ঢাকা, রোববার 22 January 2017, ৯ মাঘ ১৪২৩, ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিথ্যা তথ্যে বাড়ছে শেয়ারের দাম

এইচ এম আকতার : পুঁজি বাজারে তেজিভাব অব্যাহত রয়েছে। এটি স্বভাবিক না অস্বাভাবিক তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এ নিয়ে বিশ্লেষণ থেমে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কোম্পানি ও পুঁজিবাজার সম্পর্কে মিথ্যা এবং অতিরঞ্জিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারদর। বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী হলেও মিথ্যা তথ্যের বিষয়ে প্রায় তিন বছরেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফেসবুক পেইজ বন্ধে রয়েছে আইনী জটিলতা। এ কারণে যদি বাজার আবারও বড় কোন দুর্ঘটনার শিকার হয় তাহলে এই দায় কার। যদিও ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকেই এ নিয়ে হুশিয়ারি দিয়ে আসছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
 চলতি ২০১৭ সালের ১৪ কার্যদিবসে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় সাড়ে চার শ পয়েন্ট বেড়েছে। আর লেনদেন বেড়েছে হাজার কোটি টাকার বেশি। বাজারের এই টানা উত্থানে কিছুটা শঙ্কিত বিশ্লেষক ও বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর ও ২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে খুব বেশি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত বলে আমার মনে হচ্ছে না। একদিকে ব্যাংকে আমানতের সুদ হার কম, তাই কিছু মানুষ বাড়তি মুনাফার আশায় শেয়ারবাজারে ঝুঁকছেন। আর পুরোনো খেলোয়াড়েরা সেটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মতো খেলাধুলা চালাচ্ছেন। তাই এ অবস্থায় নতুন করে যারা বাজারে ঝুঁকছেন, তাদের অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, এটা বাজারের স্বাভাবিক শক্তি নয়। তবে ডিএসই মনে করে বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। সূচক বৃদ্ধিতে কোন ভয় নেই। ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে তারা।
এদিকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে শতাধিক ফেসবুক পেইজ বন্ধে বিএসইসি ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মধ্যে চিঠি চালাচালিও হয়েছে। কিন্তু তিন বছরেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি। এখনও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানি সম্পর্কে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র এম সাইফুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ সম্পর্কে তদন্তের পর ১০০টি ফেসবুক পেইজ বন্ধের জন্য বিএসইসির পক্ষ থেকে বিটিআরসিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে গত বৃহস্পতিবার বিকাল পৌনে ৫টায় ‘বাবু খান’ নামের একজন ব্যবহারকারী ‘ডিএসই স্মল ইনভেস্টর ক্লাব’ নামের একটি পাবলিক গ্রুপ পেইজে ‘ন্যাশনাল ফিডের’ ট্রেডিং কোড (এনএফএমএল) সম্পর্কে লিখেছেন, ‘শুধু জুন ’১৬ পর্যন্তই উৎপাদন-৫৩ শতাংশ, ইপিএস ১ দশমিক ৭৯, সব ঋণ পরিশোধ, বিদেশী নতুন মেশিনে চারগুণ উৎপাদন শুরু হয়েছে, নিজস্ব মেশিনে সয়াবিন উৎপাদন ও বাজারজাত। ডিসেম্বর ’১৬-য় আসছে কোয়ার্টারে উৎপাদন ও ইপিএস ডাবল (দ্বিগুণ) হবে। এবার বুঝে দেখুন দাম কোথায় যেয়ে ঠেকবে। প্রায় এক ঘণ্টার ব্যবধানে দু’দফায় পোস্টটি একই আইডি থেকে প্রচার করা হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, ওই তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ডিএসইর তথ্যমতে, জুন ক্লোজিংয়ের কারণে ১৮ মাসে অর্থবছর হওয়ার কারণে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০১৬ সালে বেড়েছে চার কোটি ছয় লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে দুই কোটি ২৪ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে। একই সময় আগের বছরের তুলনায় শেয়া প্রতি আয় (ইপিএস) তিন পয়সা কমেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি সম্পর্কে দেওয়া তথ্যও অতিরঞ্জিত। আর কোম্পানিটি সব ঋণ শোধ করার তথ্যও মিথ্যা।
ডিএসইর তথ্যমতে, বর্তমানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী মিলিয়ে কোম্পানিটির ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। অন্যদিকে গত দুই মাসে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা লভ্যাংশ হিসেবে পাওয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার বিক্রি করেছেন, যা কোম্পানিটির মোট শেয়ারের প্রায় চার শতাংশ।
তবে শুধু ওই একটি কোম্পানি ছাড়াও বাবু খানের আইডি থেকে গত এক সপ্তাহে ডেসকো ও কনফিডেন্স সিমেন্ট সম্পর্কেও ইতিবাচক তথ্য-সংবাদ ছড়ানো হয়েছে। আর ‘ডিএসই স্মল ইনভেস্টর ক্লাব’ ফেসবুক পেইজে আরএন স্পিনিং, এমারেল্ড অয়েল, ফ্যামিলিটেক্স, বেক্সিমকো, রিজেন্ট টেক্সটাইল, ড্রাগন সোয়েটার, সিএন্ডএ টেক্সটাইল, ইসলামিক ফাইন্যান্স ও তাকাফুল ইন্স্যুরেন্স বিষয়ে তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে মিলেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারদর বাড়া-কমাসহ মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছড়াচ্ছেÑএমন ফেসবুক পেইজের সংখ্যা দেড় শতাধিক। আর ঠিক কী পরিমাণ ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্ট থেকে ‘গুজব’ ছড়ানো হচ্ছে, তার সঠিক কোনো তথ্য মেলেনি।
অনুসন্ধানে মিলেছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অসচেতনতার সুযোগ নিতে কারসাজিচক্র এখন তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কয়েক বছর ধরেই গুজব ছড়ানোর অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়ে উঠেছে ফেসবুক-টুইটার ও ব্লগ। ‘বাংলাদেশ স্টক মার্কেট শেয়ার বিজনেস’, ‘ডিএসই ফর রিস্কি গেইম’, ‘ডিএসই ইনভেস্টরস ক্লাব’, ‘ডিএসই ক্লাব’ ও ‘ডিএসই কারেন্ট ডেটা এনালাইসিস নিউজ’, বিডি স্টক ডিসকাশন (ডিএসই+সিএসই), ডিএসই এক্সপ্রেসসহ শতাধিক ফেসবুক পেইজের সন্ধান পেয়েছে বিএসইসি। শতাধিক ফেসবুক পেইজ ব্যবহার করে কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫টি পেইজের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ‘গুঞ্জন’ ছড়ানো হচ্ছে। কখনও কখনও কোম্পানির শেয়ারদর বাড়া-কমার বিষয়ে আগাম ঘোষণাও দেওয়া হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে টাকার বিনিময়েও মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে। শুধু ফেসবুক পেইজই নয়, বিভিন্ন একাউন্ট ব্যবহার করেও মিথ্যা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও  চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) নামেও প্রতারণা করা হচ্ছে। এর আগে খোদ সিএসইর নামেই সাতটি ভুয়া ফেসবুক পেইজ খোলা হয়েছিল।
বিএসইসির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৯৬৯ সালের সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশের ১৭ ধারার নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘নিজ স্বার্থসিদ্ধি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কোনো উপায়েই কেউ কোনো নির্দিষ্ট শেয়ার ক্রয় বা বিক্রয়ে অন্যদের প্ররোচনা দিতে পারবে না। আইন লঙ্ঘন ঠেকাতে ২০১৩ সালের ২১ অক্টোবর প্রথম সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তী প্রকাশ করে বিএসইসি। এরপর ২০১০ সালের ধসের প্রাক্কালে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে ২০১৫ সালের ৪ আগস্ট মাহবুব সারোয়ার নামের একজনকে দুবছরের কারাদ- দেন পুঁজিবাজার সম্পর্কিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। তারপরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং প্রচারের ধরণ বদলেছে।
২০১৬ সালের শুরুতে আবারও সক্রিয় হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিষয়টির তদন্ত করা হয়। তদন্তে শতাধিক ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়ানোর প্রমাণ পায় সংস্থাটি। ২০১৬ সালের এপ্রিলে ১১৬টি ফেসবুক পেইজ বন্ধে টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির শরণাপন্ন হয় বিএসইসি। পেইজগুলোর মধ্যে ২৫টি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের অনুরোধও করা হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চিঠি পাঠানোর ৯ মাসেও ওইসব পেইজ বন্ধে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এখনও এ বিষয়ে বিটিআরসির পক্ষ থেকে বিএসইসিকে কিছু জানানো হয়নি। আর দায়িত্বশীল দুই সংস্থার কড়াকড়ির মধ্যে এখনও মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা প্রচার চালানো হচ্ছে।
বিটিআরসির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, ফেসবুক স্বাধীন সামাজিক প্ল্যাটফর্ম। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলেই ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কোনো পেইজ বন্ধ করতে চায় না। এজন্য থানায় জিডিসহ আরও কিছু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি নিজেই ওই পেইজগুলোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে। তারা সরাসরি ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কারণ, সংশ্লিষ্ট খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ বিটিআরসির কাছে ফেসবুক পেইজ বন্ধের কয়েক হাজার আবেদন প্রক্রিয়াধীন।
বিটিআরসি সচিব ও মুখপাত্র সারওয়ার আলম বলেন, ফেসবুক পেইজ বন্ধের জন্য বিভিন্ন দফতর থেকে দেড় হাজারের বেশি চিঠি এসেছে। ধারাবাহিকভাবে কাজ চলছে। বিষয়টি বেশ সময়সাপেক্ষ। তবে বিএসইসি চাইলে আমাদের টিমের পরামর্শ নিয়ে নিজেরাই ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি সুরাহা করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ