ঢাকা, রোববার 29 January 2017, ১৬ মাঘ ১৪২৩, ৩০ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন কমিশন গঠনে গতবারের পুনরাবৃত্তি মানুষ চায় না

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ‘জেলে যেতে আর ভয় লাগে না। জেলে যেতে আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছি। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য অনেক নেতাকর্মী জেলে আছেন। আমাদের প্রত্যেকের সাত আট বার করে জেলে যাওয়া হয়েছে গেছে। তবে এখন জেলে যাওয়ার জন্য তৈরি হলে চলবে না। এখন জেল ভাঙার জন্য তৈরি হতে হবে’। কথাগুলো বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। সাবেক এ ছাত্রনেতার বক্তব্যেই সার্চ কমিটি গঠনে দলীয়করণের ফলে ক্ষুব্ধ মনোভাবের বহি:প্রকাশ ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের একগুয়েমী আচরণের কারণে নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে রাজপথ। বারবার সংলাপের আহবান প্রত্যাখ্যান, সমঝোতা না করা এবং আরেকটি অনুগত নির্বাচন কমিশন গঠিত হলে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সামনে আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের আন্দোলনে তারা আগের ভুলগুলো করবেন না। অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো তাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তুলবে।
সূত্র মতে, বিতর্কিত এবং সর্বজন সমালোচিত কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশিন গঠন নিয়ে সর্বত্র আলোচনা শুরু হয়েছে। কবে সার্চ কমিটি গঠনে সরকারের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে বিরোধী রাজনৈতিক জোটসহ অনেকেই গতবারের পুনরাবৃত্তিই হতে পারে বলে আশংকা করছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিমধ্যে বলেছেন, সরকার যেভাবে সার্চ কমিটি গঠনে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করেছে তাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের আশা করা যায় না। সরকার আবারো রকিব মার্কা অথর্ব কমিশন গঠন করতে চাইছে। যাতে করে আওয়ামী লীগ তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে আবারো আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে। তিনি বলেন, আমরা গৃহপালিত নির্বাচন কমিশন মানবো না। গ্রহণযোগ্য একটি কমিশন দেশবাসী দেখতে চায়।
নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সার্চ কমিটি নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তারপর যাদের নিয়ে ওই কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। সার্চ কমিটি কোন মানদ-ের ভিত্তিতে সম্ভাব্য নির্বাচন কমিশনারদের নাম সুপারিশ করবে তা ঠিক করে দিতে হবে। বদিউল আলম মজুমদার আরো বলেন, ২০১২ সালের সার্চ কমিটির মাধ্যমে অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন পেয়েছি আমরা। এই কমিশন দেশের নির্বাচনব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। আগের কমিশন নির্বাচনী আইনকানুন মানার যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল তা এই কমিশন নষ্ট করে দিয়েছে। তারা যে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন সেই কমিটির কয়েকজন সদস্যই ছিলেন বিতর্কিত। এবারো সেই কমিটির লোকদের রাখা হয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ব্রতির নির্বাহী পরিচালক শারমিন মোরশেদ বলেন, আমি এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে চাইব, এমনভাবে একটি নির্বাচন কমিশন তৈরি হোক যার ওপর আস্থা রাখা যাবে। দেশের রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে নিশ্চয় সরকার ওয়াকিবহাল। তারা চাইবে না আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেটা আরো ঘনীভূত হোক। সরকারি দলের পক্ষ থেকে সবার পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের যে আভাস দেওয়া হয়েছে তা ইতিবাচক হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নতুন কমিশনার নিয়োগ দিতে বিতর্কিত সার্চ কমিটির সদস্যরা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নামও চেয়েছেন। তবে অনেক দলই তাদের নাম দিতে অপারাগতা প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন আ’লীগ যে চলমান রাজনৈতিক সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান চায়না সেটি দলটির সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যেই ফুটে উঠেছে। একইসাথে তারা স্বরণ করে দিয়ে বলেন, দেশের প্রায় সব ক’টি রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এবার সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য ইসি গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সব রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য একটি কমিশন দেশবাসী দেখতে চায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার যদি সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন না হয় তাহলে আগামী নির্বাচন ঘিরে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট আরো বাড়বে।
সূত্র মতে, বিতর্কিত এবং সর্বজন সমালোচিত কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। গতবারের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি এবারো ‘সার্চ কমিটি’র মাধ্যমে সিইসি ও ইসি নিয়োগ দেবেন। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনে তার দলের পক্ষ থেকে ১৩ দফা প্রস্তাবনা দিলেও সেগুলো আমলে নেয়নি সরকার। সর্বশেষ এই প্রস্তাবনা নিয়ে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে যান খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। সেখানে খালেদা জিয়া তার প্রস্তাবনাগুলো রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরেন। প্রায় ঘন্টাকানেক সময় তারা বঙ্গভবনে অবস্থান করেন। বৈঠকের বিষয়ে বিএনপি ও রাষ্ট্রপতি উভয়েই ‘ইতিবাচক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলীয় বিবেচনাতেই সার্চ কমিটি গঠন করা হলো। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনা চলছে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মিজানুর রহমান শেলী বলেন, রাষ্ট্রপতি ইসি গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ করেছেন। সবাই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের দাবি জানিয়েছেন। যেহেতু সার্চ কমিটি নিয়ে নেগেটিভ বক্তব্য আসছে তাই সংকট নিরসনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের কোনো বিকল্প নেই। এটি সরকারকেই করতে হবে। অন্যথায় বিরোধী জোটের আন্দোলন ছাড়া কোন গতি থাকবেনা। 
সূত্রে জানা গেছে, সভা-সমাবেশ করতে না দেয়া, হামলা মামলা এবং গণগ্রেফতার সত্ত্বেও  ধৈর্য্য ধরে চুপ থেকেছেন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বাধীন জোট মনে করে, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনেই শুধু যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যতিরেখে এ সকল সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারে সেই উদ্দেশ্যে একটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দাবি আদায়ের আন্দোলনে নামার আগে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের পর নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা তুলে ধরবে বিএনপি। তাই সার্চ কমিটি’র নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও নির্বাচন কমিশন কতটুকু নিরপেক্ষ হয় তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচিতে পরিবর্তন নিয়ে আসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, আন্দোলনের সম-উপযোগী করে খুব শীর্ঘ্রই ঢাকা মহানগরীতে জোটগতভাবে কমিটি ঘোষণা করা হবে। তবে আগেকার মতো আন্দোলন এবার তারা করতে চান না। দাবি আদায়ে এবার স্বল্প সময়ের টার্গেটে কিছুটা ভিন্ন কৌশলে সেই আন্দোলন ঢাকাকে ঘিরেই গড়ে তোলা হবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সূত্র জানায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সাফ কথা, নির্বাচনকালীন যে সরকারেই হউক না কেন, সরকারের প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো নয়ই, এমনকি দলীয় কাউকে মানা হবে না। সরকার প্রধান নির্দলীয় হতে হবে। তাই জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সর্বশক্তিদিয়ে রাজপথে নামা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একদিকে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা বলছে, অন্য দিকে বলছে তাদের হাতে ক্ষমতায় যেতে দেয়া যাবে না। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তাহলে আওয়ামী লীগ কী চায়? আওয়ামী লীগ আসলে সেটাও বলছে না। তাহলে কি আওয়ামী লীগ আসলে জোর করেই ক্ষমতায় থেকে যেতে চায়। যদি তারা (আওয়ামী লীগ) আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে চায়, তখন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংলাপ আলোচনায় আপত্তি কেন?
আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, আমরা একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন চাই। সেই সঙ্গে নির্বাচন কালীন সরকারকেও নিরপেক্ষ হতে হবে। সরকার যদি এটি না করে তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করা হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বিএনপিকে নিয়ে যেসব কথা বার্তা বলছে সেটি তারা ভয়ে বলছে। কারণ তারা জানে, নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। তাই তারা যেনতেন ভাবে ক্ষমতায় থাকতে চায়। এবার দেশের জনগণ সেটি হতে দিবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ