ঢাকা, বুধবার 25 January 2017, ১২ মাঘ ১৪২৩, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পর্নোগ্রাফি অকল্যাণের ভাগাড়

মো: তোফাজ্জল বিন আমীন : পর্নোগ্রাফি একটি সামাজিক ব্যাধি। পর্নোগ্রাফি দ্বারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উঠতি বয়সের তরুণ তরুণীরা। এটা কেউ স্বীকার করুক বা না করুক বাস্তবতা হচ্ছে পর্নোগ্রাফীর সয়লাব সবর্ত্র বিরাজ করছে। একটি দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি যদি নৈতিকমান উন্নয়নের চেষ্টা না করে, তাহলে সে দেশে ভালো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। এই বিষয়টি রাষ্ট্রের ভেবে দেখা প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মের জন্য বড় একটি ঝুঁকি হলো অনলাইনে পর্নোগ্রাফি দেখা। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৫৫ সালে পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতাকে সভ্যতার কালো দাগ বলে মন্তব্য করেছেন। আজ থেকে কয়েক বছর আগে একটি কলাম পড়েছিলাম। এটি আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিটনের। সেই কলামে তিনি লিখেছিলেন আমেরিকার জন্য যুদ্ধ সমস্যা কোন সমস্যা না। আমেরিকায় জন্য খাদ্য সমস্যা কোন সমস্যা না। আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমেরিকার যুব সমাজ। তারা আজ বেওয়ারিশ হয়ে যাচ্ছে। বিল ক্লিন্টন সাহেব বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে, আমরা যদি আমাদের যুব সমাজকে নোংরামীর হাত থেকে রক্ষা করতে না পারি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীকে ডমিনেট করতে পারব না। বিল ক্লিটনের উপলব্ধি হলেও মুসলিম অধ্যুসিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের এই উপলব্ধি প্রশ্নবিদ্ধ। সময়টা অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ডিজিটাল। অনেকে বিজ্ঞানের আবিষ্কারের দোষ দিয়ে খানিকটা স্বস্তি প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু আমার মনে হয় এই দোষটা শুধুমাত্র বিজ্ঞানের আবিষ্কারের নয়! কারণ বিজ্ঞানের আবিষ্কার যত বাড়বে আল্লাহ্র কুরআন বুঝা তত সহজ হবে। কিন্তু আমরা এই কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছি না বলেই নোংরামীর সকল রাস্তা প্রসারিত হচ্ছে।
ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি কী এটি নতুন করে কাউকে বুঝিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ বর্তমান এই যুগে ভিক্ষুকের হাতেও রয়েছে ডিজিটাল মোবাইল ফোন। একটি ডিজিটাল মোবাইলকে মিনি কম্পিউটার বলা যায়। তরুণ তরুণীদের নষ্ট করার প্রয়াসে মোবাইল অপারেটর কোম্পানীগুলো অফারের প্রতিযোগীতায় নেমেছে? আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের রয়েছে নিজস্ব মোবাইল ফোন। আবার অনেকেরই রয়েছে একাধিক ফোন। অধিকাংশ ফোনেই রয়েছে মেমরি কার্ড ব্যবহার সুবিধা।
ভাল ও মন্দ দু’ধরনের কাজেই মেমরিকার্ড ব্যবহার করা হয়, যে কারণে অনায়াসে খুব সহজে অন্যায় ও গর্হিত কাজে জড়িয়ে পড়া যে কারো পক্ষে খুবই সহজ। বিতর্কিত কাজ থেকে নিজেরা বিরত থাকলেও আমাদের সন্তানদের বিরত রাখছি কিনা সেটিও ভেবে দেখা প্রয়োজন। পর্নো কারও জন কল্যাণকর নয়! পর্নো আসক্তি হলে নৈতিক অবক্ষয়,যৌন নিপীড়ন,পারিবারিক কলহ,হতাশা,সামাজিক ও মানসিক হাজারো সমস্যার সৃষ্টি হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফির প্রায় শতকরা ২০ ভাগ অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে। প্রতি সপ্তাহে ২০,০০০ এর বেশি অপ্রাপ্তদের ছবি ইন্টারনেটে পোস্ট করা হয়। পর্নোগ্রাফির মতো নোংরা বিষয় থেকে আমাদের সন্তান ও তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষার জন্য পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র এ দায় এড়াতে পারে না।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকা শহরের পর্নো ছবির দর্শকের মধ্যে স্কুলগামী তরুণদের সংখ্যা প্রায় ৭৭ শতাংশ যারা পর্নোগ্রাফি দেখে। স্কুলগামী ৫০০ জনের ওপর জরিপটি চালানো হয়। তাদের মতে, ছাত্ররা পর্নো দেখার সুযোগ নিচ্ছে মোবাইল ফোনে, সাইবার সেন্টারে, বাসার ইন্টারনেটে এবং কম্পিউটারে মাধ্যমে। কম টাকায় চাইনিজ মাল্টিমিডিয়া সেট পাওয়ার কারণে সমাজের নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা পর্নোতে ঝুঁকে পড়ছে। শহরের তরুণ তরুণীর কথা না হয় বাদই দিলাম। গ্রামের তরুণ তরুণীদের অবস্থা ভয়াবহ। গ্রামে দেখেছি উঠতি বয়সের তরুণের হাতে রয়েছে মোবাইল ফোন। স্কুলপড়ুয়া একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করছিলাম মোবাইল ফোন ব্যবহার করা কী তোমার খুব জরুরী? জবাবে সে উত্তর দিল জরুরী না হলেও মোবাইলের প্রয়োজন আছে। কারণ আমার বন্ধুরা সবাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এমনকি যারা পড়ালেখা করে না তারাও মোবাইল ব্যবহার করে। তারপরে জিজ্ঞেস করলাম মোবাইল ফোন কথা বলা ব্যতীত আর কী কাজে লাগে? সে জবাব দিল আমি মেমোরিকার্ডের মাধ্যমে গান শুনতে পারি ও গান ডাউনলোড করতে পারি। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি ঐ ছেলেটির দোষ দিতে নারাজ। কেননা আমাদের অভিভাবকেরা নৈতিক শিক্ষাকে আজ অবমূল্যায়নের চোখে দেখেন। একটা সময় তো এমন ছিল ফজরের নামাযের পর সব ছেলেমেয়েকে মক্তবে পাঠানো হতো। আজ আর এমনটি দেখা যায় না। ভিনদেশীয় সংস্কৃতির জোয়ার সর্বত্র বিরাজ করছে। গ্রামের চায়ের দোকানগুলোতে সারাদিন টেলিভিশনে হিন্দি বাংলা ছবি দেখানো হচ্ছে, অথচ কেউ একটু টুঁ শব্দ পর্যন্ত করছে না। ক্রমেই আমাদের মধ্যে পরিমিতিবোধ ও শালীনতার সীমা ভেঙে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও আমাদের দেশে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কোন ধরনের কটূক্তি করলে বা বিতর্কিত কোনো ছবি পোস্ট করলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ তথ্য ও প্রযুক্তি (সংশোধিত) আইন ২০১৩ প্রয়োগ করে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হলে অশ্লীল ছবি, অশ্লীল পুস্তিকা, অশ্লীল গান, অশ্লীল ভিডিও পোস্টকারী ও পর্নোসাইট নিয়ন্ত্রণে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ এ দণ্ডবিধির ২৯২ ধারা ও ২৯৩ ধারার বিধান মতে শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাধা কোথায়? ইন্টারনেট ব্যবহারে ক্ষেত্রে সরকার ইচ্ছে করলে কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করে অশ্লীলতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, সারাদেশে প্রতিদিন কয়েকশ’ কোটি টাকার লেনদেন হয় পর্নো ছবির ব্যবসায়। বিষয়টি পুরনো হলেও বাস্তবতা আর ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে সমস্যাটা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। যে কারণে বাড়ছে ধর্ষণসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ। এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটানো। কেবল মাত্র আইনের মাধ্যমে পর্নো সমস্যার সমাধান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না যতখন না পর্নোগ্রাফির সকল পথকে বন্ধ করা না হয়। রাজধানীর ইস্টার্ন প্লাজা সর্ববৃহৎ মোবাইল পর্নো ছবির মার্কেট। এই মার্কেটে প্রায় ৯৫টি মোবাইলের দোকান রয়েছে, যেখানে পর্নো ছবি আপলোড করা হয়। এই দোকানগুলোতে মোবাইল সেট বিক্রির পাশাাশি পর্নো ছবি আপলোডের ব্যবসাও করে থাকে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইস্টার্ন প্লাজার প্রতিটি দোকানে গড়ে প্রতিদিন ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মতো বিক্রি হয় এসব পর্নো ছবি। ইস্টার্ন প্লাজার পরেই পর্নো মোবাইল মার্কেট হিসেবে বসুন্ধরা শপিং মলের নাম রয়েছে। এখানে অবশ্য আরও বেশি চড়া মূল্য দিয়ে নিতে হয় পর্নো ছবি। এছাড়া মোতালেব প্লাজা, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, ইস্টার্ন মল্লিকা,নাহার প্লাজা, ইস্টার্ন প্লাস টু, গুলশান, গুলিস্তান, উত্তরাসহ রাজধানী ঢাকায় ১০০ ওপরের মার্কেটে প্রতিদিন কোটি টাকার পর্নো ছবি মোবাইলে আপলোড করা হয়। সারাদেশে এর পরিমাণ ২০ কোটি টাকার কম হবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য রাষ্ট্রের পুলিশের সামনেই চলছে এমন বাণিজ্য। রাষ্ট্রের সদিচ্ছা থাকলে সকল অন্যায় নোংরামী অশ্লীলতা বন্ধ করা সম্ভব। নতুন করে কোন আইন পাস করার দরকার নেই। কারণ দ-বিধির ২৯২ ও ২৯৩ ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ রহিয়াছে যে, অশ্লীল পুস্তকাদি বিক্রয়, ভাড়া, বিতরণ, প্রকাশ্যে প্রদর্শন কিংবা প্রচার করলে তিন মাস পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, অর্থ দণ্ডে অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।
পর্নোগ্রাফির ভয়াবহতা থেকে জাতির তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করার প্রয়াসে এখন দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে পরিবারের অভিভাবক, মসজিদের সম্মানিত খতিব সাহেব, শিক্ষকবৃন্দ, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ব্যক্তিবগের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে পর্নোগ্রাফির হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ