ঢাকা, মঙ্গলবার 24 January 2017, ১১ মাঘ ১৪২৩, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

তাওহীদের গুরুত্ব শিরকের প্রকারভেদ ও পরিণাম

আলাউদ্দিন ইমামী : তাওহীদের পরিচয় ও গুরুত্ব : তাওহীদ মানে একত্ববাদ। ওয়াহিদ মানে এক। আহাদ মানে একক। আহাদ আর ওয়াহিদ হতে তাওহীদ। তাওহীদই হলো জান্নাতী ও জাহান্নামী হওয়ার এবং আল্লাহর রহমত পাওয়ার ও গজবে পরার মূল বিষয়। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় এবং একক নিরংকুশ, সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে বিশ্বাস, গ্রহণ ও মান্য করার নাম হলো তাওহীদ। যারা আল্লাহর সাথে অন্যজনকে বা অন্য কিছুকে যুক্ত অথবা সমান করে তারা তাওহীদ বিশ্বাসী বা তাওহীদবাদী হতে পারে না। তারা হবে শিরিককারী। তাই আল্লাহ তার পরিচয় দিয়ে বলেন, “হে রাসূল (স) আপনি সবাইকে বলে দিন, আল্লাহর কোন শরিক নেই। আল্লাহ এক, তিনি মুখাপেক্ষীহীন। তোমাদের ইলাহ একক ইলাহ। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তার সমকক্ষ কেউ নেই। যাহা ইচ্ছা তা তিনিই করতে পারেন। তাই তিনিই শুধু সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। তিনি ছাড়া আর কোন বিধানদাতা নেই। তিনিই রহমান, তিনিই রহীম। নিশ্চয়ই আল্লাহ চূড়ান্ত ক্ষমতার মালিক এবং প্রচুর রিজিকদাতা” আল-কুরআন। তাওহীদভিত্তিক একক ক্ষমতার মালিক যিনি, তার পক্ষেই শুধু সম্ভব নিরপেক্ষভাবে শাসন করা। যার যার মর্যাদা ও অধিকার অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য দান করা। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে শুধু তিনিই বিচার ও ফয়সালা করতে পারেন। সবার জন্য সমান সুযোগ সুবিধা দিয়ে ন্যায় নীতির ভিত্তিতে আইন ও বিধান রচনা করা শুধু তার পক্ষেই সম্ভব। এই কারণে শুধু তারই অধিকার আছে সবার আনুগত্য, এবাদত ও প্রশংসা পাওয়ার এবং সবার জন্য আইন ও বিধান দেয়ার। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর ছাড়া দ্বিতীয় আর একজন ইলাহ থাকলে দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যেত” আল-কুরআন।
শিরিকের পরিচয় : তাওহীদের বিপরিত হচ্ছে শিরিক। শিরিক মানে বহুত্ববাদ। অর্থাৎ বহুজন বা বহুশক্তিকে অথবা বহু প্রতিষ্ঠানকে, কথায়, কাজে, বিশ্বাসে, মর্যাদা, ক্ষমতা ও অধিকারে, সত্তায় এবং গুণাবলীতে এক সমান করা। এই জন্যই ২ জন পার্টনার এক সাথে ব্যবসা করলে সেই ব্যবসাকে শিরীকি ব্যবসা বলে। সকল কাজে শরিক ও শিরিক করা যায়, যেমন আমরা শরীকে ব্যবসা করি। কুরবান দেই। কিন্তু আল্লাহর সাথে কাউকে কোন দিক থেকে শরীক ও সমান করা যাবে না। ইসলামী পরিভাষায় এবং ইসলামী শরিয়তে কোন ব্যক্তি, বস্তু, শক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সত্তায় ও গুণাবলীতে, অধিকার ও মর্যাদায় অথবা ক্ষমতায় আল্লাহর সমান করাই হলো শিরিক। শিরিক করতে যারা মানুষকে হুকুম দেয় অথবা বাধ্য করে তারা হলো তাগুত। যেমন ফেরআউন, সে মানুষকে শিরিক করতে বাধ্য করেছে। শিরিক ও তাগুত হলো হারাম। কবিরা গুনাহ। তাগুত ও শিরিকের পরিণাম হলো আল্লাহর গজব ও আজাব। এদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। দুনিয়ার বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট হলো আল্লাহর গজব, আখিরাতের দুঃখ-কষ্ট ও জাহান্নামের শাস্তি হলো আজাব। এই শিরিকের কারণে তাগুতের সাথে আল্লাহর প্রেরিত সকল নবী রাসূলদের সংঘাত ও সংঘর্ষ হয়েছে। কারণ তারা আল্লাহর সাথে শিরিক করত অথবা নিজেরা তাগুত হয়ে অন্যকে বা অধীনস্ত জনগণকে আল্লাহর সাথে শিরিক করার হুকুম দিত অথবা শিরিক করতে বাধ্য করত। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তার সাথে কোন কিছু শরিক করাকে ক্ষমা করবেন না” আল-কুরআন। তাগুতের ব্যপারে তিনি বলেন, “তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুতকে ত্যাগ কর” আল-কুরআন। তাই তাগুত আল্লাহর হুকুম মতো চলতে বাধা দিত তারাই নবী রাসূলদের (স)কে নিজিদের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও প্রভৃত্বের জন্য বিপদ ও অন্তরায় মনে করে নবীদের বিরোধীতা করত এবং নবীদের উপর অত্যাচার করত। একই কারণে মক্কার কোরাইশ নেতাগণ আমাদের প্রিয় নবী (স)কে মক্কা ছেড়ে যেতে, হিজরত করতে বাধ্য করেছে। বর্তমান যুগেও যারা আল্লাহর দেয়া বিধিবিধান ও হুকুম মত চলতে চায় না বরং নিজেরাই বিধিবিধান ও হুকুম জারি করে মানুষকে নিজেদের ইচ্ছামত চালাতে চায়, তারাও সেই যুগের তাগুতের মত। এরা আল্লাহর বিধিবিধান ও হুকুম মত চলার কথা যারা বলবে তাদের উপর জুলুম অত্যাচার করবে। কারণ আল্লাহর হুকুম ও বিধান মত চলাটাকে তাদের হুকুম ও কর্তৃত্বের জন্য অন্তরায়  মনে করে। আগের যুগের নেতারা যেমন বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নবীদেরকে দোষারোপ করার চেষ্টা ও চক্রান্ত করেছে, বর্তমান যুগের তাগুতরাও যারা আল্লাহর হুকুম ও বিধি বিধান মত চলার কথা বলবে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অত্যাচার করে তাদেরকে দমন করার চেষ্টা করবে। সারা দুনিয়ায় এখন সেই অবস্থায়ই চলছে। এমন কি মুসলমান দেশগুলুতেও। সেই কারণেই মুসলমানদের ব্যপারে আল্লাহ বলেন, “অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে আবার শিরিকও করে” (ছুরা ইউছুফ, ১০৬ আয়াত। আল-কুরআন)। তিনি আরো বলেন, “তারা কি জাহেলোী যুগের বিধান মত (মানে আল্লাহর বিধান ও হুকুম বাদ দিয়ে মানুষের হুকুম ও বিধান মত) চলতে চায় অথচ আল্লাহর চাইতে উত্তম বিধান ও হুকুম দাতা কে আছে?” (ছুরায়ে মায়েদা, আয়াত নং ৫০, আল-কুরআন)। এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, আল্লাহর হুকুম ও বিধান বাদ দিয়ে অন্যের হুকুম ও বিধান মত চলাই শিরিক।
শিরিকের প্রকারভেদ : ইসলামী শরিয়ত মুসলমানদেরকে শিরিকমুক্ত এবং নির্ভেজাল তাওহীদবাদী করার জন্য শিরিকের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করেছে। যেমন : ১. সত্তায় শিরিক, ২. গুণাবলীতে শিরিক, ৩. অধিকারে শিরিক, ৪. ক্ষমতায় শিরিক, ৫. মর্যদায় শিরিক, ৬. এবাদতে শিরিক। যত নবী আল্লাহ দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তাদের সকলের একটাই মিশন ছিল, মানুষকে শিরিকমুক্ত করে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা এবং আল্লাহর জমীনে আল্লাহর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বকে নিরংক্ষুশ করা। এই জন্য সকল নবী রাসূলের একটাই স্লোগান ছিল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” শুধু মানুষের জন্যই তারা এই স্লোগান নিয়ে এসেছিলেন। কারণ পুরা জগত আল্লাহর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বকে মেনে চলে শয়তানের প্ররোচনা এবং নফসের তাড়নায় মানুষই শুধু তার উল্টা চলে এবং অবাধ্য হয়। এই কারণে মুসলমানদের পুরোপুরি আল্লাহর অনুগত রাখার এবং শিরিকমুক্ত করার জন্য ইসলামী শরিয়তের বিজ্ঞ আলেমগণ শিরিকের বিস্তারিত বাখ্যা দিয়েছেন।
১. শিরক ফিজ জাত, মানে সত্তায় শিরিক : কোন শক্তি, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কোন বস্তুকে আকার আকৃতিতে আল্লাহর সমান বলা বা সমান করা। অথবা গঠন প্রকৃতিতে সমান করা ও সমান বলা। আল্লাহ বলেন, তার মত কিছু নেই কেউ নেই।
২. শিরিক ফিচ ছিফাত, মানে গুণাবলীতে শিরিক : আল্লাহর যেমন গুণ ও ক্ষমতা আছে অন্য কাউকে বা কোন কিছুকে সে রকম গুণ ও ক্ষমতা সম্পন্ন মনে করা। আল্লাহ যেমন পারে অন্যরাও তেমন জানে অথবা পারে, এমন মনে করা, বলা বা বিশ্বাস করা শিরিক।
৩. শিরক ফিল এখতিয়ারাত, মানে অধিকারে শিরিক : আল্লাহ যে রকম বান্দার উপর অধিকার রাখেন অন্যদেরকে সে রকম অধিকারী মনে করে তাদেরকে সেভাবে প্রধান্য দেয়া, মান্য করা ও সুযোগ দেয়া শিরিক।
৪. শিরক ফিল হুকুম ওয়াল আমর, মানে ক্ষমতায় শিরিক : যা ইচ্ছা তা করার ক্ষমতা, শাসন করার কথ বা বিধান ও হুকুম দেয়ার ক্ষমতা আল্লাহর যেমন আছে অন্য কাউকে বা কোন ব্যক্তি শক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবে ক্ষমতাবান মনে করা বা ক্ষমতা দেয়া শিরিক। আল্লাহ বলেন, হুকুম করার ক্ষমতা আল্লাহর ছাড়া আর কারো নেই।
৫. শিরিক ফিল একরাম, মানে সম্মান ও মর্যদায় শিরিক : আল্লাহ যেমন মর্যাদাবান অন্য কাউকে সেভাবে সমান মর্যাদা দেয়া বা তাকে সেভাবে মান্য করা শিরিক। এই কারণে আল্লাহ কুরআনের শুরুতে সূরায়ে ফাতেহায় প্রথমেই বলে দিয়েছেন সমস্ত প্রশংসা পাওয়ার মালিক, অধিকারী, উপযুক্ত সত্তা একমাত্র আল্লাহ। তাই কোন ব্যক্তি নেতা, কর্মকর্তা, পীর পুরোহিত, মাঝার ও মূর্তিকে অতিরিক্ত সম্মান দেখানো শিরিক। যেমন তাদের সামনে মাথা নত করা। আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে তাদের হুকুম মত চলা বা কাজ করা। আল্লাহ বলেন, সমস্ত ইজ্জ্বতের মালিক আল্লাহ। আল-কুরআন।
৬. শিরিক ফিল এবাদাত, মানে এবাদতে শিরিক : গোলামীতে, আদেশ পালনে, অনুগত্যে অন্য কাউকে কথায়, কাজে বা বিশ্বাসে অথবা এবাদত বন্দেগীতে আল্লাহর সমান বানিয়ে দেয়া শিরিক। আল্লাহ বলেন, যে আল্লাহর সাক্ষাৎ প্রত্যাশী সে যেন তার রবের এবাদতে অন্য কোন কিছুকে শরিক না করে। আল-কুরআন। এই কারণে কেউ নামায পড়ার সময়, রোজা রাখতে অন্য কোন জনকে দেখাবার জন্য যদি করে তা হবে শিরিক। এভাবে ইসলাম ধর্মের সাথে অন্য ধর্মকে বা অন্য ধর্মের দেব দেবীকে সমান করলে, আল্লাহর কুরআনের সাথে অন্য ধর্মীয় কোন বইকে কথায়, কাজে, বিশ্বাসে অথবা বিধানে আল্লাহর কুরআনের সমান করলে সেটা হবে শিরিক। তাই মুসলমানগণ অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানে যাওয়াও শিরিকি গুনাহ।
শিরিকের পরিণাম : শিরিক হলো সব চাইতে বড় পাপ। শিরিকের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করেন না। শিরিকের পরিণাম হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টি গজব ও আজাব। শিরিকারীর ঠিকানা হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম। তবে কেউ যদি তাওবা করে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে সেভাবে চলে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন এবং জান্নাত দেবেন।
লেখক : খতীব, বান্দরবান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ