ঢাকা, শুক্রবার 3 February 2017, ২১ মাঘ ১৪২৩, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জনকের পত্র

মাখরাজ খান : নতুন ডাক পিয়ন এলে এই অবস্থা হয়। চিঠিপত্র সহজে হাতে পৌঁছে নাÑ কোনো কোনো সময় দু’চার বাড়ি ঘুরেও আসে। কেউ কেউ চিঠি ছিঁড়ে পড়ে, তারপর দিয়ে যায়। এবার যে পিয়নটি চিঠি নিয়ে এসেছে সেও নতুন, তাই তার কিন্তু কিন্তু ভাব দেখুন তো চিঠিটা আপনাদের কারো কিনা?
বাবা-মা’কে ছেড়ে গেছে বাইশ বছর আগে, ছেড়ে গেছে মানে মরে যায়নি। ত্যাগ করেছে। তখন আমি খুব ছোট। মায়ের নামে চিঠি, আমি তো ভাবতেই পারি না, বড় হয়ে বাবার হাতের লেখা যে সব কাগজপত্র দেখেছি ঠিকানাটা দেখে তো হাতের লেখা সেই রকমই মনে হয়। কিছুই আন্দাজ করতে পারছি নাÑ চিঠি কে দিলো। মাকে ডাকলাম। তিনি নাতির হাত ধরে আমার ঘরে ঢুকলেন।
কি বাবা?
মা দেখ তো এ চিঠিটা। মা চার কোনা লেফাফাটা না ছুয়েই জবাব দিলেন, তুই খুলে দ্যাখ।
কিন্তু এটা তো এসেছে তোমার নামে তাই তুমি দেখ।
আমর নামে। মা যেন কিছুটা আশ্চর্য হলেন। এখনো যে তার নামে কোনো চিঠি আসতে পারে এটা কম বিস্ময়ের ব্যাপার নয়।
ছেলেকে আনোয়ারা বেগম চিঠিটা খুলতে চললেনÑ আমি তো বাবা এখন চোখে ভাল দেখি না, তুই চিঠিটা খুলে পড়।
হ্যাঁ মনসুরের বাবারই চিঠি। চিঠির শেষে স্পষ্ট করে মিশির আলী স্বাক্ষর করেছে কাঁপা হাতে। মনসুর বললো, মা এটা বাবার চিঠি, তোমার কাছে লিখেছে।
আনোয়ারা বেগম ছেলের কথার কোনো জবাব দিতে পারলো না, স্বামী-স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর কাছে স্বামীত্ব হারালেও পিতা তো পুত্রের কাছে পিতৃত্ব হারায় নাÑ তাই বাবার চিঠি বলার পর আনোয়ারা বেগম তোর বাবার চিঠি তুই পড়। বলতে যেয়েও বলতে পারলো না। যে তার মিশির আলীকে শুধু আনোয়ারা বেগম মনে রেখেছে তাই নয়, মনে রেখেছে এ গ্রামের মানুষও, এই মনে রাখাটা তার মহৎ কোনো কাজের জন্য নয়, তার অভিনব ধরনের নষ্টামী আর স্বার্থপরাতার জন্য। মিশির আলি বাবরি চুল রাখতো, কী এক কোম্পানীর যেন কেরানি ছিলো। বাড়িঘর কোথায় আনোয়ারা বেগমের বাবা গিয়াসউদ্দিন খোঁজ খবর নিয়ে দেখেনি কিন্তু ছেলেটার সরল সরল চেহারা দেখে গিয়াসউদ্দিন মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন। তার মনে এই ধারনা হয়েছিলো হয়তো মিশির আলী তার এই বোকাসোকা মেয়েটিকে কোনো কষ্ট দিবে না। চাকরি করবে, সংসার করবে আর সুখে শান্তিতে থেকে মেয়েটির জিন্দেগী শেষ হয়ে যাবে। আজ বাবা নেই, আনোয়ারা বেগমের মাও নেই, একমাত্র ছেলে মনসুর তার বউ আর পাঁচ বছরের নাতি। এই চারজন মানুষ নিয়েই আনোয়ারা বেগমের ছোট্ট জগৎ।
মিশির আলী যখন চলে যায়, মনসুরের বয়স তখন দশ। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্ররা সব না বুঝলেও অনেক কিছু বুঝে, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝেছিলো মা খুব চিন্তিত। টাকা পয়সা আদান-প্রদান হয়ে গেছে। দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে তালাক কার্যকরী হয়েছে। আনোয়ারা বেগম নির্বাক। উচ্চ স্বরে যে কাঁদবে সে সাহস এবং শক্তি তার নেই। পাড়া-পড়শিরা হায় হায় করে উঠে। রশিদ নানা তো রেগেই আগুন। মিয়া ভাই কেন আপনি এইভাবে রাজি হলেন? ব্যাটাকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়তাম। টাকা পয়সা দিলেই হলো। আমাদের মেয়ের জীবনের কোনো দাম নাই, গিয়াস উদ্দিন অশ্রুত সজল চোখে জবাব দিয়েছিলেনÑ আমার ভুল হয়েছিলো রে ভাই আমি খোঁজ খবর না নিয়েই ভুল করেছিলাম। সেই ভুলের গুনাহকারী আমার কলিজার টুকরাকে দিতে হলো, আর আইন আদালতের কথা বলছিসÑ কী লাভ হতো এ সব করে জোর করে তো কাউকে ধরে কথা যায় না। আমি পরে শুনেছি বিয়ের পর থেকে একদিনও মা আমার শান্তিতে ঘর করতে পারেনি। বাইরে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ছিলো কিন্তু ভিতরে ছিলো ঘৃণা, অবহেলা আর শত্রুতার বিয়ের কাটা। আমার এই  অবুঝ মেয়েটা কতদিন এই জ্বালা সইতে পারতো বল। হয় ও নিজে মরে যেতো অথবা ডাক মেরে ফেলে দিতো। আমি কী করে সহ্য করতাম বল। ঘরে সৎ মা। জানিস তো শুধু স্বামীর জ্বালা নয়। সৎ মায়ের অসহ্য গঞ্জনাও ওকে সহ্য করতে হয়েছে।
গিয়াসউদ্দিন সৎ মায়ের গঞ্চনা থেকে বাঁচাবার জন্যই আনোয়ারাকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়েছিলেন। শ্বশুর বাড়িতে থাকলেও মিশির আলী আনোয়ারা বেগমের উপর মার্শাল ল’ জারি করে রাখতো। ঘনিষ্ট আত্মীয় স্বজন ছাড়া বাড়ির ভিতরে বা বাহিরে কোনো পর পুরুষের সাথে কথা বলা যাবে না। শীত বা গ্রীষ্মকাল যাই থাকুক প্রতিদিন গোছল করতে হবে। দাঁত মাজতে হবে নীম গাছের দাতন দিয়ে কয়লা বা পোড়া মাটি দাঁতে ছুয়ালে শাস্তি পেতে হবে, তবে এই শাস্তি কি-তা মিছির আলী স্পষ্টভাবে তখন উল্লেখ করেনি। তিনি সিগারেট খেতেন আর গুল দিতেন।
মিশির আলীর এতসব বদ অভ্যাস এবং বদ ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও গিয়াসউদ্দিন আর গ্রামের লোকজন তাকে কাল নজরে দেখতো না। মিশির আলী সব সময় গ্রামের লোকজনের বিপদে আপদে ছুটে যেতেন কাউকে হাসপাতালে নেয়ার দরকার হলে কর্দমাক্ত রাস্তায় ভ্যানগাড়ি ঠেলে দিয়ে যেতো মিশির আলী, আর সেই মিশির আলীই যখন আনোয়ারা বেগমকে তালাক দিলো তখন  সবার চোখে ধুলো দিয়ে কাবিন বাবদ কতগুলো জাল টাকা দিয়ে গেল। আনোয়ারা বেগম খুশি বা বেজার কিছুই হলো না। তালাকের লজ্জায় সে মুখ বোঁজে কাঁদতে লাগলো। মনসুরের বয়স যদিও খুব বেশি নয়, তবুও বুঝতে পারলো, টাকা শুধু মানুষের জীবনে আশীর্বাদই বয়ে আনে না অভিশাপও বয়ে আনতে পারে। আনোয়ারা বেগমের হাতের এই টাকাগুলো আজ অভিশাপ বয়ে এনেছে। এ টাকাগুলো সে রাখতেও পারছে না, ফেলে দিতেও পারছে না।
অভিশাপের মধ্যেও যে অভিশাপ লুকিয়ে ছিল তা বুঝতে পারলো কিছুদিন পরে।
মিশির আলি সন্ত্রাসী দলের সদস্য ছিলো। সে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যাসহ এগারটি মামলার আসামী।
পুলিশ তাকে খোঁজার জন্য রাত-বিরাতে এসে আনোয়ারা বেগমের ঘরের দর্জা ধাক্কায়। ঘর তন্নতন্ন করে খোঁজে-কোনো কোনো সময় বকাঝকাও করে।
কতবার সে পুলিশকে বলেছে, মিশির আলি তাকে তালাক দিয়ে কোথায় চলে গেছে সে জানে না, কিন্তু পুলিশ তা মানে না।
পুলিশ বলে, আকাশের যত তারা, পুলিশের তত ধারা, সেই আইনের বলেই তোমার এখানে আমরা আবার মিশির আলিকে খোঁজতে আসবো। এভাবেই একদিন রাতে আবার খোঁজতে এলো পুলিশ আর বাকস-পেটারা খোলে দেখতে লাগলো। একটা মানুষ কি বাকসের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে? আনোয়ারা বেগম বিড়বিড় করে জানতে চাইলো।
মানুষ নয়, অস্ত্র, বোমা কত কিছুই তো সন্ত্রাসীরা রাখে।
-দেখুন।
আর যায় কোথায়? বাকসের মধ্যে পেয়ে গেল এক বান্ডিল জাল টাকা। আনোয়ারা বেগমকে গ্রেফতার করলো পুলিশ।
মনসুরের এসব মনে আছে, দশ বছরের ছেলে সবই বুঝে-মনসুরও বুঝতো, তাই বাবার চিঠির কথা শোনে সেই আগের ক্ষোভ আর বিরক্তি দেখা দিল আনোয়ারা বেগমের চোখে মুখে।
-কোনো মানুষ কি জাল টাকা দিয়ে তালাক দেয়া স্ত্রীকে এমনভাবে বিপদে ফেলতে পারে? মানুষের গঞ্জনা, পুলিশের নির্যাতন সবই সহ্য করেছে আনোয়ারা বেগম, নারী জীবনের এমন কোনো দুর্ভোগ নেই, যার মোকাবিলা তাকে করতে হয়নি। তবুও সে মনসুরকে ডিম ফোটা মুরগীর বাচ্ছার মতো দু’বাহু দিয়ে আগলে রেখেছে, সেই মনসুরও এখন এক সন্তানের জনক। বাপের চিঠি পাওয়ার পর তার মনে কি চিন্তার উদয় হয়েছে জানে না আনোয়ারা বেগম, কিন্তু আনোয়ারা বেগমের মনে মিশির আলির জন্য এখনো কোনো করুণার জায়গা সৃষ্টি হয়নি। বাপ বেটায় মিলে যদি থাকতে চায় থাকগে সে যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকবে।
চিঠিটা নিয়ে ছেলের সঙ্গে কোনো কথা বলা হয় না আনোয়ারা বেগমের। মিশির আলি ফিরে আসতে চাইছে জেল থেকে বেরিয়ে, দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিল। শীর্ণশীর্ণ দেহ। যদি ক্ষমা করে দেয়, তাহলেই আসবে। কথাগুলো বলে ছেলের বউ, আনোয়ারা বেগম জানতে চায়, মনসুরের মত কি?
-তেনার মত আর কি? আফনের মতেই তার মত!
-বাপের জন্য দরদ উথলে উঠছে। জাল টাকা রাইখা জেল খাটাইলো আমারে আর চিঠিতে লিখেছে জেল খাইটা শরীর ভাঙছে ওসব ডাহা মিথ্যা কথা বউমা। ঐ মানুষটার কথা আমার সামনে উচ্চারণ করলে আমার মনে শুধু ঘৃণাই জাগে, দরদ জাগে না।
মনসুর বোধ হয় ঘরের বাইরেই ছিল, সে এবার মায়ের সামনা সামনি এলো বাপের পক্ষে কথা বলার জন্যই যে, সে মায়ের মুখোমুখি হয়েছে এটা আনোয়ারা বেগম ভেবেই রেখেছে।
-মা। বললো মনসুর
-আমি জানি তুই কি বলতে চাস্?
-কেমনে জানলা?
-তর বউই তো আমারে কইলো।
-দেখ মা। জন্মদাতা পিতা যদি ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায়, তাহলে কি কোনো পুত্র তাকে ক্ষমা না করে পারে?
-ক্ষমা কি তোর কাছে চাইছে, না আমার কাছে?
-তোমার কাছে, এরপর সবার কাছে।
-এখন কি করবি?
-তুমি যা বল তাই?
-দ্যাখ মনসুর, ঐ মানুষটা তোর বাবা-একথা ঠিক কিন্তু আমার স্বামী না, সে আমাকে তালাক দিছে। সে এখন একজন পর পুরুষ।
- না মা। না- তোমাকে বাবা তালাক দিয়েছে ঠিকই কিন্তু তালাক হয়নি।
-কেন?
-তালাক দিলে যে দেনমোহর দিতে হয়, সেটা কি তুমি পেয়েছ।
-আনোয়ারা বেগম চুপ করে রইলেন। জাল টাকায় দেনমোহর শোধ করলে তালাক হয় কিনা তার জানা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ