ঢাকা, শুক্রবার 20 January 2017, ৭ মাঘ ১৪২৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সুনামগঞ্জে বন্দুকযুদ্ধে হতাহতের ঘটনায় এলাকায় এখনো আতঙ্ক

দিরাই (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা : সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে কোটি টাকার জলমহাল দখল নিয়ে সুরঞ্জিত-মতিউর গ্রুপের বন্দুক যুদ্ধে তিন জন নিহতের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। আর নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের আহাজারীতে হাতিয়া আকিলনগর সহ এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। বন্দুক যুদ্ধে হতাহতের ঘটনায় দিরাই উপজেলা চেয়ারম্যান, দিরাই পৌরমেয়র, উপজেলা আওয়মী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ৩৯ জনকে আসামী করে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন প্রতিপক্ষ যুবলীগ নেতা একরার হোসেন। মঙ্গলবারের ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে গ্রেফতার বা কোন অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে জলমহাল এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে। ঘটনার পরদিন সুনামগঞ্জের এসপি, ডিআইজি সিলেট রেঞ্জ অফিসের এসপি ও দিরাই সার্কেলের এএসপি অকুস্থল পরিদর্শন করেন।জলমহাল ভোগদখলকারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জারলিয়া জলমহালের নিয়ন্ত্রন ও কোটি টাকার বানিজ্য নিয়ে দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক এমপি আলহাজ মতিউর রহমানের অনুসারী লোকদের মাঝে এই রক্তক্ষয়ী বন্দুক যুদ্ধটি হয়। 

 সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্য্যালয়ের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা যায়, দিরাই উপজেলাধীন ঘোড়ামারা সাতপাকিয়া প্রকাশিত জারলিয়া জলমহালটি ১৪২০ থেকে ১৪২৫ বাংলা সালের জন্য নিকটবর্তী নাগেরগাঁও মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির নামে ইজারা প্রদান করা হয়। ৯৭একর ৬২ শতাংশ আয়তনের এ বিরাট জলমহালটির জন্য ১২লাখ ৯৫ হাজার ৮ শ ১৩ টাকা বাৎসরিক রাজস্ব দিতে হয়। ইজারা প্রদানের সময় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন উমেশ দাস। ইজারা নেয়ার পর উক্ত জলমহালটির উপর নজর পরে সরকারীদলের প্রভাবশালী নেতাদের। দুই বছর অতিবাহিত হতে না হতেই সমিতির সাধারণ সম্পাদক কে পরিবর্তন করে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী নেতাদের আস্থভাজন ধনঞ্জয় দাস কে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাওর বেষ্টিত এলাকায় সরকার মৎস্যজীবি সমিতির নামে বিভিন্ন জলমহাল ইজারা দিলেও নিয়ন্ত্রন করেন সরকারী দলের নেতারা। জারলিয়া জলমহাল থেকে বছরের কমপক্ষে ১ থেকে দেড় কোটি টাকার মাছ ধরা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী দুই বছর অন্তর জলমহাল থেকে মাছ আহরন করার কথা থাকলেও ক্ষমতার জোরে প্রতি বছরই মাছ ধরে বিক্রি করেন এসব ওয়াটারলর্ড গণ। তাছাড়া ইজারাদার কর্তৃক জলমহালটির সাব ইজারা নীতিমালায় না থাকলেও সেটি অমান্য করে প্রভাবশালীদের কাছে সাব ইজারা দেয়া হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় জারলিয়া জলমহালটিতে প্রতি বছর মাছ আহরনকালে ক্ষমতাশীন দলের দুই পক্ষের লোকজন সংঘর্ষ ও বন্দুক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ নিয়ে দুপক্ষের মাঝে ডজনখানেক মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। দু পক্ষের লোকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, নাগেরগাও মৎস্যজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক উমেশ দাস ইজারাপ্রাপ্ত জলমহালটি প্রথম বছরই স্থানীয় বাসিন্দা উপজেলা যুবলীগ নেতা একরার হোসেনের কাছে ৬ বছরের চুক্তিতে সাব লীজ দেন। এর পর কোটি টাকার জলমহালটিতে অংশিদারিত্ব নিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের যোগসাজশে উমেশ দাস কে পরিবর্তন করে ধনঞ্জয় দাস কে সমিতির সাধারণ সম্পাদক করা হয়।যুবলীগ নেতা একরার হোসেন বলেন প্রকৃত ইজরাদারের নিকট থেকে সাব-লীজ নেয়ার পর জারলিয়া জলমহালটিতে বিনা টাকায় ভাগ নিতে দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পৌরসভার মেয়র মোশাররফ মিয়া মরিয়া হয়ে উঠেন। মঙ্গলবার সকালে প্রদীপ রায় ও মোশাররফ মিয়া কোটি টাকার জলমহালে জোরপূর্বক দখল নিতে আমার লোকদের উপর অবৈধ অস্ত্রধারীদের নিয়ে হামলা চালান। এসময় তাদের বন্দুদকের গুলিতে আমার তিন জন পাহরাদার নিহত হয়। অপরদিকে উপজেলা আওয়ামী লগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মোশাররফ মিয়া জারলিয়া জলমহালে অংশিদারিত্ব ও বন্দুক যুদ্ধের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্ঠতা অস্বীকার করে বলেন একরার হোসেন দীর্ঘদিন আমাদের বলয়ে (সুরঞ্জিত) যুবলীগের রাজনীতি করে আসছে, গত ইউপি নির্বাচনে তাকে সমর্থন না দেয়ায় সে অন্য বলয়ে (মতিউর) চলে গেলে আমাদের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। এজন্য সে এই ঘটনায় আমাদের জড়ানোর চেষ্টা করছে, ঘটনার সময় আমি দিরাই শহরে ছিলাম। একই বক্তব্য দিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় বলেন ১৬ জানুয়ারী থেকে আমি ঢাকায় অবস্থান করছি। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সাথে আলাপকালে জানা যায় জারলিয়া জলমহালটির সাব ইজারাদার যুবলীগ নেতা একরার হোসেন সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় ও মেয়র মোশাররফ মিয়া কে ভাগ দিতে না চাইলে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এ নিয়ে দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ঢাকা ও দিরাইয়ের বাসভবনে বিগত কয়েক বছরে একাধিকবার সমঝোতা বৈঠক হয়। এরপরও প্রতিবছরই মাছ আহরনের সময় দুই পক্ষের মাঝে সংঘর্ষ ও বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। গতবছর জলমহালটির দখল নিতে উভয় পক্ষের সংঘর্ষকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মাসুক মেম্বার একরার হোসেনের লোকজন কর্তৃক আহত হন। এসময় মাসুক মেম্বারের লাইসেন্সকৃত বন্দুকটির খোয়া যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছর মাছ আহরনের শুরু থেকেই জলমহালটিতে উভয় পক্ষ অস্ত্রের মহড়া দিতে থাকে। অনাকাঙ্কিত ঘটনার আশংকা বিদ্যমান থাকায় পূর্ব থেকেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করেছিলেন স্থানীয় জন প্রতিনিধিগণ। এদিকে ঘটনার তিনদিন পর মতিউর রহমান গ্রুপের পক্ষে যুবলীগ নেতা একরার হোসেন বাদী হয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের নাম উল্লেখ করে দিরাই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে আসামী করা হয়েছে বিএনপি ছেড়ে সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদানকারী দিরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান তালুকদার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় , দিরাই পৌরসভার মেয়র মোশাররফ মিয়া, মেয়র পুত্র উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক উজ্জল মিয়া সহ মোট ৩৯ জনকে। দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল জলিল বলেন জারলিয়া জলমহালে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় একরার হোসেন বাদী হয়ে ৩৯ জনের নামে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন । তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে । ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে পুলিশের অভিযান চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ