ঢাকা, সোমবার 30 January 2017, ১৭ মাঘ ১৪২৩, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অস্বাভাবিক হারে কমেছে রেমিট্যান্স বেড়েছে মূল্যস্ফীতি

সংসদ রিপোর্টার : চলতি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের প্রান্তিক বাজেট বাস্তবায়নের চিত্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমেছে রেমিট্যান্স। গত অর্থ বছরের প্রান্তিক বাজেটের তুলনায় এবারের জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাদ্য-বর্হিভূত মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অপরদিকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে যার পরিমাণ ৭০ কোটি ১৫ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার।

গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও আয়-ব্যয়ের গতিধারা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত উত্থাপিত প্রতিবেদনে অর্থমন্ত্রী আবুল মালা আব্দুল মুহিত এ তথ্য জানান।

অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশে প্রবাস আয়ের প্রবাহ ছিল ৩ হাজার ২৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৩১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার যা দিয়ে ৮ দশমিক ৪ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে। 

অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, প্রথম প্রান্তিকে মোট ব্যয় হয়েছে ৪২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা যা বাজেটের ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে অনুন্নয়নসহ অন্যান্য ব্যয় ৩৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা যা বাজেটের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে গত অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় মোট ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, অনুন্নয়নসহ অন্যান্য ব্যয় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ব্যয় দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে ৭ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকার। বিগত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। 

এডিপি বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সর্ম্পক বিভাগ, দাতা গোষ্ঠী ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় বিভাগ সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও বৃহৎ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পরিবীক্ষণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেন। 

অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র হতে জিডিপি’র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ সূত্র হতে জিডিপি’র ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। 

চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপি’র ৪ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া জিডিপির শতাংশ হিসেবে সরকারি ঋণের স্থিতি ৩৫ শতাংশ যা অত্যন্ত সহনীয় বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। সার্বিকভাবে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় অবস্থান বেশ সন্তোষজনক বলেও বলেন অর্থমন্ত্রী। 

মুদ্রা ও ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খেলাপী ঋণের হার কমিয়ে আনার কারণে বাজার সুদের হারের এই নি¤œমুখী ধারা অব্যহত থাকবে বলে আমি মনে করি। 

২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে ব্যাপক মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা বেশি। এ সময় নীট বৈদেশিক সম্পদ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেলেও নীট অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার নীচে ছিল। মূলত সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে অব্যাহত উদ্বৃত্ত ও সরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ হ্রাসের কারণে এটি হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেন। 

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে বার্ষিক ভিত্তিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের (এমটু) প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম। মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির কাঙ্খিত হার অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ পরিমিত রাখার ক্ষেত্রে মূলত রিজার্ভ মুদ্রার যোগান নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেয়া হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধেও অব্যাহত থাকবে। রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত বছরভিত্তিতে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা হতে কোন ঋণ গ্রহণ করেনি বরং ৩ হাজার ৪৭ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে। তবে এ সময়ে সরকার জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প খাত হতে নীট ১০ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে যেখান হতে মোট ৮ হাজার ৭০১ কোটি টাকা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের দায় পরিশোধিত হয়েছে । ফলে ব্যাংক বহিঃর্ভূত উৎস হতে নীট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। 

ব্যক্তিখাতে অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতা উজ্জীবিত হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন। বিগত অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬.৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৫.৩ শতাংশ। অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৬.৫ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী। 

সুদের হার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, আমানত ও ঋণের সুদের হারের গড় ব্যবধান রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪ শতাংশের নিচে ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ৩ শতাংশের নীচে নেমে এসেছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হারও গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় কমে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান বিগত অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৪ দশকি ৮২ শতাংশ যা চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে ৪.৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত তারল্য বিদ্যমান থাকায় কলমানি রেট বিগত অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ৫.৭১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে যা ৩.৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে। 

জনজীবনে স্বস্তি বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে রেখেছি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, খাদ্য বিহ:র্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়লেও মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাওয়ায় সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বর ২০১৫ সময়ের ৬.২৫ শতাংশ হতে সেপ্টেম্বর ২০১৬ সময়ে ৪.৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। সন্তোষজনক কৃষি উৎপাদন, আর্ন্তজাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের স্থিতিশীল মূল্য, অনুকূল মুদ্রা সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সর্বোপরি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বিধায় সামনের দিনেও মূল্যস্ফীতি বাড়বে না বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। 

বৈদেশিক খাতে রফতানি পরিস্থিতি বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থবছরের একই সমেয়র তুলনায় ৪.১২ শতাংশ বেশি। আমদানি ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ১০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থবছরের এক্ই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি। 

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ ধরে অনেক সম্ভাবনাকে সামনে রেখে সূচনা হয়েছে ২০১৬-১৭ অর্থবছর। বছরের শুরু থেকেই সচল আছে অর্থনীতির চাকা সরকারের প্রাজ্ঞ ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীল রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির সকল খাত, আছে রাজনৈতিক সুস্থিতি। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সৃজিত হচ্ছে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ। বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রসার ধীরে ধীরে বাড়াচ্ছে জনগণের জ্ঞানের পরিধি ও দক্ষতা, বহির্বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ততায় প্রসারিত হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি জীবনবোধে আসছে ইতিবাচক পরিবর্তন। সব মিলিয়ে ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত, সুষম, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন রচনা করেছি তা বাস্তবায়নের এখনই অনুকূল সময়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ