ঢাকা, মঙ্গলবার 24 January 2017, ১১ মাঘ ১৪২৩, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মতিঝিল-পল্টন-গুলিস্তানের ফুটপাত পাহারায় এবার লাঠি হাতে ডিএসসিসির স্বেচ্ছাসেবকরা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের পর তারা যেন নির্দিষ্ট সময়ের আগে আর পসরা সাজিয়ে বসতে না পারে, তা তদারকির দায়িত্ব পেয়েছে ৫২ জন স্বেচ্ছাসেবক। লাঠি হাতে নির্দিষ্ট রঙয়ের পোশাক পরা এই তদারকদের নিয়োগ দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। কর্পোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এসব কর্মীদের ‘স্বেচ্ছাসেবক’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণের মতিঝিল, গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, বাইতুল মোকাররম, পল্টন ও দিলকুশাসহ আশপাশের এলাকায় তারা দায়িত্ব পালন করবেন। বেদখল হওয়ার হাত থেকে এইসব স্বেচ্ছাসেবক নামধারী তদারকগণ ফুটপাতকে রক্ষা করবেন। রোববার থেকেই তারা উল্লিখিত এলাকায় দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন।

এদিকে ডিএসসিসি মেয়রের হকার উচ্ছেদের এই উদ্যোগকে অবৈধ দাবি করে হকার সংগঠনসমুহের নেতৃবৃন্দ বলছেন, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য নয়। উচ্ছেদ বন্ধে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর দরজা পর্যন্ত যাওয়া হবে বলে জানান তারা। পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতে যে কোন সময় নতুন আন্দোলন কর্মসূচিরও ঘোষণা দেয়ার কথা জানিয়ে হকার্স সংগঠনগুলো বলছে, এ নিয়ে চিন্তা ভাবনা চলছে।

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য তৈরি ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে আসছে হাজার হাজার হকার। এতে জনগণের চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ রাজধানী জুড়েই অসহ্য যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে ফুটপাতগুলো যেন বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার উচ্ছেদ অভিযান ও হলিডে মার্কেট চালুসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও কোনোভাবেই ফুটপাতগুলো হকারমুক্ত করা যাচ্ছে না। উপরন্তু উচ্ছেদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। হকার ও লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজদের হামলার শিকারও হয়েছেন নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাসহ আইন শৃংখলাবাহিনীর সদস্যরা। ফলে বিভিন্ন সময়ে দফায় দফায় নানা ধরনের উদ্যেগ নিয়ে বেসামাল হকারদের লাগাম টেনে ধরতে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে হকার নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক, মতবিনিময়সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়।

পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসনের জন্য হকার তালিকা, হলিডে (ছুটির দিন) মার্কেট এবং নির্দিষ্ট সময়ে ফুটপাতে হকার বসতে দেয়াসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট নন হকাররা। তারা ফুটপাত দখল শেষে নগরীর রাজপথেও দখলের বিস্তার ঘটাতে থাকেন।

এ অবস্থায় হকারদের ফুটপাত থেকে উচ্ছেদে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় সিটি কর্পোরেশন। সর্বশেষ নগরীর ফুটপাত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার উদ্যোগ নেন ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। এ বিষয়ে গত ১১ জানুয়ারি হকার নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারি কর্মদিবসে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সড়কে হকার বসতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৪ জানুয়ারি থেকে যদি হকাররা ফুটপাত না ছাড়ে তাহলে ১৫ জানুয়ারি থেকে উচ্ছেদের ঘোষণা দেয়া হয়। এছাড়া চলতি বছরের শুরুতে হকারদের জন্য ৫টি স্থানে হলিডে মার্কেট চালু করা হয়।

কিন্তু কর্পোরেশনের এমন সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগের পরও ফুটপাত থেকে কোনোভাবেই হকার সরানো যাচ্ছিলো না। এরপর ঘোষণা অনুযায়ী ১৫ জানুয়ারি (রোববার) থেকে টানা চারদিন ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান চালায় সিটি কর্পোরেশন। এ সময় পুলিশ সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করে। এরপরও বিভিন্ন সময় সুযোগ বুঝে ফুটপাতে বসে পড়েন হকাররা। ফুটপাত পাহারায় সার্বক্ষণিক পুলিশ ফোর্স না পেয়ে এবার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। রোববার সকাল থেকে এসব স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। সবার গায়ে বিশেষ পোশাক ও হাতে প্লাস্টিকের লাঠি দেয়া হয়েছে। ফুটপাতে স্বেচ্ছাসেবকদের উপস্থিতির ফলে কোনো হকার বসতে দেখা যায়নি। প্রথম অবস্থায় চারটি স্থানে ৫২ জন কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়।

সিটি কর্পোরেশনের জারি করা ওই অফিস আদেশে দেখা গেছে, প্রাথমিক অবস্থায় যে চারটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, মতিঝিল ব্যাংকপাড়া থেকে দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে পল্টন পর্যন্ত, জিরো পয়েন্ট, জিপিও এবং বায়তুল মোকাররম, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড (সুন্দরবন মার্কেট) এবং নবাবপুর মোড় থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেণট, দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা ও বঙ্গভবনের উত্তর পাশ এবং গোলাপশাহ মাজার হতে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার পাতাল মার্কেট। 

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে এ চারটি এলাকায় ১০ জন করে মোট ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন। সম্পত্তি বিভাগের চারজন সার্ভেয়ার চারটি টিমে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবে। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে দু’জন করে সহযোগী হিসেবে চেইনম্যান দায়িত্ব পালন করবে। এ চারটি স্থানে সর্বমোট ৫২ জন দায়িত্ব পালন করবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবেন।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বেদখল হয়ে যাওয়ায় নগরীর ফুটপাতে হাঁটা যায় না। জনগণের পথ তাদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে ডিএসসিসি মেয়র বদ্ধপরিকর। আমরা বহুবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু অভিযান শেষে ফুটপাত প্রতিবারই হকারদের দখলে চলে যায়। তাই এখন থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা ফুটপাত পাহারা দেবে, যাতে কোনো হকার সরকারি অফিস চলাকালীন দখল করতে না পারে।

দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘ফুটপাত জনগণের সম্পদ। এটি উদ্ধারে উচ্চ আদালত এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ করছি। ফুটপাত দখলে যত বড় জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাশালী ব্যক্তি হোক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আমার চেষ্টা আছে, ফুটপাত দখল মুক্ত রাখবো।’

আন্দোলনের চিন্তাভাবনা : ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে চলছে ফুটপাতের অবৈধ হকার উচ্ছেদ অভিযান। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে রাস্তার ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকান দিয়ে বসা হকারদের দৌরাত্ম্য কমাতে মেয়র কিছুটা সফলতা অর্জন করতে পারলেও ভিন্নমত হকার নেতাদের। 

মেয়রের হকার উচ্ছেদের এই উদ্যোগকে অবৈধ দাবি করে তারা বলছেন, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য নয়। উচ্ছেদ বন্ধে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যাওয়া হবে বলে জানান তারা। পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতে যে কোন সময় নতুন আন্দোলন কর্মসূচিরও ঘোষণা দেয়ার কথা জানিয়েছে হকার্স সংগঠনগুলো।

হকার্স সংগঠন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে প্রায় ৬০টিরও বেশি হকার্স সংগঠন আছে। এক একটি সংগঠনে ৫, ১০ হাজার থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি হকার জড়িত। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন তাদের জন্য কোন পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উল্টো ব্যবসা থেকে হকারদের বঞ্চিত করছে। 

সূত্র জানায়, গত বছরের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাগিণা একনেকের এক বৈঠকে হকারদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করে তাদের পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়র একথা জেনেও কোন ব্যবস্থা না করে হকার উচ্ছেদে অভিযান চালাচ্ছে। 

বাংলাদেশ ছিন্নমূল হকার্স সমিতির সভাপতি কামাল সিদ্দিকী বলেন, আমরা ফুটপাতে বসা নিয়ে প্রতিনিয়ত পুলিশের সাথে আলাপ-আলোচনা ও যোগাযোগ করছি। তারা তো মেয়রের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তবে মেয়রের এ সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। মেয়র আমাদের ফুটপাতে বসতে না দিলে আমরা অন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। ইতোমধ্যে আমরা শ্রমিক ইউনিয়ন, বামপন্থী দলসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের সাথে নিয়মিত বৈঠক করেছি। আমরা যে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারি। তিনি জানান, রাজধানীতে যদি হকার উচ্ছেদ করতে হয় তাহলে তার আগে তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় তারা ফুটপাতে বগেই ব্যবসা পরিচালনা করবে। হকার্সদের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আগামীকাল ২৫ তারিখে প্রথমে শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাথে বৈঠক করবো। সেখানে সকল হকার সংগঠনের নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আমরা বড় আকারের সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছি। 

কাউছার আলী নামে গুলিস্থানের এক হকার বলেন, রাজধানীতে যেসব স্থানে হলি-ডে মার্কেট রাখা হয়েছে সেসব স্থানে কোন কাস্টমার পাওয়া যায় না। তাহলে আমরা কিসের ব্যবসা করবো। কাস্টমার না পাইলে সেখানে কি দোকান খুলে বসে থাকবো? তাছাড়া আমরা যেখানে কাস্টমার পাবো সেখানেই বসার নির্দেশ দেয়া হোক। তিনি বলেন, আমরা ব্যবসা করে যা আয় করবো প্রয়োজনের সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য ট্যাক্স দেব। তারপরেও আমাদের ভালোভাবে ব্যবসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ করছি।

হকার সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক আবুল হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ের উপযোগী না হলে হলি-ডে মার্কেট করলে হকারদের কি লাভ হবে। তাছাড়া এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশন আমাদের সাথে কোন কথাবার্তা বা বৈঠক পর্যন্ত করেনি। অচিরেই হকারদের সমস্যা সমাধান না হলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ