ঢাকা, শুক্রবার 27 January 2017, ১৪ মাঘ ১৪২৩, ২৮ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পাঠ্যবই এখন নাট্যমঞ্চে

সাজজাদ হোসাইন খান : ভুল থাকতেই পারে। কেবল পাঠ্যবইয়ে নয়, সব ধরনের বইপত্রেই ভুল-ভ্রান্তি থাকে। এটি একটি স্বাভাবিক দস্তুর। কোন সময় অজ্ঞতার কারণে এমনটি ঘটে, আবার অসাবধানতাবশত হয় এরকম ভুল। বানান ভুল, শব্দে ভুল এমনকি তথ্যে ভুল থেকে যায় কোন কোন সময়। হয়তো বিষয়টিকে সরলীকরণের জন্যে ‘মুদ্রণপ্রমা;দ ছাপাখানার ভূত’। ইত্যাকার বাক্যের প্রচলন রয়েছে প্রকাশনা জগতে। দেখা যায়, অতি সাবধানতার পরও দু’চারটা ভুল থেকেই যায়। কেউ কেউ বইয়ের শেষভাগে শুদ্ধিপত্র জুড়ে দেন। ইদানীং অবশ্য এ রকম শুদ্ধিপত্র দৃষ্টিগোচর খুব কমই হয়। ভুল তো ভুলই। ভুলের সংশোধন প্রয়োজন। ফি বছর পাঠ্যবই ছাপা হয়। যথানিয়মে এবারও ছাপা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে হাতেও চলে গেছে ইতিমধ্যে। এসব পাঠ্যবইয়ে বিশেষ করে বাংলা বইয়ে ছাপাখানার ভূত নাকি ঢুকে পড়েছে দাপটের সাথে। এ জন্যে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রলাপ বকছে দু’চারজন। এই ভূত তাড়ানোর জন্য ওঝা-বৈদ্যের সন্ধানে হাতড়ে মরছে এদিক-সেদিক ‘বিজ্ঞ-বিদ্বানগণ’। পত্র-পত্রিকা, টিভি পর্দায় কতিপয় ভূতে ধরা জ্বিনে পাওয়া মানুষজনদের আছাড়ি-পিছাড়ি অবস্থা দেখছে দেশবাসী। ভুলতো প্রতিবছরই থাকে কমবেশি। কিন্তু এবার এতটা বেচইন কেন? যদিও এদের সংখ্যা অতি অল্প, শতকরা এক/দুই ভাগ হবে কিনা সন্দেহ।

কুসুম কুমারীর পদ্যে গ-গোল হয়েছে। এটি একটি বড় ভুলতো বটেই। এ নিয়ে জবাবদিহিতা হতেই পারে। তাই বলে এতো হট্টগোল? শিক্ষার্থীদের ভুল শিখানোর মধ্যে কল্যাণ নেই। এ ব্যাপারে অভিভাবকগণ তো সচেতন হবেনই। হওয়া উচিতও। এই যে পাঠ্যবই নিয়ে ডানে-বামে হৈ চৈ এটি এক ধরনের সচেতনতারই পরিচায়ক। এ জন্যে ভুল আবিষ্কারকগণ সাধুবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু মুশকিল হলো ভিন্ন প্রান্তে। ভুল শব্দটির আড়ালে লুকানো রয়েছে বিদ্বেষের শায়ক। বানান ভুল এবং পদ্যে ভুলের নেপথ্যে দাঁড়িয়ে আছে পাঠ্যবইয়ে উপস্থাপিত বিষয়-আশয়। অপছন্দটি এখানেই। বিদ্বেষের গড়ল খোলস ছেড়ে কি উৎকটভাবে বেরিয়ে পড়েছে, তার নমুনা দু’একটি শিরোনাম পাঠেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এক আবিষ্কার কর্তার শিরোনাম ‘পাঠ্যবইয়ের হেজাবীকরণ’ অন্য জন ‘পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশির কাছে অশনিসংকেত।’ কি চমৎকার আবিষ্কার! এমনকি ‘ও’তে ওড়না’ এ শব্দটিকেও এখন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। এখান থেকেও নাকি সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ উড়ছে। কারণ এই ওড়না মুসলিম কিশোরীগণ তাদের বয়ঃসন্ধিকালে নাকি ব্যবহার করে। তাই এই শব্দটি সাম্প্রদায়িক। অতীতে ও’তে ওল ছিল, বর্তমানে ওড়না শিখানো হবে কেন? বিদ্বেষ কতটা পুষ্ট হলে এমন ধারণা মগজকে উত্তপ্ত করতে পারে! ওড়নাতো কেবল মুসলিম মেয়েরাই ব্যবহার করে না, অমুসলিমরাও করে। এখানে শালীন-অশালীনের প্রশ্ন জড়িত। কোন সভ্য অভিভাবকই চাবেন না তার সন্তান অশালীনভাবে চলাফেরা করুক। শিক্ষাজীবন তো সভ্যতা ভব্যতা শিক্ষারই সময়। তাই পাঠ্যবইয়ে ওড়নার উল্লেখ থাকাটাই জরুরি। ওড়না রুচিশীলতারও পরিচায়ক। রুচিবর্জিতরাই ওড়নার ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। ও’তে ওলকপি যেমন সঠিক ও’তে ওড়নাও বেঠিক নয়। এই পরিবর্তনে এতটা গোস্বা হওয়ার কি থাকতে পারে? 

পাঠ্যবই থেকেই শিশু জ্ঞান আহরণ করে জীবনের পাথেয়। দেশপ্রেম, সভ্যতা, বিনয়, শালীনতা, রুচিশীলতা- এর সবকটাই ধারণ করে পাঠ্যবই। তাই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই তৈরি করার সময় তীক্ষè নজর রাখতে হয় বিষয়গুলোর প্রতি। অতীতে শিক্ষার্থীদেরকে নীতিবাক্য শিক্ষা দেওয়া হতো। পরবর্তী জীবনে তারা নীতিনিষ্ঠ হয়ে বেড়ে উঠতো। কি পদ্যে কি গদ্যে শিক্ষার্থীরা জানতো প্রতি প্রণতি জানানোর প্রথম পাঠ। বর্তমানে নানা তন্ত্র-মন্ত্রের দোহাই দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীগণের মনমগজকে বিভ্রান্তির ঘুরপাকে ফেলে দেয়া হচ্ছে। সত্যের প্রতি শালীনতার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলা হচ্ছে। যে কারণে এসব শিশুগণ পরবর্তী জীবনে অভব্য অ-শালীন আচরণ করতে দ্বিধা করছে না। দেশের প্রতিও আনুগত্যের প্রকাশ লোপ পাচ্ছে দিন দিন। যে পাঠক্রম পিতা-মাতার উষ্ণ আলিঙ্গন থেকে ছিন্ন করার কৌশল শিখায়, নিজের অতীত গৌরবকে আঁধারে ঢাকার বিহিত ব্যবস্থা করে,ধর্মীয় মূল্যবোধকে আড়ালে ফেলতে সচেষ্ট হয়, তখন দুঃখের আর অবশেষ থাকে না। পাঠ্যবই যারা রচনা করেন, পাঠ্যবই যারা সংকলন করেন, যারা সম্পাদনা করেন তাদের সততা তাদের মানসিকতা বিশেষভাবেই নির্ভরশীল, দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের মঙ্গল-অমঙ্গলে। তাই পাঠ্যবই হবে কল্যাণের বার্তাবাহক। দেশীয় কতিপয় চিন্তকের মতো বিদেশি চিন্তকরাও নাকি বিচলিত বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের ব্যাপারে। এমনি একখানা দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে পত্রিকায়। সে প্রতিবেদনেই অশনিসংকেতের আলামত আবিষ্কার করেছেন। সেসব চিন্তকের কপালে নাকি বলিরেখাও বাড়তে শুরু করেছে। ভাবনার বিষয়ই বটে। যদিও বাংলাদেশে তেমন কোন উত্তাপ নজরে আসছে না। দু’-একজনের বিদ্বেষযুক্ত একচোখা কথাবার্তা ছাড়া। যৌক্তিক সমালোচনা তো হবেই। যুক্তিতর্ক সাবলীল সমাজেরই লক্ষণ। বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের সংযোজন বিয়োজন নিয়ে দি নিউইয়র্ক টাইমসও বিচলিত। সংযোজন-বিয়োজনটি হলো কতিপয় মুসলিম মনীষীর জীবনবৃত্তান্ত, মুসলিম বীরের কীর্তি কাহিনী উপস্থাপন। কোথাও নামাজ-রোজার উল্লেখ। এতেই গেলো গেলো। মুসলিম প্রধান দেশের শিক্ষার্থীরা তো নিজস্ব ধর্মবোধ ইতিহাস ঐতিহ্যই ধারণ করবে। এতে অপরাধের কি থাকতে পারে।

এগুলো তো এমন কোন বিষয় নয় যা পাঠে শিশুরা বখে যাবে। কলকাতার স্কুল পাঠ্যবইয়েতো পূজা পার্বন দেবদেবী পৌরাণিক কাহিনী হিন্দু বীরদের উল্লেখ আকছার থাকছে। এ ব্যাপারে তো কেউ প্রশ্ন তোলে না সেখানে। তোলা উচিতও নয়। কারণ এমন পাঠে তাদের শিশুগণ জাতিয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হবে। জাতীয় বীরদের সাথে পরিচিত হবে। এভাবেই দেশপ্রেম ধর্মপ্রেম জাগ্রত হয় শিশুমনে। পাঠ্যবই সংকলকদের শুধু সজাগ থাকতে হবে যেন এই বই পাঠ করে শিশুরা অন্য ধর্মের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে না উঠে। সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো কোন কর্মে জড়িয়ে না পড়ে। ভিনধর্মের অনুসারী কোন বন্ধুর সাথে কলহে জড়িয়ে না পড়ে পাঠক্রমের কারণে। এ বছরের পাঠ্যবই এমন কোন বিষয় সংযোজিত হয়েছে কি যা উল্লিখিত আচরণগুলোকে স্পর্শ করে? যদি না করে তবে কেন অহেতুক হৈ-হুল্লা? করলে তো চিন্তার ব্যাপারই বটে। আর তা না ঘটে থাকলে এতো অস্থিরতারই বা কী প্রয়োজন।

কি কি বিষয় সংযোজন হলো অন্যদিকে, কি কি বিয়োজন হলো তা কিন্তু পুরোপুরি স্পষ্ট করছে না যারা গোস্বা বা বেজার হয়েছেন। সংযোজন বিয়োজনের বিষয়গুলোর উল্লেখ করলে অভিভাবকগণ জানতে পারতেন এমন কী ‘সন্দেশ’ থেকে তাদের সন্তানদের বঞ্চিত করা হলো। আর এমন কী বিষয় পাঠ্য-তালিকায় যুক্ত হলো যা পাঠে তাদের সন্তান বিপথে যাবে। অসাধু অসততায় নিমজ্জিত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ