ঢাকা, শুক্রবার 3 February 2017, ২১ মাঘ ১৪২৩, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ ও বেচাকেনা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : গ্রন্থস্বত্ব অর্থ যে কোন বিষয় সম্পর্কিত আক্ষরিক লিখিত রচনার মালিকানা। যে মালিকানা উক্ত গ্রন্থ প্রকাশের অধিকার প্রদান করে। অতএব গ্রন্থস্বত্ব বলতে কোন বই বা রচনাকর্ম প্রকাশ করার অধিকার। হস্তলিপি আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই মানুষ লিখে আসছে। মনের ভাব প্রকাশের দুটি প্রধান মাধ্যম রয়েছে বলা ও লেখা। কোন বক্তব্য ও বিষয় দীর্ঘদিন ধরে রাখার উৎকৃষ্ট উপকরণ হল লেখা। ভুলে গেলে ও কোন লেখা দেখে বিষয়টি মনে করা সম্ভব। তাই সর্বকালেই লেখার গুরুত্ব ছিল। কাগজ উদ্ভাবনের আগপর্যন্ত মানুষ গাছের ডাল, পাতা, হাড্ডি, পাথর ইত্যাদি বস্তুতে লিখত। একটি সময় কাগজ আবিষ্কার হলে ও ছাপাখানা ছিল না। হাত দ্বারাই লেখার প্রয়োজন মিটানো হতো। সাধারণ পুস্তকের চেয়ে ধর্মীয় পুস্তক লেখার গুরুত্ব ছিল বেশি। তবে মুদ্রণযন্ত্র ও ছাপখানা আবিষ্কারের পর বই পুস্তক ছাপানোর ক্ষেত্রে নতুন দিক উন্মোচিত হয়। বিশেষত আজকের আধুনিক যুগে বিশ্বের প্রতিটি দেশে কোটি কোটি বই, পত্র পত্রিকা ম্যাগাজিন ছাপা হচ্ছে। বরং প্রকাশনা একটি শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পূর্বকালে বাণিজ্যিকভাবে বই পুস্তক প্রকাশ ও বাজারজাতের তেমন কোন ধারণা ছিল না। লেখক বই কিতাব লেখার পর অন্য লোক দ্বারা কপি করা হতো। তারাও হাতেই কপি করত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বই পুস্তক ও কিতাবাদি প্রণয়নে মুসলমানদের বিষ্ময়কর অবদান রয়েছে। তাঁরা হাত দ্বারাই কিতাব লিখেছেন। এসব মনীষী নিজেদের গ্রন্থের কোনো স্বত্ব রাখতেন, নাকি রাখতেন না, এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ইতিহাস জানা যায় না। তাদের পাহাড়সমূহ নিষ্ঠা ও বই পুস্তকের বাণিজ্যিকীকরণ না থাকাও এর অন্যতম কারণ। কিন্তু বর্তমান যুগে গ্রন্থের স্বত্ব সংরক্ষণ করার যে ধারা শুরু হয়েছে তা শরীয়তের আলোকে কতটুকু বৈধ? উপরন্ত, গ্রন্থস্বত্ব কোনো প্রকাশনীর বা ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার বিধান কী? গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ ও বেচাকেনার ব্যাপক প্রচলন শুরু হওয়ার পর ফকীহ ও মুজতাহিদগণ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। শরীয়তের মূলনীতির আলোকে সমাধান দেওয়ার চেষ্টাও করেন।
গ্রন্থস্বত্ব ও তা প্রচলনের ইতিহাস ঃ শাব্দিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রন্থস্বত্বের কয়েকটি প্রতিশব্দ রয়েছে, যেমন লেখকস্বত্ব, মেধাস্বত্ব, কপিরাইট ইত্যাদি। ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো দ্বারা কোন মৌলিক রচনা অনুলিপি তৈরির অধিকারকে উদ্দেশ্য করা হয়। অতএব, গ্রন্থস্বত্ব বা  কপিরাইট বলতে কোন কাজের উপর তার মূল রচয়িতার একক, অনন্য অধিকারকে বোঝানো হয়। কপিরাইটের চিহ্ন হলো । বিরাটাকার পরিব্যাপ্তিতে ছাপানোর প্রসার হওয়ার আগ পর্যন্ত কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব উদ্ভাবিত হয়নি। সতের শতকের শুরুর দিকে ছাপাখানাগুলোর একচেটিয়া আচরণের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে ব্রিটেনে এরকম একটা আইনের ধারণা জন্ম নেয়। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় চার্লস বইগুলো অনৈতিক  অনুলিপি তৈরির ব্যাপারে সচেতন হয়ে রাজকীয় বিশেষাধিকার প্রয়োগ করে লাইসেন্স বিধিমালা ১৬২২ জারি করেন; এর ফলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত/ অনুমোদিত বইগুলোর একটি নিবন্ধন তালিকা প্রণয়ন করে এক একটি অনুলিপি সমস্ত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে জমা রাখতে হয়। দ্যা ষ্টাচু অব অ্যান ছিল মেধাস্বত্ব সংরক্ষিত প্রথম রচনাকর্ম যা এর লেখককে নির্দিষ্ট সময়ের মেধাস্বত্ব প্রদান করে এবং সেই নির্দিষ্ট মেয়াদের পর মেধাস্বত্ব সমাপ্ত হয়ে যায়। তবে প্রথম কপিরাইট আইন প্রণীত হয় ১৭০৯ সালে ইংল্যান্ডে। ১৯১৪ সালের এক সংশোধনীর মাধ্যমে এ উপমহাদেশকে কপিরাইট আইনের আওতাভুক্ত করা হয়। দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার ১৯১৪ সালের কপিরাইট আইন বাতিল করে ১৯৬২ সালে কপিরাইট অধ্যাদেশ নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করে করাচিতে কেন্দ্রিয় কপিরাইট অফিস প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে ঢাকায় একটি আঞ্চলিক কপিরাইট অফিস স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদে  অনুমোদিত আইনের মাধ্যমে ১৯৬২ সালের অধ্যাদেশের কিছু ধারা সংশোধন করে আঞ্চলিক অফিসকে জাতীয় পর্যায়ের দপ্তরে মর্যাদা প্রদান করে। সে সময় এ অফিসটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাথে কপিরাইট অফিসকে সংযুক্ত করা হয়। বর্তমানে কপিরাইট অফিস জাতীয় পর্যায়ের একটি আধা বিচার বিভাগীয়  প্রতিষ্ঠান। উল্লেখ্য ২০০০ সালে কপিরাইট আইন জারীর পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তানী আমলের (১৯৬২ সালের) সংশোধিত অধ্যাদেশ ও ১৯৬৭ সালের কপিরাইট রুলস এর আওতায় কাজ করেছে কপিরাইট অফিস, ঢাকা। সর্বশেষ ২০০৫ সালে ২০০০ সালের কপিরাইট আইনটি সংশোধন করা হয়। ১
গ্রন্থস্বত্ব সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় ঃ আরেকটি বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য, গ্রন্থস্বত্বের সংশ্লিষ্ট আরো কয়েকটি বিষয় রয়েছে। সেগুলোর বিধান ও অনুরূপ। সবগুলো একই পর্যায়ের বিষয় এবং একই মূলনীতির অধীন। একটির বৈধতা-অবৈধতার ওপর সবগুলোর বৈধতা-অবৈধতা নির্ভর করে। যেমন: আবিষ্কার সর্ম্পকিত অধিকার। এটি একটি ব্যাপক শব্দ। এর অধীনে অনেক কিছুই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বইপুস্তক লেখা ও অনুবাদ করা ও আবিষ্কার, কোনো যন্ত্রপাতি বানানো, ক্যালিগ্রাফি বা ডিজাইন নকশা এসব ও আবিষ্কার। এমনকি কোনো গান ও সাহিত্যেও আবিষ্কার। প্রশ্ন  হচ্ছে এসবের উদ্ভাবনকারী এগুলোর স্বত্ব সংরক্ষন ও বেচাকেনা করতে পারবেন কিনা।
ব্যবসায়িক সুনাম বা ট্রেডমার্ক বেচাকেনা করা। ব্যবসায় বাণিজ্যের উৎকর্ষের এ যুগে ব্যবসায়িক সুনাম এবং কোম্পানির বিশেষ চিহ্ন ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি পণ্যই বিভিন্ন কোম্পানি বাজারজাত করে। সব কোম্পানির পণ্য একমানের হয় না। ভোক্তাদের বিশেষ কোম্পানির প্রতি ঝোঁক ও আকর্ষন থাকে। তারা ওই কোম্পানির পণ্যই কিনতে চায়। তারা জানে এ কোম্পানির সব পণ্যই উৎকৃষ্ট হয়ে থাকে। এ কোম্পানি নিজের ব্যবসায়িক সুনাম, ট্রেডমার্ক কিংবা লোগো বিক্রি করে দিতে পারবে কিনা। ব্যবসায়িক ট্রেডমার্কের মতোই লাইসেন্স বিক্রি করা হচ্ছে। পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রেই অনুমোদিত লাইসেন্সধারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কাউকে এক্সপোর্ট ইমপোর্ট করার অনুমতি দেয় না। প্রশ্ন হল ব্যবসায়ের এ লাইসেন্স বিক্রি করা জায়েয কিনা? আধুনিক এ বিষয়গুলোর মতোই প্রাচীন আরও কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন: চলাচলের স্বত্ব, ছাদের উপরিভাগের স্বত্ব, পানি চলাচলের স্বত্ব, পানি পানের স্বত্ব। এধরনের আরও স্বত্বের বিষয় ফিকহের গ্রন্থমূহে আলোচিত হয়েছে। সবগুলোকে ফিকহের পরিভাষায় নিরেট স্বত্ব বলে অভিহিত করা হয়েছে।
একদল আলিমের মতে, গ্রন্থস্বত্ব একটি বৈধ বিষয়। অন্যান্য বস্তুর মতোই এটিও ব্যক্তির মালিকানায় থাকতে পারে। লেখক স্বীয় গ্রন্থের মালিক, স্বত্বাধিকারী। নিজের বৈধ মালিকানাধীন বৈধ জিনিসপত্র যেমন বিক্রি করা জায়িয, তদ্রƒপ গ্রন্থস্বত্ব বিক্রি করাও বৈধ। নাজায়েয, হারাম বা নিদেনপক্ষে মাকরূহও নয়। যারা এ মত পোষণ করেন তাদের মধ্যে রয়েছেন: মুস্তাফা আয-যারকা, ওয়াহাবা আল-যুহাইলী, ফাতেহী আদ-দুরাইনী, মুহাম্মদ সাঈদ রমযান আলÑবুতী, মুহাম্মদ উসমান শুবাইর, আলী আলÑকুররাহ দাগী, আজীল আন-নাশমী, মুহাম্মদ রাওয়াশ কুলআহ, মুফতী তাকী উসামানী প্রমুখ। “মুহাম্মদ আলী আলÑযাগলূল ও হামদ ফাখরী অযযাম, “আল-হুকূক আলÑমালিয়্যাহ লিল মুআল্লিফ: দিরাসাহ ফিকহিয়্যাহ মুকারানা”, আল-মাজাল্লা আল-উরদুনিয়্যাহ ফীদ দিরাসাতিল ইসলামিয়্যাহ, সংখ্যা ১, ২০০৫ খ্রি.”
তারা তাদের মতের পক্ষে বিভিন্ন প্রমাণ উপস্থাপন করেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণসমূহ নিম্নরূপ:
কুরআন শিক্ষা দেয়ার বিপরীতে পারিশ্রমিক নেওয়ার বৈধতার সঙ্গে কিয়াস করলে প্রমাণিত হয়, যে কোন জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষাদান বা প্রসারের নিমিত্তে রচিত গ্রন্থ থেকে আর্থিক উপকারিতা গ্রহণ বৈধ। তাঁর কুরআন শিক্ষা দানের পারিশ্রমিক গ্রহণের বৈধ হওয়ার প্রমাণস্বরূপ হাদীসটি উল্লেখ করেন: “তোমরা যা কিছুর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নাও তার মধ্যে আল্লাহর কিতাব অগ্রগণ্য। “আল-বুখারী, সহীহ বুখারী, কিতাবুত তিব, হাদীস ৫৭৩৯”। একজন কারিগর যেমন তার মেধা ও শ্রম দিয়ে কোন শিল্প বিনির্মাণ করলে তার বিনিময় গ্রহণ করেন, একজন  গ্রন্থকারও তদ্রƒপ নিজ মেধা-মনন দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করলে বিনিময় গ্রহণ তার জন্য বৈধ হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে গ্রন্থস্বত্ব একটি উরফে পরিণত হয়েছে। উরফে শরীয়াহ বিরোধী কোন অনুষঙ্গ না থাকলে তা বৈধ।
লেখক তার লিখনীর ব্যাপারে দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। বইয়ে অন্তর্ভুক্ত যে কোন ধরনের ভুল তথ্যের ব্যাপারে তিনি দায়ী থাকেন। আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক ছোট ও বড় বিষয় লিপিবদ্ধ রয়েছে।” “আল কুরআন, ৫৪:৫৩”। এটিই স্বাভাবিক নিয়ম যে, কোন লেনদেনের ঝুঁকি বহনকারী এ থেকে আগত লভ্যাংশের অধিকারী হন। এটি মূলত একটি ফিকহী কায়দা (সূত্রে) থেকে নি:সরিত বিধান। কায়েদাটি হলো, “ঝুকির ভিত্তি লাভ বণ্টিত হবে।” দ্র. ইবন. ইবন নুজাইম, আলÑবাশবাহ ওয়ান নাজাঈর (দামিশক: দারুল সংক্ষাণ ১৪২০.পৃ.১৭৫?
পূর্বসূরী অনেক আমিল তাঁদের রচিত অনেক গ্রন্থ বিক্রয় করেন। গ্রন্থ প্রণয়নে তাঁদের যে কালি, কাগজ রয়েছেন তার চেয়ে অত্যন্ত চড়া মূল্যে সেসব গ্রন্থ বিক্রি হয়েছে। যেমন আবূ নু‘আইম তাঁর “হিলয়াতুল আওলিয়া” গ্রন্থটি চারশত দিনারে বিক্রি করেন; ইমাম ইবন হাজার আলÑআসকালানী তাঁর একটি গ্রন্থ বিক্রি করেন তিনশত দিনারে। তাদের এ কার্যক্রম সমসাময়িক কোন আলিম বিরোধিতা করেছিলেন বলে জানা যায়নি। যা থেকে প্রমাণিত হয়, পূর্বসূরীরাও গ্রন্থস্বত্বের বিষয়টি স্বীকৃতি দিতেন। আবূ যায়েদ বকর ইবন আব্দুল্লাহ, ফিকহুন নাওয়াযিল (বৈরূত: মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ১৯৯৬ খ্রি), খ.২, পৃ. ১৪৩
উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, গ্রন্থস্বত্ব একটি বৈধ অধিকার ও সম্পদ। গ্রন্থকার, সলক বা অনুবাদক গ্রন্থের স্বত্ব সংরক্ষণ করতে পারেন। ইচ্ছে করলে বিক্রি করতে পারেন। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ এ গ্রন্থ প্রকাশ ও বাজারজাতকরণের অধিকার রাখে না। এমনটি করা নাজায়েয ও হারাম হবে। অধিকন্ত, তা চুরি ছিনতাই ও খেয়ানত বলে বিবেচিত হবে। কারণ, রাসূলে কারীম স. ইরশাদ করেন: কোনো মুসলমানের সম্পত্তি তার পূর্ণ সম্মতিÑসন্তুষ্টি ছাড়া নেওয়া হালাল হবে না। বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, হাদীস ১১৮৭৭”। নিম্নের হাদীস থেকেও গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ ও বেচাকেনা বৈধ হওয়ার দলীল গ্রহণ করা যায়: যে ব্যক্তি প্রথমে কোনো বস্তুর দিকে অগ্রসর হল, যার দিকে কোনো মুসলিম অগ্রসর হয়নি, তাহলে এটা তার। “আবূ দাউদ, আস-সুনান, হাদীস: ৩০৭৩, অধ্যায়:; বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, হাদীস: ১২১২২”।
অনাবাদি ভূমি দখল ও চাষাবাদ করলে মালিকানা ও স্বত্ব অর্জিত হওয়ার বিষয়টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সকল ফকীহ এ বিষয়ে একমত। এর ওপর কিয়াস অনুমান করে গ্রন্থস্বত্ব এবং আবিষ্কারস্বত্বের বিষয় বিধান জানা সম্ভব। আমরা সংক্ষিপ্ততার প্রতি লক্ষ্য রেখে মাত্র একজন ফকীহের ভাষ্য উল্লেখ করছি। বিশিষ্ট হাম্বলী ফকীহ ইবনে কুদামাহ রহ. লিখেন:
যে ব্যক্তি অনাবাদি ভূমিতে চিহ্ন দিল এবং চাষাবাদ শুরু করল কিন্তু শেষ হয়নি; তবুও সে এ ভূমির মালিকানা অর্জনে অন্যের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে। কেননা রাসূলে কারীম স. ইরশাদ করেন: “যে ব্যক্তি প্রথমে কোনো বস্তুর দিকে অগ্রসর হল, যার দিকে কোনো মুসলমান অগ্রসর হয়নি, সে এর স্বত্বলাভে অগ্রাধিকার পাবে।” [ইমাম আবু দাউদ রহ. হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।] এখন এ ব্যক্তি অন্য কাউকে এ ভূমি দিয়ে দিলে সেও অগ্রাধিকার পাবে। কারণ, স্বত্বাধিকারী নিজের ওপর তাকে প্রাধান্য দিয়েছে। স্বত্বলাভকারী মৃত্যুবরণ করলে তার ওয়ারিশগণ মালিক হবে। এ ক্ষেত্রে রাসূল কারীম সা. বলেন: “কেউ কোনো স্বত্ব বা সম্পদ রেখে মারা গেল তার ওয়ারিশগণ পাবে। আর যদি এ ব্যক্তি ওই স্বত্ব বিক্রি করে দেয়, তাহলে তার বিক্রয় জায়েয হবে না। কারণ, সে এটার মালিক হয়নি। তাই তার বিক্রিও বিশুদ্ধ হবে না। যেমন শুফ‘আর অধিকার বিক্রি করা নাজায়েয। তবে আরেকটি মতানুযায়ী তার এ বিক্রয় বিশুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, সে এ ভূমির মালিকানা লাভে অন্যের চেয়ে বেশি হকদার। “মুওয়াফাকুদ্দীন ইবনে কুদামাহ, আল-কাফী ফী ফিকহিল ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৪ খ্রি.), খ.২, পৃ. ২৪৩”। সুতরাং প্রতিভাত হল, গ্রন্থের লেখক বা অনুবাদক যেহেতু সকলের আগে কাজটি সম্পন্ন করেছে, তাই সে এর স্বত্বের মালিক। এ স্বত্ব নিজে সংরক্ষণ করতে পারবে, বিক্রি করাও বৈধ।
গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ বা বেচাকেনা সম্পর্কে নেতিবাচক অভিমত ঃ অন্য একদল আলিমের মত, গ্রন্থস্বত্ব রাখা অবৈধ। লেখক, সস্কলক বা অনুবাদকÑ কেউই গ্রন্থের স্বত্ব রাখতে পারবে না। বইটি দ্বারা সকলেই সমভাবে উপকৃত হতে পারবে, যে কেউ ছাপিয়ে বাজারজাতও করতে পারে। যেহেতু গ্রন্থস্বত্ব রাখা অবৈধ, তাই গ্রন্থস্বত্ব বিক্রি করাও বৈধ নয়। এ দলের মধ্যে রয়েছেন, মুফতী মুহাম্মত শফী, আহমদ হাজ্জী আল-কুরদী, তাকী উদ্দীন নাবাহানী প্রমুখ। “হুবাইলী, আল-হুকুক আল-মুজাররাদা, পৃ.১৫১”। তাঁরা তাঁদের মতের পক্ষে যেসব প্রমাণ উপস্থাপন করেন তার মধ্যে রয়েছে: গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত হলে ইলম প্রকাশে ও বিতরণে বাধা দেওয়া বলে গণ্য হবে এবং তা ইলম গোপন করার শামিল। ইলম গোপন করা বৈধ নয়। শরীয়তের ইলম গোপন করার ব্যাপারে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে। মহানবী স. বলেন: কেউ কোন ইলমের বিষয় জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর তা গোপন করলে কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরিধান করানো হবে। “তিরমিযী, কিতাবুল ইলম, বাবু মা জায়া ফী কিতমানিল ইলম, হাদীস নং-২৬৪৯”। অতএব, গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ করা নাজায়েয এবং বিক্রিয় বিধানও অনুরূপ।
কোনো গ্রন্থ ক্রয়কারী সবধরনের উপকার হাসিলের অধিকার পায়। সে নিজের টাকা দিয়ে বইটি কিনে এনেছে। বইটিতে তার অধিকার অর্জিত হয়েছে। কাউকে হাদিয়াও দিতে পারে, বিক্রিও করতে পারে। তদ্রƒপ বইটি ছাপিয়ে বাজারজাতও করতে পারবে। তাঁরা বলেন, গ্রন্থস্বত্ব একটি নিরেট স্বত্ব; কোনো দৃশ্যমান বস্তু নয়। মাল হওয়ার জন্যে দৃশ্যমান বস্তু হওয়া আবশ্যক। “আবূ যায়েদ, ফিকহুন নাওয়াযিল, খ.২, পৃ.৯৭”।
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত ঃ উপরে বর্ণিত উভয় পক্ষের মতামত ও দলীল-প্রমাণ আলোচনার পর আমরা মনে করি যে, প্রথম পক্ষের মতই অধিক যুক্তিযুক্ত ও তাদের উপস্থাপিত দলীল-প্রমাণ অধিকতর শক্তিশালী। কেননা, বিভিন্ন প্রকার সম্পদের মধ্যে মেধাসম্পদও এক ধরনের সম্পদ। একজন সৃজনশীল ব্যক্তি তার মেধা ব্যবহার করে এ সম্পদ অর্জন করেন। এতএব, এর মালিকানা পাওয়ার অধিকার তারই। এছাড়া যারা গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ ও বেচাকেনা অবৈধ মনে করেন তাদের উপস্থাপিত যুক্তি-প্রমাণ দুর্বল। আমরা উপরে উল্লেখিত তাদের দলিলের প্রতি উত্তরে বলতে পারি:
গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত রাখলে ইলম গোপন করা হয় না। গ্রন্থকার নিজে তার গ্রন্থ প্রকাশ করছে অথবা কোনো প্রকাশনীকে প্রকাশ করার অনুমতি দিয়েছে। গ্রন্থস্বত্বের প্রশ্ন তো গ্রন্থ প্রকাশ করার সময়েই আসে। তাই ইলম গোপন করার অভিযোগ অযৌক্তিক। দুয়েক জনের কাছে ইলম পৌঁছে দিলেও দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কয়েকশ ছাত্র ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিলে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের ধারণক্ষমতা ও সক্ষমতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাত্রকে ভর্তির সুযোগ প্রদান করে। সবাইকে ভর্তি করে না। এখন কি এ কথা বলা যাবে যে, তারা ইলমকে গোপন রাখার লিপ্ত হল? কারণ, তারা সবাইকে ইলম শিক্ষা দেয়নি! তদ্রƒপ এখানেও এ কথা বলা অবান্তর ও অযৌক্তিক।
এটি একটি যুক্তি মাত্র। যুক্তিটি অন্যায্য। বই কেনার দ্বারা সবরকমের অধিকার হাসিল হয় না। বাজার থেকে একটি কিনে এনে নিজের নামে ছাপিয়ে প্রকাশ করা কি জায়েয হবে? অন্যের বই নিজের নামে চালিয়ে দেওয়াও কি বৈধ? খেয়ানত হবে না? তাই যদি হয়, তাহলে বলুন, আমরা আমাদের টাকার মালিক। এখন এ টাকার মতো অনুরূপ টাকা ছাপিয়ে বাজারজাত করা কি বৈধ হবে? কখনোই বৈধ হতে পারে না। ঠিক তেমনি, বাজার থেকে একটি ব্রান্ড বা বিখ্যাত কোম্পানির লোগো নকল করে ওই পণ্য বানিয়ে বাজারজাত করতে পারবেন?: বিষয়টি সম্পূর্ণ নাজায়েয। তদ্রƒপ গ্রন্থ কিনে আনলেও তা ছাপিয়ে প্রকাশ করতে পারবে না, হারাম ও অবৈধ কারণ, গ্রন্থটি স্বত্ব আরেকজনের। স্বত্বাধিকারীর অনুমতি ব্যতীত তার স্বত্বে হস্তক্ষেপ করা অন্যায় ও খেয়ানত বলে বিবেচিত হবে। আমরা শক্তিশালী দলিল-প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত করেছি যে, মাল হওয়ার জন্য দৃশ্যমান বস্তু হওয়া আবশ্যক নয়। তাই তাঁদের এ বক্তব্যও একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
গ্রন্থস্বত্ব অন্যান্য সম্পদের মতো একটি সম্পদ। প্রত্যেক মালিক নিজের সম্পদ সংরক্ষণের অধিকার রাখে এবং ইচ্ছা হলে তা বিক্রিও করতে পারে। গ্রন্থস্বত্ব এবং অন্য নিরেট স্বত্বসমূহও মাল বলে বিবেচিত হয়। তাই গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষণ করা বৈধ এবং এর বেচাকেনাও জায়িয। অনুমতি ছাড়া করো হস্তক্ষেপ করা অন্যায় ও চুরি। সুতরাং কোনো লেখকের স্পষ্ট অনুমতি ব্যতীত তার কোনো বই ছাপানো অথবা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া নাজায়েয। হ্যাঁ, লেখক যদি পরিষ্কার বলে দেয় যে, আমরা অমুক বই অথবা আমার সকল বই যে কেউ ছাপিয়ে প্রকাশ করতে পারে, তখন তা বৈধ হবে। লেখক অথবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো বই প্রকাশ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ বিষয়ে অনেকেই খেয়ানতের শিকার হচ্ছে। সর্বপ্রকার খেয়ানত থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ