ঢাকা, মঙ্গলবার 31 January 2017, ১৮ মাঘ ১৪২৩, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অভিমানের ছোঁয়া

সেলিনা ইসলাম : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
মিনহাজ সেদিন মাতবরের বউয়ের কাছে বাবা মা এবং মলিকে বাঁচানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানায়। আর মাতবরকে সে ছেড়ে দেবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে। কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে পারেনি এই মাতবরেরই বউয়ের অনুরোধে। স্বামীকে ক্ষমা করে দেবার জন্য সেদিন চাচী মিনহাজের কাছে হাত জোড় করেছিল। যে মানুষ বাবা মা প্রিয়তমা স্ত্রীকে হায়েনার লোভী দৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন জীবন দিয়েছিল! সেই হায়েনাকে মেরে ফেলে মানুষটাকে বিধবা করে শাস্তি দিতে চায়নি সে। তবে একেবারে সাঁজা না দিলে যে অনেক স্বার্থপরতা হয়ে যাবে। আর তাই সে একদিন মাতবরকে প্রচণ্ড মারধর করে পা ভেঙে পঙ্গু করে দেয়। যা সে কাউকেই বুঝতে দেয় না। একজন দেশদ্রোহী রাজাকারের জন্য বেঁচে থেকে প্রতিক্ষণ মৃত্যু যন্ত্রণার অনুভব পাওয়া-এর চেয়ে বড় সাজা আর কী হতে পারে? তারপর মিনহাজ গ্রাম ছেড়ে সবাইকে নিয়ে চলে আসে মফঃস্বল এই শহরে...।
মলি অনেক শখ করে এই বাড়িটা করেছে। মিনহাজ এই শহরেই সবচেয়ে বেশিদিন চাকরি করেছে। এবং এখানেই রিটায়ারমেন্ট নিয়েছে। চেনা বাগান, চেনা গাছপালা। চেনাজানা সব মানুষগুলোর কারণে এই শহরের উপর কেমন যেন একটা মায়া জড়িয়ে গেছে। কিন্তু গ্রাম...? বুক চিরে বের হয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস...।
ঠাণ্ডা চায়ে টোস্ট ডুবিয়ে কামড় বসায় মিনহাজ উদ্দিন। খক খক করে কেশে যায়! “আরে ছেমড়ি পানি দিয়ে যায়নি!” কাশতে কাশতে দম বন্ধ হবার জোগাড়। কুলসুম গ্লাসে করে পানি নিয়ে দৌড়ে এসে এগিয়ে দেয়। মিনহাজ পানি মুখে দিয়েই চিৎকার করে উঠে
-উ হু রে...উরে ঠাণ্ডা রে...। এই ছেমড়ি তোরে না কইছি গরম পানি মিশায়ে দিবি। ঠাণ্ডা পানিতে আমার দাঁত মাড়ি সিরসির করতিছে! ওহ্ রে...।
 বেহায়া মেয়েটা আবার হাসে!
- ‘হিঃ হিঃ হিঃ দাদা আপনার দাঁত তো মোডে চাইরহান আর তো সব ফাঁকা...হিঃ হিঃ হিঃ মেয়েটা মাঝে মাঝে এভাবেই দাদার সাথে মজা করে। মিনহাজের সব রাগকে ও হাল্কা করে নেয়। মেয়েটা মাঝে মাঝে অনেক আপনের মতো করে ওর যত্ন করে। ট্রে নিতে নিতে একটা লিস্ট আর টাকা এগিয়ে দেয়-
-দাদা খালাম্মা বলছে লিস্ট ধরে ধরে বাজার আনতে
-তোর খালু কই গেছে? ওরে বল বাজারে যেতে।
-খালুই তো টাকা দিয়ে কইল আপনারে দিতে! সে অফিসে চইল্যা গেছে।
কথাটা বলে টাকা লিস্ট আর ব্যাগ রেখে কুলসুম গটগট করে চলে যায়। মিনহাজ সোয়েটারের উপরে শাল আর মাথায় মাঙ্কি টুপিটা জড়িয়ে অনিচ্ছায় বাসা থেকে বের হয় বাইরে তখনও টপটপ করে বৃষ্টির মতো বড় বড় ফোঁটায় শিশির পড়ছে। গেইটের কাছে এসে লিস্টটা মেলে ধরে চোখের সামনে। তারপর মোড়ানো টাকাটা খুলে আঁৎকে উঠে- ‘আরে এই টাকায় এতো কিছু হবে নাকি? বাজারে জিনিসের যে চড়া দাম। এতে তো অর্ধেক সদাইও হবে না।’ নিজের পকেটে হাত দেয়। এইমাসে পেনশনের টাকা যা পেয়েছে? তার থেকে এক হাজার টাকা হাত খরচ রেখেছে। বাকী টাকা গরীবদের মাঝে শীতের কাপড় কিনতে সব পাঠিয়ে দিয়েছে গ্রামে। গরীব বলতে দূরের কেউ না। খালাতো মামাতো আত্মীয়-স্বজন। এই অভ্যাসটা মলির...। আর সেখান থেকে সঙ্গ দোষে ওর মাঝে ঢুকে গেছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখে হাত খরচের পুরো টাকাটাই পকেটে আছে। বের করবে করবে করে আর বের করে রাখা হয়নি! ‘এই টাকা বাজারে খরচ করলে সারা মাস সে যে একটু বিড়ি, আর মাঝে মাঝে ঘোষের দোকানে দৈ মিষ্টি খায়। এইটা কীভাবে চালাবে? আর ওষুধ...? আচ্ছা আফজাল না হয় ওষুধের টাকাটা দিলো কিন্তু ওর অন্য খরচের কী হবে? নাতিরাও মাঝে মাঝে দাদুর কাছে হাত পাতে! এখন কী করবে সে...?” ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না আসলেই সে কি করবে।
 আজকাল প্রায় মাসেই সে দেখছে, পেনশনের টাকা পাবার পরপরই? কোন না কোনভাবে ওর টাকা সংসারের কাজে খরচ হয়ে যায়। ছেলের কী কম আছ? মাঝে মাঝে ভাবে সত্যি কী আফজাল ওকে বাজার করতে বলে? ছেলেটা তো ওকে সরাসরিও বলতে পারে। এই উছিলায় না হয় একটু কথা বলা হবে। আহা ছেলেটার সাথে কতদিন একসাথে বসে খাওয়া হয় না! সে কী আবার বাড়ীর ভিতরে ঢুকে দীনার কাছ থেকে টাকা আনবে? না না এইটা ঠিক হবে না!
দ্বিধাদ্বন্দ্বে বাড়ির সামনেই অনেকটা সময় পার করে দেয়। বাজার বেশ দূরে। ঠাণ্ডা না হলে সে হেঁটেই যেত। তখনও ঘন কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। এমন সময় কুলসুম গেইট থেকে বের হয়ে তাকে দেখে প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠে-
-দাদা আফনে এহনতরি সদাই আনেন নাই? নাস্তা বানামু কহন?
মিনহাজ যেন লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চিন্তা করছিল আর ঝিমুচ্ছিল। চমকে উঠে বলে - এই ছেমড়ি আস্তে কতা ক! তোর খালু যে টাকা দিছে তাতে তো অর্ধেক সদাইও হবে না।
- না হইলে আফনে টাকা পুরাই আনবেন। আপনে না দুইদিন আগে পেনশনের টাকা পাইছেন?
অবাক হয় মিনহাজ কুলসুমের মুখে এমন কথা শুনে। ওর খুব রাগ হয়। রাগ হয় ছেলের উপর। রাগ হয় নিজের উপর। ঠাণ্ডাটা যেন ওর হাড়ের মজ্জাকে জমিয়ে দিচ্ছে। ঠকঠক করে কাঁপছে সে। মনে হচ্ছে পড়ে যাবে...। এমন সময় সামনে একটা রিকশা এসে টুং টুং করে বেল বাজায়। রিকশাচালক বলে-খালু যাইবেননি?
মিনহাজ কিছু না বলে রিকশায় উঠে বসে। বাতাসে সাঁতার কেটে রিকশা ছুটে চলে...। শীতটা যেন এখন আরও বেশী লাগে। মনে পড়ে যুদ্ধের সময়ে শত্রুদের ধ্বংস করতে প্রচণ্ড হিম ঠাণ্ডা পানিতে ডুব দিয়ে থেকেছে! আবার ছুটে গিয়ে বাজ পাখি হয়ে উড়াল দেবার মত করে সাঁতার কেটেছে। একসময় শত্রুর জাহাজ থেকে কিছুটা দূরে ঠাণ্ডা পানিতে দম বন্ধ করে ডুব দিয়ে দিয়ে জাহাজে এসে মাইন সেট করে রেখেছে। তখন কঠিন ঠাণ্ডাকেও ঠাণ্ডা মনে হত না। শত্রুকে শেষ করার লক্ষ্যে সমস্ত শরীরে ঠাণ্ডা যেন ভিড়তেই পারতো না। মনে পড়ে যেদিন সে মুক্তিসেনাদের নিয়ে প্রথম গ্রামে পা রেখেছিল? সেদিনও ছিল কনকনে ঠাণ্ডার দিন। সেদিন ওদেরকে দেখে গ্রামের সবাই উল্লাস আর চিৎকার করে বলেছিল’ জয় বাংলা...বাংলাদেশ জিন্দাবাদ! যুদ্ধ শেষ...আর যুদ্ধ হইব না! আমরা স্বাধীন।” চারিদিকে কেবলই আনন্দের জোয়ার বয়েছিল সেদিন। এক একজন মুক্তিসেনাকে এক মুহূর্ত জড়িয়ে ধরার জন্য মানুষের সেকি উল্লাস...! অথচ আজ স্বাধীন দেশে আপনজনের কাছেই অবহেলিত হতে হয়!  কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মিনহাজ গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেয়।
-‘চাচা কই যাইবেন!’
চালকের কথায় বাস্তবে ফিরে আসে মিনহাজ। সাঁ সাঁ করে রিকশা ছুটে চলে ‘মিয়া একটু আস্তে চালাও...। উফ একেবারে মাঘের শীত!’ হঠাৎ খেয়াল করে পায়ে মুজা পরে আসেনি! এই এক সমস্যা...আজকাল অনেক কিছুই সে ভুলে যায়! ‘এইটাও কী ডায়াবেটিকসের কারণে?’ ভাবনায় পড়ে যায় সে। কিছুদূর যেতেই দেখে রশিদ সাহেব রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ‘এই থামা থামা থামা!’ রিকসা থামিয়ে হাঁক ছাড়ে
-কি হে বন্ধু রিকশা লাগবে?
বহুদিন পর বন্ধুকে দেখে সহাস্যে বলে মিনহাজ। এই কিছুক্ষণ আগে যত অস্থিরতা আর শীতের কাঁপন ছিল? সব এক নিমিষেই কোথায় যেন উড়ে যায়। রিকশায় উঠতে উঠতে নকল দাঁত বের করে হেসে দেয় রশিদ সাহেব।
হেঃ হেঃ হেঃ তুমি কী বন্ধু এই ঠাণ্ডার মধ্যে লিফট দিতে বের হয়ছো? না কী অন্য কিছু?
মিনহাজ মুখ চেপে হেসে দেয়। দাঁতহীন মাড়ি দেখাতে সে লজ্জা পাচ্ছে। রশিদ সাহেবকে দেখলে তার কিছুটা হিংসে হয়। ওর ছেলে, ছেলে বউ ওর অনেক খেয়াল রাখে। অথচ সে সেই কবে থেকে আফজালকে বলছে দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে একটা নকল দাঁত সেট করে দিতে। কিন্তু ছেলেটা সময় করতে পারছে না। আজ তিন বছরেও সময় হল না! সময় হবে মরলে!? নিজে যাবে তাও যেতে দেবে না। ওর কোন বন্ধুর পরিচিত ডাক্তার আছে, গেলে ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে। ‘খেতা পুড়ি তোর ডিসকাউন্টের!’ কিন্তু মুখ না খুলে কথা বলবে কীভাবে সে? তাই যতটা সম্ভব ঠোঁট চেপে কথা বলে। বাজারে যাচ্ছে এইটা বলতে গিয়েও কী ভেবে যেন বলল না। মুচকি হেসে বললÑ
-তুমি গাড়ী চড়া মানুষ রিকশায় লিফট নিতে কী তোমার ভাল লাগবে?
-হাঃ হাঃ হাঃ যা বলেছ...গাড়ি যদি হাসপাতালে থাকে রিকশাই তখন ঘোড়ার কাজ দেয়। হাঃ হাঃ হাঃ
‘বিখ্যাত ঘোষের দই মিষ্টি’ দোকানের কাছে আসতেই রশিদ সাহেব চালককে থামায়। মিনহাজকে বলে
-আরে নেমে আসো। এখানে আজকে ভাপা পিঠা বানাবে।
-ভাপা পিঠা...! খুশিতে টলতে টলতে মিনহাজও নেমে আসে। ভাড়া মিটিয়ে দুই বন্ধু ঢুকে যায় হোটেলে। ভাপা পিঠা কত বছর হয়েছে সে খায় না। মলি এই পিঠাটা খুব মজা করে বানাতে পারতো। সে বলত ‘আপনি অনেক পছন্দ করেন বলেই না আমি এতো মজা করে বানানো শিখেছি!’ কথাটা ভেবে হাসি পায়। গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে মলির চেষ্টা থাকত যতটা সম্ভব শুদ্ধ করে ওর সামনে কথা বলা। অথচ মিনহাজের গ্রামের ভাষাই বেশি ভালো লাগত। ভাষার মাঝেও যে মাটির একটা ঘ্রাণ থাকে তা ওর মত করে মনে হয় না কেউ বুঝে! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে নতুন খেজুর গুঁড়ের ঘ্রাণে পেটের মাঝে গড়গড় করে শব্দ হয়। দুই বন্ধু বসে অনেক কথা বলে আড্ডা দেয়। পেট ভরে ভাপা পিঠা আর দমফ মিষ্টি খায়। মিনহাজ ভুলে যায় তার ডায়াবেটিকস কতটা মারাত্মক পর্যায়ে আছে! মিষ্টি খাওয়া মানে তার জন্য বিষ। খাওয়া শেষ করে রশিদ সাহেব অনেকক্ষণ ধরে পকেট হাতিয়েও মানিব্যাগটা খুঁজে পাচ্ছে না। মনে হয় বাসায় রয়ে গেছে। আর তাই সে মিনহাজকে উদ্দেশ্য করে হেসে হেসেই বলে- বন্ধু আজকে কিন্তু আমাকে তুমি খাওয়াচ্ছ। আরেকদিন আমি খাওয়াব তোমাকে, মনে রেখ।
খুশিতে মিনহাজও হেসে হেসে বলে- আরে বন্ধু ভেবো না...! যত খুশি খাও...পরে ঠিকই সুদ আসলে আদায় করে নেব! হাঃ হাঃ হাঃ
রশিদ সাহেব একটু খেয়াল করলে দেখতে পেত, মাঝে মাঝেই অজানা এক ভাবনায় মিনহাজের চোখ ভিজে ভিজে যাচ্ছে। ‘বিখ্যাত ঘোষের দই মিষ্টি’ দোকান থেকে আরও কিছু পিঠা আর দই নিয়ে বের হয়ে আসে মিনহাজ। ঘড়িতে দেখে একটা বাজে! সময় যে কীভাবে চলে গেছে সে টেরই পায়নি। রশিদ সাহেব চলে গেছে কিন্তু ওর বাসায় যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। “একটা জরুরি কাজ আছে!” এই কথা বলে বিদায় জানিয়েছে বন্ধুকে। লাঠিতে ভর দিয়ে দিয়ে পার্কের ভীতরে ঢোকে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কুয়াশা ঘেরা মেঘের ফাঁক গলে সূর্যটা ঝিমুনি নিয়ে উকি দিয়েছে। সবুজ ঘাসে জমে থাকা খানিকটা শিশির হাতে নিয়ে ঠোঁটে মাখে সে। একটা কষ্ট বুকের বাম দিকে চিনচিন করে ব্যথা বাড়ায়। হাজারো চিন্তা মাথার মাঝে ভনভন করছে। “আফজাল আজকাল ছুটির দিনেও অফিস করছে? ছেলেটা কী করে তা ওকে কখনো বলে না। জিজ্ঞাসা করলেও বিরক্ত হয়। কিন্তু কেন?” কথাগুলো ভেবে কষ্ট বাড়ে...।
পাশেই দেখে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা এই মধ্য দুপুরেও পুরনো টায়ার আর কাগজ জ্বেলে আগুণ ধরিয়ে গোল হয়ে বসে আছে। আগুনের চেয়ে ধোঁয়া হচ্ছে বেশী। চোখ জ্বালা করছে। তবুও কী যেন ভেবে সেও গিয়ে ওদের পাশে মাটিতে বসে পড়ে। আগুণের ওম নেয়...! বাচ্চাগুলো খিলখিল করে হেসে যায়। কেউ কেউ বারবার ওর কাছে থাকা পিঠা দৈ-এর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেটে নেয়। মিনহাজ ব্যাগটা খুলে দুইটা পিঠা ওদেরকে দেয়। ওরা সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। “কী আশ্চর্য! সবাই ভাগা ভাগি করে পিঠাগুলো হাতে নেয়! ওদের মাঝে কত মিল মহব্বত!” কোথা থেকে যেন হিম ঠা-া একটা বাতাস এসে ওকে জড়িয়ে ধরে। ভীষণ শীত লাগে...! বাথরুমের বেগ আসে। অনেক কষ্টে রাস্তায় এসে একটা রিকশা নেয়।
“সারাদিন ঘরের ভীতরেই তো থাকে। মাসে একটা দিন একটু বাজারে পাঠাই তাতেও কত ঢং করে! গিয়ে দেখ, এই বুড়ো বয়সে কোথায় বসে আড্ডা মারছে।” দরজার কাছে এসে দীনার উঁচু স্বরের কথা শোনা যায়। মিনহাজ বাসায় ঢুকতেই দেখে দীনা কুসুমের সাথে কথা বলছে। ওকে দেখে থেমে যায়। বাইরে থেকে কথাগুলো সে শুনতে পেয়েছে। বুকের মাঝে তোলপাড় করে চেনা ব্যথারা। কুলসুম ওকে দেখে এগিয়ে এসে হাত বাড়ায়। মিনহাজ ব্যাগে আনা পিঠা আর দৈ ওর হাতে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে। পিছনে দীনা চিৎকার করে বলে উঠে-
-এইসব রাস্তার জিনিষ কেউ খায় নাকি...? ফেলে দে! এই দে আমাকে, আমি নিজেই ফেলে দিচ্ছি। এইসব খাবে আর বাথরুম নষ্ট করবে। যত্তসব...!” জানালা দিয়ে কিছু ফেলে দেবার শব্দ কানে এলো। মিনহাজ ভীষণ ঘামছে তবুও শীত লাগছে। বাথরুম সেরে উঠে দাঁড়াতেই চারিদিকে অন্ধকার করে ঠা-া একটা কাঁপন ঝাঁকুনি দিয়ে ওকে ফেলে দিতে চায়। ডায়াবেটিকসটা যে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে তা বুঝতে বাকি থাকে না। দরোজা খুলে বের হয় কিন্তু মনে হয় সব কিছুই করছে বাতাসে ভেসে ভেসে!
-“দাদা বাজার সদাই কই? কিছুই তো আনেন নাই! খালাম্মা রাগ করছে অনেক। শেষমেশ পিজা হুম ডিলিভারি অর্ডার দিয়া আনছে! ও দাদা বাজার না হইলে দুপুরে রান্দুম কী? খাইবেন কী?” মিনহাজ কিছুই বলে না। দীনা কীসব যেন বলছে তাও ঠিকমত শুনতে পায়না। রাগে গজগজ করছে মেয়েটা। মিনহাজ সোজা নিজের ঘরে ঢুকে জানালায় চোখ রাখে। দেখে পাশের বস্তির কয়েকটা বাচ্চা কী অসীম তৃপ্তি নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা ভাপা পিঠা দই চেটেপুটে খেয়ে যাচ্ছে। কৃতজ্ঞতায় বারবার এই বাড়ীর দিকে তাকাচ্ছে! একদম ভীতর থেকে একটা কষ্ট উগরে বের হতে চায়। কিন্তু বের হতে না পেরে বুকে জ্বালা ধরায়। পায়ে পায়ে বাড়ি লাগে...। মিনহাজ আর কোনভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
-“উহ্হ আহ্...উহ্হ” করতে করতে লেপ গায়ে জড়ায়। বুঝতে পারছে আজকের অভিমানটা অনেক বেশিই হয়ে গেছে। “মলি...ও মলি? আমার অনেক শীত করছে...। জানালা দরজা সব বন্ধ করে দাও! উফ্...মলি শুনতে পাওনা!” কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চোখ বুজে আসে। তবুও থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে জলে ভরা ঘোলা চোখ মেলে তাকায় দেয়ালে ঝুলানো প্রিয়তমার ছবিটার দিকে। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ