ঢাকা, বুধবার 25 January 2017, ১২ মাঘ ১৪২৩, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাষ্ট্র ও সমাজে এলিটতত্ত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : বর্তমানকালে রাজনৈতিক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে নতুন নতুন তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। এলিটতত্ত্ব এর মধ্যে একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। এলিটতত্ত্বের গোড়াপত্তন হয় প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তাবিদ কার্ল মার্কসের লেখনীতে। তিনি সমগ্র সমাজের মানুষকে দুটি বৃহত্তর শ্রেণীতে ভাগ করেছেন যথা- শাসক শ্রেণী ও শাসিত শ্রেণী। শাসক শ্রেণী সব সময় বিত্তবান (Bourgeosie) এবং শাসিত শ্রেণী বিত্তহীন (Proletariate) হয়। শাসক শ্রেণীর সংখ্যা কম, শাসিত বা শোষিত শ্রেণীর সংখ্যা বেশি। এর সামঞ্জস্য পাওয়া যায় ইতালির সমাজ বিজ্ঞানী প্যারেটো ও মোস্তার লেখনীতে। সমাজে স্বার্থবিরোধী দুটি দল বাস করে, একটি দল উৎপাদনের উপকরণের মালিক এবং অন্য দল সহায়-সম্বলহীন উৎপাদক বা শ্রমিক শ্রেণী। মার্কসের মতে, যে কোনো সমাজ ব্যবস্থাতেই হোক না কেন, ক্ষমতা কতিপয় লোকের হাতে অর্পিত থাকে। এই সব আলোচনায় এলিটতত্ত্ব জন্ম লাভ করেছে। এর প্রকৃত কথা হল, প্রতিটি সমাজ প্রধান দুটি ভাগে বিভক্ত। একদিকে এলিট অন্যদিকে ব্যাপক জনগণ। এলিটের সংখ্যা কম কিন্তু তাদের হাতে থাকে প্রকৃত ক্ষমতা ও সম্পদ। এই তত্ত্বটি মোস্কার “Ruling Class’’, প্যারেটোর “Circulation of Elite’’ এবং রাবার্ট মিশেলসের “Iron Law of Oligarchy’’-এর চিন্তাধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। “হাসান উজ্জামান, সমসাময়িক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতি (ঢাকা; দেশ প্রিয় পাবলিকেশন্স, ১৯৮৫), পৃ. ১৯’’।
আজকাল এই তত্ত্বটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রদের কাছে বহুল আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এলিটতত্ত্বকে বাদ দিয়ে আধুনিককালের রাজনৈতিক অধ্যয়ন ও অনুশীলন অসম্ভব। এই বিষয়ের উপর প্রচুর লেখালেখি শুরু হয়েছে। ১৯৬৭ সালের মধ্যে লেখা বই ও প্রবন্ধের সংখ্যা ছিল ৪২০০ এবং বর্তমানে ৫ হাজারের উপরে। “এমাজউদ্দিন আহমেদ, তুলনামূলক রাজনীতি; রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (ঢাকা; গোল্ডেন বুক হাউজ, ১৯৮১), পৃ. ৮১’’ এলিটকে কোনো কোনো লেখক বাংলায় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বলে অভিহিত করেছেন। (মোহাম্মদ আবুল কাসেম, তুলনামূলক রাজনীতি, রাজশাহী; ইউনাইটেড প্রিন্টার্স, ১৯৮৮), পৃ. ১২৫। আমার মতে নামকরণটি যথার্থ, কারণ তারা হল সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং সম্পদ, সুনাম ও ক্ষমতা তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের এলিট নামে অভিহিত করা যায়।
কথাটি ফরাসি শব্দ থেকে এসেছে। এর মূল অর্থ Choice বা পছন্দ। ফরাসিরা এলিট বলতে বাছাই বা পছন্দকৃত সমাজের এক ব্যক্তিসমষ্টিকে বুঝত। এই বাছাইকৃত ব্যক্তিগণ সমাজিকভাবে খুব প্রভাবশালী ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে এলিট বলতে উন্নতমানের পণ্যসামগ্রীকে বুঝান হত। কথাটি পরবর্তীতে সমাজের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের (Nobility) ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হত। ১৮২৩ সালের দিকে ইংল্যান্ডে এটা সামাজিক শ্রেণীর বেলায় ব্যবহৃত হয়। সমাজের প্রাধান্য বিস্তারকারী ব্যক্তিসমষ্টিকে এলিট বলা হত। বিংশ শতাব্দীতে এটা কতিপয় রাজনৈতিক সমাজ বিজ্ঞানীর লেখনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। তারপর থেকে সমাজ বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এলিট একটি বহুল আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্যারেটো, মোস্কা প্রমুখ লেখক এই তত্ত্বের প্রকৃত রূপদানকারী। তাদের লেখনীর মূল বক্তব্য হল, প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থায় বা রাষ্ট্রে দু’টি শ্রেণী থাকে যথা- এলিট বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং সাধারণ জনগোষ্ঠী। সাধারণ জনগোষ্ঠী সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সংখ্যা কম কিন্তু তারা প্রকৃতপক্ষে সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। এলিটের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে ল্যাজওয়েল (Lasswell) বলেন, “যে সমস্ত ব্যক্তি ক্ষমতাশালী, যারা প্রাপ্ত মর্যাদা, আয় ও নিরাপত্তার অধিকাংশ লাভ করে, যারা সবচেয়ে অধিক সংখ্যক হয়, তাদের এলিট বলা হয়। অবশিষ্ট জনসম্প্রদায় সাধারণত জন হিসেবেই পরিগণিত হয়। “H. D. Lasswell, Politics : Who Getss what when and how (New York; The world Publishing Co., 1958), p-3’’ যে সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যারা সমাজের উচ্চপদ ও সম্মান অধিকার করে তারা হল সমাজের হর্তাকর্তা। সবসময় সমাজে এমন কিছু সংখ্যালঘু বিদ্যমান থাকে, যারা প্রধান পদগুলোতে বহাল থাকে এবং জাতীয় আয়ের একটি বিরাট অংশ ভোগ করে। “আবুল কাসেম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬’’ C. W. Mills এলিটের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে বলেন, এলিট হবে তারাই, যারা সমাজের উচ্চপদ ও সম্পদের মালিক। এই শ্রেণীর ক্ষমতা ও শক্তি সবার উপরে (Elites are those who have the command post and wealth to exercise powers, They are superior in power and energy) ‘’C. Writght Mills, The Power Elite (New York; Oxford University Press, 1956). 13’’ জি. প্যারী বলেন, “রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমধর্মী প্রভাবশালী ভূমিকা পালনকারী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীই এলিট (Small minority who appears to play an exceptionally influencial part in political and social affairs) ‘’G. Parry, Political Elite (London; George Allen & Unwin Ltd. 1969’’. Introduction chapter, P-13) প্যারেটো বলেন, “প্রত্যেকটি সমাজে দুটি দল আছে, একটি হল প্রভাবশালী এবং অন্যটি অ-প্রভাবশালী। প্রভাবশালীরাই হল এলিট। নিজ নিজ আওতায় তাদের প্রভাব সর্বদা পরিলক্ষিত হয়। “V. Pareto, The Mind and Society (New Yourk; Harcourt and Brauches Co. 1935), Vol. 4. (Quoted in T. B. Bottomore, Elite and Society (New York; Penguin Book Ltd. 1982). pp. 7-8.’’
র‌্যামন্ড এ্যারন বলেন, “এলিট বলতে আমি স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তিবর্গকে বুঝি, যারা প্রতিটি সমাজে শাসনকার্য পরিচালনা করে।’’ T.B. Bottomore বলেন, বর্তমানকালে এলিট শব্দটি সাধারণভাবে কর্মজীবী বা পেশাজীবী গোষ্ঠীকে বুঝানোর জন্যে ব্যবহার করা হয়, যারা সমাজে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী (The term elite is now generally applied infact, to functional, mainly, occupational groups which have high status in socity’’| ‘’T.B. Bottomore, Elite and Society, opcit, p.14’’ অতি সাধারণ অর্থে এলিট বলতে এমন ব্যক্তিগণকে বুঝায়, যারা কোনো সমাজের উপর পদগুলোতে অধিষ্ঠিত থাকে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে বিশেষ ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিগণকে, বিশেষত শাসক সংখ্যালঘু শ্রেণীকে এবং যে সকল মহল হতে এই সকল ব্যক্তিগণকে সংগ্রহ করা হয়, তাকে বুঝায় (Elite in the most general sence, denotes a group of persons who, in any socity, hold positions of eminence, More specially, it denotes a group of persons who are eminent in a particular field specially the governing minority and the circles from which the governing class is recruited) ‘’A Dictionary of Social Sciences (Elite) p.234’’ সুতরাং যেসব ব্যক্তি তাদের কার্যে প্রাধান্য অর্জন করেছে তাদেরকে এক শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করলে যে গোষ্ঠী হবে তারাই এলিট বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী। বটোমার এলিট বলতে বুঝিয়েছেন, যারা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কার্যত চর্চা করে। হান্টারের আলোচনা থেকে দেখা যায়, ক্ষমতা এবং প্রভাব শেষ পর্যন্ত অর্ধডজন এলিটকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। প্রকৃতপক্ষে সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের মূল পরিচালিকা শক্তিই হল এই প্রভাবশালী গোষ্ঠী, তারাই সকল ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করে। সমাজের সকল পর্যায়ে তাদের বিচরণ পরিলক্ষিত হয়।
এলিট আলোচনা প্রসঙ্গে এর শ্রেণীবিভাগ জানা তাৎপর্যপূর্ণ। এ সম্পর্কে দুটি মতবাদ প্রচলিত আছে যথা: একত্ববাদী (Monestic) এবং বহুত্ববাদী (Pluralistic)। একত্ববাদী মতবাদে বিশ্বাসী লেখকবৃন্দের মতে, সমাজের সকল ক্ষমতা একটি মাত্র প্রভাবশালী শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। আর যারা বন্ধুত্ববাদে বিশ্বাস করে তাদের মতে, ক্ষমতা বা প্রভাব কোন বিশেষ শ্রেণীর হাতে থাকে না। এলিটদের একটি শ্রেণীতে ফেলা যায় না। সমাজে বহু এলিট আছে এবং তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাথমিকভাবে এলিটকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায় যথা- শাসক এলিট (Ruling Elite) এবং অ-শাসক এলিট (Non-Ruling Elite)। যাদের হাতে শাসক ক্ষমতা থাকে, তাদের শাসক এলিট এবং যাদের হাতে থাকে না, তাদের অ-শাসক এলিট বলা হয়। শাসক এলিটকে রাজনৈতিক এলিটও (Political Elite) বলা হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাধারী সেই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে বুঝায়, যারা জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং যাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সমাজের অন্য কোন শক্তি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত নয়। শাসন ব্যবস্থায় যারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে তাদের শাসনকারী এলিট (Ruling or Governming Elite) এবং অন্য যারা বর্তমান থাকে তাদের অ-শাসনকারী এলিট বলা হয়।
সমাজ বিজ্ঞানীগণ সমাজের অবস্থান, পদ্ধতি ও মর্যাদার ভিত্তিতে এলিটকে দু’ভাগে ভাগ করেছেন যথা- রাজনৈতিক বা শাসনকারী এলিট এবং সামরিক এলিট। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যাদের প্রভাবে পরিচালিত, তাদের বলা হয় রাজনৈতিক বা শাসনকারী এলিট। “G. Mosca, The Ruling Class (New York; MacGraw Hill Book Co, 1939), p. 11’’ বর্তমানকালে সেনাবাহিনীও দেশের একটি শক্তিশালী শ্রেণীতে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রকাশ্যে অথবা গোপনে হোক না কেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রভাব শুধু ব্যারাকের মধ্যে সীমিত নয়, পর্দার আড়াল থেকে অথবা প্রকাশ্যেও রাজ ক্ষমতায় সহযোগিতা করে। সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ এই সংখ্যালঘু শ্রেণীই সামরিক এলিট নামে খ্যাত। অর্থ ও সম্পদের মানদন্ডের ভিত্তিতে এলিটকে বিত্তশালী ও ব্যবসায়ী এলিট বলা যায়। এই শ্রেণীর এলিটদের হাতে ব্যাপক সম্পদ থাকে। দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। তারা পুঁজিপতি নামেও পরিচিত। সরকার তাদের কথামত না চলে পারে না। ধনতান্ত্রিক দেশে বিত্তবান শ্রেণীর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তেমনিভাবে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে সামরিক এলিটদের প্রাধান্য অধিক। সামাজিক মর্যাদার উপর ভিত্তি করে পদ মর্যাদা ও পেশাগত এলিটের সৃষ্টি হয়। পেশাজীবী শ্রেণী যখন সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে, তখন তাকে পেশাজীবী এলিট বলা হয়। সামাজিক কল্যাণ ও উন্নতির ক্ষেত্রে স্বীয় অবদানের জন্য প্রকৌশলী বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসকগণ সমাজে বিশেষ পদমর্যাদার অধিকারী হয়। স্বাভাবিকভাবে তাই এদের প্রভাব সমাজের উপর আরোপিত হয়। তেমনি অন্তত শিক্ষাঙ্গণে শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বিদ্যমান। দেশের স্থায়ী সরকারী কর্মচারীদের (সিভিল সার্ভিস) ক্ষমতা যখন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়, তখন তাদের আমলাতন্ত্র বলা হয়। আমলারাও এলিট শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। আমলাতান্ত্রিক এলিট বলতে সেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বুঝায়। যারা যোগাযোগ ও প্রচার মাধ্যমের সাথে সংযুক্ত থেকে সমগ্র সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে, তাদের যোগাযোগ এলিটের উদাহরণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক সংগঠন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও এলিটগণ প্রাধান্য অর্জন করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য সাধারণ দলীয় নেতৃবর্গের প্রাধান্যকে অবহেলা করতে পারে না, যার জন্য সংখ্যাগুরু সদস্যদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। “সিরাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত পৃ. ৩১২’’ এ জন্য মিচেল (গরপযবষং) বলেছেন, সব রাজনৈতিক দলই স্বল্প ব্যক্তি দ্বারা সংগঠিত হয়। (All political parties are organized oligarchically) ‘’R. Michels, Political parties (Glencoe, Free Press, 1949), p. 11.’’ এ প্রসঙ্গে ভূ-মালিকগণও যে প্রভাবশালী শ্রেণী, তা অস্বীকার করা যাবে না। ১৯৫১ সালের পূর্বে জমিদার শ্রেণী দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করত। বর্তমানে তাদের প্রভাব কম হলেও একেবারেই যে নেই একথা বলা যাবে না। পরিশেষে বলা যায় যে, শাসনকারী এবং অ-শাসনকারী এলিটই হোক না কেন, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে তাদের প্রভাব ব্যাপক এবং সুবিস্তৃত।
এলিট মতবাদের অনুসারে সমাজে দুটি শ্রেণী আছে যথাঃ শাসক ও শাসিত শ্রেণী। শাসক শ্রেণীকে এলিট বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী বলা হয়। তারা সবসময়ে সংখ্যায় স্বল্প, যারা শাসিত তাদের সংখ্যাই বেশি। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় ঐ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দ্বারা পরিচালিত হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বল প্রয়োগেই কেবল সংখ্যালঘুগণ সংখ্যাগুরুদের অবদমন করত। কিন্তু এলিট শ্রেণী শুধু যে বল প্রয়োগকারী শক্তির দ্বারাই সংখ্যাগুরুদের প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে তা নয়। বল প্রয়োগকারী শক্তি যে একেবারেই বর্তমান তা নয়, তবে এর পরিমাণ অত্যন্ত গৌণ। অন্য পদ্ধতি ও কৌশলে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। জনসাধারণ যেন তাদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও স্বত:স্ফূর্তভাবে সমর্থন দেয় সেজন্য বৈধ পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। এলিটগণ দেশ বা সমাজের পরিচালনাকারী শক্তিতে পরিণত হয় গায়ের জোরে বা নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে নয়। ক্ষমতা গ্রহণের কারণ যাই হোক না কেন, এর পিছনে জাতীয় গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তির অবতারণা করা হয়। তাদের ভাষ্য পর্যালোচনা করলে মনে হবে, যেন তারাই এ মহাবিপদ বা জাতীয় সংকটকালে রাষ্ট্রীয় বৈতরণীর সঠিক হাল ধরেছে অন্যথায় এটা মাঝদরিয়ায় ডুবে যেত। উদ্দেশ্য তাদের যাই হোক না কেন, ক্ষমতায় আসার যে কারণের কথা ফলাও করে তাতে মনে হবে আদর্শ স্থানীয়। যেমন বলা হয়, “বিশেষ কারণে আমরা ক্ষমতা দখল করেছি গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার আমাদের মূখ্য বিষয়’’ ক্ষমতা আমরা চাই না- শুধু চাই সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের পুন:প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। এগুলো এলিটদের বৈধতাবাদ প্রচারের উদাহরণ। এতে তারা জনসমর্থন আদায় করে। জনগণ যেন তাদের প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন না হয় সেজন্য কৌশলে বশে আনার ব্যবস্থা করা হয়। এক নায়কগণ যেমন জনমতের প্রাধান্য দেয় না, এলিটগণ কিন্তু তা নয়। তারা জনমত সব সময়ে অনুকুলে রাখার জন্য কৌশল অবলম্বন করে। কার্য প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করতে চায় যে, তাদের ক্ষমতা গ্রহণ শুধু দেশ ও জনগণের কারণে। শাসনকারী, আশাসনকারী, ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতালিপ্সু প্রতিটি এলিটের একটি নিজস্ব বৈধতাবাদ থাকে। এর দ্বারা আদর্শ প্রচার করে। বৈধতাবাদগুলো নিম্নরূপ।
আদর্শ : প্রতিটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর একটি নীতি বা আদর্শ আছে। স্বীয় নীতি বা আদর্শে বিশ্বাসী হবার জন্য প্রচারণা চালান হয়। জনসমষ্টি যেন তাদের আদর্শে আস্থা স্থাপন করে সেজন্য কৌশল অবলম্বন করা হয়। আদর্শের প্রতি জনসমর্থন রাখার জন্য সচেষ্ট থাকে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ্য করলেই তারা সতর্ক করে দেয় যেন জনসাধারণ সে সম্পর্কে পূর্বেই সজাগ হতে পারে। সব সময়ে জনসাধারণকে বুঝাতে থাকে যে, প্রকৃতপক্ষে যা করা হচ্ছে তা তাদেরও দেশের জন্য অর্থাৎ এটা সমাজের মঙ্গলামঙ্গলের জন্য মাত্র। আরো প্রচার করে, তাদের কার্যপ্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত। প্রচারণা এ ব্যাপারে বড় একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আদর্শের কথা ফলাও করে বলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়।
আক্রমণ : ক্ষমতা দখলের বা প্রতিরক্ষার অন্যতম ব্যবস্থা হলো আক্রমণ। ক্ষমতা দখলের জন্য প্রয়োজনবশত: আক্রমণ করে থাকে। আবার ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যবস্থাও করে। এগুলো দ্বারা বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব সংঘটিত হয়। অবশ্য এই ধরনের প্রতিবিপ্লব সমগ্র সমাজ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে না। এতে সামগ্রিক ধ্বংসও সাধিত হয় না। এটা একটি বিশেষ লক্ষ্যে পৌছাব কৌশল মাত্র। এক শ্রেণীর এলিট অন্য শ্রেণীকে বা সমগ্র জনসাধারণকে এই প্রক্রিয়ায় দমিয়ে রাখে।
অর্থ ও সম্পদ : অর্থ বা সম্পদ ধ্বংস করে, ধরে রাখা, ভাগ-বন্টন করে দেওয়া ইত্যাদিতে প্রভাবশালী শ্রেণী নিজেদের আধিপত্য অক্ষুণœ ও অক্ষত রাখার প্রয়াস চালায়। ক্ষমতালিপ্সু বা প্রতিবাদী এলিটগণ ক্ষমতাসীন এলিটদের নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের প্রতিপত্তি খর্ব করে নিজেদের আধিপত্য পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ ও সম্পদের ধ্বংস সাধন করতেও কার্পণ্য করে না। অনেক সময় রেশনিং প্রচলন, উৎকোচ প্রদান এবং আর্থিক সুবিধা দানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী একে অপরের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। অনেক সময় জনসাধারণকেও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সমর্থন আদায়করত এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী অন্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে অবদমন করতে চায়। বিশেষত ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতালিপ্সু এলিটদের মাঝে এ ধরনের তিক্ততার সৃষ্টি হয়।
[চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ