ঢাকা, মঙ্গলবার 24 January 2017, ১১ মাঘ ১৪২৩, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নীতিমালা না থাকায় মুনাফা থেকে বঞ্চিত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা

এইচ এম আকতার : নীতিমালা না থাকায় কোম্পানির রিজার্ভ বৃদ্ধিতে চলছে অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুঁজি বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। একটি কোম্পানির কি পরিমাণ অর্থ রিজার্ভ থাকবে তার সীমা না থাকায় রিজার্ভের পাহাড় গড়ছে। কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণ মুনাফা করলেও তা যথাযথভাবে বণ্টন না করে রিজার্ভের নামে সংরক্ষণ করছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হচ্ছেন বঞ্চিত, আর পরিচালকরা এক পর্যায়ে সে রিজার্ভের মালিক হচ্ছেন।

কোনো কোম্পানির রিজার্ভ যদি পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পেতে বিপাকে পড়তে হয় সে কোম্পানিকে। আবার কোম্পানির অর্জিত মুনাফা থেকে লভ্যাংশ না দিয়ে রিজার্ভ বাড়ালে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন বিনিয়োগকারীরা। তবে রিজার্ভের স্ফীতি বিনিয়োগকারীদের জন্য কতটা লাভজনকএ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মতভেদ থাকলেও পুঁজিবাজারে চলছে বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে রিজার্ভ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা।

জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৯৩টি কোম্পানির কাছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রিজার্ভ এন্ড সারপ্লাস রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মুনাফার লভ্যাংশ না দিয়ে অধিকাংশ কোম্পানিই রিজার্ভের পাহাড় গড়ে তুলছে। তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানি কী পরিমাণ রিজার্ভ রাখতে পারবে এবং কীভাবে সেই রিজার্ভ ব্যয় করবে এ সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা না থাকায় কোম্পানিগুলোর মধ্যে এক ধরনের অসাধু প্রতিযোগিতা চলছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, রিজার্ভের টাকা বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির আস্থার হাতিয়ার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণ মুনাফা করলেও তা যথাযথভাবে বণ্টন না করে রিজার্ভের নামে সংরক্ষণ করছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হচ্ছেন বঞ্চিত, আর পরিচালকরা এক পর্যায়ে সে রিজার্ভের মালিক হচ্ছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক কোম্পানি তাদের পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রিজার্ভ সংরক্ষণ করছে। আবার কিছু কিছু কোম্পানি তার অনুমোদিত মূলধনের চেয়েও অনেক বেশি রিজার্ভ সংরক্ষণ করছে। বছরের পর বছর এসব কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ালেও ডিভিডেন্ডের পরিমাণ কমছে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতে, অধিকাংশ কোম্পানির পরিচালক খাতে-কলমে মুনাফা কম দেখিয়ে বছর শেষে কম লভ্যাংশ দিচ্ছেন। আর কোনো বছর কোম্পানি লোকসানে থাকলে কোনো ধরনের লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রিজার্ভ ভেঙে লভ্যাংশ দেওয়ার প্রবণতা বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে খুবই কম বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা।

তাদের মতে, রিজার্ভের পাহাড় না জমিয়ে সে টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে বাজারের তারল্য সংকট কেটে যাবে। একই সঙ্গে রিজার্ভ থেকে লভ্যাংশ দিলে বিনিয়োগকারীরাও লাভবান হবেন বলে আশা তাদের। বিএসইসিকে কোম্পানিগুলোর রিজার্ভ বেশি রাখার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। অন্যদিকে কোম্পানির উৎপাদনে লোকসান হলে আবার উৎপাদনে ফিরে আসতে যে পরিমাণ রিজার্ভ ফান্ড দরকার, সেটা রিজার্ভে রাখা দরকার।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের দ্বিগুণ টাকা রিজার্ভ ফান্ডে রাখা যুক্তিসঙ্গত। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কোম্পানির রিজার্ভ বেশি থাকাও যথোপযুক্ত। অন্য খাতের যেসব কোম্পানি দ্বিগুণের বেশি রিজার্ভ রাখছে, তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

এদিকে কোম্পানিগুলো বলছে, বিনিয়োগকারীদের কোম্পানির ঝুঁকি এড়াতে রিজার্ভে মোটা অঙ্কের টাকা রাখা হচ্ছে। মুনাফার কত শতাংশ রিজার্ভে রাখা যাবে কিংবা রিজার্ভের সাইজ কতটুকু হবে এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। নেই কোনো জবাবদিহিও।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, রিজার্ভের টাকা বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির আস্থার হাতিয়ার। রিজার্ভ ফান্ড কোম্পানিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে সহযোগিতা করে। তবে বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করে রিজার্ভ বাড়ানো যুক্তিসঙ্গত নয়। ব্যাংক-বিমার রিজার্ভ ফান্ড বেশি থাকা স্বাভাবিক। তবে অন্যান্য খাতের কোম্পানির অতিরিক্ত রিজার্ভ বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধাজনক নয়।

কোম্পানিগুলোর কাছে সত্যি রিজার্ভ রয়েছে, নাকি শুধুই কাগজে-কলমে দেখাচ্ছে, তাও নজরদারির পরামর্শ দেন প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ।

কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৯৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের কাছে রিজার্ভ রয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। এ খাতের তালিকাভুক্ত ২৯টি কোম্পানি রিজার্ভ সংরক্ষণ করছে ২৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভ্রমণ ও অবকাশ খাত। এ খাতের তালিকাভুক্ত চার কোম্পানির কাছে রয়েছে ১৮ হাজার ৮৯৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এ তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এ খাতের ১৯ কোম্পানির কাছে ১১ হাজার ৬৭৬ কোটি ৫২ লাখ টাকার রিজার্ভ রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পুঁজিবাজারে চার হাজার ৪৫৪ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা রিজার্ভ নিয়ে বিবিধ খাতের কোম্পানি বেক্সিমকো শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকায় প্রথম স্থানে আছে। এরপর রয়েছে ওষুধ ও রসায়ন খাতের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। কোম্পানিটির রিজার্ভের পরিমাণ তিন হাজার ১৬৬ কোটি ১১ লাখ সাত হাজার টাকা। তিনে থাকা ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি ইসলামী ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ তিন হাজার ১১৯ কোটি ২৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। চতুর্থ স্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। কোম্পানিটির রিজার্ভ রয়েছে দুই হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এছাড়া ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের কোম্পানি ইউনিক হোটেল এন্ড রিসোর্ট এক হাজার ৭১৪ কোটি ৭২ লাখ তিন হাজার টাকা রিজার্ভ নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের তিন কোম্পানির মধ্যে এক হাজার ৬৮৩ কোটি ৪৮ লাখ দুই হাজার টাকা রিজার্ভ নিয়ে এবি ব্যাংক তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে, এক হাজার ৫৩৮ কোটি ৪৯ লাখ তিন হাজার টাকা রিজার্ভ নিয়ে পূবালী ব্যাংক তালিকার সপ্তম ও এক হাজার ৫১৬ কোটি ২২ লাখ সাত হাজার টাকা রিজার্ভ নিয়ে সিটি ব্যাংক অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৯ম স্থানে থাকা বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর এক হাজার ৪০৩ কোটি ৭৬ লাখ দুই হাজার টাকা এবং ১০ম স্থানে থাকা জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি যমুনা অয়েলের এক হাজার ২১৪ কোটি ৩৮ লাখ চার হাজার টাকা রিজার্ভ রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ