ঢাকা, শুক্রবার 20 January 2017, ৭ মাঘ ১৪২৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন্দে আলী মিয়ার কবিতায় লোকজ উপাদান

ড.আশরাফ পিন্টু : লোকসংস্কৃতিই হলো আমাদের নিজস্ব সংসকৃতি। আকাশ সংস্কৃতির প্রাবল্যে লোকসংস্কৃতি আজ অনেকটাই নিষ্প্রুভ। তবুও আধুনিক কালের কবিদের কবিতায় কখনো সচেতন ভাবে কখনো অজান্তে ধরা পড়েছে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান। আধুনিক কবিদের মধ্যে বন্দে আলী মিয়ার কবিতার মধ্যে আমরা প্রচুর পরিমাণে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের সন্ধান পাই। ত্রিশ-যুগের কবি হয়েও তিনি বেছে নিয়েছিলেন ছায়ানিবিড় মায়াময় গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষকে।
লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে আমরা বন্দে আলী মিয়ার কবিতায় লোককথা, কিংবদন্তি, লোকবিশ্বাস বা লোকসংস্কার, প্রবাদ ও বাগধারা, লোকভাষা ও লোকশব্দ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে। এই উপাদানগুলো ব্যবহারে তার কবিতাগুলোকে করেছে শিল্পগুণে ঋদ্ধ। এখন আমরা এসব উপাদান সমৃদ্ধ কবিতার পঙ্ক্তিগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করব।
লোককথা
বাংলাদেশ লোককথায় ঋদ্ধ। লোককথায় বিভিন্ন সমার্থক শব্দ আছে তা হলো: লোককাহিনী, লোকগল্প, কেচ্ছা-কাহিনী ইত্যাদি। মৌখিক ভাবে যে সব গল্প যুগ যুগ ধরে গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে সেগুলোই মূলত লোককথা বা লোককাহিনী। লোককথার বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ আছে। যেমন, রূপকথা, উপকথা, পুরাণকথা, ব্রতকথা ইত্যাদি। কবি বন্দে আলী মিয়ার “নদের চাঁদ কুমির হয়ে যায়” শিরোনামের কবিতাটিতে লোককাহিনীর সুন্দর চিত্র ফুটে উঠেছে। মূলত প্রচলিত লোককাহিনীটিকে কবি পদ্যকারে বর্ণনা করেছেন। মন্ত্র পড়ে গায়ে জল ছিটিয়ে নদের চাঁদের কুমির হওয়া এবং পুনরায় মানুষে ফিরতে না পারার যে মর্মবেদনা তা কাব্যিক ভাষায় হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছেÑ
কুমিরের মুখে ভাষা নাই তো যে সান্ত¦না দেবে মায়
হাত উঠাইয়া ললাট দেখায় অকথিত বেদনায়।
ছলছল চোখে চাহিয়া সে রয় অভাগী মায়ের মুখে
তার পরে গিয়ে ডুব দিলো ধীরে কাজলদীঘির বুকে।
লোককথার অন্যতম প্রধান শাখা রূপকথা। আদিমকাল থেকে মানুষের মনে গল্প বলা বা শোনার যে অদম্য নেশা নিহিত আছে ; সেই প্রবণতাকে রূপ দিতেই মানুষ কল্পনার রঙে রাঙিয়ে বাস্তবের মিশেল দিয়ে তৈরি করেছে রূপকথা। রূপকথা শিশুমনের উপযোগী হলেও এর আড়ালে থাকে জীবনের গল্প। বন্দে আলী মিয়ার কাব্যে রূপকথার প্রসঙ্গ এসেছে বেশ কয়েকটি কবিতায়। “কুচবরণ কন্যা” রূপকথাধর্মী শিরোনামে তাঁর একটি কবিতা রয়েছে। এ কবিতায় রূপকথার প্রসঙ্গ তেমন না থাকলেও “নানা আর নানী” কবিতায় পাওয়া যায় রূপকথার দৃশ্যপটÑ
কত না রাজার কত না কাহিনী ব্যাঙ্গম ব্যাঙ্গমীর কথা
রাজার ঝিয়ারি ঘুম যায় তার শিয়রেতে জাগে তোতা।
তেপান্তরের মাঠেতে কে আজ ঘোড়ায় চড়িয়া যায়
সামনে তাহার রাক্ষপুরী- দৈত্য পিছনে ধায়।
কিংবদন্তি
কিংবদন্তি হলো লোক-প্রচলিত এক প্রকার কল্পকথা। সাধারণত ছোট পরিসরে কোনো ব্যক্তি , স্থান বা ঘটনার নামকরণের ইতিবৃত্ত নিযে কিংবদন্তি গড়ে ওঠে। বন্দে আলী মিয়ার বেশ কয়েকটি কবিতা কিংবদন্তি নিয়ে রচিত হয়েছে। “ময়নামতীর বটগাছ”, “সোনাপাতিলার বিল”, “ডাকাতমারির ভিটা”, “ভাতার মারার পাথার”, “ভাড়ালার মসজিদ” ইত্যাদি কবিতা উল্লেখযোগ্য। “ময়নামতীর বটগাছ”-এ কিংবদন্তির লোকবিশ্বাসকে দিয়েই কবিতাটির পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে। কেননা-
মাদার গাজী সে নাকি এ গাছের পরে
বারোমাস বসবাস করে।
তাহারি জটার প্রায়
থলো থলো বও সব নেমেছে তলায়।
তাই এই মাদার গাজীর তরে মানত করে তা ভঙ্গ করলে পরিণতি হবে মফিজ আলীর মতো-
ব্যামোতে ভুলিয়া বহুদিন হলো মরেছে মফিজ আলী
গাঁর লোক কয়, ‘বিদায় আপদ-গিয়েছে চোখের বালি।
লোকবিশ্বাস বা লোকসংস্কার
লোককাহিনী বা কিংবদন্তিকে ঘিরেই মানুষের মনে লোকবিশ্বাস বা লোকসংস্কার গড়ে ওঠে। সাধারণত অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মনে এই লোকবিশ্বাস গড়ে উঠলেও শিক্ষিত মানুষের মনেও তা জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে প্রভাব বিস্তার করে। তাই একে জীবন থেকে একবারে আলাদা করা যায় না। বন্দে আলী মিয়ার অনেক কবিতাতেই দেখা যায় লোকবিশ্বাসের প্রয়োগ। তাঁর “ভাড়ালার মসজিদ”, “ঝপঝপের দহ”, “সোনাপাতিলার বিল” ইত্যাদি কবিতাগুলো রচিত হয়েছে লোকবিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই। “ভাড়ালার মসজিদ’’-এ দেখা যায়-
যে যাহা হোথা করেছে মানত বিফল হয়নি তার
বিপদে পড়িলে তখনি সেথায় আসে সবে বার বার।
“ঝপঝপের দহ”-এর পাশে যে বাবলা গাছটি রয়েছে তার শাখা পাতা নেই; কিন্তু-
ন্যাকড়া ঝুলিছে সব ডালে তার এতটুকু নাহি ঠাঁই;
জুতো পাকেল কঞ্চির আগা বেঁধেছে কে নিরিবিলি
‘তেনাছেঁড়া গাছ’ নাম দেছে কবে গাঁয়ের লোকেরা মিলি।
কবে থেকে এই মানত পূজা-অর্চনা শুরু হয়েছে তার ইতিহাস জানা যায় না; তবে ‘ভিন গাঁ হইতে লোকেরা আসিয়া সুধায় ইহার খোঁজ’।
প্রবাদ ও বাগধারা
প্রবাদ এক প্রকার লোকোক্তি যা জ্ঞানগর্ভ এবং রূপকধর্মী। প্রবাদের স্রষ্টা সাধারণ মানুষ। এই সাধারণ মানুষের ব্যবহারের মধ্য দিয়েই প্রবাদ গড়ে ওঠে এবং এক সময় তা সার্বজনীনতায় রূপ নেয়। বাঙালির স্বকীয় চিন্তাধারা, রীতি-নীতি, চাল-চলন, প্রাণসত্তা প্রভৃতি বাংলাপ্রবাদের মধ্যে পাওয়া যায়। লোকসাহিত্যের অন্যান্য উপাদানের মধ্যে প্রবাদ সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু অধিকতর ভাব প্রকাশ্যে উৎকৃষ্ট। বাগধারা প্রবাদেরই একটি অংশ বিশেষ। যার আরেক নাম প্রবাদমূলক বাক্যাংশ। বন্দে আলী মিয়ার কবিতায় প্রবাদ ও বাগধারা ব্যবহারে ভাষা হয়েছে প্রাঞ্জল ও পঙ্ক্তিগুলো হয়ে উঠেছে স্পষ্টতর। “দুইবন্ধু” কবিতায় ধনী ও দরিদ্রের পার্থক্য বোঝাতে ‘দিন আনে দিন খায়’ প্রবাদটির ব্যবহার করেছেন সুনিপুণভাবে। মহিম ও সিরাজ দুই বন্ধু ‘মহিমেরা ধনীলোক’ আর-
বড়ই গরীব সিরাজের বাবা ‘দিন আনে দিন খায়
সকাল দুপুর মাঠে কাজ করে খালি গায় খালি পায়।
“দুর্দিন” কবিতায় ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’ প্রবাদটিকে ভেঙে কবি নিজের মতে করে ব্যবহার করেছেন-
অভাব হইলে স্বভাব কখনো যায় না ঠিক রাখা।
এভাবে “বোকা ঝড়–র কা-” কবিতায়ও দেখি ‘গাধা পিটায়ে মানুষ করা’ প্রবাদটি কবি প্রয়োগ করেছেন এভাবে-
কত গাধা পিঠে হাকিম করে দিলাম-
এ ছাড়া ‘‘ময়নামতীর বটগাছ’’ কবিতায় ‘চোখের বালি’ এবং “দূর বিদেশে রইলাম একা” কবিতায় ‘তুষের আগুন’ বাগধারার ব্যবহার েেরয়ছে।
লোকভাষা ও লোকশব্দ
ভাষাবিজ্ঞানী ম্যাক্সমুলার বলেছেন, “ঞযব ৎবধষ ধহফ হধঃঁৎধষ ষরভব ড়ভ ষধহমঁধমব রং রহ রঃং ফরধষবপঃং.” অর্থাৎ ভাষার প্রকৃত এবং স্বাভাবিক জীবন তার উপভাষাগুলোতে। এই উপভাষা বা লোকভাষা (আঞ্চলিক ভাষা) লৌকিক জীবন যাপনের প্রধান বিষয় যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে লোকসমাজ ও সংস্কৃতি। এই লোকভাষাকে সমৃদ্ধ করে বিভিন্ন আঞ্চলিক বা লোকশব্দ। বন্দে আলী মিয়া লোকজীবন ও পল্লীপ্রকৃতি নিয়ে কবিতা লিখলেও লোকভাষা (আঞ্চলিক ভাষা) নিয়ে বেশি কবিতা নেই। তবে লোকজ শব্দের ব্যবহার দেখা যায় কবিতাতে। তার কিছু গীতিধর্মী কবিতায় লোকভাষার প্রয়োগ আছে-
বন্ধুর আগে কইয়ো খবর
শুইন্যা তুমি যাও
আমার দেশের চাঁদ সুরুযু
দেখতে কি ভাই পাও?
(বন্ধুর আগে কইয়ো খবর)
এমনি আরেকটি কবিতা “দূর বিদেশে রইলাম একা’-তেও ফুটে উঠেছে পাবনা জেলার লোকভাষা-
সাঁচি পানের খিলি দিত
তইলা আমার গালে
জাড় কালেতে সরাপিঠ্যা রসের পিঠ্যা করে
মাথায় কিরা দিয়া আমায় মুখে দিত ভরে।
এ ছাড়া তাঁর বিভিন্ন কবিতায় কয়োড়, কুটুমপক্ষী, বিহান, আঙ্খী, দেয়া, মলাম, হুড়ম, মিটকুমড়া, ডুলি, কুড়ানী, সাজি, মুড়কি, মাজা, সোয়ামি, জোত, পোঁটলা ইত্যাদি লোকজ শব্দের সুনিপুণ ব্যবহার দেখা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, কবি বন্দে আলী মিয়ার কবিতায় ফুটে উঠেছে লোকজজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার এক চিত্রময় রূপ। কাবতায় তিনি বিভিন্ন লোকজ-উপাদান ব্যবহার করে তাকে আরো জীবন্ত, হৃদয়গ্রাহী ও বাস্তবস্পর্শী করে তুলেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ