ঢাকা, শুক্রবার 20 January 2017, ৭ মাঘ ১৪২৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ আজ

সামছুল আরেফীন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে আজ শুক্রবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটেল ওয়েস উইংগে হবে জমকালো এ শপথ অনুষ্ঠান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ৯টায় অভিষেকের মূল পর্ব শুরু হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে গত ৪০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে নিচ্ছেন ট্রাম্প। শপথের সময় ট্রাম্প বিরোধীরা বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছেন। ইতোমধ্যে অভিষেক অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণাও এসেছে। 
ক্যাপিটেল হিলের পশ্চিম প্রান্তে প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট শপথ নেবেন। এ সময় তাদের পরিবার, কংগ্রেসের সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত থাকবেন।
এদিকে অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জমকালো ওই অনুষ্ঠানের খরচ হবে ২০ কোটি টাকা (২০০ মিলিয়ন ডলার)। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অভিষেক জমকালো আর উৎসবমুখর করার লক্ষ্যে ইতেমধ্যেই সব প্রস্তুতি শেষ করেছে আয়োজক কমিটি।
ওয়াশিংটন এলাকার সব ধরনের হোটেল-মোটেল বুকিং হয়ে গেছে। ক্যাপিটেল হিলের বাইরে কয়েক হাজার ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার স্থাপন করা হচ্ছে। সব অঙ্গরাজ্য থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক এবং রিপাবলিকান দলের নেতারা যোগ দিচ্ছেন অভিষেক অনুষ্ঠানে। পাশাপাশি ট্রাম্প বিরোধী শিবিরও ক্যাপিটেল হিলের বাইরে বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশের প্রস্তুতি নিয়েছেন।
ট্রাম্পের পক্ষে ১০ লাখ লোকের সমাবেশ এবং প্রতিবাদকারী ২০ লাখ মিলে ৩০ লাখ লোকের সমাবেশ সামাল দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে নিরাপত্তা দল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হচ্ছে, অভিষেক অনুষ্ঠানের ব্যয়ের ৭০ মিলিয়ন ডলার আসবে বিভিন্ন করপোরেট এবং ব্যক্তিগত অনুদান থেকে। বাকি অর্থ ব্যয় হবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। মূল শপথ অনুষ্ঠানে ব্যয় হবে মাত্র এক মিলিয়ন ডলার। সর্বমোট ২০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে অর্ধেকেই যাবে নিরাপত্তা এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেনস আরলিংটন জাতীয় কবরস্থানে যাওয়ার কথা। সেখানে আমেরিকার জাতীয় বীরদের সম্মান জানানোর মধ্যদিয়ে অভিষেক অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এদিন মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ শিরোনামে প্রাক-অভিষেক উৎসব শুরু হবে লিংকন মেমোরিয়ালে।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা: শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ১৬ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে নিরাপত্তা বলয়  তৈরিতে। এফবিআই বলেছে, গঠন করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স। তারা গ্যাস বা রাসায়নিক হামলা মোকাবিলার দায়িত্বে থাকবে। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে ড্রোন ব্যবহার করে এমন হামলা হতে পারে। এজন্য ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন ডেইলি স্টার।
এ দিকে হোয়াইট হাউসের চার পাশের কয়েক মাইল পর্যন্ত রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকদিন ধরেই হোয়াইট হাউসের আকাশে চলছে হেলিকপ্টার মহড়া। শুধু হোয়াইট হাউস এলাকায় নয়, এর আশেপাশেও হেলিকপ্টার দিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন নিরাপত্তা কর্মীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস পরিচালক জোসেফ ক্লানসি বলেছেন, অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা মোকাবিলার জন্য এফবিআই এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সঙ্গে কাজ করছেন তার সংস্থার এজেন্টরা। যদি কোনো ড্রোন দেখা যায় তাহলে তা ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের সমাগম হতে পারে ওয়াশিংটন ডিসিতে। ফলে নিরাপত্তা রক্ষা করা খুব কঠিন একটি বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ওয়াশিংটন মেট্রোপলিটন পুলিশ ভিন্ন এক কৌশল নিয়েছে। তারা বলেছে, বালু ও সিমেন্ট ভর্তি করা হবে আবর্জনা ফেলার ট্রাকে। তারপর তা ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ে আসা-যাওয়ার পথে রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে যাতে অন্য কোনো যানবাহন ওই এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে। যানবাহনে বিস্ফোরক নিয়ে কোনো আত্মঘাতী হামলাকারী জনতার ভিড়ে প্রবেশ করতে না পারে। তবে শপথ অনুষ্ঠান চলাকালে ২০টি গ্রুপকে বিক্ষোভ করতে ও মার্চ করতে অনুমতি দেয়া হয়েছে।
 হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মাইকেল চারটপ বলেছেন, এবার এমন নিরাপত্তা দেয়া হবে যা আমি কোনো শপথ অনুষ্ঠানের জন্য কখনও ভাবি নি। শপথ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায় রয়েছে কংগ্রেশনাল কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর রয় ব্লান্ট। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন প্রকাশ্যে যা বলছেন গোপনীয়ভাবেও তাই বলছেন। আগেকার চেয়ে এবার বিভিন্ন দিক থেকে আরও বেশি হুমকি রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ৭০ বছর বয়সী  ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের ১০ কোটি মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে আরো ৫০ কোটি মানুষ সরাসরি উপভোগ করবেন। পেনসিলভ্যানিয়া এভিনিউ থেকে হোয়াইট হাউস পর্যন্ত প্যারেডের পরই শুরু হবে এই অনুষ্ঠান।
কম জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের গত ৪০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ৬০ শতাংশ নাগরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে পছন্দ করেন না। জর্জ ডাব্লিউ বুশের কাছ থেকে ক্ষমতা নেওয়ার সময় বারাক ওবামার জনপ্রিয়তা ছিল ৮০ শতাংশ।
এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের জনমত জরিপের ফলাফলে এ তথ্য জানানো হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তার প্রশাসনের জন্য পছন্দের যে তালিকা করেছেন, জনমত জরিপে মাত্র ৪০ শতাংশ তা পছন্দ করেছে। ওবামাকে পছন্দের এ হার ছিল ৭৯ শতাংশ। হোয়াইট হাউসে যাওয়ার প্রাক্কালে জনপ্রিয়তায় এমন ভাটা থাকলেও ট্রাম্পকে নিয়ে জনগণের মধ্যে এক ধরনের উচ্চাশা রয়েছে। ৬০ শতাংশ আমেরিকান মনে করে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প ‘খুব ভালো’ করবেন বা ‘ভালো’ করবেন। জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ জনগণের প্রত্যাশা, জঙ্গিবাদ দমনে ট্রাম্প ভালো করবেন।
জরিপে দেখা গেছে, জনগণের ৬১ শতাংশ ট্রাম্পের নানা সিদ্ধান্তে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান। ওবামা যখন প্রথম দফা ক্ষমতায় আসেন, তখন ৬১ শতাংশ জনগণ তাঁর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত দেশের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে আশা প্রকাশ করেছিল।
অভিষেক অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন ট্রাম্প সমর্থকরা : প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতারা অনেকেই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না বলে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন। অন্তত ৫০ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা অভিষেক অনুষ্ঠানে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু অন্যদিকে রিপাবলিকান সমর্থকদের উৎসাহের কমতি নেই।
রিপাবলিকান লিন্ডা কুলস শিকাগো থেকে ওয়াশিংটন এসেছেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। তিনি তার প্রিয় প্রার্থী ও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেকে উপস্থিত থাকতে এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন।
জনসংযোগ লেখক লিন্ডা কুলস (৫০) এএফপিকে বলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত। একটি নতুন পালাবদল, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর দেখা আমার জন্য খুবই আনন্দের হবে।’
শপথ অনুষ্ঠানের আগে লিন্ডার মতো ট্রাম্প সমর্থকরা ওয়াশিংটনে ভিড় জমাচ্ছেন। তারা ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে চান। তারা ট্রাম্প সমালোচকদের উপযুক্ত জবাব দিতে চান যে, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে তাদের ধারণা ভুল। ভাসি গাওয়া ও তার স্বামী ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নারদিনো থেকে এখানে এসেছেন।
বর্জনকারীর সম্ভাব্য সংখ্যা ২৭ থেকে ৪২: যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির অন্তত ২৭ জন আইনপ্রণেতা বলে দিয়েছেন, তাঁরা প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে যাবেন না। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা জন লুইস এবং অন্যদের নিয়ে ট্রাম্পের ‘আক্রমণাত্মক মন্তব্যের’ প্রতিবাদেই মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের ওই ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে প্রভাবশালী ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা ট্রাম্পের অভিষেক বয়কট করতে যাওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতার সংখ্যা ৪২ বলে উল্লেখ করেছে।
 ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বৈধ প্রেসিডেন্ট’ নন বলে জন লুইস মন্তব্য করেছিলেন। জবাবে ট্রাম্প টুইটারে লেখেন, লুইসের কাজ শুধু কথায় সীমাবদ্ধ। কাজ বা ফলাফল নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব জন লুইস। দেশের বহু মানুষের কাছে তিনি আদর্শ। ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকারের দাবিতে এক মিছিলের সময় পুলিশ হামলা করেছিল। সে সময় আরও অনেকের সঙ্গে লুইসও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তিনি ১৯৮৭ সালে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হন। জর্জিয়ায় তাঁর নির্বাচনী এলাকাকে ট্রাম্প ‘অপরাধপ্রবণ’ আখ্যা দিয়েছেন। প্রতিক্রিয়ায় নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা ইভেট ক্লার্ক বলেন, ‘জন লুইসের অপমান মানে আমেরিকার অবমাননা।’
জন লুইস ৩০ বছর ধরে কংগ্রেসের সদস্য। এই প্রথম তিনি কোনো প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগের কারণেই এমন অবস্থান নিয়েছেন লুইস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ