ঢাকা, মঙ্গলবার 31 January 2017, ১৮ মাঘ ১৪২৩, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পুঁজি বাজারের আবারও কালো মেঘের ঘনঘটা

এইচ এম আকতার : পুঁজি বাজারের আকাশে আবারও কালো মেঘের ঘনঘটা। দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে বাজারে কিছুটা চাঙ্গাভাব দেখে উৎফুল্ল হয়েছিল বিনিয়োগকারিরা। কিন্তু তাদের সে আনন্দ স্থায়ী হলো না। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণার বিনিয়োগকারিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আর এ কারণেই গত দুই দিনে পুঁজিবাজারে সূচকে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। দু’দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক (ডিএসইএক্স) কমেছে ২০৬ পয়েন্ট, যা সাম্প্রতিক সময়ের বড় পতন। একইসঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ।

সম্প্রতি পুঁজিবাজারে কিছুটা গতিসঞ্চার হয়েছে। রোববার সে গতি বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। ‘পুঁজিবাজারে নজরদারি না বাড়লে অতীতের মতো আবারও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন’ বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবিরের এমন আশঙ্কায় সূচকের বড় পতন হয়েছে বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। পতনের ধারা গতকালও অব্যাহত ছিল।

রোববার মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় গবর্নর বলেন, ২০১০ সাল থেকে বিরাজমান মন্দাবস্থা থেকে পুঁজিবাজার বেরিয়ে আসছে। এ প্রক্রিয়াটি যাতে সুস্থ ধারায় থাকে সেজন্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি অতীব জরুরি। না হলে অতীতের মতো এবারও প্রলুব্ধ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ধসের ঘটনায় সে সময়ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নরকে দায়ী করেছিল সাধারণ বিনিয়োগকারিরা। তখন তারা গবর্নরের পদত্যাগ দাবি করে রাজপথে আন্দোলনও করেছিল। কিন্তু চাঙ্গা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ঘোষিত নীতি থেকে সরে আসেনি। ফলে বাজারে ধস নেমে আসে।

পুঁজি বাজার উত্থানেও বিনিয়োগকারিদের মনে এক ধরনের ভয় ছিল। তারা মনে করেছিল এটি আবার কোন নতুন কৌশল কিনা। বাজারে সূচক বাড়লেও অধিকাংশ শেয়ারের দাম কমেছে। এ ধরনের আচরণকে সাধারণ বিনিয়োগকারিরা পুঁজি বাজারের আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা হিসেবেই দেখছেন।

মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় পুঁজিবাজার নিয়ে গবর্নরের এ মন্তব্যের কারণেই বাজারে বড় দরপতন হয়েছে দাবি করে ডিএসইর পরিচালক ও সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, তিনি (গবর্নর) এখন যে ধরনের নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন তা এ মুহূর্তে কোনো দরকার নেই। নেতিবাচক কথা বললে বাজারে এর একটি প্রভাব পড়বেই।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, গত দু’দিন বাজারে যে পতন হয়েছে, তা স্বাভাবিক কারেকশন (মূল্য সংশোধন) নয়। এত বড় পতনের কারণ কী হতে পারে, তা আমার জানা নেই, তবে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে পারে। মুদ্রানীতির নেতিবাচক প্রভাবও বাজারে পড়তে পারে।

ডিএসইতে রোববার লেনদেনের শুরু থেকে বাজারে উত্থান-পতন থাকলেও ৪০ মিনিট পর টানা পড়তে থাকে সূচক। শেষ দিকে দুবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয় বাজার। গতকাল রোববার লেনদেন শেষে সূচকের পাশাপাশি কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারদর। আর টাকার অঙ্কে লেনদেনও আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমেছে। আলোচিত সময় পর্যন্ত ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজার নিয়ে সতর্ক করার পর দুই বাজারেই সূচক নামতে থাকে। আড়াইটায় লেনদেন শেষ হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে পতনের প্রবণতা।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেও (ডিএসই) গত দিনের মতো মূল্য সূচকের পতনে শেষ হয়েছে। এদিন ডিএসই প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ৭৯ পয়েন্ট। রোববার এ সূচক কমেছেল ১১৭ পয়েন্ট। কমেছিল লেনদেনের পরিমাণও।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোমবার ডিএসইতে ১ হাজার ৭৪ কোটি ৫১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা কম। ডিএসইতে ৩২৭টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৯টি বা ৭৬ দশমিক ১৫ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে। আর ৬৮টি বা ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ কোম্পানির দর বেড়েছে এবং ১০টি বা ৩ দশামক ০৬ শতাংশ কোম্পানির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

টাকার অঙ্কে ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে বারাকা পাওয়ারের শেয়ার। এদিন কোম্পানির ৪৮ কোটি ২২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আরএসআরএম স্টিলের ৩৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ৩৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক।

লেনদেনে এরপর রয়েছে- বেক্সিমকো, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, সাইফ পাওয়ারটেক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, শাশাঁ ডেনিমস, ন্যাশনাল ব্যাংক ও ইফাদ অটোস।

ঘোষিত মুদ্রানীতিতে প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধের জন্য ব্যক্তিখাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন না হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবির পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে বেশকিছু মন্তব্য করেন। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গবর্নরের বক্তব্যের কারণেই বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ এ হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘মুদ্র্রনীতি ঘোষণার সময় গবর্নর বাজারে নজরদারি বাড়ানোর যে কথা বলেছেন এতে প্যানিক সৃষ্টি হয়ে দরপতন ঘটেছে।

মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রসঙ্গে গবর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাংকগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, যাতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে তারা আইন নির্দেশিত মাত্রা মেনে চলে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিক থেকেও তাদের গ্রাহকদের নেয়া বিভিন্ন ঋণ সঠিক খাতে যথাযথ ব্যবহার হয় কি না, পাশাপাশি অস্বাভাবিক লাভের আশায় বিনিয়োগের যাতে অপব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হবে।

তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ইতোমধ্যে সতর্কতামূলক উপদেশ জারি ও বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়াতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। স্পন্সরদের শেয়ার ও অস্বাভাবিক উচ্চ প্রাইস আর্নিং রেশিওধারী শেয়ারগুলোর বিপরীতে মার্জিন ঋণ জোগানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপও এক্ষেত্রে বাঞ্ছনীয় হতে পারে।

 বিনিয়োগকারী বলেন, রোববার দুপুর ১২টার পর থেকেই যে ধস শুরু হয়, তার সঙ্গে শুধু ২০১০ সালের ধসেরই তুলনা চলে! লেনদেনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ ধস অব্যাহত ছিল। গতকালও একই অবস্থা অব্যাহত ছিল। পুরো সময়টিতে কি সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রক আইসিবি ঘুমিয়ে ছিল? এদিন এমনটি হতে পারে তাদের আগে থেকেই তাই প্রস্তুতি নেয়া জরুরি ছিল।

গবর্নরের বক্তব্য নিয়ে চলছে চুলচেড়া বিশ্লেষণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আসলে কি ধরনের নজরদারি করবেন সেটি দেখার বিষয়। আর এ কারণেই বিনিয়োগে সতর্ক সাধারণ বিনিয়োগকারিরা। এতে করে বাজারে পতন নেমে আসে। গবর্নর ইতিবাচক বক্তব্য দিলেই বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তা না হলে বাজার আর কত পয়েন্ট সূচক হারাবে তা কেউ বলতে পারছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ