ঢাকা, মঙ্গলবার 24 January 2017, ১১ মাঘ ১৪২৩, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিসরের মুসলিম নেত্রী জয়নব গাজ্জালী

মিসরীয় মুসলিম নেত্রী জয়নব গাজ্জালী। মুসলিম মহিলা সমিতির জামায়াত অলি সাইয়্যেদাত আল মুসলিমাত্য-এর প্রতিষ্ঠাতা। তার পিতা আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে যুগপৎ স্বতন্ত্র ধর্মীয় শিক্ষাকর্তা ও পাশাপাশি সূতার ব্যবসা করেন।
ওহুদের যুদ্ধে রাসল (সাঃ)-এর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নুসাইবা বিনতে কা’ব আল মুজানিয়্যার অনুকরণে ইসলামী নেত্রী হওয়ার জন্য জয়নবের পিতা তাকে উৎসাহিত করতেন।
তরুণ বয়সে জয়নব মিসরীয় মহিলা ইউনিয়নে যোগদান করেন এটি প্রমাণ করার জন্য যে, পরিবারের মধ্যে মহিলাদের ইসলাম যে অধিকার দিয়েছে অন্যকোন ধর্মে মহিলাদের এই অধিকার দেয়নি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে মুসলিম মহিলা সমিতি (জামায়াত আল সাইয়্যেদাত আল মুসলিমাত) প্রতিষ্ঠা কান। তার দাবি, তার এ সিমিতির সদস্য সংখ্যা সমগ্র মিসরে প্রায় ত্রিশ লাখ। ১৯৬৪ সালে মিসর সরকার এই সমিতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
হাসান আল বান্নার প্রতি আনুগত্য:
মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্না তার মহিলা সমিতিকে ব্রাদারহুডের সাথে যুক্ত করার আমন্ত্রণ জানালে তার মহিলা সমিতির স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশংকায় তিনি হাসান আল বান্নার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। যাহোক, পরবর্তীতে তিনি হাসান আল বান্নার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তার সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে যুক্ত না থাকায় মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ হওয়ার পর ও তার সমিতি আইনসঙ্গতভাবে কাজ করতে পারতো। আইনত বৈধ থাকার কারণেই সমিতিকে অব্যাহত রেখে প্রচারপত্র বিলি ও নিজের বাড়িতে সভা অনুষ্ঠান করতে পারত।
জয়নব গাজ্জালী এমন এক নারীবাদ প্রচার করতেন যা ছিল জন্মগতভাবেই ইসলামী। ইসলাম ও কুরআনের উপর বাস্তব জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন নারীমুক্তি, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার অর্জন করতে হলে ইসলামকে আরও গভীরভাবে জানতে হবে। আল গাজ্জালী আরও বিশ্বাস করতেন, মহিলাদের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো পরিবার, প্রাথমিক দায়িত্ব সম্পাদনের পরই রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশ গ্রহণের প্রশ্ন আসে। গাজ্জালীর পিতার আদর্শই তাকে পুরুষ তান্ত্রিক ইসলামী নেতাদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতে শিখিয়েছে।
মুসলিম মহিলা সমিতি
তুলুন মসজিদে তাঁর সাপ্তাহিক বয়ানে তিন হাজার লোকের সমাবেশ হতো। পবিত্র রমযান মাসে ৫০০০ হাজার ছাড়িয়ে যেত। মহিলাদের প্রশিক্ষণ ছাড়াও একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন, এতিমখানা, দরিদ্র্যদের সাহায্য করতেন, পারিবারিক শালিসের কাজ করতেন। সমিতির রাজনৈতিক দাবী ছিল মিসরে কুরআনের শাসন কায়েম করা।
লায়লা আহমদ, মিরিয়ান কুক, এম কাসিম জামান, রোক্সাসা ইউবিনের মত পণ্ডিত ব্যক্তিগণ অনেক দূরে, এমনকি তার প্রচারিত ধারণারও তারা সমালোচনা করেন। এসব পণ্ডিতগণ গাজ্জালীর পারিবারিক জীবন পদ্ধতি সম্পর্কে সমালোচনামুখর, তার কথাবার্তা, সাক্ষাৎকার, প্রকাশনা এবং চিঠিপত্র পড়লে বোঝা যায়, তিনি মহিলাদের মা এবং স্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করতেই পছন্দ করেন।
এমনই যদি পরিস্থিতি হয়, তখন স্পষ্টত পারিবারিক জীবন ব্যক্তিগত স্বার্থের সাথে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অপরপক্ষে ইসলামিক কর্মকাণ্ড এবং বিবাহিত জীবন দাওয়াত এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পরিবার একটি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে, কাজেই প্রত্যেকেই নিজ নিজ আপন পদ্ধতিতে চলা উচিত। আমার জেহাদী কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য আমি আপনাকে অনুরোধ জানাবো না কিন্তু আল্লাহ্র পথে জেহাদী কর্মকাণ্ডে আপনি আমাকে বাধা দিবেন না আপনার কাছ থেকে এই প্রত্যাশা থাকা আমার অধিকার। অধিকন্তু আমার জেহাদী ভাইদের কর্ম কাণ্ড নিয়ে আমাকে কোন প্রশ্ন করতে পারবেন না, এটা আমাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ব্যাপার। একজন মহিলার উপর একজন পুরুষের পূর্ণ আস্থা থাকা উচিৎ বিশেষ করে ঐ মহিলা যিনি ১৮ বছর বয়সেই নিজেকে আল্লাহ এবং দাওয়াতের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। বিবাহ সম্পর্কিত চুক্তির সাথে যদি দাওয়াত কাজের সংঘাত বা বিরোধ সৃষ্টি হয় সেক্ষেত্রে বিবাহ চুক্তি দাওয়াতের ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে যাবে বলে আল-গাজ্জালি বিশ্বাস করেন।
তার বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে গাজ্জালী বলেন, তার কোন সন্তান না থঅকাটা তার জন্য “আশীর্বাদ” এটাকে আমি সহজভাবে নিয়েছি এই জন্যই এর ফলে বহির্জগতের সাথে যুক্ত হতে আর কোন বাধা থাকালো না। তার জেলে থাকা অবস্থায় তার দ্বিতীয় স্বামী মারা যায়, সরকারি হুমকির মুখে আমার দ্বিতীয় স্বামী আমাকে তালাক দেন অন্যথা সরকার তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দিয়েছিল, আল গাজ্জালীর পরিবার তার দ্বিতীয় স্বামীর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিল তবে আলগাজ্জালী তার প্রতি অনুগত ছিলেন। জেল থেকে বের হয়ে যখন দেখলেন তার স্বামীর ছবিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে তখন তিনি ছবিটি যথাস্থানে পুনরায় স্থাপন করেন।
জেল জীবন
১৯৪৯ সালে হাসান আল বান্নার হত্যাকাণ্ডের পর ৬০ এর দশকের পথম দিকে আল-গাজ্জালী ব্রাদার হুডকে পুনঃসংগঠিত করার দায়িত্ব নেন। ১৯৬৫ সালে তার কার্যকলাপের জন্যে তাকে গ্রেফতার ও ২৫ বছরের কঠোর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের শাসনামলে তিনি মুক্তি পান।
জেলখানায় আল-গাজ্জালী ও ব্রাদারহুডের অন্যান্য সদস্যদের অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। জেলখানার দুর্বিষহ জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে আল গাজ্জালী বলেন, একটা সেলে তালা বন্ধ করে কুকুরের সাথে আমাকে রাখা হয় এবং প্রেসিডেন্ট নাসের হত্যাকা-ের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করার জন্য আমার উপর প্রচ- চাপ সৃষ্টি করা হয়। জেল জীবনের এই সীমাহীন কষ্টের দিনে মোহাম্মদ (সাঃ)-এর কষ্ট ও তার দূরদৃষ্টির বিষয় বার বার স্মরণ করতেন। জেলখানার এই কঠিন জীবনে আমি খাদ্য ও আশ্রয়ের ক্ষেত্রে অনেক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার অর্জন করেছি।
জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি শিক্ষকতা গ্রহণ করেন এবং মুসলিম ব্রাদার হুডের ম্যাগাজিন ‘আদ দাওয়া” এর পুনর্জাগরণের জন্যে কাজ করেন। আদ দাওয়ায় শিশু ও মহিলা বিভাগের সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, এই বিভাগে লেখার সময় তিনি মহিলাদের স্বামীর প্রতি অনুগত থেকে শিশু সন্তানের লালন-পালনের জন্য মহিলাদের উৎসাহিত করতেন। গেলে জীবনের উপর তিনি একটি বই ও লেখেন।
ফেরাউনের প্রত্যাবর্তন
“জীবনের কিছু স্মৃতি” (আয়্যাম মিন হায়াতি) শীর্ষক জেল জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লিখেন। এই বইতে প্রেসিডেন্ট নাসেরকে বলা হয়েছে ফেরাউন। তার জেল জীবনের অসহনীয় নির্যাতন যা অনেক পুরুষও সহ্য করতে পারতো না সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতির নিখুঁত চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি কিছু বিস্ময়কর ও দূরদৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন যা তাঁকে জেল খানায় টিকে থাকতে শক্তি যুগিয়েছে।
উত্তরাধিকার
জয়নব গাজ্জালী একজন লেখক। প্রখ্যাত ইসলামী জার্নাল ও ম্যাগাজিনে তিনি ইসলাম ও মহিলা বিষয়ে লিখেন। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনে বহু তরুণী যুক্ত হয়েছে। ১৯৭০ সাল থেকে জয়নব গাজ্জালী নিজেরে সাংগঠনিক ও কর্ম দক্ষতায় বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের একজন বড় নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
-আল-বেরুনী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ