ঢাকা, মঙ্গলবার 24 January 2017, ১১ মাঘ ১৪২৩, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাল্যবিবাহ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

রহিমা আক্তার মৌ : আমেনার বয়স ১৭ বছর। এখনো আমেনা জাতীয় পরিচয়পত্র পায়নি। মানে পরিচয়পত্র করার বয়স হয়নি। অথচ আমেনার কোলে ৩টি সন্তান। বয়স ৫ বছর, ৩ বছর আর ছোটটার বয়স ১০ মাস। বিষয়টা কি খুব হাস্যকর। বাংলাদেশের জলবায়ুর কারণে নারীদের অল্প বয়সেই পিরিয়ড শুরু হয়। আর পিরিয়ড হলেই সন্তান হবার কোনো বাধা থাকে না। ১১ বছর বয়সে বিয়ে দেয়া হয় আমেনাকে।
আমেনার মা সালেহা কাজ করে বাসা বাড়িতে। বাবা হলেন আবাসিক ভবনের দারোয়ান। সালেহার মুখে আমেনার অসুস্থ্যের কথা শুনে দেখতে যাই। আবারও আমেনার গর্ভে সন্তান। সন্তান নষ্ট হবার ওষুধ খেয়েছে আমেনা। এখন ৪/৫ দিন যাবৎ ব্লিডিং হচ্ছে। খবর পেয়ে দ্রুত নিয়ে যাই হাসপাতালে। আমেনার অবস্থা ভাল না। দ্রুত ওটিতে নিয়ে এমআর করা হয়। আমেনার গর্ভ থেকে ৪/৫ মাসের ছেলে সন্তান বের করা হয়। বর্তমানে আমেনা সুস্থ থাকলেও তার শরীরে রয়েছে হিমোগ্লোবিন, ভিটামিন, আয়রনের অভাব। যে মায়ের শরীরে এগুলো প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব তার সন্তানরা কতটুকু সুস্থ ও স্বাভাবিক তা আমার জানা নেই। আশা করি, আমাদের সমাজব্যবস্থার জানা আছে।
বর্তমান সরকার মেয়েদের বিয়ের বয়স কমিয়ে ১৮ থেকে ১৬ বছর করার প্রস্তাব পেশ করেন। গণপ্রজাতন্ত্রী এই বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়স হলে যখন জাতীয় পরিচয়পত্র পাবার আইন আছে। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র পাবার আগেই তাকে বিয়ে দেয়া যাবে। বিষয়টা কিছু হলেও হাস্যকর বটে। মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার লক্ষ্যে মঞ্চে, সভা-সেনিমারে অনেক বক্তাই অনেক কথা বলেন। যা আমরা খুব মনোযোগ সহকারে শুনে থাকে।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু। হ্যাঁ, শিশুরা জাতীয় পরিচয়পত্র পায় না। শিশু বয়স পার হলেই জাতীয় পরিচয়পত্র পাবে। অথচ ওই শিশু বয়সী ১৬ বছর বয়সী মেয়েটাকে বিয়ে দিতে পারবে।
আমেনার মতো হাজার হাজার মেয়ে শিশু বাংলার আনাচে-কানাচে আরও ২/৩ টা শিশুর জন্ম দিচ্ছে। যে বয়সে আমেনার থাকার কথা ছিল স্কুলের বারান্দায় আর ক্লাস রুমে সে বয়সে আমেনা প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালন করছে তার সন্তানের। বাল্যবিবাহ সমাজের ভয়ঙ্কর অভিশাপের নাম। একটি বাল্যবিবাহের কারণে অভিশাপের মুখে পড়ছে একটি পুরো পরিবার। বছরের পর বছর জন্ম দিচ্ছে শিশুর।
এক শিশু জন্ম দিচ্ছে আরেক শিশুর। বাল্যবিবাহ নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে তবে তা হাতেগোনা কয়েকটি স্থানে। বাল্যবিবাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে মেয়েরা এমন পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি এই দেশে। তারপরও ২/৪ টা ঘটনা যা ঘটে তা আমরা দেখতে বা শুনতে পাই। তবে হাজার হাজার আমেনার কথা আমরা কেউ জানি না। জানার চেষ্টাও করি না। একদিকে এক অপ্রাপ্ত বয়স্ক মা জন্ম দিচ্ছে শিশুর।
অন্যদিকে সুস্থ শিশু হচ্ছে না বলে বার বার সন্তানের জন্ম দিচ্ছে। বাড়ছে জনসংখ্যা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে জনসংখ্যা তাদের আশীর্বাদ হলেও আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবে থেকে বাল্যবিবাহ প্রচলন শুরু হয়েছে তা অনেকটাই অস্পষ্ট। তবে ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৬শ শতকের অষ্টম দশকের দিকেও বিশ্বের সব উপমহাদেশে বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল। সেই রূপ ছিল আরও ভয়ঙ্কর। মেয়ে সন্তান হবার পর পর ছেলের বাবা বলেই বসতো ‘তোমার সাথে আমার ছেলের বিয়ে হবে।’ এমনকি অনেক পরিবারে সন্তান জন্মের আগেই বলে বসত যে, মেয়ে হলে ওর ছেলের সাথে বিয়ে দেয়া হবে। আর বাবা-মায়ের কথা রাখতে গিয়ে সেই ৬/৭ এমনকি ৩/৪ বছর বয়সে ওদের বিয়ে দেয়া হতো। ইউরোপের পরিব্রাজকরা তাদের গ্রন্থে বাল্যবিবাহ প্রচলনের তথ্য পেয়েছে। ঐতিহাসিক আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে তৎকালীন সমাজে বাল্যবিবাহ প্রথার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার আন্দোলন ও রুখে দাঁড়ায় রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এরপর বেগম রোকেয়াও এর জন্য অনেক প্রতিবাদ করেন।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের ওয়ার্ল্ড চিলড্রেনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের ৬৪ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর বয়স হবার আগেই। অন্যদিকে ১৫ থেকে ১৯ বছরেই গর্ভবতী হয় এক-তৃতীয়াংশ নারী। যাকে বলা হবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থা। এই সময়ে সন্তান জন্ম হলে মা ও শিশুর জন্যই ক্ষতির কারণ।  বাংলাদেশে জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে যাদের ১৩ দশমিক ৭ ভাগ মেয়ে শিশুর বিয়ে হয় ১৯ বছর বয়সের আগেই। শহরের তুলনায় গ্রামে এর হার অনেক বেশি।
বাল্যবিবাহ বন্ধে সরকার আইন জারি করেছে। আইন থাকা সত্ত্বেও অহরহ হচ্ছে বাল্যবিবাহ। শিক্ষার হার দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সেই হারে বাল্যবিবাহ বন্ধ হচ্ছে না। নারীদের এখনও ঘরে বা বাড়িতে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তাই গৃহকর্তার নির্দেশই আসল বলে ঘরের অল্পবয়সী মেয়েকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে। আইনের ব্যবহার আর সচেতনতা না বাড়ালে অনেক আমেনার অবস্থা এমন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ