ঢাকা, সোমবার 23 January 2017, ১০ মাঘ ১৪২৩, ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৬ বছরে পিডিবির লোকসান ৪০ হাজার কোটি টাকা

কামাল উদ্দিন সুমন : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এমপি গত ২১ জানুয়ারি দাবি করেছেন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন এমনভাবে বেড়েছে আগামী দিনে কার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হবে তা নিয়ে ভাবনায় পড়েছে সরকার। তবে প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্য ফিকে হয়ে আসছে কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুৎ কেনার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষত বেড়ে যাওয়ায়। পরিসংখ্যান বলছে, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে বেসরকারী উদ্যোগে। দরপত্র ছাড়া বেসরকারী খাত থেকে বিদ্যুৎ কিনে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে। সর্বশেষ হিসেব মতো বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনায় গত ছয় বছরে লোকসান গুণছে ৪৮৫ কোটি ১৭ লাখ ডলার যার হিসেব দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসতে শুরু করে। বেসরকারি খাতের এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনায় ওই অর্থবছরই লোকসানে পড়ে পিডিবি। ওই সময় পিডিবির লোকসান হয় ৬২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। পরবর্তীতে লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়তে থাকে। ২০১১-১২ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৮১ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। তবে পরের অর্থবছরে লোকসান কিছুটা কমাতে সক্ষম হয় পিডিবি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসান হয় ৬৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আবারো লোকসান বেড়ে হয় ৮৭ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। এরপর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৩ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ১০ মাসে প্রায় ৯৫ কোটি ডলার লোকসান করে পিডিবি। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস এন্ড ফিন্যান্সিয়াল এনালিসিসের (আইইইএফএ) এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। 

জানা গেছে, ২০১০ সালে ১৩টি কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট অনুমোদন দেয়া হয়। এদের কাছ থেকে বিনাটেন্ডারে গড়ে ১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা দামে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম দিকে কম নেয়া হলেও ২০১২ সালের শেষ দিক থেকে চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত হিসাবে দেখা গেছে, এই দামে কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ৮শ’ থেকে ১৩শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেয়া হয়।

সূত্র জানায়, কুইক রেন্টাল চালুর পর বেড়ে চলেছে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচও। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হতো ২ টাকা ৬০ পয়সা। কিন্তু ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে কিলোওয়াট ঘণ্টা ৫ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়ায়।

পিডিবি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ৬ টাকা। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ ২ থেকে আড়াই টাকা। আর ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্রতি ইউনিটের খরচ ৬-৭ টাকা। তবে ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র থেকে (কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল) প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২-১৫ টাকায় কিনছে পিডিবি। এভাবে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার ফলে ব্যয় ও লোকসান বাড়ছে সংস্থাটির।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বেসরকারি খাতে ১০০ মেগাওয়াটের ৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। রংপুর, ঠাকুরগাঁও, বাগেরহাট, বগুড়া, চাঁদপুর ও নোয়াখালী অঞ্চলে এসব কেন্দ্র হবে। কনফিডেন্স সিমেন্ট ২টি, এনার্জিপ্যাক, ডরিন পাওয়ার এবং এক্সসিএল-ইপিসিএল ১টি করে।

বিদ্যুৎ সেক্টরের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, টেন্ডার ছাড়া বিদ্যুৎ কেনায় এতদিন সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা গেছে। একদিকে এসব রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকরা শুল্কমুক্ত তেল আমদানির অনুমতি পাচ্ছেন, অন্যদিকে হ্যান্ডলিংয়ের নামে ৯ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন। এভাবে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করেছেন, অন্যদিকে বেশি দামে সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করেছেন। 

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে উৎপাদনে রয়েছে ৩২টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এর মধ্যে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ১৮। যদিও ২০১৫ সালে দেশে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল ১৭টি। তার আগে ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫টি। এর আগের তিন বছর ২০১৩, ২০১২ ও ২০১১ সালে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল সাতটি করে।

বর্তমানে ১৮টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে এগ্রিকোর রয়েছে পাঁচটি, যেগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ৩৮০ মেগাওয়াট। ডাচ্-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে দুটি। একটি করে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে ম্যাক্স পাওয়ার, দেশ এনার্জি, আইইএল পাওয়ার, সামিট পাওয়ার, পাওয়ারপ্যাক, একম, ইউনাইটেড, কেপিইএল, খানজাহান পাওয়ার, নর্দান পাওয়ার ও আমনুরা পাওয়ারের।

পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্লান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ২০১৮ সালের আগে কয়লাভিত্তিক কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনে আসার সম্ভাবনা নেই। এ কারণে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ছে।

আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বেড়ে গেছে। প্রতি বছর ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ। কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ফলে এ ব্যয় বাড়ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২০১৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভার রিপোর্ট অনুযায়ী ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নর্দার্ন পাওয়ার পিডিবির কাছে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে ১৮.৪৩ টাকা। পাওয়ারপ্যাক বিক্রি করেছে ১৪.৯৫ টাকা, আমনুরা সিনহা পাওয়ার বিক্রি করেছে ১৮.৭৫ টাকা, এনজিস পাওয়ার ১৬.৫০ টাকা, আইইএল কনসোর্টিয়াম ১৫.৭৫ টাকা, সামিট পাওয়ার ১২.৪৩ টাকা। 

পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. খালেদ মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ খরচ এখন কমবে। কারণ সম্প্রতি যেসব ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে, সেগুলোর কাছ থেকে ইউনিটপ্রতি কম মূল্যে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছি। এছাড়া তুলনামূলক উৎপাদন খরচ কম এমন কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করছি আমরা। ফলে আগামীতে যত দিন ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে, তাতে খরচ অনেক কমে আসবে।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ বলেন, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অধিক দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহকের কাছে বিক্রির কারণে এ লোকসান। তবে কুইক রেন্টাল থেকে পিডিবি যদি কম দামে বিদ্যুৎ নিত, সেক্ষেত্রে লোকসানের পরিমাণটা অনেক কমে যেত। কিন্তু পিডিবি সেটি করতে পারেনি। যে কারণে বছরের পর বছর লোকসানও বাড়ছে তাদের।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, এটি সত্য। কারণ আগে আমাদের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। কিন্তু সেটি কমে এখন ৬২ শতাংশে নেমে এসেছে। যেখানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ছে। আর তেল তো ব্যয়বহুল জ্বালানি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশে তেল ও বিদ্যুতের দাম কমাতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ