ঢাকা, বুধবার 25 January 2017, ১২ মাঘ ১৪২৩, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিডিয়ার বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প প্রথমেই গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ করা হবে ‘সর্বশক্তি’ দিয়ে। এমন সিদ্ধান্ত ও ঘোষণার আশু কারণ হিসেবে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে জনতার উপস্থিতি অনেক কম দেখানোর কথা উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, এটা ছিল মিডিয়ার ‘অন্যায্য আক্রমণ’। ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ রেইন্স প্রিবাস বলেছেন, সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘অবৈধ’ বানানোর চেষ্টা করছেন। ফক্স নিউজ সানডে’র অনুষ্ঠানে চিফ অব স্টাফ আরো বলেছেন, উপস্থিত জনতার আকার বড় বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে আক্রমণ এবং একদিনেই নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অগ্রহণযোগ্য করার উদ্যোগ। এমনটি হতে থাকলে আর চুপ করে বসে থাকবেন না জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রতিদিন সর্বশক্তি দিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন তারা। ওদিকে ট্রাম্পের প্রেস সচিব শন স্পাইসার অভিযোগ করেছেন, গণমাধ্যমগুলো ‘কারসাজি করে’ জনতার উপস্থিতি অনেক কম দেখিয়েছে। প্রেস সচিবের মতে হোয়াইট মলে সেদিন সাত লাখ ২০ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছিল এবং এটা ছিল জনতার ‘এ পর্যন্ত সর্ববৃহৎ’ উপস্থিতি।
চিফ অব স্টাফ এবং প্রেস সচিবসহ ট্রাম্পের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হলেও দেশি-বিদেশি কোনো গণমাধ্যমেই কিন্তু দাবিটির সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অন্য সকলের পাশাপাশি এখনো নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত বিবিসিও জানিয়েছে, ওপর থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, ট্রাম্পের অভিষেকের অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল ২০০৯ সালের তুলনায় অনেক কম। উল্লেখ্য, সেবার বারাক হোসেন ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। কোনো কোনো গণমাধ্যমের খবরে একথাও বলা হয়েছে যে, ওবামার অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রায় ১২ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল। সে তুলনায় ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে উপস্থিতি শুধু কমই ছিল না, জনতার অনাগ্রহ ও বিরোধিতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। বলা হচ্ছে, কেবলই কম উপস্থিতি দেখানোর কারণে ট্রাম্প প্রশাসন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। দ্বিতীয় একটি বড় কারণ ছিল ট্রাম্প বিরোধী বিক্ষোভের খবর। হোয়াইট মলে যখন প্রেসিডেন্টের অভিষেক অনুষ্ঠান চলছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়শ’ নগরীতে বিক্ষোভ করেছেন লাখ লাখ নারী ও পুরুষ। তারা ট্রাম্পের নির্বাচনকে অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য বলেছেন এবং তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। মার্কিন গণমাধ্যমগুলো অভিষেক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি একই সঙ্গে এসব বিক্ষোভের খবরও প্রচার করেছে। অনেক টিভি চ্যানেল লাইভও দেখিয়েছে। মূলত সে কারণেই গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা। বলার অপেক্ষা রাখে না, সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার খবর নিঃসন্দেহে আশংকাজনক। কারণ, গণমাধ্যমকে সারা বিশ্বেই সরকার, পার্লামেন্ট ও আইন বিভাগের পাশাপাশি রাষ্ট্রের অন্যতম একটি স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে সে গণমাধ্যমকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেছেন। উল্লেখ্য,  ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও আগে ট্রাম্প নিজেই এ যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। শপথ নেয়ার পর প্রথম দিনই তিনি অভিযোগ করেছিলেন, সাংবাদিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে হোয়াইট হলে জনতার উপস্থিতি ‘খাটো’ করে দেখিয়েছেন। এজন্যই তিনি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার এ ঘোষণার সূত্র ধরেই একের পর এক দৃশ্যপটে এসেছেন অন্য জনেরা।
বলা হচ্ছে, ঘোষিত এ যুদ্ধের পরিণতি অশুভ না হয়ে পারে না। কারণ, এমনিতেই হোয়াইট হাউজের সঙ্গে গণমাধ্যমের তথা সাংবাদিকদের সম্পর্ক আগে থেকে যথেষ্ট তিক্ত ও দ্বন্দ্বমূলক। এমন অবস্থার মধ্যে ট্র্ম্পা প্রশাসন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়ার ফলে এই সম্পর্ক আরো বেশি তিক্ত হয়ে পড়বে। পরিণতিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই। কারণ, সাংবাদিকরা তাকে এড়িয়ে চলবেন এবং অনেক সত্য খবরও জানতে পারবে না বিশ্ববাসী। এ ধরনের পরিস্থিতিতে গুজব রটে যাওয়ার এবং গুজবকেই সত্য বলে ধরে নেয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
আমরা মনে করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচিত বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা এবং গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেয়া। এ প্রসঙ্গে কিছু তথ্য অবশ্যই মনে রাখা দরকার। যেমন ইলেক্টোরাল কলেজের বিতর্কিত ভোটে নির্বাচিত হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়েছেন মাত্র ৪০ শতাংশ ভোটারের সমর্থনে। অন্যদিকে  হোয়াইট হাউজ থেকে বিদায় নেয়ার সময়ও বারাক ওবামার পক্ষে জনমত ছিল ৬২ শতাংশ। দ্বিতীয় তথ্যটি হলো, ডেমোক্রেটিক পার্টির ৬০ জনের বেশি কংগ্রেসম্যান ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ ধরনের বর্জনের কথা জানা যায় না। শুধু তা-ই নয়, প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন সে রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানরাও নতুন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার ব্যাপারে সন্দিহান অবস্থায় রয়েছেন। কারণ, তাকে বলা হচ্ছে ‘টেরিবলি আন-অ্যামেরিকান’। অর্থাৎ এমন একজন যিনি ‘ভয়ানক রকমের অ-মার্কিন’। তৃতীয় তথ্যটি হলো, অভিষেকের দিন ৩০টির বেশি সংগঠন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সারা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ করেছে। এদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
চতুর্থ তথ্যটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কেবলই গণমাধ্যমকে দোষারোপ করা হলেও বাস্তবে তার বিরোধীরাই অনেক বেশি শক্তিশালী। ১৯৬০-এর দশকে মার্কিন মানবতাবাদী নেতা মার্টিন লুথার কিং-এর সহকর্মী এবং বর্তমান সময়ের মানবাধিকার আন্দোলনের খ্যাতনামা নিগ্রো নেতা জন লুইসের মতো অনেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে  বৈধ বা আইনসম্মত প্রেসিডেন্ট হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ট্রাম্প জন লুইসকেও যথেচ্ছ ভাষায় নিন্দা ও গালাগাল করেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো রকম বিরোধিতা ও সমালোচনাই সহ্য করতে পারেন না। বলা বাহুল্য, গণতন্ত্রে এমন মানসিকতা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা তাই আশা করতে চাই, নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরমত সহিষ্ণুতা দেখানোর ব্যাপারে অনেক বেশি উদার হবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তো বটেই, সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও এটা বিশেষভাবে দরকার। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, যার নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর গোটা বিশ্বের অস্তিত্ব নির্ভর করে। একই কারণে ব্যক্তিগতভাবে যতো উগ্র ও ভয়ানকই হোন না কেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবশ্যই পরমতসহিষ্ণু হতে হবে। গণমাধ্যমের প্রতি তার মনোভাব তো পাল্টাতে হবেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ