ঢাকা, সোমবার 23 January 2017, ১০ মাঘ ১৪২৩, ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দোহাই ইয়াবা এ দেশের তরুণদের ধ্বংস করো না!

আলাউদ্দিন কবির : ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের কৈশোর আর একালের কৈশোরে কতো তফাত! অবাক লাগার অনুসঙ্গ পেশ করতে চাইলে অনেক কিছুই করা যায়। আবার প্রজন্মে প্রজন্মে যে তফাত-ফারাক, তার সবকিছুকেই প্রাকৃতিক আখ্যা দিলে দিব্যি নিশ্চিন্তমনে ঘুমানোও যায়। সুযোগ থাকলেও এ ‘নিদ্রাদলে’ নাম লেখাতে পারিনি এখনো। নাম লেখানোর সাহস পাই না পুরনো প্রবাদবাক্য ‘অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না’-তে ‘ঈমান’ রাখি বলে। সেদিন চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে ‘গুটি’ শব্দের নতুন এক বাগর্থ আবিষ্কার করলাম। দুর্ভাগ্য আমার, এ আবিষ্কারের পরে আনন্দিত না-হয়ে আতঙ্কিতই হতে হলো!
এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে, ‘দোস্ত, চল্ গুটি খেয়ে আসি।’ বন্ধুর উত্তর, ‘নারে দোস্ত, একটু পরে কলেজে যেতে হবে। সন্ধ্যায় আস্তানায় আসিস, একসাথে খাবো।’ শব্দ নিয়ে কায়কারবার করি বলে, নতুন কোনও শব্দ শোনামাত্রই অটোকন্ট্রোলে আমার কান খাড়া হয়ে যায়! ব্যস্ততা শুরু হয় ওই শব্দের আদ্যন্ত উদ্ধারে। তো, ‘গুটি’ নিয়ে অদ্ভুত বাক্যক’টি শুনে আমি তাদের দিকে তাকাই। দেখে পোশাক-আশাকে বেশ ভদ্রঘরের সন্তানই মনে হল। বয়স আনুমাণিক ১৫ থেকে ১৭ এর মধ্যেই হবে। আঠারো যে হয়নি চেহারার শিশুসূলভ আদল ও নির্মল লাবণ্য দেখেই আঁচ করা যায়। কর্মস্থলে ফিরে সহকর্মী মামুনের সঙ্গে ব্যাপারটা শেয়ার করলাম। মামুন সাহেবের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা। তিনিও এই ‘গুটিভক্ষণ’ (‘গুটিসেবন’ই হয়তো শুদ্ধতম) বিষয়ে তার এক অভিনব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তার মারফতে জানলাম, ইদানিং নাকি জীবনঘাতী মাদক ইয়াবাকে এদেশের চেইন ড্রাগাররা ‘গুটি’, ‘বাবা’, ‘ট্যাবলেট’-এর মত নানা ধরনের ‘নিক নেম’-এ ডাকা শুরু করেছে। অভিভাবক, সচেতন জনসাধারণ ও প্রশাসনের পাকড়াও থেকে রক্ষা পেতেই নাকি তাদের এই শব্দবাজি!
মামুন সাহেবের ব্যাখ্যা শুনে আমায় নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসে। মনে পড়ে যায়, আমাদের শৈশব এবং প্রথম কৈশোরের অনিবার্য আনন্দসঙ্গী ও খেলার উপকরণ মারবেলের ডাকনাম বা ‘নিক নেম’ও ছিল গুটি। অবশ্য এটা আমাদের চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রচলিত মারবেলের ডাকনাম। অঞ্চলভেদে হয়তো দেশের অন্যান্য এলাকায় অন্য নামও হতে পারে এবং এটাই স্বাভাবিক। তো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন আমরা স্কুল থেকে ফিরে কিংবা ছুটির দিনগুলোতে একে-অপরকে প্রস্তাব দিতাম, ‘এই চল্, গুটি খেলে আসি।’ মারবেলের চেয়ে গুটি শব্দটিরই বেশি চল্ ছিল আমাদের এলাকায়। চার-পাঁচ বছর বয়েসি ভাইবোনদের হাতে সহজে গুটি দিতাম না আমরা কেউ। ধান ক্ষেতের বিষ কিংবা ইঁদুরের ওষুধ মেশানো বিস্কুটের মতোই ছোট্ট শিশুদের নাগালের বাইরে রাখা হতো মারবেল তথা গুটিসম্প্রদায়কে। তারপরও কারও অসাবধানতাবশত কোনো কোনো ছোট্ট শিশু একটি কি দুটি গুটি যে মনের অজান্তে গিলে ফেলতো না- তা-ও কিন্তু নয়। আমাদের প্রজন্মের কিশোর বয়েসি ভাইবোনদের প্রায় সবাই ছোট্ট ভাইবোনদের ‘গুটিগেলা’ কেসের জেরে আসামী হতাম আব্বা-আম্মার পারিবারিক আদালতে! বিচারক বাবা কিংবা মায়ের রায় অনুযায়ী ‘গুটিগেলা’ ছোট্ট ভাইটি কিংবা বোনটি বেকসুর খালাস পেলেও আমরা ‘শাস্তি’র সম্মুখীন হতাম অবধারিতভাবেই। মাথা পেতে নিতে হতো বাবার বকুনি, মায়ের কানমলা অথবা ক্ষেত্রবিশেষে হজম করতে হতো হালকা-পাতলা উত্তম মধ্যমও!
চলতি মাসেই বেশ ক’টি জাতীয় দৈনিকে এই বিশেষ ধরনের গুটি তথা ইয়াবা বিষয়ক খবরাখবর প্রকাশ পেয়েছে। ব্যাপারটি দেশের সচেতন অভিভাবকদের কপালের ভাঁজ বাড়িয়েছে বৈ কি! গত ৬ জানুয়ারি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর লিড হেডিং ছিলো ‘শত ইয়াবা কারখানা ঢাকায়’। বিস্তারিত রিপোর্টে বলা হয়, ‘...কক্সবাজারসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করছে ইয়াবার চালান। চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকায় এখন খোদ রাজধানীতেই তৈরি হচ্ছে ইয়াবা। সংশ্লিষ্টদের আশংকা, ছোট-বড় মিলিয়ে রাজধানীতেই রয়েছে ইয়াবার শত কারখানা। এর আগে গুলশানের মত অভিজাত এলাকায় একাধিক ইয়াবার কারখানা ধ্বংস করেছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। তারপরও আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কতিপয় প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় ইয়াবা তৈরি হচ্ছে। ব্যবসাও চলছে জমজমাট।...’
অপরদিকে গেলো ১৬ জানুয়ারি দৈনিক নয়াদিগন্ত’র শেষ পৃষ্ঠায় বড় বড় অক্ষরে ছাপা রিপোর্টের সাক্ষ্য ছিল, ‘চট্টগ্রামে নামীদামি হোটেল ও বিলাসবহুল বাসায় ইয়াবার ২০ কারখানা’। প্রিয় পাঠকদের সুবিধার্থে রিপোর্টটির আংশিক তুলে ধরা সমীচীন মনে করছি, ‘...পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, অত্যাধুনিক মেশিনে ইয়াবা তৈরি করে চট্টগ্রামে ছড়িয়ে দিচ্ছে, এমন সিন্ডিকেটের সংখ্যা ২০টিরও অধিক। তারা বিভিন্ন নামীদামি হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং ভিআইপি এলাকার বিলাসবহুল বাড়ি ভাড়া নিয়ে ইয়াবা তৈরি করে। ...অভিযানে নেতৃত্ব দানকারী পতেঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম ভূঁইয়া বলেন, চট্টগ্রামে এই প্রথম ইয়াবা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হল। এর আগে যেসব ইয়াবার চালান আটক হয়েছে, সবগুলো পার্শবর্তী দেশ- মিয়ানমার থেকে এসেছে বলে ধৃতরা জানান।...’
মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে আমরা জানতে পারলাম, দেশের রাজনৈতিক রাজধানী ঢাকা এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম- দু’টিই এখন জীবনঘাতী ইয়াবার কবলে। কথায় বলে, ‘কোনও দেশ দখল করতে চাও তো, তার রাজধানীটা দখল করে নাও।’ তো, আমাদের রাজধানী যদি জীবনঘাতী ইয়াবার সাম্রাজ্য ও করদরাজ্যে পরিণত হয়; তখন কি আর জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব হুমকিমুক্ত হতে পারে?! অথচ এতদিন আমরা বিশ্বাস করে এসেছি, ইয়াবা এদেশীয় কোনও মাদক নয়। এর সবটাই আসে আমাদের পার্শবর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে। একটা বিষয়ে আমাদের আরেকটু চিন্তা-নিয়োগ মনে হয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, দুই প্রতিবেশী দেশ- ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমরা যা কিছু আমদানি করি কিংবা দেশ দু’টির সীমান্তপথে চোরাচালানের মাধ্যমে এদেশে অনুপ্রবেশ করে- তার বেশির ভাগই কিন্তু জীবনবিনাশী ও তারুণ্যবিধ্বংসী মাদকদ্রব্যই! অথচ হওয়া উচিত ছিল এর বিপরীত। একটা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্য এটা বড়ই লজ্জাজনক।
সময় এসেছে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষত ইয়াবার বিপক্ষে চূড়ান্ত লড়াই শুরু করার। এ-বিষয়ে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রয়োজনে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট এর মত সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারেন আমাদের আপাদমস্তক সরল ও মাটির মানুষ, এ-দেশের অভিভাবক প্রেসিডেন্ট মহোদয়। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে তার দেশে মাদকের মাত্রাতিরিক্ত উৎপাত দেখে সম্প্রতি সামরিক শাসন জারির হুমকি দিয়েছেন।
গত ১৬ জানুয়ারি দৈনিক যায়যায়দিন এর ৮ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত রিপোর্টটির শিরোনাম ছিলো, ‘মাদক: ফিলিপাইনে সামরিক শাসনের হুমকি দিলেন দুতার্তে’। রিপোর্টটির আংশিক উদ্ধৃতি এক্ষণে প্রাসঙ্গিক মনে করছি, ‘ফিলিপাইনে মাদক সমস্যার অবনতি হলে সামরিক আইন জারি করতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে। তিনি বলেন, এটি করা হবে, ফিলিপিনো জনগণ ও তরুণদের সুরক্ষার জন্য।...’
আমরা বলছি না, আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট মহোদয়েরও ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের মত সামরিক আইন জারির হুমকি কিংবা ঘোষণা দিতে হবে। আমরা বরং দৃঢ় বিশ্বাস রাখি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের ইতিবাচক মনোভঙ্গি ও প্রশাসনের সচেতন দৃষ্টি এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়নই যথেষ্ট মাথাচাড়া দিয়ে-উঠা এই ইয়াবা-সা¤্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে যখন ইয়াবা কারখানার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, তখন দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহর বিশেষত সীমান্তবর্তী জেলা ও এলাকাগুলোতেও যে এমনতর অসংখ্য কারখানা অভিযান চালালেই ধরা পড়বে তা দেশের একজন সাধারণ মানুষও মেনে নেবেন। এ দেশের চৌকস গোয়েন্দা বিভাগের প্রতি এখনও আমজনতার সুধারণা ও আস্থা অটুট রয়েছে।
তারা যদি দেশের তারুণ্য-বিধ্বংসী ইয়াবা সা¤্রাজ্যের পতন ঘটাতে প্রয়োজনীয় মাত্রায় তৎপর না হন; একটা সময় হয়তো এ দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের আমরা বলতে শুনব, ‘দোহাই ইয়াবা, এ দেশের তরুণদের ধ্বংস করো না!’
লেখক: কবি ও কলামিস্ট
[email protected]
আলাপন: ০১৮৪০-১৯ ৩৪ ৪৯

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ