ঢাকা, মঙ্গলবার 24 January 2017, ১১ মাঘ ১৪২৩, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আগৈলঝাড়ায় আলো শিখা আলো ছড়াচ্ছে সর্বত্র

এসএম শামীম, আগৈলঝাড়া (বরিশাল): বরিশালের বিলাঞ্চল বলে খ্যাত আগৈলঝাড়া উপজেলা। ওই উপজেলার নিভৃত ও প্রত্যন্ত একটি গ্রামের নাম হচ্ছে রাজিহার। এক সময়ে ওই এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য নৌকা ছিলো একমাত্র ভরসা। গ্রামের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে নৌকায় করে তাকে সদরের হাসপাতালে নেয়ার পূর্বে অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করতেন। লেখাপড়া তা আবার কি! গ্রামের খেটে খাওয়া দিনমজুরেরা তাদের   সন্তানদের স্কুলে পাঠানো তা একটা বিরক্তিকরই মনে করতেন। তাই লেখাপড়ায় অকালেই ঝড়ে পড়তে শুরু করে ওইসব এলাকার শিশু-কিশোরেরা। এমন একটি সময় গ্রামের ঝড়ে পড়া ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য সেই কিশোর বয়সে (১৯৭৬ সনে) স্থানীয় কয়েকজন যুবককে নিয়ে নিজ বাড়িতেই পাঠশালা খোলেন ওই সময়ের দশম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র ও একাত্তরে পাক সেনাদের নির্মম বুলেটে নিহত শহীদ সামুয়েল হালদারের পুত্র জেমস্ মৃদুল হালদার। কালের বির্বতনে আজ অনেক কিছুই পাল্টে গেছে, উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বর্তমানে মনোরম পরিবেশে সাজানো গোছানো স্বেচ্ছাসেবী এনজিও আলোশিখা রাজিহার-এর প্রতিষ্ঠানগুলো দেখলেই যেকোন মানুষের মন কেড়ে যায়। এখানে রয়েছে শিশুদের বিনোদন ব্যবস্থা, রেস্ট হাউজ, হরিনের খামার ইত্যাদি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বহু কষ্টের বিনিময়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে ১৯৭৬ সনের সেই পাঠশালা থেকে ১৯৭৮ সনে স্বেচ্ছাসেবী এনজিও আলোশিখা রাজিহার সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। সেই কিশোর বয়সের পাঠশালাটি আজ ৪৫টি স্কুলে রূপান্তরিত হয়েছে। যেখানে প্রতিনিয়ত বিনামূল্যে শিক্ষা নিচ্ছে প্রায় ১৭’শ শিক্ষার্থী। বিনাচিকিৎসায় ওই এলাকার অসংখ্য মানুষকে অকালেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবর্তী মা ও শিশুদের। জীবনের সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জেমস্ মৃদুল হালদার এলাকাবাসির সু-চিকিৎসার কথা চিন্তা করে নিজ বাড়িতেই এনজিও আলোশিখার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মারিয়া মাদার চাইল্ড ক্লিনিক। যেখানে এখন প্রতিনিয়ত চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন রাজিহার এলাকাসহ পাশ্ববর্তী অজপাড়া গাঁয়ের শত শত জনসাধারন। শুধু এতেই থেমে থাকেনি তার (জেমস্ মৃদুল হালদারের) পথচলা। এলাকার বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভোকেশনাল টেনিং সেন্টার। যার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন ওই এলাকার অসংখ্য বেকার যুবক-যুবতীরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। এলাকার সচেতন মহলের মতে, বরিশালের বিলাঞ্চল বলেখ্যাত আগৈলঝাড়ার অজপাড়া গাঁয়ে আজ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন আলোশিখা। এ আলোর দ্রুতি আজ আগৈলঝাড়ার সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পরেছে গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, মাদারীপুর, রাজৈর, কালকিনি, উজিরপুর ও কুড়ালিয়া এলাকায়।
শিক্ষা: স্বেচ্ছাসেবী আলোশিখা রাজিহারের পরিচালক জেমস্ মৃদুল হালদার বলেন, গ্রামের ঝড়ে পড়া শিশুদের পাঠদানে মনযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সনে আমি দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় গ্রামের কয়েকজন যুবকের সহযোগীতায় প্রথমে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করি। ওইসময় দাতা সংস্থা অক্সফ্যাম বাংলাদেশ থেকে পাঠশালার জন্য সর্বপ্রথম ৮৯ হাজার টাকা অনুদান পেয়ে আমার উৎসাহ আরো বেড়ে যায়। পরবর্তীতে এসএসসি. এইচ.এস.সি ও বিএ পাশ করি। লেখাপড়ার পাশাপাশি ১৯৭৮ সনে অবহেলিত এলাকায় আলো ছড়াতে (সমাজ উন্নয়নের জন্য) আরো কর্মকান্ড আরো বাড়াতে থাকি। প্রতিষ্ঠা করি আলোশিখা রাজিহার সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র নামের একটি সংগঠন। একই সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করতে থাকি বিভিন্ন দাতা সংস্থার সাথে। নিজের উৎসাহ ও দাতা সংস্থার সাহায্যে বর্তমানে আলোশিখার অধীনে আগৈলঝাড়ার গৈলায় একটি, রাজিহারে একটি ও উজিরপুরের সাতলায় একটি কিন্ডার গার্টেন। আগৈলঝাড়ার বিভিন্ন গ্রামে ৯টি, কোটালীপাড়ায় ১৩টি, উজিরপুরে ১৪টি, কালকিনিতে ২টি, রাজৈরে ৩টি, ডিমচর এলাকায় ১টিসহ ৪৫টি প্রি স্কুলে শিক্ষাদানের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ওইসব স্কুলে বর্তমানে প্রায় ১৭শ’ শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনাবেতনে পাঠদান করানো হচ্ছে। এছাড়াও গ্রামের বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ২০১০ সনে প্রতিষ্ঠা করা হয় এসএসসি ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার। সম্পূর্ণ বিনাবেতনের এ প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি লাভ করে (যার কোড নং ৪২০৮৯)। অস্টম শ্রেণী পাস শিক্ষার্থীদের ভর্তির মাধ্যমে নবম ও দশম শ্রেণীর সেন্টারে বর্তমানে তিনটি ট্রেডে ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও গার্মেন্ট এন্ড টেইলারিং-এর অনুমোদন পেলেও ওয়েলডিং ট্রেডটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিটি ট্রেডে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষিত শিক্ষকদ্বারা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ইতোমধ্যে প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে পেয়েছেন। এখানে রয়েছে দূর-দূরন্তেরর শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা খাওয়ার সু-ব্যবস্থা। এভাবেই সেই সংগঠনটি এনজিওতে রূপ নেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ