ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 January 2017, ১৩ মাঘ ১৪২৩, ২৭ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নানা অনিয়মকে সঙ্গি করে চতুরতার সাথে নির্মাণ খরচ বেড়েছে ৫৭ শতাংশ ॥ কাজ শেষ কবে জানে না কেউ

  • সরকারি ক্রয় নীতিমালা-পিপিআরকে বুড়ো আঙুল !

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর নিত্য যানজট যন্ত্রনা থেকে নগরবাসীকে রেহাই দিতে বিভিন্ন সংযোগ সড়ক মোড় ও প্রান্তে একের পর এক উড়াল পুল ( ফ্লাইওভার ) নির্মাণের যে উদ্যোগ তার একটি “ মগবাজার- মৌচাক উড়ালপুল প্রকল্প ”। এই প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে কবে , তা এখন নগরবাসী বিস্মৃত হতে চললেও এটার ভোগান্তির মাত্রা কতটা পর্যায়ে পৌঁছেছে তা হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিচ্ছে । প্রতিদিনই তাদের স্মৃতিতে ঠাসা হচ্ছে এই প্রকল্পের নামে জনভোগান্তি ।

এ দিকে , সরকারি ক্রয় নীতিমালা-পিপিআরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে মগবাজার মৌচাক উড়ালপুল প্রকল্পটি। ঠিকাদার নিয়োগ, গাড়ি কেনা এমনকি কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও মানা হয়নি আইন। এসব কারণে চার বছরে প্রকল্পের খরচও বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। এসব ঘটনাকে বড় অনিয়ম বলছেন বিশ্লেষকরা। আর এসব ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি প্রকল্প পরিচালক।

ঢাকার বুকে সাপের মতো বেয়ে উঠছে উড়ালপুল। অথচ হাজার কোটি টাকার এসব প্রকল্প যতোটা না স্বস্তি দিচ্ছে নগরবাসীকে, ভোগাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। কেবল তাই নয়, খরচের ক্ষেত্রেও বড় আর্থিক অনিয়ম ঘটেছে বেশ কিছু প্রকল্পে। যার অন্যতম বহুল আলোচিত মগবাজার মৌচাকের এই উড়াল সেতু।

অনিয়মের ফিরিস্তি : দরপত্র ডাকা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু কাজ দেয়া হয়েছে সর্বনিম্ন প্রস্তাবের চেয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা বেশিতে। এমনকি পরিমাণ না বাড়লেও, চুক্তিতে থাকা একই কাজ করতে খরচ করা হয়, মোটা অঙ্কের বাড়তি টাকা।

 কেবল তাই নয়, প্রকল্প এলাকার জন্য পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া নির্মাণ সামগ্রীর নির্ধারিত দামকেও অগ্রাহ্য করেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এসব গুরুতর অনিয়ম ঘটেছে বহুল আলোচিত মগবাজার মৌচাক উড়ালপুল প্রকল্পে। সম্প্রতি সরকারের নিরীক্ষা বিভাগ এক পর্যবেক্ষণে সুপারিশ করেছে দায়িদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার।

প্রকল্পের মৌচাক অংশের পাঁচ নম্বর প্যাকেজের প্রায় চার কিলোমিটার অবকাঠামোর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১২ সালে। সে সময় ছয়টি যৌথ ও একক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দর প্রস্তাব করলে তা পাঠানো হয় ডোনার এজেন্সির কাছে। কিন্তু সর্বনিম্ন দরদাতা টিসিসিএল-আইচসিআইএল এর ৩০৪ কোটি টাকার প্রস্তাব গৃহীত হয়নি অর্থায়নকারী সংস্থার কাছে। তারা পরামর্শ দেয়, তৃতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান এসিএল-সিমপ্লেক্সকে ৩৩০ কোটি টাকায় কাজটি দেয়ার। অথচ সেটি না করে আবারো দরপত্র আহ্বান করে কাজ দেয়া হয় তমা কনস্ট্রাকশানকে; পৌনে চৌদ্দ কোটি টাকা বেশিতে। যাকে পিপিআর লঙ্ঘন এবং প্রকল্পের টাকায় অপচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ওই অংশের কাজে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেশি দেখিয়ে প্রায় সাড়ে দশ কোটি টাকা বাড়তি নেয় ওই ঠিকাদার। অর্থাৎ, পরিসংখ্যান ব্যুরো ঢাকা বিভাগের জন্য পূর্ত কাজের যে পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে, তা মানেনি ওই প্রতিষ্ঠান। বরং ভিন্ন এলাকার জন্য দেয়া দাম ব্যবহার করে বেশি নিয়ে যায় ১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এছাড়া, একই প্যাকেজের কাজ ৩০ অক্টোবর ২০১৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ এর মধ্যে শেষ হওয়ার শর্তে মূল্য সমন্বয় বাবদ রাখা হয় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। কিন্তু দেয়া হয় ২০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ বাড়তি ১৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা তুলে নেয় ওই ঠিকাদার।

এছাড়া প্রকল্পের আরেক অংশের কাজের জন্য ১৩ কোটি টাকার এসটিইউ যন্ত্র আমদানি করা হয় পিপিআর না মেনে। যার যৌথ ঠিকাদার নাভানা-সিমপ্লেক্স।

নির্মাণ খরচ বেড়েছে ৫৭ শতাংশ : সরকারি ক্রয় নীতিমালা-পিপিআরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এই প্রকল্পটি। ঠিকাদার নিয়োগ, গাড়ি কেনা এমনকি কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও মানা হয়নি আইন।

এসব কারণে চার বছরে প্রকল্পের খরচও বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। এসব ঘটনাকে বড় অনিয়ম বলছেন বিশ্লেষকরা। আর এসব ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি প্রকল্প পরিচালক। 

যানজটকে নিত্যসঙ্গী করে ঢাকার মানুষ স্বপ্ন দেখে উড়াল সেতুতে চড়ার। কিন্তু সময় যতো যায়, সে স্বপ্নকে আরো দূরে ঠেলে দেয় মগবাজার মৌচাক প্রকল্প। কেননা, এখানকার বাস্তবতা হলো, সময় যায় ঠিকই, কিন্তু কাজ আর অজুহাত যেন থামে না।

এই প্রকল্পের ঠিকাদার নির্বাচন করতেই আইন ভাঙা হয়েছে কঠোরভাবে। যেমন, পাঁচ নম্বর প্যাকেজের ভিত্তি ও আংশিক অবকাঠামো নির্মাণের কাজ পায় তমা কনস্ট্রাকশান। যার অর্থমূল্য ৭০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু দরপত্রের শর্ত ও চুক্তিতে দেখা যায়, এ ধরনের কাজ কেবল সেই প্রতিষ্ঠানকেই দেয়া যেতে পারে, যাদের অন্তত একটি ফ্লাইওভার, সেতু অথবা ৭৫০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইলিং করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ, এসবের কোনোটিই সে সময় ছিল না তমা কন্সট্রাকশনের। ফলে, এখানে পিপিআর লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে নিরীক্ষা বিভাগ। যদিও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি ওই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা।

এখানেই শেষ নয়, প্রকল্পের চার ও ছয় নম্বর প্যাকেজে অতিরিক্ত নির্মাণ কাজের অজুহাতে দুই যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেশি নিয়ে যায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, নাভানা সিমপ্লেক্স এবং এমসিসিসি-এসইএল। আর উন্নয়ন প্রস্তাবনায় উল্লেখ না থাকলেও, সোয়া দুই কোটি টাকার গাড়ি কিনে অপচয় করা হয় প্রকল্পের টাকা। কেবল তাই নয়, ২০১১ সালের মূল প্রস্তাবনায় প্রকল্প ব্যয় ৭৭২ কোটি টাকা হলেও , নানা অজুহাতে ২০১৫ সালে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে নকশা ভুল হওয়ায় তার পেছনে গচ্চা যায় ৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর এসব ব্যাপারে সাড়া মেলেনি প্রকল্পের পরিচালকের কাছ থেকেও।

প্রকল্পের কারিগরি কমিটিও নির্বাচন করা হয়েছে পিপিআর অমান্য করে। এমনকি, এই উড়াল সেতু বাস্তবায়নের আগে নেয়া হয়নি ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি-ডিটিসিএর অনুমোদনও।

 ভোগান্তিতে নগরবাসী : এই উড়ালপুলের কাজ শুরুর পর থেকেই গত চার বছর ধরে নগরবাসীর উপর চেপেছে যানজটের অসহ্য যন্ত্রণা । প্রতিদিনই এ যন্ত্রণার কবলে পড়ে গন্তব্যের পথে চলাফেরা করতে গিয়ে হাফিয়ে উঠছেন । এখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে মগবাজার-মৌচাক উড়ালপুলের নিচে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্্িরবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। দীর্ঘদিন ধরে চলা উড়ালপুলের নির্মাণ কাজের কারণে এমনিতেই ভয়াবহ সমস্যায় রয়েছে নগরবাসী, তার ওপর নতুন করে রাস্তা খোঁড়ার কারণে রীতিমতো বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ সড়ক ব্যবহারকারী লাখ লাখ নগরবাসীকে রাত-দিন দীর্ঘ যানজটের কবলে পড়তে হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা। 

ডিপিডিসির একজন কর্মকর্তা জানান, মগবাজার-মৌচাক উড়ালপুল নির্মাণের খোঁড়াখুঁড়ির সময় উলন-ধানমন্ডি ১৩২ কেভি উপকেন্দ্রের একটি ক্যাবল সার্কিট ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অপর দু’টি ক্যাবল সার্কিটের ওপর পাইল ক্যাপ ও কলাম নির্মাণের কারণে ক্যাবলগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় ক্যাবলে ত্রুটি দেখা দিলে ধানমন্ডি ১৩২/৩৩ কেভি উপকেন্দ্রের আওতাধীন এলাকায় মারাত্মক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য উলন-ধানমন্ডি ১৩২ কেভি ভূ-গর্ভস্থ ক্যাবল লাইন নুতনভাবে প্রতিস্থাপন করতে হচ্ছে। রমনা থানার সামনে থেকে শুরু হয়ে মগবাজার মোড় হয়ে মৌচাক পর্যন্ত এবং মৌচাক মোড় থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া আবুল হোটেল পর্যন্ত এ কেবল স্থাপন করা হবে। 

শ্রমিকেরা জানান, গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে রাস্তা খোঁড়া হয়েছে। মোট ৯টি ক্যাবল স্থাপন করা হচ্ছে। রমনা থানার সামনে থেকে মগবাজার পর্যন্ত ৫৮০ ফুট এবং মগবাজার মোড় থেকে মৌচাক পর্যন্ত ৬১৫ ফুট ক্যাবল স্থাপন করা হবে। কাজ শেষ হতে আরো দেড় মাস লাগতে পারে বলে কর্তব্যরত শ্রমিকেরা জানান। 

মগবাজার অংশে দেখা যায় উড়ালপুলের নিচে রাস্তা কেটে পিচের টুকরা, মাটি ও বালু রাস্তার মাঝখানে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া চার-পাঁচ ফুট চওড়া করে রাস্তা খোঁড়ার কারণে সরু হয়ে গেছে সড়ক। আড়ং মার্কেটের সামনে এক দিকে খোঁড়া হয়েছে, অন্য দিকে রয়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি, এতে মূল রাস্তা একেবারেই সরু হয়ে গেছে। ওয়্যারলেস মোড়ে রয়েছে সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিন (কনটেইনার)। রাস্তার অর্ধেক অংশজুড়ে রাখা হয়েছে এ ডাস্টবিন। এতে সড়ক সরু হয়ে দিন-রাত সব সময় যানজট লেগেই থাকছে। এর সাথে বাড়তি হিসেবে রয়েছে ময়লার দুর্গন্ধ ।

 মৌচাক মোড় থেকে মালিবাগ রেলগেট হয়ে আবুল হোটেল পর্যন্ত সড়কেও রাস্তার পশ্চিম লেন খোঁড়া হয়েছে। এ কারণে মৌচাক মোড় দিয়ে পশ্চিম লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পূর্ব লেন দিয়ে দুই দিকের যানবাহন চলতে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া মালিবাগ রেলগেট মোড় থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত রাস্তার দুই লেনের অবস্থাই দীর্ঘদিন থেকে খারাপ। এ কারণে খিলগাঁও উড়ালপুলের দিক থেকে আসা বেশির ভাগ যানবাহন বাইপাস সড়ক ব্যবহার করে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া আবুল হোটেলের সামনে গিয়ে উঠছে। তবে যাদের রেলগেট মোড় ব্যবহার করতে হয় তাদের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। মৌচাক মোড় থেকে মালিবাগ মোড় পর্যন্ত সড়কে উড়ালপুলের ওপরে কাজ চলছে। সে কারণে জনসাধারণের চলাচলে সতর্ক বার্তা লিখে রাখা হয়েছে। তারপরও এর মধ্য দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলছে নগরবাসী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ