ঢাকা, বুধবার 25 January 2017, ১২ মাঘ ১৪২৩, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আ’লীগের সমর্থনপুষ্টদেরই সার্চ কমিটিতে রাখার অভিযোগ 

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: যে কোন সময় ঘোষণা করা হবে ইসি গঠনের নিমিত্ত্ েএকটি সার্চ কমিটির নাম। রাষ্ট্রপতির সাথে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিএনপিসহ বেশীর ভাগ দলই একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি গঠনের উপর জোর দিয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে গেল মাসে রাষ্ট্রপতি একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে উদ্যোগ নিবেন বলে আশাবাদ প্রকাশ করা হলেও সম্প্রতি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যে তারা সন্দেহ পোষণ করে বলছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন পুষ্ট লোকদেরই সার্চ কমিটিতে রাখা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি লোক দেখানোর জন্য আলোচনা করেছেন। নির্বাচন কমিশনে কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে তা দুই বছর আগেই আওয়ামী লীগ ঠিক করে রেখেছে। ইসি গঠনে সার্চ কমিটিতে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা শুধু ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকই নন, তারা আওয়ামী লীগের চামচা। দলটির নেতারা জানান, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউই থাকছেন না বহুল আলোচিত সার্চ কমিটিতে। নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি করার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী নিজেই সার্চ কমিটির সদস্যদের বাছাই করেছেন। সূত্রটি আরো জানায়, যারা সার্চ কমিটিতে থাকছেন তাদের নাম প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেয়া হয়েছে। সার্চ কমিটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি বৈঠকও করেছেন। 

সূত্র মতে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে বহুল বিতর্কিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। সংবিধান অনুযায়ী তার আগেই নতুন কমিশন গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। তবে এই কাজে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ৩১টি দলের সঙ্গে কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি। দলগুলোর প্রতিটিই তাকে আলাদাভাবে পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবাই একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে জোর দিয়েছেন। সংলাপ শেষে রাষ্ট্রপতি পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করতে যাচ্ছেন বলে বঙ্গভবনের সূত্র দিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। গত ১৮ ডিসেম্বর বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির এই সংলাপ শুরু হয়। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের শীর্ষ নেতারা ওই আলোচনায় অংশ নেন। সংলাপ শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, এই সংলাপ নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। আশা করছেন একটি ভালো সিদ্ধান্ত বের হয়ে আসবে। 

তবে সম্প্রতি সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যে হতাশা প্রকাশ করে বিএনপি নেতারা। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রতি অনুগত বর্তমান কমিশনের ন্যায় ইসি গঠিত হলে সেটি মেনে নেয়া হবে না। রাষ্ট্রপতির সাথে অনুষ্ঠিত সংলাপের কথা উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারি দল আলোচনা করতে চায় না। তাদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। তবে আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, আন্তরিকতার সঙ্গেই রাষ্ট্রপতি ডেকেছেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গেই একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি গঠন করবেন, যার মাধ্যমে নিরপেক্ষ ইসি গঠন করা হবে।

নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে দেশের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের দিকে। একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন বিষয়ে ৩১টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাষ্ট্রপতি। এতে বেশির ভাগ দলই একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে জোর দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরো বিষয়টি এখন রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার।

জানা গেছে, সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে সোমবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তারা সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশনে কারা থাকবেন সেটা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সার্চ কমিটির একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। সেখানে বিএনপির দেয়া প্রস্তাবের আলোকে একজনকে রাখা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনে কারা থাকবেন সেটি আওয়ামী লীগের তালিকা অনুযায়ীই হবে বলে জানা গেছে। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, দলীয় সরকারের আনুগত্য আছে এমন ব্যক্তিদের দিয়ে সার্চ কমিটি গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে। তিনি বলেন, সার্চ কমিটিতে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তারা শুধু আওয়ামী লীগই নয়, তারা আওয়ামী লীগের চামচা। এদেরকে নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব দিলে তাহলে বুঝতে হবে সরকার আবার রকিব উদ্দিনের মতো কমিশন করে প্রহসনের নির্বাচন করতে চাইছে। তিনি বলেন, ওই ধরনের নির্বাচন করতে দেওয়া হবেনা। সেজন্য নিরপেক্ষ সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষ নিবাচন কমিশন করতে হবে, যাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে। সেই নির্বাচন হলে আমরা বিশ্বাস করি, জনগণ বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, রাষ্ট্রপতি লোক দেখানোর জন্য আলোচনা করেছেন। নির্বাচন কমিশনে কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে তা দুই বছর আগেই আওয়ামী লীগ ঠিক করে রেখেছে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা নিয়োগ পেলে মানবো না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর দেশে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তোরণে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির একটি উদ্যোগই যথেষ্ট বলে তারা মনে করেন। তিনি ইচ্ছা করলে স্বাধীন নিরপেক্ষ একটি কমিশন গঠনের সকল চেষ্টাই করতে পারেন। দেশের রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এখন তার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে এ ক্ষেত্রে তাকে দেশের সংবিধান এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যেই সব কিছু করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন বা সার্চ কমিটি গঠন করবেন। তারপরও দেশের অভিভাবক হিসেবে তিনি তার ভূমিকা রাখতে পারেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের অধীনে নিরপেক্ষ ইসি হলেও কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। কারণ ৭৩ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ইসি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। কিন্তু সহায়ক সরকার বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে যত নির্বাচন হয়েছে সব নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। সেজন্য দলীয় সরকারকে রেখে ইসিকে একশভাগ শক্তিশালী করা হলেও কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। তিনি বলেন, নিরপেক্ষ ইসি গঠন করলেই হবেনা। ইসিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার গঠন।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। নতুন ইসির অধীনে অনুষ্ঠিত হবে আগামী জাতীয় নির্বাচন। ইসি গঠনে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সংকট আগের মতোই থেকে যাবে। 

বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেছেন, দেশের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধাণে রাষ্ট্রপতির সংলাপ জাতিকে আশার আলো দেখিয়েছে। অথচ এরই মধ্যে সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র নেতৃবৃন্দ অসংলগ্ন আচরণ করছেন। যা গণতন্ত্রের জন্য অশুভ ইংগিত বহন করছে বলে আমি মনে করি। তিনি বলেন, গ্রহণযোগ্য সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে দেশে যদি আবারও সংকট ঘনীভূত হয় এবং নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় তার দায় সরকারকেই বহন করতে হবে। তিনি বলেন, জনগণ প্রত্যাশা করে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে জনগণের মতামত উপলদ্ধি করে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সার্চ কমিটি গঠন করবেন। যারা পরবর্তিতে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। কিন্তু, সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনলে মনে হয় তারা তা করতে দিতে চাননা রাষ্ট্রপতিকে। 

রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে রাষ্ট্রপতির সংলাপ ও সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার এবং বিরোধী জোটের মধ্যে বাকযুদ্ধ চলমান। এরই মাঝে যে কোন সময় রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করতে পারেন। সার্চ কমিটির সদস্য কারা হতে পারেন সে বিষয়টিও মোটামুটি নিশ্চিৎ। সার্চ কমিটির গঠন বিষয়ে রাষ্ট্রপতি তার সামরিক সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও তার ব্যক্তিগত সচিব, রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিবসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। একটি সূত্র জানায়, সার্চ কমিটির সদস্য সংখ্যা পাঁচজন হতে পারে।

কারা কারা থাকছেন এই বিষয়ে জানতে চাইলে সূত্রটি জানায়, কারা কারা থাকবেন এটার জন্য রাষ্ট্রপতির ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে কমপেক্ষ দুইজন বিচারপতি থাকবেন এটা মোটামুটি নিশ্চিৎ। এর আগের যে সার্চ কমিটি করা হয়েছিল ওই সার্চ কমিটির সদস্য হিসাবে যে সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ ছিলেন এবার তাদের রাখা হচ্ছে কিনা এই ব্যাপারে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ওই ধরণের কোন পরিকল্পনা করা হয়নি। বিষয়টি রাষ্ট্রপতি আলোচনা করেই করবেন। সিদ্ধান্ত তিনি নিলেও বিষয়টি যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় তিনি তেমন সিদ্ধান্তই নিবেন।

সূত্র মতে, সার্চ কমিটি হয়ে গেলে এরপর তারা বেশি সময় পাবেনও না। কারণ ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কমিশন গঠন করতে হবে। আগামী একসপ্তাহ থেকে দশ দিন সার্চ কমিটিকে সম্ভাব্য কমিশনারদের নাম বাছাই করার জন্য সময় দেওয়া হতে পারে। এরমধ্যে সার্চ কমিটি নির্বাচন কমিশনার হওয়ার জন্য যাদেরকে যোগ্য মনে করবেন এই রকম দশটি নাম দিবেন। ওই দশটি নাম থেকে রাষ্ট্রপতি পাঁচটি নাম চূড়ান্ত করবেন। নাম চূড়ান্ত করার পর এখন চারজনকে নিয়োগ দিবেন। আর বাকি একজনকে নিয়োগ দিবেন আরো এক সপ্তাহ পরে। কারণ নির্বাচন কমিশনের বর্তমান চার কমিশনারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৮ ফেব্রুয়ারি। আর বাকি একজনের মেয়াদ শেষ হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসাবে একজন পরে দায়িত্ব নিবেন। তবে দায়িত্ব পরে নিলেও নিয়োগ একসঙ্গেও দেয়া হতে পারে। এদিকে রাষ্ট্রপতির সংলাপ যদি ফলপ্রসু না হয় তাহলে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে বিএনপি। অপরদিকে রাজপথ দখলে রাখার ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। রাষ্ট্রপতি কি করছেন এটার অপেক্ষায় বিএনপি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ