠ্য-পুস্তকের নাম, সংখ্যা ও সুনির্দিষ্ট কোন কিছু জানা না গেলেও তিনি যে একাধিক পাঠ্য-পুস্তকের প্রণেতা ছিলেন সে সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে।
এখানে নজিবর রহমানের যেসব গ্রন্থের উল্লেখ করা হলো তার মধ্যে নয়টি তাঁর জীবনকালে প্রকাশিত হয়। বাকি চারটি বইÑ ‘বেহেস্তের ফুল’, ‘নামাজের ফল’, ‘রমণীর বেহেস্ত’ ও ‘দুনিয়া কেন চাই না’ প্রকাশের জন্য লেখক কলকাতায় প্রকাশকের কাছে গিয়েছিলেন, ফিরে আসেন অসুস্থ হয়ে। পরে এ বইগুলোর আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি। লেখক এরপর আর সুস্থ হয়ে ওঠেন নি। ফলে তাঁর পক্ষে ঐ পা-ুলিপিগুলোর খোঁজ-খবর নেয়া সম্ভব হয় নি। এগুলো পরে মুদ্রিত হয়েছে কিনা তা জানা যায় না। ফলে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নজিবর রহমানের পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যকর্মের হদীস পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি তাঁর পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যালোচনা করাও অনেকটা দুরূহ। এ প্রসঙ্গে নজিবর রহমানের জীবনীকার খন্দকার বশিরউদ্দিন বলেন:
“শেষবারের মত তিনি চারখানা বইয়ের পা-ুলিপি নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন এবং কলকাতা থেকে ফিরে এসেই একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এ সময় তাঁর দুরারোগ্য যক্ষ্মারোগ দেখা দেয়। অবশেষে ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর তারিখে ৬৫ বছর বয়সে হাটিকুমরুলস্থ স্বীয় বসতবাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।” (খন্দকার মোঃ বশিরউদ্দিন: মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ, এপ্রিল ১৯৮৭, পৃ. ৩০)
এ প্রসঙ্গে খন্দকার বশিরউদ্দিন আরো বলেন: “তাঁর পরলোকগমনের প্রায় ছ’মাস পরে আমি ও হামিদুর রহমান নামক আমার এক মামাশ্বশুর (নজিবর রহমানের শেষ পক্ষের শ্যালক) কলকাতায় যেয়ে উক্ত পা-ুলিপিগুলির সন্ধান করি, কিন্তু মখদুমী লাইব্রেরীর মালিক মোবারক আলী সায়েব সে সম্বন্ধে কিছুই জানেন না বলে মন্তব্য করেন। অতঃপর আমরা অনুমান করে আরও তিন চারজন মুসলমান প্রকাশকের নিকট যেয়ে এতদসম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তাঁরাও তাঁদের নিকট নজিবর রহমানের কোন পা-ুলিপি নেই বলে মন্তব্য করেন, কাজেই আমরা হতাশ হয়ে ফিরে আসি। আমার মনে হয়- মখদুমী লাইব্রেরীর মালিক অথবা অন্য কোন প্রকাশক নজিবর রহমানের মৃত্যুর সংবাদ শুনে উক্ত পা-ুলিপিগুলো গোপন করেন এবং পরে বইয়ের নাম ও গ্রন্থকারের নাম পরিবর্তন করে উহা প্রকাশ করেন।” (প্রাগুক্ত পৃ. ৩২-৩৩)।
এ কারণে নজিবর রহমানের মৃত্যুর দীর্ঘকাল পরেও তাঁর সমগ্র রচনাবলী নয়, খ-িতভাবেই তাঁর আলোচনায় সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এখানে সমাজের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে পারে। এত জনপ্রিয় একজন লেখকের রচনাবলী যথাযথরূপে সংরক্ষিত না হওয়া জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্যজনক। 
সীমাহীন অবহেলা আর উপেক্ষার মধ্যেও নজিবর রহমান এখনো অত্যুজ্জ্বল। তাঁর রচিত ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস কালজয়ী জনপ্রিয় উপন্যাসসমূহের অন্যতম, ক্লাসিক মর্যাদায় অভিষিক্ত। মৃত্যুর প্রায় শতাব্দীকাল পরেও তাঁর সাহিত্য পাঠকের হৃদয়ে মহিমময় দ্যুতিতে সমুজ্জ্বল। কথাসাহিত্য রচনায় তিনি যে নতুন ধারার প্রবর্তন করে গেছেন, সে ধারা অনুসরণ করে পরবর্তীতে মোহাম্মদ কোরবান আলী ‘মনোয়ারা’ (১৯২৫), আব্দুল ফাত্তাহ কোরেশী ‘সালেহা’ (১৯২৬) এবং মোজাম্মেল হক ‘জোহরা’ (১৯২৭) উপন্যাস রচনা করেন। শেখ ইদরীস আলী রচিত ‘ ‘প্রেমের পথে’ গ্রন্থটি নজিবর রহমানের ‘প্রেমের সমাধি’রই প্রতিফলন। এছাড়া, ডা. লুৎফর রহমান ও কাজী ইমদাদুল হকসহ পরবর্তী অনেক মুসলিম সাহিত্যিক নজিবর রহমানের উপন্যাসের দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাঙালি মুসলিম সমাজে যে নবজাগরণের প্রেরণা সৃষ্টি হয়, তার ফলে অনেক কবি-সাহিত্যিক, লেখক-সাংবাদিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আবির্ভূত হন। নজিবর রহমান তাঁদের অন্যতম। এ সময় তাঁদের মধ্যে যেসব সাধারণ গুণ ও মূল্যবোধ পরিলক্ষিত হয়, তা হলোÑ স্বদেশ ও স্বজাতিপ্রেম, জাতীয় উন্নয়ন, উন্নত মহৎ চরিত্র ও মানবিক সৎ গুণাবলী ইত্যাদি। ঐ সময়কার প্রায় সব মুসলিম কবি-সাহিত্যিক-লেখক-সাংবাদিকের মধ্যেই কমবেশি এসব গুণের সমাহার লক্ষণীয়। কারো কারো মধ্যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা ও যুক্তিবাদিতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তবে তাঁদের অনেকেই প্রচলিত সমাজ-মানসিকতার সাথে সহজে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে পারেননি। ফলে অনেকে সে পথ পরিহার করেন অথবা সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু নজিবর রহমান মুসলিম সমাজের মূলধারাকে, তাদের চিন্তা-চেতনা, আদর্শ, জীবন-ভাবনা ও স্বপ্ন-কল্পনাকে যথাযথরূপে বাস্তবায়নের প্রয়াস পেয়েছেন। তাই সমকালীন মুসলিম সমাজে তিনি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং শতাব্দীকাল পরেও তিনি স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন।
চিরায়ত বাঙালি সমাজ সর্বদা বিশেষ মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের উপর সংস্থাপিত। সে মূল্যবোধ ও বিশ্বাস কালক্রমে পরিবর্তিত-বিবর্তিত হলেও কোন না কোন একটি বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরেই এ সমাজ টিকে আছে ও অগ্রসর হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগ্রত মুসলিম সমাজ তাদের নিজস্ব ধর্মীয়বোধ, বিশ্বাস, জীবনধারা ও ঐতিহ্য-সংস্কৃতির ভিত্তিতে বিগত পরাধীন জীবনের লাঞ্ছনা-দুর্গতি মুছে ফেলে নতুন সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের আলোকোজ্জ্বল পথের সন্ধান করেছে। নজিবর রহমানও তাঁর সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে ধর্মবিশ্বাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও লালিত স্বপ্নকে স্বসমাজে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন।
রেনেসাঁ বা নবজাগরণের মুল প্রেরণা হলো অতীত ঐতিহ্য ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পুনরুজ্জীবন। তার আলোকে বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু জীবনধারাকে পাল্টে নতুন প্রতিশ্রুতিশীল জীবনের উদ্দীপনাকে ধারণ করে নব জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়া। সমাজ-ধর্ম-জাতির ধারক-বাহক হলো মানুষ। মানুষ বা সমাজের পতন ঘটে নৈতিকতার অভাব ও মূল্যবোধের অবক্ষয় হলে। অন্যদিকে, মানুষ যখন বিশেষ কোন নৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও শাশ্বত মূল্যবোধ ধারণ করে তার আদলে জীবন ও সমাজকে গড়ে তুলতে চায়, তখন মানুষ বা সমাজের উন্নতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। নজিবর রহমানের সাহিত্যচর্চার মূল প্রেরণা হিসাবে উন্নত নৈতিক চেতনা ও শাশ্বত মূল্যবোধ কাজ করেছে। তিনি যে সময় জন্মগ্রহণ করেন, তখন পরাধীন ও অধঃপতিত বাঙালি মুসলিম সমাজে নবজাগরণের সূচনা হয়েছে। এ নবজাগরণের মূল ভাব ও প্রেরণা তাঁর মধ্যে প্রবলভাবে কাজ করেছে এবং তাঁর সাহিত্যে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে।
নজিবর রহমান চিরায়ত ইসলাম ধর্মীয় বোধ-বিশ্বাস ও জীবনধারাকে অবলম্বন করে এবং ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য-সংস্কৃতির আলোকে বর্তমান বাঙালি মুসলিম সমাজকে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই তাঁর লেখনী পরিচালনা করেন। এদিক থেকে তাঁকে অনেকে পুরাতনপন্থী বা অতীতমুখী মনে করতে পারেন। কিন্তু তাঁর গ্রন্থের ভাব-বিষয় ও চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করলে এটা সুস্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করা যায় যে, তিনি কোন অবস্থায় পুরাতনপন্থী বা অতীতমুখী ছিলেন না। তিনি ইসলামী জ্ঞান ও জীবনাচারের সাথে আধুনিক প্রগতিশীল  বৈজ্ঞানিক সভ্যতার সমন্বয় ঘটিয়েছেন। সমাজের অশিক্ষা-কুশিক্ষা ও বিভিন্ন ধরনের পশ্চাদমুখী প্রথা-প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি শিক্ষার আলোকে, বিষেশত নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রচলনের মাধ্যমে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ-মানসিকতার পরিবর্তন সাধনে সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁর লেখায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, শিক্ষালাভের মূল লক্ষ্য চাকরি করা নয়, শিক্ষার দ্বারা মানুষ নিজেকে জানতে পারে, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ও স্বাবলম্বি হয়ে ওঠে ও প্রকৃত মনুষ্যত্ব অর্জন করে। সেজন্য দেখা যায়, তাঁর উপন্যাসের অনেক চরিত্র চাকরি করাকে জীবনের মূল উদ্দেশ্যরূপে গণ্য করেনি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ইত্যাদি নানা ধরনের অপ্রচলিত (হড়হ-ঃৎধফরঃরড়হধষ) অর্থনৈতিক কায়-কারবারের মাধ্যমে আর্থিক উন্নতি ও সমাজ উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এরদ্বারা নজিবর রহমানের প্রগতিশীল উন্নয়নমুখী প্রাগ্রসর চিন্তা-চেতনার পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। 
নজিবর রহমানের বিভিন্ন গ্রন্থে যেসব নারী চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে নেয়া। তিনি বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন ধরনের নারী চরিত্র যথাযথরূপে অঙ্কন করে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর অঙ্কিত প্রধান নারী চরিত্রসমূহ প্রায় সকলেই অভিজাত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে তাঁর টিপিকাল ধরনের মন-মানসিকতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে এটা সহজেই উপলদ্ধি করা যায় যে, তিনি এসব চরিত্রের মাধ্যমে যে বিশেষ সমাজের রূপ অঙ্কন করতে চেয়েছেন এবং সমাজকে যে বিশেষ ধরনের মেসেজ দিতে চেয়েছেন, সেজন্য এ ধরনের নারী চরিত্র চিত্রণ বলতে গেলে, একরকম অপরিহার্য ছিল। 
নজিবর রহমানের আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি প্রচলিত বইয়ের ভাষার সাথে তাঁর নিজস্ব ধর্মীয় পরিভাষা সহজ প্রাঞ্জলভাবে ব্যবহার করেছেন। ঐ সময় বইয়ের ভাষা হিসাবে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষাকেই আদর্শ মনে করে হতো। সকলে তাঁর মত অলংকারবহুল প্রাঞ্জল সাধু বাংলা ব্যবহারে সচেষ্ট ছিলেন। হিন্দুরাতো বটেই মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যেও মীর মোশাররফ হোসেন, মুন্শী মেহেরুল্লাহ্, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, শেখ হবিবর রহমান, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখ সকলেই বঙ্কিমচন্দ্রীয় ভাষার আদলে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। নজিবর রহমানও তাঁদেরই অনুসারী। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো তিনি সাধুবাংলার সাথে আরবি-ফারসি ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। এজন্য তাঁকে যথেষ্ট সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি তাঁর সমালোচনায় হতদ্যম হয়ে পড়েননি। কারণ এসব পরিভাষা ব্যতিরেকে মুসলমানদের ধর্মীয় রীতিনীতি, আদব-অনুষ্ঠান, মুসলিম সমাজচিত্র ইত্যাদি সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিল না। তাই একজন প্রকৃত জীবনশিল্পীর পক্ষে এ দিকটা উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। তিনি যে, এ ব্যাপারে যুক্তিযুক্ত ও সঠিক ছিলেন, তা তৎকালীন অনেক হিন্দু প-িত কর্তৃক তাঁকে সমর্থন করার মাধ্যমে প্রমাণ হয়। রাজশাহী কলেজের খ্যাতনামা বিজ্ঞানাচার্য ও সাহিত্য সমিতির তৎকালীন সম্পাদক শ্রীযুক্ত পঞ্চানন নিয়োগী মন্তব্য করেনÑ
‘‘আপনার ‘আনোয়ারা’ পড়িলাম শুধু নভেল পড়ার মত পড়ি নাই, সবিশেষ মনোযোগ দিয়াই পড়িয়াছি। পুস্তকখানির ভাষা খাঁটি বাঙ্গালা ভাষা, মুসলমানী ভাষা আদৌ নহে। তবে আপনি মধ্যে মধ্যে অনেকগুলো ফার্সি ব্যবহার করিয়াছেন, যথা আম্মাজান (শাশুড়ী), কলেজা (হৃৎপি-), দুলামিঞা (জামাতা), বরকত (আয়, উন্নতি),  খোস এলহানে (সুমধুর স্বরে) প্রভৃতি। হিন্দু পাঠকবর্গের নিকট এই সকল শব্দ অবোধ্য হইলেও এই সকল শব্দ ব্যবহার আদৌ অন্যায় হয় নাই, কারণ মুসলমান সমাজে এ সকল শব্দ নিত্য ব্যবহৃত হইয়া থাকে। মনে রাখিতে হইবে, বাঙ্গালা ভাষার একচতুর্থাংশ আরবি-ফারসি হইতে প্রাপ্ত। মনে রাখিতে হইবে যে, বাঙ্গালা শুধু হিন্দুর মাতৃভাষা নহে, মুসলমানদের মাতৃভাষাও বটে। সেই জন্য মুসলমানদের লিখিত বাংলা ভাষায় মুসলমান সমাজে প্রচলিত দুই একটা আরবি-ফারসি কথা না থাকাই আশ্চর্য্যরে বিষয়। আপনি হিন্দু পাঠকবর্গের সুবিধার জন্য ফুটনোট এই সকল কথার অর্থ দিয়া বিশেষ বিবেচনার কার্য করিয়াছেন। আমার মনে হয়, মুসলমানী বাঙ্গালা নামক বিকৃত কথিত ভাষার হাত হইতে নিস্তার পাইতে হইলে আপনার পথই  প্রশস্ত। এরূপ ভাষার প্রচলন হইলে কালে মুসলমান সমাজেই মাইকেল, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের ন্যায় কবি ও লেখক জন্মগ্রহণ করিবেন। আপাতত মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের মধ্যে বঙ্গ-সাহিত্যের লেখক খুবই কম। আশা করি, আপনার সৎদৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া অনেক মুসলমান মাতৃভাষার সেবা করিতে আরম্ভ করিবেন।” (শ্রী পঞ্চানন সরকার (এমএ, বিএল) সম্পাদিত, সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, রংপুর শাখাঃ ত্রৈমাসিক, তৃতীয় ভাগ, সন ৩১৫ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১২৯)।
নজিবর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘হাসন-গঙ্গা বাহমনি’র ভূমিকায় লিখেছেনঃ “আমার প্রথম উপন্যাস ‘আনোয়ারা’তে পানি, ফুফু, আম্মাজান প্রভৃতি মুসলমানী কথা ব্যবহার করায়, খবরের কাগজে একটু আন্দোলনের তরঙ্গ উঠিয়াছিল, কিন্তু সুখের বিষয় তাহার গায়ে লাগিবার পূর্Ÿেই বিপরীত তরঙ্গাঘাতে তখনই প্রতিহত হইয়াছে।
“মহামহোপাধ্যায় প-িত শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী গত বৎসর সাহিত্য-সম্মিলন-ক্ষেত্রে বলিয়াছেন, যাহা চলিত, যাহা সকলে বুঝে, তাহাই চালাও। যাহা চলিত নয়, তাহা আনিও না। যাহা চলিত তাহা ইংরেজীই হউক, পারসীই হউক, সংস্কৃতই হউক চালাও। প্রবীণ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতটী আমাদের বড়ই পছন্দ। তাই উপস্থিত গ্রন্থেও পানি, জানানা, একছার প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারে সঙ্কোচ বোধ করি নাই। পরন্তু হিন্দু মুসলমানের হরিহরবৎ মিলন যেমন উভয় সম্প্রদায়ের উদার-চরিত্রগণের অভিন্ন অভিপ্রায়; তেমনি উভয় জাতির ধর্মমূলক প্রাণের শব্দ প্রসূনগুলি ভা’য়ে, ভা’য়ে, গায়ে গায়ে মিলা মিশা থাকার ন্যায় এক-সূত্রগ্রথিত থাকা আমরা বাঞ্ছনীয় মনে করি। তাহাতে পরস্পর জাতীয় প্রীতিবর্ধনের আশা করা যায়।” (‘চাঁদতারা বা হাসনগঙ্গা বাহমনি’ উপন্যাসের ভূমিকা)।
উপরোক্ত দু’জন প্রখ্যাত হিন্দু প-িতের দৃষ্টিতে নজিবর রহমানের আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার কোন অন্যায় বা বিষদৃশ মনে না হওয়ায় বরং তা বাঙালি মুসলমানের জীবনায়নকে সহজ-স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অপরিহার্য গণ্য হওয়ায় নজিবর রহমান এতে আরো উৎসাহিত হয়ে তাঁর পরবর্তী বিভিন্ন গ্রন্থে এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
ইদানিং নজিবর রহমানের সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ও এম.ফিল পর্যায়ে গবেষণা হচ্ছে। নজিবর রহমান বাংলা সাহিত্যে বিশেষত বাংলা কথাসাহিত্যে ইসলাম, মুসলিম সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জীবনধারা সমন্বিত এক নতুন বিষয়-বৈভব ও চিন্তাচেতনা নিয়ে সাহিত্য রচনার সূত্রপাত করেন। ইতঃপূর্বে বাংলা কথাসাহিত্যের রচয়িতা ছিলেন সকলেই হিন্দু। সেখানে হিন্দুধর্ম, হিন্দুদের দেব-দেবী, পূজা-পার্বণ, মঠ-মন্দির, বিধবা রমণীর অবৈধ প্রেম, অবিবাহিতা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অসামাজিক প্রেম-প্রণয়, হিন্দু সভ্যতা-কৃষ্টি ও জীবনধারা নিয়ে যে কথাসাহিত্য রচিত হয়েছে, তা মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ কারণে মুসলিম সমাজ সে সাহিত্য পাঠে অনীহা প্রকাশ করেছে। কিন্তু নজিবর রহমান বাংলা কথাসাহিত্যে যে নতুন বিষয়-বৈভব, জীবনচৈতন্য, ধ্যান-ধারণা ও নীতিবোধ শাসিত মহত্তম অনুপ্রেরণাদায়ী জীবনালেখ্য তাঁর সাহিত্যে রূপায়িত করলেন, তা শুধু বাঙালি মুসলিম সমাজ সাগ্রহে লুফে নিয়েছে তাই নয়, বাঙালি হিন্দুরাও তার প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়। মূলত বাংলা কথাসাহিত্যে নজিবর রহমান এক্ষেত্রে এক নতুন নীতিমালা ও আদর্শ স্থাপন ও সংযোজন করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি মহান পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এবং এজন্য তিনি চিরকাল সসম্ভ্রমে স্মরণীয় বরণীয় হয়ে থাকবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ