ঢাকা, শুক্রবার 20 January 2017, ৭ মাঘ ১৪২৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সেই মুুখ

ফজলে রাব্বী দ্বীন : ডা: তরিকুল ইসলাম এ শহরের জনপ্রিয় একজন ডাক্তার। আজকাল প্রায় সময়েই অসাধ্য কাজকেও সাধ্যে পরিণিত করা তার একটা স্বভাবে পরিণিত হয়ে গেছে। যে সব রোগীকে এ শহরের ডাক্তারেরা পুরু দমে ভালো করার  কোন আশ্বাস দিতে পারে না সেই সমস্ত রোগীকেই তরিকুল সাহেব কেমন করে যেন বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে একদম সারিয়ে তুলেন। এ যেন বিষ্ময়ের কোন শেষ নেই পুরু জেলার মানুষদের মধ্যে। এমন অনেক ঘটনার-ই চমৎকার ক্রিয়া স্থাপন করে জনমহলে বেশ প্রিয়তার পরিচয়ে দাড়িয়ে আছেন এ ডাক্তার।
ডা: তরিকুল ইসলামের এমন সব প্রশংসা এক লোকের মুখ থেকে শুনে বেশ চমকে উঠেছিলাম। এত ভালো একজন ডাক্তার এ শহরে আছে আগে তো জানা ছিল না। এদিকে মা-টা চিকিৎসাহারা হয়ে মরছে। কিন্তু পরক্ষণেই সেই  লোকটার মুখে আরেকটা কথা শুনে বুকটা আমার ধড়াৎ করে উঠল। সেই ডাক্তার নাকি টাকা ছাড়া কিচ্ছু বুঝেনা। টাকার গল্পটা সবার আগে সেরে নেয়। তারপর অন্যকিছু। প্রচুর টাকা পেলে যেকোন অসাধ্য কাজকেই সাধ্য পরিণিত করে নচেৎ নয়।
মায়ের অসুস্থতার তীব্রতা বাড়ছে তো বাড়ছেই। অনেক ডাক্তারের কাছে ঘুরে সব সম্বল ফুরানো প্রায় শেষ। কিন্তু লাভের ঘরে শূন্য ছাড়া কিছুই আর জুটেনি। এদিকে হাতের কাছে পাচহাজার টাকা ছাড়া আর একটা পয়সাও নেই। তাহলে কি করে ডা: তরিকুল ইসলামের কাছে যাবো। না, এত ভাবনার আর সময় নেই। যা করতে হবে তাড়াতাড়ি। মা এখনও ভ্যানগাড়ির উপর শুঁয়ে শুঁয়ে কোঁকাচ্ছে। এক দৌড়ে ভ্যানগাড়ির কাছে এসে চালককে বললাম জলদি ডাঃ তরিকুল ইসলামের চ্যাম্বারে নিয়ে যেতে। তিনি আর দেরী না করে জলদি সেই ডাক্তারের ক্লিনিকের দিকে রওনা দিলেন।
বেলা পাচটা। অনেকক্ষণ বসে থেকে ডাক্তারের সাথে দেখা করার যখন একটা সুযোগ এল তখন ভেতরে ঢুকেই চমকে উঠলাম। ডাক্তারকে কেমন যেন পরিচিত পরিচিত মনে হল। পরক্ষণে হঠাৎ মনে পড়ল পনের সালের শেষের দিকে উনিই তো আমাদের কলেজে একটা সাহিত্যিক প্রোগ্রামে প্রধান অতিথি হিসাবে গিয়েছিলেন। যাক্ ভালোই হলো, মনে মনে কিছুক্ষণ আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করে তারপর উনাকে বললাম, ‘স্যার আমাকে চিনেছেন? সেই গতবছরের কথা। আপনিই তো আমাকে কলেজের সেরা সাহিত্যিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারপর একটা ক্রেস্ট প্রদান করেছিলেন। মনে পড়ে কি?’
‘তুমি কি আমায় এসব বলতে এসেছ? নাকি অন্যকিছু? আমি কাউকে ক্রেস্ট প্রদান করেনি। আর কাউকে চিনিও না। এই তরিকুল ইসলামের চ্যাম্বারে আসলে কি কি নিয়ম কানুন মানতে হয় সেটা কি তুমি পড়ে আসনি?
লোকটা আমায় চেনে না, মিথ্যা কথা কেন বলল বুঝতে পারলাম না। বাইরে থেকে মাকে ভেতরে নিয়ে আসলাম। উনি দেখেই চোখটা প্রথমে কপালে তুললেন। তারপর মুখটা ভেংচি কেটে বললেন, ‘এ রোগীর চিকিৎসা করতে কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার টাকা নগদ লাগবে। যেহেতু অপারেশন করা জরুরি। যদি পারো টাকার ব্যপারটা মিটিয়ে পরে এসো কেমন?’
‘স্যার এমন কথা বলবেন না, আমার মাকে বাঁচানো খুব জরুরি। কিন্তু এত টাকা কোথায় পাব? এই টাকার জন্যই মেডিকেলে পরিক্ষা দিতে পারছি না। একটু-আকটু পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করি। এতে দুই একশ টাকা যা পাই তা দিয়েই আর কি...!’
‘রাখ তোমার লেখালেখি। ওসব করে কি মজা পাও? টাকা ছাড়া এই তরিকুল আজ পর্যন্ত কোন কাজে হাত দেয়নি আর দেবেও না। যাও এখান থেকে।  কোথা থেকে যে আসে এসব, কে জানে!’
‘স্যার স্যার... দয়া করেন? এমন কথা বলবেন না। নইলে আমার মা আর বাঁচবে না।’ বলতে বলতে ডাক্তারের পা টাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।
‘সিকিউরিটি..সিকিউরিটি...’ ডাক্তার গলা ফাটিয়ে ডাক দিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে দুই-তিনজন লোক এসে হাজির। গলা-ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলো মা আর ছেলেকে।
দুই বছর পেরিয়ে গেছে। মা আজ আর বেঁচে নেই। গ্রামের বাড়িতে একটুকরো ভিটেমাটিটা বিক্রি করে দিয়ে শহরে এসে অতি কষ্টে মেডিকেলে ভর্তি কোচিং করেছি। চাঞ্জও নিশ্চিৎ হয়েছে। এখন আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট। কিন্তু সাহিত্যকে এখনও ছাড়িনি। আজকাল গান লেখার দিকে মনটা কেমন যেন উতলা হয়ে থাকে। গান লিখলে হালকা হয়ে যাই। কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে বসেই অনেক সময় লিখে ফেলি মনের কোণে উঁকি দেওয়া কাঙ্খিত একটা গান। পরিবেশের সাথে হৃদয় যেন জড়িয়ে পড়ে ।
একদিন সকাল বেলা বরাবরের মত ক্যাম্পাসে বসে গানের সুর করছিলাম। হঠাৎ মেয়েলী সুরে পিছন থেকে কে যেন ডাক দিলো আমায়, ‘হ্যালো...,’
মুখটা উপরের দিকে তুলতেই দেখি সুন্দর ফুটফুটে একটা তরুণী। মুখখানা চাঁদের মতো ঝলঝল করছে। গানের খাতাটা হাত থেকে পাশের চেয়ারটার উপরে রেখে ততক্ষণাৎ বললাম, ‘জ্বি, কিছু বলবেন আমায়?’
‘আমি মেডিকেলে নতুন ভর্তি হয়ে এসেছি। নতুন বলে কিছুই চেনা জানা নেই। বাইলজি স্যারের রুমটা কোন দিকে একটু দেখিয়ে দেবেন প্লিজ?’
এত সুন্দর একটা মেয়ের অনুরোধের বাক্যটাকে কি করে সম্মান করবো বুঝতে পারলাম না। শুধু হাতটা নেড়ে দেখিয়ে দিলাম, ‘বাম দিকে..।’ শরতের নীল আকাশে ভেজা ভেজা কোন ভাব নেই। কেবল কাশের মতো কিছু সাদা ছবি ঘুরঘুর করছে মন আকাশে।
একটা পরীর গল্প মনে পড়ে। কি করে সেই পরীটাকে ভুলে যাই! ভেবে পাই না। পরদিন তাই আগের সেই জায়গাতেই গিয়ে বসলাম। আবার যদি হুট করে সেই পরীর মুখখানা একবার দেখতে পাই তাই! খাতাটা বের করে মেয়েটাকে নিয়ে একটা গানের কলিও লিখে ফেললাম। হঠাৎ পিছন থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠের একটা আওয়াজ। সেই মুখ, সেই সুখ। তাকিয়ে দেখি গোলাপের চোখ। আমায় বলল, ‘সেদিন আপনাকে ধন্যবাদ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই আজ ধন্যবাদ দিতে এসেছি।’ শুধু একটু ধন্যবাদের জন্য ফেরা? নাকি আমার মতো মেয়েটাও নীল আকাশে সাদা ছবি দেখতে পায়?
‘না না, ও কিছু না, আপনার নাম কি?’ গলা থেকে কেমন যেন কথাটা বের করে ফেললাম।’
‘ছায়া’, শেরপুর থেকে এসেছি।’
‘শেরপুর মানে, আমিও তো শেরপুর থেকেই এসেছি। ঝিনাইগাতি থানা।’
‘আমাকে হয়ত চিনতে পারবেন, আমার বাবার নাম ডা: তরিকুর ইসলাম। খুব ভালো ডাক্তার নামে উনার পরিচয়ের অভাব নেই।’
কথাটা শুনার সাথে সাথেই নীল দুনিয়া আগুনে পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেল। টাকা আর গলাধাক্কা...।
‘কিছু বললেন?’
‘না না, কিছু না’ বলে বেরিয়ে আসলাম সেখান থেকে। যে মেয়েটার কণ্ঠের ধ্বনি কিছুক্ষণ আগেও মোহন বাঁশির সুর চিনেছিল সেই কণ্ঠেই এখন আমার একরাশ ঘৃণার ছবি। কোথাকার যেন এক রাখাল গাছের ডালের বসে বিষের বাঁশির সুর তুলছে।
থেকে থেকে মেয়েটার প্রতি মনের ভেতর একটা প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল। নিজের বশে আনতে পারলেই এবার প্রতিশোধের কিছুটা আগুন নিভবে।

পরদিন সকাল বেলা। ভার্সিটির বন্ধুরা এসে বলল, সন্ধ্যায় কলেজ ক্যাম্পাসে নাকি সাংস্কৃতিক একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে। একটা গান গাওয়া ছাড়া আমার কোন ছাড় নেই। তালে তালে মিলে যাচ্ছে যাচ্ছে সব। আলো আর ছায়ার মিতালির কি অভাব থাকে? ছায়া তো ছায়াই। পাগলের মতো লিখে ফেললাম একটা গান। সুন্দর সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের আয়োজন দেখে সকল ছাত্র-ছাত্রীরাই এসে উপস্থিত সন্ধ্যায়। অনুষ্ঠানের মাঝখানে ‘মেহেদী হাসান’ বলে ডাক দিতেই স্টেজে উঠে পড়ি। তারপর যা হবার তাই। একটা গানেই সব রহস্য উন্মোচন হয়ে গেল। অভিনয়টা গাছের ডালেই না হয় থাক্  আর ভালবাসার ছায়াটা আমার জন্যই দিওয়ানা হোক। সবার সামনে ভালবাসার গানটা তাকেই উপহার দিলাম। ছায়া বিশ্বাস করতে পারছিল না নিজেকে। শুধু অবাক কাজল কালো চোখ দুটি দিয়ে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। ছলছল করছিল ওর চোখ।
ছায়া এখন আমার নিজের ছায়ার মতন। ওর সাথে অভিনয় করা প্রতিটি মুহূর্ত ভুলতে পারা কঠিন। যদিও সত্যকে আমি মুছে দিতে চাই। নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসে ও আমায়। তারপরও আমার জিদের কাছে সব হার মানতে রাজি। দিন যায় আর মাস কাটে।
ছয় মাস মানে একটা ইতিহাস। ছায়া আমাকে ছাড়া এখন আর কিছুই ভাবতে পারে না। কিন্তু ভয়ংকর একটা শব্দ হচ্ছে ভয়। ছায়া তার বাবাকে ভীষণ ভয় পায়। যে ভয় পৃথিবীর কোন প্রাণীই দেখাতে পারবে না। তবুও সে তার বাবাকে ভীষণ ভালবাসে। আর তার বাবাও জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসে মেয়েকে। মেয়ের জন্য পৃথিবীর সকল অসাধ্যকেও সাধ্য করতে প্রস্তুত। কিন্তু ভালবাসার দুনিয়ায় কি আর ভয় নামের কোন শব্দ উচ্চারিত হয়? ছায়া বুঝতে পারল। বাড়ি গিয়ে সোজা তার বাবাকে বলল আমার কথা। দামী ফোনে তুলা ফটোগ্রাফির  বেশ কয়েকটা চিত্র দেখেই তরিকুল ইসলামের কিছুই আর বুঝা বাদ থাকল না। অমনি ফোনটাকে ফ্লোরে একটা আছাড়। ফলাফল টুকরো টুকরো আর চুরমার। ভীষণভাবে ‘থ’ খেয়ে গেল ছায়া। মায়ের কাছে গিয়ে শুনতে পেল সেই পুরনো ‘টাকা আর গলাধাক্কার’  সব ইভেন্ট। প্রতিবাদী হতে গিয়ে অনির্দিষ্ট দিনের মতো শাস্তি ভোগ করতে হল তাকে। ঘরবন্ধী।
এক সপ্তাহ্ পর। কোথা থেকে যেন ছায়া আমার কাছে হঠাৎ দৌড়িয়ে আসল। তারপর হাত দুটা জাপটে ধরে পাগলপনা শুরু করল। এক ঝটকা দিয়ে ফ্লোরে ফেলে দিলাম তাকে। চমকে উঠল ও। কিছুই বুঝতে পারল না। যার সাথে এত অন্তরঙ্গ ভাব সেই কিনা ধাক্কা দেয়।
আবার উঠে হাত দুটা জড়িয়ে ধরল আমার। এবার আর কোন কথা না। পাঠিয়ে দিলাম সোজা তার বাবার কাছে।
পরদিন। ক্যাম্পাসের একটু বাইরে বেরোতেই সামনে তাকিয়ে দেখি বড় অসহায় হয়ে তীব্র রোদের ভেতর দাড়িয়ে আছে ছায়া। রোদটাকে তার ঘায়েল করা সম্ভব নয়। অপেক্ষার প্রহর গুনছে আমার জন্য। টকটকে মুখটা ভীষণ মলিন হয়ে আছে। আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতেই দেখি সেই লোকটা। স্বয়ং ডা: তরিকুল ইসলাম আজ আমার সামনে এসে হাজির। ভাবতেই কেমন যেন অবাক লাগছে। মাথা নিচু করে আমার দিকে হেঁটে হেঁটে আসছে। পিশাচটাকে দেখেই আমার পিত্তি জ্বলে উঠল। তবুও অভিমানে আর রাগটাকে কিছুটা সংযত করার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ লোকটা আমার নিকটে এসে হাত দুটা জাপটে ধরল। কান্নাকাতর কণ্ঠে নালিশের শেষ নেই। ‘আমার একমাত্র মেয়েটাকে বাঁচাও বাবা। ওকে যে আমি আমার জীবনেও থেকেও বেশি ভালবাসি। বারবার আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। ট্রেনের সামনে থেকে সরিয়ে এনেছি তোমার কাছে। খাওয়া নেই, ঘুম নেই কিচ্ছু নেই। ও তোমাকে ছাড়া বোধ আর এক মুহূর্তও বাঁচতে পারবে না। যত দোষ ত্রুটির শাস্তি না হয় আমাকে তুমি দাও।’
একদিন আমিও হাত জোড় করে কেঁদেছিলাম এই লোকটার কাছে। শুধু হাত জোড় নয় পা-টাও পর্যন্ত ধরেছিলাম। শুধু পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল নামধারী এই লোক। আজ আমার মা নেই। কিন্তু আছে আমার গলা ধাক্কার দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু সেটা আমি চাইলেও পারব না। কারণ আমার মায়ের নিষেধ। অন্যায়ভাবে কোন কাজ করার শিক্ষা তিনি দেননি আমায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ