ঢাকা, বুধবার 25 January 2017, ১২ মাঘ ১৪২৩, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সত্য বলার সৎ সাহস

এম. হেফজুর রহমান : ১৯৮৮ সালের ৮ই নবেম্বর মঙ্গলবার রাত ৯ টায় বিটিভিতে যারা ‘বহুব্রীহি’ নাটকটি দেখেছিলেন তারা নিশ্চয়ই ‘সত্য দিবস’ এর কথা শুনেছেন এবং হয়তো আজও মনে রেখেছেন। ‘বহুব্রিহী’ এর রচয়িতা ড. হুমায়ূন আহমেদ একটা সুন্দর বিষয় উপস্থাপন করেছেন তার ঐ নাটতকটিতে। তিনি তার নাটকের একটি চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন যে, প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর অন্তত এই একটা দিন আমরা ‘সত্য দিবস’ হিসাবে পালন করব। তা ছাড়া দিনটিও ভাল, বিজয় দিবস। ‘সত্য দিবস’ অর্থাৎ এই দিনটিতে সূর্য্য উদয় থেকে অস্ত পর্যন্ত আমরা সবাই সত্য কথা বলবো। এই আলোচ্য অংশটুকু আমার ভাল লেগেছিল। হয়তো আপনারা যারা দেখেছিলেন তাদেরও এই ‘সত্য দিবস’ সম্পর্কে একমত হয়ে আমি কিছু কথা আজ বলতে চাই।
আমরা ছোট বেলায় পড়েছি সদা সত্য কথা বলবে মিথ্যা বলা মহা পাপ। কিন্তু আজ আমরা ক’জন সেই কথা মনে রেখেছি?  কেউ কি বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন যে, তিনি মিথ্যা কথা বলেন না। শতকরা দু’-একজন ছাড়া পারবেন না। তারা ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রম দিয়ে সমাজ চলে না। তাই আমাদের সমাজে মিথ্যার মহা সাগরে সত্য তলিয়ে গেছে। সমাজের রন্দ্রেরন্দ্রে আজ মিথ্যার জোয়ার বয়ে চলেছে। যে যেভাবে পারছে মিথ্যা বলে যাচ্ছে। মিথ্যা বলতে তার বুক একবারও কাপছে না।
একজন ব্যবসায়ী তার পণ্য দ্রব্যে ভেজাল মিশাচ্ছে। অথচ ক্রেতাকে সে বলছে, এর চেয়ে খাঁটি জিনিস আর কোথাও পাবেন না। এ প্রসঙ্গে তেল বা দুধের কথা বলা যায়। বলা যায় আরও অনেক পণ্যের কথা। একজন তেল বিক্রেতাকে যখন আপনি জিজ্ঞেস করবেন তেল কি খাঁটি?  বিক্রেতা অবলিলায় বলবে জি এক নম্বর খাঁটি তেল। এমনি করে মাছে বা ফলে ফরমালিন মিশালেও বলবে প্রিজারভেটিব। এমনি করে সবাই আমরা মিথ্যা, বলে চলেছি। মারফী বলেছেন, কাপুরুষ ছাড়া কেউই মিথ্যা বলে না। ও ডাবলিউ হোলমাস বলেছেন, পাপের অনেক যন্ত্রপাতি আছে তবে মিথ্যাটাই হলো সবচেয়ে বড় যন্ত্র যা অন্য সব কিছুকে ঘুরানোর জন্য হাতলের মতো কাজ করে।
আজ আমরা সবাই জ্ঞাত স্বরে বা অজ্ঞাত স্বরে মিথ্যার মহা সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়েছি। সত্য বলার সাহস যেন আজ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। একজন ঘুষখোরকে যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন, ঘুষ খান কেন?  তিনি বলবেন, কে বলেছে আমি ঘুষ খাই। ঘুষ খাওয়া হারাম, ইত্যাদি। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে অন্যেরা ঘুষ চেটে খান আর তিনি ঘুষ গিলে খান। এমনি করে আমরা আজ মিথ্যা বলতে বলতে সত্য বলার সৎ সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আজ আমরা সবাই যেন মারফীর ভাষায় ‘কাপুরুষ’। ঘুষের কথা লিখতে গেলে এই স্বল্প পরিসরে কুলিয়ে উঠবে না। যে কোন সরকারি অফিসে কোন কাজ উপলক্ষে গেলে নীচতলা থেকে উপর তলা পর্যন্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের ঘুষ না দিলে আপনার কাজ সমাধা হওয়ার আশা একেবারেই ক্ষীণ। অবশ্য ব্যতিক্রম যে নেই তা আমি বলছি না। তবে সেই ব্যতিক্রম কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা অতি নগণ্য।
জরথ্রস্ত বলেছেন, বিধাতা তার সৃষ্টি সকল মানুষের অন্তর জানেন। তার কাছে ফাঁকি চলে না। শত অন্যায়, শত অত্যাচার হোক না কেন তবু সত্যকে আশ্রয় করে থাকবো এই রূপ মনের বল যার আছে সেই আল্লাহ্র রহমত লাভ করে।
প্রসঙ্গ ক্রমে বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানির (রাঃ) কথা বলা য়ায়, তার শৈশবে বাগদাদে যাওয়ার পথে তিনি ডাকাতদের কবলে পড়েন। সাহসের সঙ্গে তিনি সে দিন সত্য কথা বলেছিলেন বলেই ডাকাত সরদার মুগ্ধ হয়ে তাকে তার সাথীদেরসহ ছেড়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ডাকাতরা ডাকাতি ছেড়ে দিয়েছিল এবং তাকেসহ  সাবাইকে বাগদাদে পৌঁছে দিয়েছিল। আজ আমাদেরকেও এক একজন বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানি (রাঃ) এর মত হতে হবে।
আমাদের সমাজ অত্যাচার আর দুর্নীতিতে ভরে গেছে। এর কারণ আমরা সত্য থেকে বিচ্যুৎ  হয়ে গেছি। মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরেছি যে ব্যক্তি সদা সত্য কথা বলেন আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন এবং তার পক্ষে কোন দুর্নীতি বা অত্যাচার করা সম্ভব নয়। সততাই হয় তার একমাত্র পন্থা। শেক্সপিয়ার বলেছেন, সততার নিকট দুর্নীতি কোনদিনই জয়ী হতে পারে না। তা ছাড়া যিনি সদা সত্য কথা বলেন, সততার সঙ্গে জীবন যাপন করেন, আল্লাহ্ তার মর্যাদাও বৃদ্ধি করে দেন।
আমাদের দেশ এই বাংলাদেশ। এ দেশে আজ যারা শিশু অর্থাৎ আগামী দিনের কা-ারী তাদেরকে আমরা সদা সত্য কথা বলানোর প্রচেষ্টা চালাই আর এ জন্য সপ্তাহে অন্তত একটি দিনকে বেছে নেই, যে দিনটিতে আমরা কেউ মিথ্যা কথা বলবো না। শুধু সত্য কথা বলবো তা সে যত কঠিন সত্যেই হোক। আর এই ভাবে অভ্যাস করতে করতে এক দিন দেখা যাবে আজ যেমন আমরা সবাই নিঃসস্কোচে মিথ্যা কথা বলছি, ঠিক তেমনি ভবিষ্যতে আমরা সবাই নিঃসঙ্কোচে শুধু সত্য কথাই বলবো। হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘সত্য লোকের নিকট অপ্রিয় হলেও তা প্রচার কর’। হাদিসে আরও আছে, ‘যে ব্যক্তি বাক্যে কর্মে ও চিন্তার সত্য নয় সে প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য নিষ্ঠ নয়।  যা সত্য শুধু তাই গ্রহণ কর আর যা মিথ্যা তা বর্জন কর’। আর যে দিন আমরা সবাই শুধু সত্য কথাকে আকড়ে ধরব, সে দিনই দেখা যাবে এ সমাজ থেকে অন্যায় অত্যাচার খুন, গুম,  রাহাজানী  দূরীভূত হয়ে এক শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
অবশেষে বলতে হয় শুধু সত্য কথা বলা নয়, সে সঙ্গে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে আর তার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ হওয়া। মনে রাখতে হবে জনগণের ঐক্য যখন এক সুতায় গাঁথা হয় তখন আর কোন অপশক্তির ষড়যন্ত্র, অসত্য ও অসুন্দরের কালো পাহাড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এক খানা ইটের কোন শক্তি নেই, কিন্ত অনেকগুলো ইট দিয়ে যখন দেওয়াল তৈরী করা হয় তখন তার শক্তি হয় মজবুত, একখানা হাতের শক্তি কম হলেও অনেকগুলো  হাত একত্রিত হলে সে শক্তি হয় ভয়ানক। তাই জাতিকে আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর তা হতে পারলে সীমান্তে ফেলানীর লাশ, বিশ্বজিৎ ও হাবিবের মত আর কারোর উপর বর্বর অত্যাচার হয়তো আর হবে না। তাই জাতির স্বার্থে আজ আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমস্ত অন্যায়-অত্যাচার আর মিথ্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী ও সত্য বলার সৎ সাহস দেখানো প্রয়োজন। আর এ পথেই কেবল আসতে পারে শান্তির নহর।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, বিজ্ঞানের চরম অগ্রগতি আর পরম আধুনিকতা মানুষকে ধীরে ধীরে বড় বেশী যান্ত্রিক করে ফেলছে। হৃদয় বৃত্তি লুপ্ত হতে চলেছে। হয়তো এ কারণেই আজ অনৈক্যের এতো প্রভাব পড়েছে। কবি নজরুল ইসলামের একটি কবিতার অংশ বিশেষ উল্লেখ করেই আমার আজকের এ লেখা শেষ করবো। কবিতাটি হল- ‘আইন যেখানে ন্যায়ের শাসক/সত্য বলিলে বন্দী হই/অত্যাচারিত হইয়া যেখানে/বলতে পারি না অত্যাচার।’ সেই ছোট্র বেলায় শিক্ষককে আমরা কথা দিয়ে থাকি-‘মানুষের মতো মানুষ হবো’। কিন্তু পরবর্তীতে কেমন করে যেন আমরা সে কথা ভুলে যাই, তাই আর মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে পারি না। আমাদের মানুষের মতো মানুষ হতে হবে। হযরত মুহম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর জীবনার্দশকে আমাদের জীবনে ধারণ করতে হবে। তা হলেই আমরা আদর্শ মানুষ হতে পারব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ