ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 January 2017, ১৩ মাঘ ১৪২৩, ২৭ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ধ্বসের আয়োজন!

স্টাফ রিপোর্টার : রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে ‘সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি’ ব্যবহার করা হবে-সরকার ও ভারতীয় কোম্পানীর পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস দেয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন তা স্রেফ প্রতারণা। এই প্রযুক্তি সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ক্ষতি কমাতে পারে। রামপাল প্রকল্পে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন হত্যার আয়োজন চলছে বলেও পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করছেন। তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের গবেষণার বরাতে দাবি করছেন, বিতর্কিত এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনটি সন্দেহাতীতভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। একইভাবে হুমকিতে পড়বে সংলগ্ন এলাকার প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

সূত্র মতে, ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর রাজধানী ঢাকা থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। ধাপে ধাপে এই প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের উদ্বোধনকাজও চলছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের কোম্পানি ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ভারত প্রকল্পটি উত্তর প্রদেশে বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। প্রকল্প থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে জলাশয় থাকায় ভারতীয় আইনবিরোধী বলে সেখানে করতে পারেনি। ২০০৮ সালে ভারত সরকার এ প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করে। অথচ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। যেখানে আইন অনুযায়ী বনের ১৫ কি.মি এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ স্থাপন নিষিদ্ধ। ভারতে এ ধরনের প্রকল্প করা হয় অনুর্বর ও পতিত জমিতে আর রামপালের এই স্থানটির ৯৫ শতাংশ সম্পূর্ণ উর্বর। 

সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে যেমন ১৪ কিলোমিটার দূরত্বের কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা চলছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি কাউন্টিতে ১৯৭৯-৮০ সালে ১২৩০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সময়ও স্থানীয় মানুষকে এভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো। এমনকি কিছু দিন পরে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে ১৬৯০ মেগাওয়াটে উত্তীর্ণ করা হয়। ফলাফল সাথে সাথে বোঝা না গেলেও ৬৬ থেকে ১৩০ ফুট উঁচু বিশালাকৃতি পেকান বৃক্ষগুলো যখন একে একে মরতে শুরু করলো ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের হিসেবে ফায়েত্তি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস বিশেষত সালফার-ডাই-অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় পেকান, এলম, ওক সহ বিভিন্ন জাতের গাছ আক্রান্ত হয়েছে, বহু পেকান বাগান ধ্বংস হয়েছে, অন্তত ১৫ হাজার বিশালাকৃতির পেকান বৃক্ষ মরে গেছে। এবং এই ক্ষতিকর প্রভাব কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৪৮ কি.মি. দূরেও পৌঁছে গেছে। ফায়েত্তি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে গড়ে ৩০ হাজার টন সালফার-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের ফলে সালফার ও এসিড দূষণে হাইওয়ে-২১ এর ৪৮ কি.মি. জুড়ে গাছপালার এই অবস্থা যদি হতে পারে তাহলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরকারি হিসেবেই দৈনিক ১৪২ টন হারে বছরে প্রায় ৫২ হাজার টন সালফার ডাইঅক্সাইড নিঃসৃত হলে মাত্র ১৪ কি.মি দূরে অবস্থিত সুন্দরবনের কী অবস্থা হবে তা ভেবেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন গবেষক-বিশেষজ্ঞরা। 

এদিকে সরকার বলছে রামপালে সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, ফলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজির কথা বলে এভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা একটা প্রতারণামূলক কাজ বলে অভিযোগ করছেন রামপাল বিরোধীরা। তাপীয় কর্মদক্ষতা বা ইফিসিয়ান্সি অনুসারে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তিন প্রকার : সাব ক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল এবং আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল। সাব ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ন্যায় সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেও কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, পারদ, সীসা, আর্সেনিক মিশ্রিত বিষাক্ত ছাই ইত্যাদি নির্গত হয়। পার্থক্য হলো, সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইফিসিয়ান্সি সাব ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ বেশি। বলা হয়, প্রতি ১ শতাংশ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ২ শতাংশ হারে পরিবেশ দূষণকারী উপাদান কম নির্গত হয়। এ হিসেবে সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে দূষণের পরিমাণ সর্বমোট মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায় যা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। যদি পুরাতন সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে দৈনিক ১০০ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়, তাহলে সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে সালফার ডাই অক্সাইড নির্গমন সর্বোচ্চ ১০ টন কমে ৯০ টন হতে পারে। এখন সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহারের ফলে এই সামান্য ১০ টন হ্রাস পাওয়ার ঘটনা থেকে যদি প্রচার করা হয় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহারের ফলে কোনো পরিবেশ দূষণ হবে না- তাহলে সেটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফার মতে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুন্দরবনের কাছে প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটির এমন কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে যেগুলো সাবক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল বা আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল- যেই টেকনোলজিই ব্যবহার করা হোক না কেন ঐ ক্ষতিগুলো হবেই। যেই টেকনোলজিই ব্যবহার করা হোক- বিদ্যুৎ কেন্দ্র চললে শব্দ দূষণ হবেই, বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতল রাখার জন্য পশুর নদী থেকে পানি গ্রহণ-বর্জন করতে হবে, ফলে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর মতো সুন্দরনের পশুর নদী দূষণের ঝুঁকি থাকবেই, সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে দিনে রাতে কয়লার জাহাজ চলাচলের ফলে শব্দ দূষণ, পানি দূষণ, আলো দূষণ ইত্যাদি ঘটবেই।

 এদিকে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন কাজের শুরু থেকে বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতর এর বিরোধিতা করলেও অধিদফতরের ১০ জন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কয়েকটি শর্তে রহস্যজনকভাবে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট প্রকল্পের কাজ চালিয়ে নিতে একটি পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করে। ছাড়পত্র প্রদান প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে আমদানিকৃত যন্ত্রের জন্য এলসি খোলা, ইনহাউজ এনভায়রনমেন্টাল মনিটরিং সিস্টেম তৈরি, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ, প্রকল্পের তরল বর্জ রিসাইক্লিং ও জিরো ডিসচার্জ পরিকল্পনা দাখিল করা, সরকার অনুমোদিত রিডিউস-রিইউজ-রিসাইকেল নীতি বাস্তবায়নসহ পরিবেশগত ছাড়পত্রের সকল শর্ত মেনে নেয়ার শর্তে ছাড়পত্রটি প্রদান করা হয়েছে।

২০১১ সালে ‘রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ বিষয়ে পৃথক দুইটি প্রতিবেদন জমা দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী। ড. আব্দুস সাত্তার তার প্রতিবেদনে বলেন, রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে সুন্দরবনের ২৩ ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের সার্বিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ও এলাকার পরিবেশ সংকট সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, কয়লায় সালফার থাকায় পানিতে মিশলে তা ক্ষারে পরিণত হয়। বাতাসের মাধ্যমে এই সালফার ওজন স্তরে জমা হবে। এই সালফার যুক্ত পানি জলাশয়ে পড়লে মাছের মৃত্যু হবে। আর মাটিতে পরলে এর উর্বর ক্ষমতা কমে যাবে। এই সালফার বায়ূ গ্রীষ্মের সময় ভারতে এবং শীতকালে বাংলাদেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

অন্যদিকে, অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন এক বছর গবেষণা করে সুন্দরবনের ক্ষতিসহ ২২টি বিষয়ের উপর জোর দিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- বিদ্যুৎ উৎপাদন, নগরায়ণ, শিল্পায়ণ, পরিবহণ, কর্মসংস্থান, ব্যবসাসহ ৭টি বিষয়ে তথাকথিত উন্নয়নমূলক পরিবর্তন হবে। তবে এই প্রকল্পের সম্ভাব্য উপকারিতা ১৯ শতাংশ এবং অবধারিত অপকারিতা ৮১ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ : বিভিন্ন মহলের সমালোচনা স্বত্ত্বেও সরকার বিতর্কিত রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত সুন্দরবনের অন্যতম একটি জলাভুমি যা পশুর নদীর পাশে অবস্থিত। দেশের উদ্বিগ্ন বিশিষ্টজনদের সংগঠন সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি (সুরজাক) চার বছর ধরে এ প্রকল্পের জন্য একটি সমন্বিত ও সঠিক পরিবেশগত প্রভাব নিরুপন (ইআইএ) দাবী করে আসছে। যার মধ্যে সুন্দরবন, তার পার্শ্ববতীর্ জনপদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক সামাজিক-অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্য হুমকিমূলক অসংখ্য আনুষঙ্গিক ও চিহ্নিত ঝুঁকিসমূহ পরিস্কারভাবে মূল্যায়ন নিশ্চিত থাকবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ভারতীয় কোম্পানী বা এদেশের সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট বিভাগ কোন প্রকার সঠিক মূল্যায়ন তৈরীতে সম্পূণভাবের্ই ব্যর্থ হয়েছে। এ অবস্থায় ‘সুরজাক’ দেশবাসীসহ সকল সুন্দরবনপ্রেমীদের রামপাল প্রকল্পের নামে সুন্দরবন ধ্বংসের রাষ্ট্রীয় আয়োজন সম্পর্কে অবহিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষক-বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। এসকল নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞবৃন্দ সর্বসম্মতভাবে একমত হয়ে বলেছেন যে রামপাল প্রকল্পটি- ১. একটি দ্বিতীয় শ্রেণির বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট যাতে রয়েছে সেকেলে ও অনুপযুক্ত প্রযুক্তি যা সুন্দরবন ও আশেপাশের জনপদের উপর অগ্রহনযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব প্রতিরোধে সক্ষম নয়; ২. এটি ভুমিকম্প ও প্লাবন বিষয়ে ঝুঁকি পূরোপূরি বিবেচনায় রাখেনি যার ফলে প্রকল্পের চারপাশের এসব দূর্যোগ থেকে জলাশয়ে ভারী ধাতুসমূহের দূষণ ঘটতে পারে; ৩. একটি অর্থনৈতিকভাবে ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা বাংলাদেশকে একটি ‘ফাঁকা পকেট’ পরিণত করবে, এবং তা থেকে দেশটি আর মুক্তি পাবে না। 

২০১৬ সালের জুলাই মাসে সুরজাক এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বিষয়ে “১০টি প্রশ্ন ও উত্তর” সম্পর্কে বিষয় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়োজিত করেছিল যাতে বিশেষজ্ঞগন মতামত প্রদান করেন। বায়ূদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ড. রঞ্জিত সাহু বলেন, প্রস্তাবিত রামপার প্রকল্প ‘স্টেট অব দি আর্ট’ বা সু-মান সম্পন্ন নয়, এটি পর্যাপ্ত বায়ু দূষণ মোকাবিলার ব্যবস্থাসম্পন্ন নয়। প্রস্তাবিত নাইট্রাস অক্সাইড নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনাটি হচ্ছে ৩০ বছরের পুরাতন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মত। এধরণের যন্ত্রপাতি কোন উন্নত দেশে ব্যবহারের জন্য কোনদিনই অনুমতি পাবেনা। এর সালফার ডাই- অক্সাইড নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাটি পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি বা টেন্ডার দলিলে বা ইআইএ’তে তার কার্যকারিতা সু-প্রমাণিত নয়। পার্টিকুলেট ম্যাটার ও পারদ অপসারণে এই কেন্দ্র অনুপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। প্ল্যান্ট থেকে অপসারিত পারদ সুন্দরবনের মাছ কাঁকড়া প্রজাতির জলজ খাদ্যচক্রে যেয়ে যুক্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পারদ অপসারণের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কয়লার ভস্মে কার্বনের মাত্রা বৃদ্ধি করছে এবং তার ফলে এটি বাজার হারাচ্ছে। ড. সাহু অনুমান করছেন, রামপাল কর্তৃপক্ষ কয়লা ভস্মেও বাজার হারানোর আশংকায়ই হয়তবা কার্যকর পারদ অপসারন যন্ত্র ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে না। 

পানি দূষণ প্রসঙ্গে ওয়াটার কিপারস এলায়েন্স এর কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানি দূষণ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ডোনা লিসেনবী বলেন, রামপাল কেন্দ্র তার কয়লার ছাই ভেজানো, যন্ত্রপাতি শীতলকরণ, ফ্লু-গ্যাস স্লাবার এর ময়লা দূরিকরণ ও ছাই অপসারণের জন্য পশুর নদীর আরো পানি ব্যবহার করবে। এতে কয়লার ছাই এ পানি ব্যবহার করা হবে, আর তাতে তৈরী হবে বিষাক্ত কয়লার কাদা। প্রতি দিন ৪২২ ঘন মিটার ভেজা কয়লার ছাই প্ল্যান্টের কয়লা-পুকুরে পাঠানো হবে। যে কোন সময় ভুমিকম্প, বা প্লাবনের ফলে যে কোন ছিদ্রপথে নির্গমিত তরল কয়লা আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম, সীসা, পারদ, থেলিয়াম, ও ইউরেনিয়াম এর সাথে মিশ্রিত হয়ে সুন্দরবনকে দূষিত করবে। বঙ্গোপসাগর থেকে রামপাল প্রকল্প পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার নদীপথ অবশ্যই ড্রেজিং করতে হবে, তাতে ৩৪ মিলিয়ন ঘন মিটার নদীর তলা খনন করা হবে, অথচ এ স্থানটিই হচ্ছে সকল মাছ, কাঁকড়া ও ডলফিনের আবাসস্থল। এছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও নদী-পথ অবারিত রাখার প্রয়োজনে প্রতি বছরই নদীর তলার ১৮ লাখ ঘনমিটার মাটি ড্রেজিং করে সরাতে হবে। পশুর নদীর প্রয়োজনীয় ড্রেজিং, এবং অপসারিত নদীর তলা ও ময়লা নদীতে বা সাগরে প্রেরণের সার্বিক কাজের মধ্য দিয়ে পানির ঘোলাটে চেহারা বৃদ্ধি পাবে, মাছ ধরা হ্রাস পাবে, মাছের আবাস্থল
পরিবর্তিত হবে, মাছসহ সকল জলজ প্রাণী অন্যত্র সরে যাবে, তাদের খাদ্য-ডিম ছাড়া ও সার্বিক প্রাণীবৈচিত্র বিনষ্ট হবে। 

কয়লার ছাই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ডেবিস ডিপার্টমেন্ট অব সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর চেয়ারম্যান প্রফেসর ডেব নিয়েমেয়ার বলেন, রামপাল প্রকল্পে কয়লার গুড়া ব্যবস্থাপনার সুযোগ সীমিত হওয়ায় প্রতি বছরই এটি থেকে ২ থেকে ৩ দশমিক ৮ টন ‘পলাতক’ গুড়া বাতাস ও পানিতে মিশবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লার গুঁড়ো নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রস্তাবিত শুধুমাত্র ‘পানি ছিটানোর যন্ত্র’ ব্যবহারের পরিকল্পনাটি তুলনামূলকভাবে অকার্যকর বলে প্রমানিত একটি বিষয়। কয়লার গুঁড়ো নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্ট জলীয় বর্জ্য যদি পশুর নদীর পানিতে পাঠিয়ে দেয় হয়, তাহলে তা থেকে গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রভাব দেখা দিবে। পানিতে মিশ্রিত কয়লার গুঁড়ো পানির মধ্যকার জমাট দ্রব্যসমূহে যেয়ে যুক্ত হয়, যা প্রকারান্তরে জলীয় প্রাণীর দেহে নানাবিধ ক্ষত তৈরী করবে যেমন: চামড়া ছিড়ে যাওয়া, চামড়া আবৃত হয়ে যাওয়া, জলীয় প্রাণীদের দেহে আলোর স্পর্শ হ্রাস, শ্বাসযন্ত্রে বা খাদ্য গিলার তন্ত্রে প্রতিবন্ধক তৈরী। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্প বয়সী মাছের গায়ে কয়লার গুঁড়ো লাগলে তাদের শতভাগই আধ ঘন্টা থেকে দুই ঘন্টার মধ্যে মারা যায়। তা ছাড়াও এসব জলজ প্রাণীর দেহে ক্যান্সার, দৈহিক বৃদ্ধির হার হ্রাস, ও প্রজনন ব্যর্থতা দেখা দেয়। কয়লার স্তূপ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বের মাটির মধ্যে কয়লার গুঁড়ো দেখা যায় বলে প্রমানিত হয়েছে। একই মাটিতে কয়লা থেকে নিঃসৃত আর্সেনিক দূষণ ৫ গুণ বেশী দেখা যায়; তাছাড়াও তা থেকে মাটির অম্লতা ও ভারী পদার্থের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। 

এছাড়া কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ গবেষণা বিজ্ঞানী ড. ক্লস এইচ জ্যাকব এবং আর্থ অবজারভেটরী প্রফেসর লেমন্ট-ডোহার্তি বলেন, একটি দূর্বল পরিকল্পনায় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্র উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপকুলীয় ঝড়-বন্যার মূখোমূখি হতে হবে যা জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রের পানির মাত্রা বৃদ্ধির অভিঘাতে আরো জটিল হতে পারে। কেন্দ্রটির কয়লার ছাই এর পুকুরের চারপাশের বাঁধ, গড় সমুদ্র উচ্চতার ৫ দশমিক ৬ মিটার উপরে রয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোন সময় ৭ দশমিক ৪ মিটার উচ্চতার ঝড় হতে পারে এবং তার ফলে সমগ্র কেন্দ্রটি ২ ফুট পানির নিচে চলে যেতে পারে। আর তার ফলে কেন্দ্রের কয়লার ছাই এর পুকুর ভেসে যেতে পারে - ব্যাপকভাবে দূষিত হবে পশুর নদী। এখানে বৃহৎ ভুমিকম্প, আঞ্চলিক ও স্থানীয় ভুমির নড়াচড়া বিষয়ে অবমূল্যায়ন রয়েছে, ফলে অত্র এলাকার মারাতœক ক্ষতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নে এই ঝুঁকিগুলোকে আমলে না নেয়ায় সমূহ বিপদের আশংকা করছেন তারা।

রামপাল প্রকল্পের ইআইএ রিপোর্টেও ক্ষতির আশংকা : রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুইটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট থাকবে। প্রথম ইউনিটটি নির্মাণের জন্য ৪৮ মাস বা চার বছর এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি শেষ হতে আরো ৬ মাস বাড়তি অর্থাৎ মোট সাড়ে ৪ বছর সময় লাগবে। এই সাড়ে চার বছর সময় জুড়ে গোটা এলাকার পরিবেশ, কৃষি, মৎস ও পানি সম্পদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সরকারি পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদনেই আশংকা করা হয়েছে। রামপাল ইআইএ’র ২৬৮ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করা হবে। এর ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি পরিবেশ আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। সমীক্ষা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, যানবাহন, জেনারেটর, বার্জ ইত্যাদি থেকে তেল পুড়িয়ে ক্ষতিকর সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস নির্গত হবে। নির্মাণ কাজের যন্ত্রপাতি ও যানবাহন ব্যাবহারের ফলে শব্দ দূষণ হবে। নির্মাণ পর্যায়ে বিভিন্ন ধরণের কঠিন বর্জ্য তৈরি হবে যা সঠিক পরিবেশ ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে পরিবেশ এর উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। নির্মাণ স্থলের নিকটবর্তি নদী-খালের পানিতে নির্মাণ যন্ত্রপাতি ও যানবাহনের তেল নি:সরিত হয়ে পানি দূষণ ঘটাতে পারে। ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর পানি ঘোলা হবে। ড্রেজিং সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে তেল-গ্রীজ ইত্যাদি নি:সৃত হয়ে নদীর পানির দূষিত হবে।

ইআইএ রিপোর্টে পরিচালন পর্যায়কে ২৫ বছর ধরা হয়েছে। এই ২৫ বছর ধরে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে যার ফলে পরিবেশ আইন ১৯৯৭ এ বেঁধে দেয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার সীমার (প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এইসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে (প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি) যার ফলে এসিড বৃষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি সহ গাছপালা জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লাখ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূত ছাই বা স্লারি ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে কারণ এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। 

উৎপাদিত বর্জ্য ছাই সিমন্টে কারখানা, ইট তৈরি ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা ইআইএ রিপোর্টে বলা হলেও আসলে কোন কারখানায় এর আদৌ কোন ব্যবহার হবে এরকম কোন নিশ্চিত পরিকল্পনা করা হয়নি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে ছাইয়ের পুকুরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এটি পশুর নদীর ঠিক তীরেই তৈরি করা হবে। এই ছাই বাতাসে উড়ে, ছাই মিশ্রিত পানি চুইয়ে মাটির নীচে ও নদীর পানিতে মারাত্মক দূষণ ঘটাবে। আরেকটা বড় ঝুঁকি হলো, বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় কিংবা অন্যকোনো কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ছাই মিশ্রিত পানি সুন্দরবনের নদীতে ও পরিবেশ ছড়িয়ে যাওয়া। 

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সমুদ্র পথে আমদানি করতে হবে। আমাদানিকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে মংলা বন্দরে এনে তারপর সেখান থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীর গভীরতা সর্বত্র বড় জাহাজের জন্য উপযুক্ত না হওয়ার কারণে প্রথমে বড় জাহাজে করে কয়লা সুন্দর বনের আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত আনতে হবে, তারপর আকরাম পয়েন্ট থেকে একাধিক ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে কয়লা মংলাবন্দরে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য সুন্দরবনের ভেতরে হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ৩০ কি.মি নদী পথে বড় জাহাজ বছরে ৫৯ দিন এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৬৭ কি.মি পথ ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে বছরে ২৩৬ দিন হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহন করতে হবে। এতে জলজ ও বণ্যপ্রাণিগুলোর জন্য নতুন বিপদ দেখা দিবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ