ঢাকা, মঙ্গলবার 24 January 2017, ১১ মাঘ ১৪২৩, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অভিমানের ছোঁয়া

সেলিনা ইসলাম : আজকের আকাশটা ধূসর মেঘে ঢাকা। বাইরে বৃষ্টির মত টুপটুপ করে শিশির পড়ছে...। ফজরের নামাজ পড়ে মিনহাজ উদ্দিন বারবার জানালার কাছে গিয়ে রাস্তার দিকে দেখছে। সময় যত এগিয়ে যাচ্ছে নিজের উপর তার ভীষণ রাগ হচ্ছে...। অনেকক্ষণ ধরে বাইরে দেখে সে আসলে বুঝতে চেষ্টা করছে এখন কয়টা বাজে? তিনি যে ঘরে থাকেন সে ঘরে কোন ঘড়ি নেই। “রিটায়ার্ড মানুষের সময় জেনে কী হবে...? তাঁদের আছে অফুরন্ত সময়! তাদের আবার ঘড়ির কোন প্রয়োজন আছে নাকি!?” আপন মনে কথাগুলো ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কাঠের ছড়িতে ভর দিয়ে আবার জানালা দিয়ে দেখে। আপন মনে বিড়বিড় করে- “নাহ কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না! রাস্তায় কেউ বের হয়নি। আকাশেও সূর্যের দেখা নেই।” এদিকে বাসার সবাই এখনো ঘুম! খাবার ঘরটা অনেক অন্ধকার। ঘরটা ডিঙিয়ে বাথরুমে যেতে হয়। কিন্তু ছড়ির ঠক ঠক শব্দে যদি সবার ঘুম ভেঙ্গে যায়? তাঁকে এই ভাবনাও বারবার তাড়া করে ফেরে। এবার আস্তে আস্তে ঘরের দরোজাটা সামান্য ফাঁক করে উঁকি দেয় রান্না ঘরের দিকে। বুকের ভিতরে ধুকপুক বাড়ে। বাম কানটা খাঁড়া করে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করে।
-“নবাবজাদি এহনও নাহে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছে! ছেমড়ি তুই জানিস সকালে উঠে এককাপ র’চা আর দুইখান টোষ্ট বিস্কুট না খালি আমার গ্যাস্টিকের ব্যথা ওঠে। নাহঃ তোর ঘুম এহনও ভাঙে না ক্যান!?” রাগে গজগজ করতে করতে আবার এসে বিছানায় বসে। ব্যথাটার কথা ভেবে দুই গ্লাস পানি খেয়েছে। এখন তো আবার বাথরুমে যেতে হবে। অস্থিরতা নিয়েই হেঁটে যায়। তবে ফ্লোরে লাঠি লেগে যেন কোন শব্দ না হয় সেই দিকে খুব সতর্ক সে।
পা টিপেটিপে হেঁটে অনেক কষ্টে বাথরুম সেরে কেবল দরজা খুলে বের হয়েছে...! শোনে খুব নিচু স্বরে কুলসুম বলছে-”দাদা আপনের ঠকাঠকে তো মোর ঘুম ছুইটা গ্যাছে! আইজ গো ছুটির দিনে কারো ঘুম ভাঙে না। আর আফনে হেই  বিহানবেলা থাইকা খট্টর খট্টর শুরু করছেন!”
-আরে ছেমড়ি আমার ঘরে চা আর টোষ্ট দিয়া যা। কথা কম ক নালি ফরে থাপড়াই দিবানি।
রাগ দমন করে যতটা সম্ভব নিচু স্বরে কথা বলে মিনহাজ। ওর কথা শুনে কিশোরী মেয়েটা বেহায়ার মত মুখে শাড়ীর আঁচল দিয়ে হাসে। হাসতে হাসতে বলে -
-দাদা আপনের কী মুইতের রোগে ধরছে?
মিনহাজ চোখ বড় বড় করে রাগ দেখায়। মনে মনে বলে “এই মেয়ে তো অনেক পাকনা। ডায়াবেটিককে বলে মুইতের রোগ! বেয়াদব কোথাকার।” জানালা দিয়ে খাবার রুমে আসা সামান্য আলোতে দেয়ালে রাখা ঘড়ির দিকে তাকায়। বুকের ভিতরটা ফাঁকা জমিনের মত হয়ে যায়। চোখে নামতে চায় জোয়ারের ঢল! মনে পড়ে এই ঘড়িটা যখন মলিকে নিয়ে কোলকাতা গিয়েছিল? তখন কিনে এনেছিল। ঘড়ির সেকেন্ড ও ঘণ্টার কাঁটা অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করে। ঘড়িটা বেশ পুরনো হলেও সময়টা বলে দিচ্ছে সঠিকভাবেই। এখন বাজে সাড়ে সাতটা। ঘড়িটা কিছু সুন্দর স্মৃতি মনে করিয়ে দিল। এই বুড়ো বয়সে স্মৃতিই যেন বেঁচে থাকার একমাত্র সহায়। মলিকে ভেবে মনটাও বেশ খারাপ হয়ে যায়। “বুড়ো মানুষের বউ না থাকলে কষ্ট বাড়ে অনেক বেশী! এইটা কেবল বুড়োরাই বুঝে!” কথাটা ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে ঢুকে পায়জামাটা পরে নেয়। অনেক ঠাণ্ডা পড়েছে আজ। সাধারণতঃ যেদিন কুয়াশা পড়ে সেদিন ঠাণ্ডাটা একটু কম থাকে। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে উল্টো। সে এতদিন যেখানে যা দেখে এসেছে? তার সব কিছুই আজকাল উল্টো হচ্ছে! সে যা কিছু আধুনিক বলে জেনেছে। এখন সেসব সবাই ব্যাকডেটেট বলে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে! তারপর যার যার মত করে নিজেরাই নিজেদের কাজে অত্যাধুনিকতার লেবাস পরিয়ে নিচ্ছে! “আধুনিকতা যদি হয় অসম্মান অশ্লীল অসভ্যতা অকল্যাণ? তাহলে সে আধুনিকতার প্রয়োজন কী?” নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
মিনহাজ সেই ছোটবেলায় নিজেই দেখেছে মাকে প্রতিদিনই বাসার সবার আগে ঘুম থেকে উঠতে। তারপর দাদা দাদীকে সকালের নাস্তা খেতে দিতেন। মা নিজের হাতেই তাঁদেরকে ওষুধ খাইয়ে তারপর অন্য কাজে যেতেন। কতদিন মিনহাজ  নিজেই দাদা দাদীর ওষুধ পড়ে পড়ে মায়ের হাতে তুলে দিয়েছে। সেই সময়ে বাড়ীর বউয়েরা ঘরে থাকা বাচ্চাদের ও মুরুব্বীদের প্রতি? অন্যদের থেকে যেন একটু বেশিই বাড়তি খেয়াল নিত। আর এই বাড়তি খেয়ালে বাড়ীর বউ ঝিয়েরা অন্যরকম এক স্বর্গীয় আনন্দ খুঁজে পেত। তারা মুরুব্বীদের সেবা শুশ্রুষা করতে পেরে তৃপ্তি নিয়ে সারাদিন আনন্দে কাটিয়ে দিত। মলিকেও সে দেখেছে মা বাবার সেবা করতে। মনে পড়ে একদিনের ঘটনা:-
সেদিন মলির প্রসব বেদনা উঠেছে। যা দেখে সে অফিসে যেতে চেয়েও আবার যায়নি। ফোন করে অফিসে বলে দিয়েছে আজ সে আসতে পারবে না। মিনহাজ দেখতে পাচ্ছে মলির সারা মুখ ব্যথায় নীল হয়ে গেছে। অথচ ঘরের কাউকেই সে বুঝতে দিচ্ছে না। ওর মনে হচ্ছিল মলিকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে দেয়। অথবা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু মলির জেদ বাবাকে আগে খাবার খাইয়ে ওষুধ খাওয়াবে। তারপর সে ডাক্তারের কাছে যাবে। বাবা কিন্তু মলির কষ্ট ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। সেদিন আমার অসুস্থ প্যারালাইজড বাবাও ছেলে বৌয়ের পাগলামি দেখে রেগে গিয়েছিলেন। মলিকে সেদিন হাসপাতালে নিতে হয়নি। বাসায় নার্স নিয়ে এলে,জন্ম নিয়েছিল আফজাল। স্মৃতিটা এখনো বেশ তাজা। মনে হয় এইতো সেইদিনের ঘটনা! কী যে আনন্দ বইয়ে গেছে সেদিন সারা বাড়ীতে। অথচ এখনকার দিনের ছেলে বউ মেয়েরা বড়দের নিয়ে কোন ভাবনা ভাবে না। কাজের মেয়েই তাঁদেরকে দেখাশোনা করে! মাঝে মাঝে মিনহাজ চোখেও ভাল দেখতে পায় না। ওষুধের নাম পড়তে ভীষণ কষ্ট হয়। ডায়াবেটিকস হলে এই এক সমস্যা-চোখের জ্যোতি কমে যায়! পেটের ভীতর কুউউ করে ডেকে ব্যথায় মোচড় দেয়। পেটটা হাত দিয়ে খানিক চেপে ধরে বিরক্ত প্রকাশ করে-
-“নাহ! ছেমড়ি এখনও চা দিয়ে গেল না।” মিনহাজ আবার দরজায় কান লাগিয়ে শব্দ শোনার চেষ্টা করে। “কেউ আসছে এদিকে!” খট খট আওয়াজ তুলে দ্রুত খাটে গিয়ে বসে। এই আড়ি পেতে কথা শুনার অভ্যাসটা ওর কোন কালেই ছিল না। তবে ইদানীং এই অভ্যাসে সে বেশ আনন্দ পায়। যেন বাচ্চাদের মত চোর পুলিশ খেলার আনন্দ। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিছু কিছু অভ্যাস মনোগত হয়ে যায় নিজেরই অজান্তে। কিন্তু এতে অন্যরকম একটা তৃপ্তি খুঁজে পাওয়া যায় বলে ওর মনে হয়। বয়স্ক মানুষের সাথে কে আর কথা বলে সময় নষ্ট করে? কিন্তু তাঁর সময় কাটাতে হবে। আর এই আড়ি পেতে কথা শোনায় সময়ও কেটে যায়। তাছাড়া আপনজনদের কাছে নিজের অবস্থান সম্পর্কেও অজানা অনেক কিছুই জানা হয়ে যায়! মাঝে মাঝে কষ্টটা যেন একটু বেশিই আনচান করে মনে- “এই যাহ আবার কে যেন আসছে...!” আবার কান খাঁড়া করে...কেবল শব্দই শুনা যায়। দীনা যেন কীসব বলছে কাজের মেয়েটাকে। মনে হচ্ছে আজকে তার মেজাজ অনেক খারাপ।
-বড় বাড়ির বেটির ঘুম তাইলে ভাঙছে? সারা রাত জাইগে থাকবে আর দুপুর পর্যন্ত ঘুমাবে! ছেলেও একখান হয়ছে...বউকে কিছুই কতি পারে না। আরে ইডারে কী সুখি থাকা বলে? লাট সাহেবের ব্যটা রাত করে ঘরে ফিরবে...! বাবা হয়ে কিছু বলতে গেলিই বলবে-
-“আপনি এখনকার কাজ বাজ বুঝবেন না আব্বা,অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়!”
-“নাহ তা কী আর আমি বুঝিনে? আমি তো আর চাকরি বাকরি করিনি। হাওয়া খাওয়াই তোগের বড় করিছি!”
-“সেই তহনকার সেই দিন এহন আর নেই আব্বা! আপনেরা ভালো কইরে কাজ করলি কী আজ এই দিন দেখতি হইত?”
-“তারমানে তুই কী কচ্ছিস? আমাগের সময় কাজ না করেই বেতন নিয়ে ঘরে আইসে পড়িছি?”
-“ঠিক তা না...আসলে আমাগের এহন সারা দুনিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতি হয়। আফনাগের সময় অভিজ্ঞ মানুষইবা ছিল কয়জন! আপনি এইসব বুঝবেন না আব্বা।” আফজালের কথায় ভীষণ রাগ হয়। কিন্তু সকাল সকাল ছেলের মেজাজ খারাপ করে দিতে সে চায়নি। সবাই ভাবে বুড়ো হইছো,রিটায়ার্ড হইছো এখন বাপু ওপারের ট্রেনে উইঠে পড়! আমার কী আমি আর কয়দিন...” হাতের ছড়ির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বেশ আগের  কথা ভেবে বিড়বিড় করতেই থাকে! দরজা ঠেলে ঘরে আসে কুলসুম। ওর হাতের ব্যাগটাই আগে নজরে আসে! মেজাজ বিগড়ে যায়। এমনিতে কাল রাত থেকে জ্বর জ্বর লাগছে তার উপর হাড় কাঁপানো শীত...! এখন সে বাইরে যাবে না। কুলসুম যে ট্রেতে চা আর বিস্কিট নিয়ে এসেছে সেদিকে না তাকিয়েই,মুখটা ঘুরিয়ে নেয় ছোট্ট বাচ্চাদের মত করে। রাগ দেখিয়ে বলে-
-এই ছেমড়ি এখন তোর ঐ শরবত আমি খাব না! কয়টা বাজে দেখিসনি? নাস্তা দে...!
-দাদা আটা নাই...আগে আইন্না দ্যান হেরপর রুটি বানামু...!
-তোর রুটি তুই খা...!
মুখ ঝামটা দেয় মিনহাজ। সে এমনটা আগে কখনো করেনি। কিন্তু ইদানীং তার প্রতি সবাই অবহেলা করছে। যা দেখে সে অবাক হয়! নিজেকে বোঝা ভেবে নিজেকেই ধিক্কার দেয়। ওর জন্য কারো সমস্যা বা অশান্তি হোক সে কোনদিন চায়নি। একমাত্র আদরের সন্তান আফজাল। ছেলেটা কখন ঘরে আসে আর কখন বের হয় তার কিছুই সে জানে না।”বুড়ো বাবাকে একটু দেখে যেতে পারে না! এইটা কোন কথা হল?” কুলসুমই ওর দেখাশুনা করে! যত রাগ সে এই মেয়েটার উপর ঝাড়ে। দীনা মাঝে মাঝে এসে বলবে-”বাবা কী ঘুমাচ্ছেন?” মিনহাজ খুব খুশি হয়ে হেসে বলে - “না মা এসো ভিতরে...কেন কিছু বলবা?”
-“না ঠিক আছে কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছি না তো তাই!”
হু হু করে বুকের ভেতর থেকে গরম বাতাস বের হয়। মেয়েটা ছেলে মেয়ের দেখাশোনা ওদের লেখাপড়া সবকিছুই করে! অনেক কাজ এটা তাও সে বোঝে! কিন্তু তাই বলে কী দিনে একবার একটু এসে দেখবে না সে কেমন আছে! মাঝে মাঝে অভাবে কথা বলে জেন দেখে সে বেঁচে আছে না মরে গেছে? ছেলে ছেলে বউ সবাই যেন কেমন একটা ছাড়া ছাড়া সম্পর্ক রেখেছে ওর সাথে। সে সম্পর্কে নেই কোন দায়িত্ববোধ! নেই কোন আন্তরিকতার লেশমাত্র...। এই সম্পর্ক ঠাণ্ডা শীতল অনুভূতি এনে ওকে আরও বেশি কষ্ট দেয়।
মাঝে মাঝে ভাবে গ্রামে চলে যাবে। কিন্তু গ্রামে বাবার রেখে যাওয়া ভিটে মাটি আজ মৃতপুরির নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে। আফজাল খদ্দের দেখছে পেলেই গ্রামের ঠিকানাটাও পর হয়ে যাবে। গ্রামের কথা মনে এলেই ছবির মত ভেসে উঠে হাজারো দৃশ্য! যে দৃশ্য আজও জ্বলজ্বল করে আগুনের মত...। যে দৃশ্যের তাপ এখনো মনে উত্তাপ এনে দেয়...!
মনে পড়ে-
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সে যুদ্ধে গিয়েছিল বলে? পাকসেনারা ওদের ঘরবাড়ি সব জ্বালিয়ে দিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হবার পরে যখন সে গ্রামে ফিরে আসে? এসে দেখে তাদের বাড়িঘর এবং আশেপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িঘর নিয়ে জায়গাটা একেবারে জ্বলন্ত শ্মশান হয়ে আছে। তখনও ভিটে মাটি আগুনের পোড়া গন্ধ ছড়াচ্ছে!
মিনহাজের মনে পড়ে যখন বাড়িতে এসে মা বাবা মলি কাউকেই পেল না? সে ধরেই নিয়েছিল ওরা কেউ হয়ত বেঁচে নেই! ও ভেবেই নিয়েছিল সবাই আগুনে জীবন্ত পুড়ে মারা গেছে। হয়ত ওরা মলিকে তুলে নিয়ে গেছে। রাগে দুঃখে সেদিন প্রায় উম্মাদ হয়ে গিয়েছিল। কেউ বলতে পারে না ওরা সবাই কোথায়...!
এই গ্রামে পাকসেনাদের সবচেয়ে পরম বন্ধু ছিল গ্রামের মাতব্বর। মিনহাজ মনে মনে ভাবে আজ সে অস্ত্রটা মেজরের কাছে জমা দিয়ে এসে ভুল করেছে! খালি হাতেই ছুটে যায় গ্রামের মাতব্বরের বাড়িতে...। কিন্তু সেখানে গিয়ে মাতব্বরকে পায় না। সে মাতব্বরের অপেক্ষায় বাড়ীর সামনের নাড়ার পালার আড়ালে বসে অপেক্ষা করে। সে সিদ্ধান্ত নেয় আজ এই মাতব্বরের সামনেই তার ঘরবাড়ি সব জ্বালিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নেবে। অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাবা মা আর প্রিয়তমাকে নিয়ে কত স্মৃতি মনের পাতায় ভেসে উঠে। যে মানুষ আজ ছয়টা মাস শত্রুর সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। সেই মানুষ আজ বাচ্চাদের মত করে প্রিয়জনের কথা ভেবে ফুঁপিয়ে কাঁদে। নিজেকেই নিজে ধিক্কার দেয়। ভাবে দেশ ও দেশের মানুষকে শত্রুর কাছ থেকে রক্ষা করতে পারলেও,আপন প্রিয়জনদের সে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই দুঃখ ও অপরাধ বোধ তাকে দুর্বল করে দেয়।
এমন সময় মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পায়! কুয়াশা ঘেরা অন্ধকারে চোখ তুলে দেখে কেউ একজন তার সামনে দাঁড়িয়ে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো কাপড়ে ঢাকা। এক নারী কণ্ঠ খুব নিচু স্বরে বলে-”কোন কথা কইও না বাজান...আমার লগে আও” মিনহাজ কিছু না বলে অনুসরণ করে তাকে। গ্রামের জঙ্গলের অলিগলি পার হয়ে ওকে নিয়ে হাঁটতে থাকে রহস্যে আবৃত নারী। মিনহাজ এক সময় দেখে জঙ্গলের একেবারে গভীরে এসে থেমে গেছে নারী ছায়াটি। কোন ভণিতা না করে কথা বলে সে-
-“তোমার বাবা মা যখন বুঝতে পারলো মিলিটারিরা বাড়ীর উঠানে আইসা পড়ছে। তখন তারা তোমার বউ রে নিয়া বাড়ীর পিছন দিকের দরজা দিয়া বাইর হইয়া আইছিল। কোন দিশা না পাইয়া ওরা সবাই আমাগো বাড়ীর ডোবার মধ্যে পলাইয়া আছিল।”
মিনহাজ আর শুনতে চায়না। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করে -তাইলে ওরা কই? সবাই বাইচা আছে?
নারী কণ্ঠ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলে-সেই রাইতে এতো শীত পরছিল যে ডোবার পানি বরফের নাহান ঠাণ্ডা আছিল।
মিনহাজ অন্ধকারেই নীচে বসে পড়ে। হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। সে জানে ওর বাবার শ্বাসকষ্ট ছিল। নিশ্চয় সে ওই ঠাণ্ডা পানিতে...আর ভাবতে পারে না...। “সব আমার দোষ! আমারে আব্বা মা নিষেধ করিল যুদ্ধে না যাতি! সব আমার দোষ!” এমন সময় কেউ একজন ওর হাত দুটো ধরে! চেনা স্পর্শ অনুভব করে মিনহাজ। ওর কান্না থেমে যায়...। সে অবাক হয় একজনের কণ্ঠ শুনে-
-“আমি বাইচে থাকতি আফনার আব্বা মায়ের কিছু হতি পারে আপনি ভাবলেন কেমনি করে?”
মিনহাজ থরথর করে কেঁপে যায়। সমস্ত কথা যেন ফুরিয়ে যায় তার। হঠাৎ করে দাঁতে দাঁত লেগে ঠকাঠক শব্দ হতে থাকে। খুশির কাঁপন তোলে সারা শরীর...। দপ করে জ্বলে উঠে হ্যারিকেন। সে দেখতে পায় সে এতক্ষণ যেখানে দাঁড়িয়েছিল তা মাটির নিচের একটা ঘর! তখনও চেনা স্পর্শ হাতদুটো ধরে রেখেছে। “মলি...!” বুকের সাথে লেপটে ধরে মিনহাজ প্রিয়তমাকে। সামনে বাঁশের চৌকিতে চোখ যায়। বুড়ো অসুস্থ বাবা মা কে দেখে ছুটে যায় তাদের কাছে।
- এইহেনে তালি ক্যামন করে আসলো!? আর আমারে ওবা কিডা নিয়ে আসলো?”কথা শেষ হতেই
রহস্যের সেই নারী এবার সামনে আসে। চমকে উঠে মিনহাজ-  
-“চাচী আফনে এইহানে!?”
-“হ্যাঁ বাবা আমি...! সেদিন তোমার বউ কোন কিছু না ভাইবাই তোমার বাবা মারে আমার কাছে নিয়া আসে! আমি কী করব বুইজা পাই না। তোমার চাচা যা করছে আমি লজ্জাই মইরা যাই। তোমার চাচা জাগো শত্রু ভাইবা পুইড়া মারতে চাইছে? আমি তাগর জান বাচাইছি জানলে,আমার উপরও নাইমা আইব মরণ!”
মাতবর চাচার বউ কথা বলে যায় দৃঢ়তার সাথে। মিনহাজ আজ অন্যরকম একজন নারীকে দেখে। এই যুদ্ধ একজন সহজ সরল গ্রাম্য নারীকেও কঠোর হতে শিখিয়েছে! চাচী আবার বলে-
-“আমার তখন মনে হইল স্বামীর এই অত্যাচার থামাইতে হয়ত আমি পারব না...। কিন্তু যাদের উপর অত্যাচার করছে? আমি গোপনে হইলেও তাদের পাশে থাকুম! আর তাই আমার বিশ্বস্ত চাকর মতিরে দিয়া জঙ্গলের মধ্যে মাটির নিচে ঘর বানাইছি। যখন মাতবর দেশের শত্রুদের সাথে মিইলা প্লান বানায় মানুষের ক্ষতি করার জন্য? আমি তখন মতিরে নিয়া বানাই তাদেরকে লুকাই রাখার জন্য এই ঘর। আর এই ঘরই একদিন কাজে লাগে বীর সন্তান মিনহাজ মিয়াঁর বাবা মা রে বাঁচাইতে! তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা দিতে।” মিনহাজ অবাক হয়ে দেখে টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোতেও চকচক করছে চাচীর দুচোখ! আজ প্রায় তিনমাস ধরে বাবা মা আর মলিকে এখানে লুকিয়ে রেখেছে সে। জানে বেঁচে গেলেও শীতের রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় অনেক সময় ধরে ডোবার মাঝে থাকাতে, এবং অনেক ভয় পাবার কারণে বাবা সেদিন ছোট্ট একটা মাইল স্ট্রোক করে। যা সেই সময়ে কেউ বুঝতে পারেনি। সেই থেকে বাবার শরীরের নীচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ