ঢাকা, রোববার 22 January 2017, ৯ মাঘ ১৪২৩, ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভ্রমণ কাহিনী মেঘের রাজ্য

তাহিয়া নাওয়ার : গত ৩ নবেম্বর ২০১৬ তারিখ রাতে আমার ছোট খালার পরিবার নানু ও মামার পরিবারের সবাই মিলে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। সাথে আমার খালুর বন্ধুরা ছিলেন। বাসে সারা রাত ঘুমিয়ে কাটল। সকালে খাগড়াছড়ি পৌঁছে নাস্তা করে নিলাম। নাস্তার পর আমরা জীপে চাঁদের গাড়ি করে মেঘের রাজ্য সাজেকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর পৌঁছে যাব স্বপ্নের সাজেকে। পথে জীপ থামলে একটি ঝরনার অদূরেই। ঝর্ণার নাম ‘হাজার ছড়া’। ঝরনা পর্যন্ত পৌঁছাতে কিছু দূর পায়ে হাঁটতে হবে। পথটা ছিল কাঁচা ও বন্ধুর। তার উপর দিনভর হয়েছিল বৃষ্টি। পথটা এতটা পিচ্ছিল ছিল যে, আমি ও আমার বোনরা হাঁটতে যেয়ে বার বার পড়ে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টিটা যদি না হতো তাহলে আরো বেশি উপভোগ্য হতো। সেখানে পৌঁছে ঝর্ণার পানিতে সবাই গোসল করলাম। আমার খালাতো ভাই ও মার গোসলের পর ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছিল। এরপর ঐ বন্ধুর জায়গা পার হয়ে আবার জীপে ফিরে এলাম আমরা। আমার খালুর বন্ধু বাশার আঙ্কেল ও আলামীন আঙ্কেলের পরিবার আমাদের জীপে ছিলেন। তাদের দুইজনই ছিলেন খুবই মজার মানুষ। বাশার আঙ্কেল আমাকে আদর করে তাহি বলে ডাকতেন। জীপে করে যখন আমরা সাজেক যাচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল অ্যামিউজমেন্ট পার্কের রোলার কোস্টারে উঠেছি। জীপে যারা ছিলেন সবাই অনেক জোরে চিৎকার করলাম। কয়েক ঘণ্টা পর আমরা সাজেক ভ্যালিতে পৌঁছে গেলাম। পৌঁছার পর আমাদের জন্য নির্ধারিত কটেজ ‘হাপাং টং’-এ ঢুকলাম। ততক্ষণে সবাই খুব ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত ছিলাম। কটেজ থেকে একটু দূরে গিয়ে একটা হোটেলে আমরা দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। কটেজে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকালে আমরা হেলিপ্যাড-১ এ গেলাম। সেখানে যেয়ে মনে হচ্ছিল যেন মেঘ ছুঁতে পারব। যত দূর চোখ যায় শুধু মেঘ আর মেঘ। সন্ধ্যা হওয়ার কিছুক্ষণ পর আমরা হেলিপ্যাড থেকে নেমে একটি কফির দোকানে বসে কফি খেলাম। কফি বিক্রেতা উপজাতি (ত্রিপুরা) হলেও আমাদের সাথে বাংলাতেই কথা বলছিলেন। কফিটা খুবই মজা ছিল। কফি খাওয়ার পর আমরা জীপে উঠে আমাদের কটেজে চলে আসি। বেলকনিতে অনেক বাতাস ছিল। সেখানে বসেই আমরা সন্ধ্যার হালকা নাস্তার পর ছোটরা মিলে নানা রকম খেলা খেলেছি। খেলতে খেলতে রাতের খাবারের সময় হয়ে এলো। কাছেই একটা হোটেলে যেয়ে রাতের খাবার খেলাম। রাতের খাওয়ার পর আমরা নামাজ পরে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরে উঠে ফজরের নামায পরে আমরা ঘুরতে বের হলাম। এবার হেলিপ্যাড ৩-এ উঠলাম। হেলিপ্যাড-১ থেকে হেলিপ্যাড-৩ বেশ উঁচু। হেলিপ্যাড থেকে নেমে আমরা আমাদের কটেজে চলে এলাম। সেখানে নাস্ত করে পাশের সেনাবাহিনীর হোটেলে গিয়ে আমরা ছবি তুলি। সেনাবাহিনীর হোটেলটি খুব সুন্দর ছিল। সকাল সাড়ে ৯টায় আমরা রাঙ্গামাটির লংগদুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। জীপে করে পাহাড় থেকে নামতে গিয়ে আবারও সেই রোলার কোস্টার অনুভূতি। পথে আমরা চিপস আর জুস খেলাম। রাঙ্গামাটির লংগদু যেতে কমপক্ষে ২ ঘণ্টা লাগে। ২ ঘণ্টা পর আমরা লংগদুতে পৌঁছে একটা বিশ্রামাগারে গেলাম। তবে সেখানে মামার পরিচিত লোক ছিল বলে ১ রাত ২ দিন থাকার সুযোগ হয়ে গেল। হোটেলের ভেতরটা দেখতে রাজবাড়ীর মতো। খাওয়ার ঘরটা ছিল বিশাল। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে শুরু হলো আমাদের খেলাধুলা। খেলার পরে আমরা যুহর ও আসরের নামাজ পড়ে সবাই মিলে খেতে বসলাম। খাওয়া শেষ করে আবার আমরা খেলায় মেতে উঠলাম। আমরা খেলতে খেলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। তখনো বৃষ্টি হচ্ছিল। সেদিন উপকূলীয় অঞ্চলে ৪নং বিপদ সংকেত ছিল। সম্পূর্ণ বিশ্রামাগারে শুধুমাত্র মহিলারা। পুরুষরা নৌকা দিয়ে গিয়েছিল দূরের বাজারে। কেয়ারটেকারেরও কোনো হদিস নেই। তার উপর বিশ্রামাগারের পেছনে ছিল একটা কবরস্থান। প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদ্যুৎ না থাকায় সারা বিশ্রামাগার অন্ধকারে ছেয়ে গেল। বিশ্রামাগার যেন একটা ভূতুড়ে আবহ। সন্ধ্যা পৌঁনে ৭টায় কেয়ারটেকার এসে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়। এরপর ভয় কিছুটা কমলো। সে রাতে বিদ্যুৎ আসেনি। মোমবাতি দিয়ে চলতে হয়েছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৮টায় মোম বাতির আলোতে আমরা রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। খাওয়ার পর নামাজ পড়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকাল ৬টায় আমাদের রাঙ্গামাটি শহরে রওয়ানা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। তবে সেদিন ৪নং বিপদ সংকেত ছিল বলে জলপথে যে কোন যান ছাড়বে না সে কথা আমাদের জানা ছিল না। একথা জেনে আমাদের মন ভীষণ খারাপ হলো। সকাল ৭টায় সবাই নাস্তা করে নিলাম। নাস্তার পর সকলে মিলে খেললাম ‘এলোনটি লন্ডন’। সকাল ৯টায় আমরা ঘুরে দেখতে বের হলাম লংগদু এলাকা। কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করে আমরা কাপ্তাই হ্রদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কাপ্তাই হ্রদে গিয়ে নৌকায় উঠলাম। হ্রদের দু’পাশে পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য দেখে আমরা মুগ্ধ হই। কিছুক্ষণ নৌকায় চড়ে আমরা নৌকায় করেই আবার লংগদুতে ফিরে আসি। সেখানে আসতে আসতে বেজে গেল সকাল সাড়ে ১১টা। এরপর আমরা খেলাধুলা করলাম। এরপর বিশ্রামাগারের পাশে একটি দোকান থেকে আমার খালামণি সিঙ্গারা নিয়ে আসলেন। আমরা সকলে মিলে তা খাই। দুপুর ১টায় আমরা ওজু করে নামাজ পড়ে নিলাম। এরপর আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিই। খাওয়ার পর আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকালে চাঁদের গাড়ি করে বাসস্ট্যান্ডে গেলাম। সেখানে আমরা শান্তি পরিবহন নামক বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। মাঝপথে খাগড়াছড়িতে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য একটি রেস্তোরাঁয় নামি। খাওয়া শেষে আমরা আবার বাসে উঠি। তখন বাজে রাত ৮টা। এরপর একটানে রাত ৪টায় আমরা ঢাকায় পৌঁছলাম। পুরো ভ্রমণটা চারদিনের একটা স্বপ্নের মতো লাগল।
২০১৪ সালে যখন আমরা কক্সবাজারে গিয়েছিলাম, আসার দিন আমি বলেছিলা-
‘ইনশাআল্লাহ আমরা আবারও এক সাথে এরকম ভ্রমণে যাবো।’ আল্লাহ্র ইচ্ছায় মাত্র এক বছরের মাথায় আবারও এত সুন্দর ভ্রমণ হলো আমাদের। আল্লাহ্ চাইলে আমরা আবারও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করতে পারব। ইনশাআল্লাহ্।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ