ঢাকা, শুক্রবার 3 February 2017, ২১ মাঘ ১৪২৩, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দস্তয়ভস্কি (১৮২০-৮১)

বাঙ্গাল আবদুল কুদ্দুস : (শেষাংশ) পথিমধ্যেই রাস্তার পাশেই দেখতে পেলেন থানা। থানায় ঢুকে পুলিশ অফিসারকে সব কথা খুলে বললেন। আশ্চর্য! পুলিশ অফিসার তাঁর কাছ থেকে পান্ডুলিপিটি জমা নিয়ে রশিদ দিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। প্রকাশিত হল ‘জুয়াড়ী’ (১৮৬৬)।
স্ত্রীর গর্দভ পুত্রের দায়, মাইকেলের গোটা পরিবারে দায়িত্ব, ঋণের বোঝা ও পাওনাদারদের তাগাদা, অভিশপ্ত মৃগীরোগের প্রকোপ এবং রোগজর্জর দেহের ক্লান্তি ও অবসাদ; এই সব মিলে দস্তয়েভস্কির জীবন হয়ে উঠে দুবির্ষহ। তাছাড়া, পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদকদের সাথে তাঁর গন্ডগোল লেগেই থাকে শর্ত বা চুক্তি নিয়ে।
সম্পাদক কাৎকফ-র কাছ থেকে তিনি তিন হাজার রুবল আগাম নেন একটি উপন্যাসের জন্যে, সেই টাকার বিনিময়ে লিখে দেন ‘অপরাধ’ ও শাস্তি’। কাৎকফ-এর ‘রনাক ভিসনিক’ পত্রিকায় ‘অপরাধ ও শাস্তি’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের জন্যে তাঁকে দেয়া হয়েছে প্রতি চার পৃষ্ঠায় একশ’ পঁচিশ রুবল, যেখানে তুর্গেনিভকে দেয়া হয়েছে প্রতি চার পৃষ্ঠায় আড়াইশ’ রুবল। এভাবেই তাঁকে ঠকানো হয়েছে। প্রায় সব সম্পাদক ও প্রকাশক তাঁর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়েছেন।
পারিবারিক জীবনে তিনি বহু দুঃখ ভোগ করেছেন, পাওনাদারদের দ্বারা চরমভাবে নাজেহাল হয়েছেন, প্রায়ই অভুক্ত থেকেছেন এবং জীবনে অসুখী হয়েছেন। কিন্তু এ সকল প্রতিক’ল অবস্থা ও তাঁর সৃষ্টি প্রতিভাকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি। তিনি মাত্র চার বছরে তিনটি বিশ্ববিশ্রুত উপন্যাস রচনা করেছেনÑ “অপরাধ ও শাস্তি’  (১৮৬৬), ‘ইডিয়ট’ (১৮৬৮) ‘ভূতগ্রস্ত’ (১৮৭১-৭২)। তাছাড়া, এই সময় তিনি তাঁর (এবং বিশ্বসাহিত্যের) শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘ব্রাদার্স কারামোজভের’ ও পরিকল্পনা করেছেন।
মেরির মৃত্যুর তিন বছর পর তিনি বিয়ে করেন আনা স্মিতকিনা (১৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৬৭) কে। আগেই বলেছি, “জুয়াড়ী’ উপন্যাস রচনাকালে তিনি আনাকে শ্রুতিলিপিকর হিসাবে নিয়োগ করেন। আনা উচ্চ শিক্ষিতা, সুন্দরী, অত্যন্ত ধৈর্যশীলা শান্ত হাসি-খুশী তরুণী। আনাকে তিনি পোলিনার ভালবাসার কথা বলেন। পোলিনার প্রেমের কাহিনী শুনতে শুনতে আনার মধ্যে প্রথমে কৌতুহল, পরে আবেগ এবং শেষে ঈর্ষার মাধ্যমে প্রেমের উদ্রেক হয়। এভাবেই তাঁর জীবনে আনার আবির্ভাব ঘটে। অথচ আনা ও তাঁর মধ্যে চব্বিশ বছরের ব্যবধান। তাঁদের দু’জনের বয়সের এই তারতম্য সত্ত্বেও তাঁরা দাম্পত্য জীবনে সুখী হয়েছেন। তাঁর মত আবেগ প্রবণ, অস্থিরচিত্ত, বদমেজাজী প্রৌঢ় স্বামীকে সে সকল সমতা ও ধৈর্য দিয়ে ভালবেসেছে এবং তাঁকে সুখী করতে চেয়েছে। বলা যায়, বাঙ্গালী রমনীর মতই আনার সেবা-যতœ ও ঐকান্তিক ভালবাসার জোরেই তাঁর মত ভবঘুরে, জাতি বাউন্ডেলে পারিবারিক জীবনের ¯েœহবন্ধনে ধরা দিয়েছেন।
পাওনাদারদের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেলেন। বিদেশে চারটি বছর তাঁর অসহ্য দারিদ্র্যের মধ্যে কাটে। তিনি দারিদ্র্যের শেষ সোপানে নিমজ্জিত হলেন। জার্মানী, ইতালী, সুইজ্যারল্যান্ড ঘুরে বেড়ালেন ১৮৬৭-র এপ্রিল থেকে ১৮৭১-র জুলাই পর্যন্ত। ভ্রাম্যমাণ জীবনে তাঁদের দু’টি কন্যা সন্তান জন্মলাভ করে। এক সোফিয়া (মার্চ, ১৮৬৮)। কিন্তু দু’মাস পর মেয়েটি মারা যায়। অপরটি লিওবো (সেপ্টেম্বর, ১৮৬৯)।
ইউরোপে গিয়ে চরম অর্থ সংকটের মধ্যেও তিনি জুয়া খেলায় মত্ত হয়ে উঠেছেন। রাউলেট খেলতে গিয়ে অর্থের জন্যে তিনি স্ত্রীর পা পর্যন্ত জড়িয়ে ধরেছেন। তার আর্থিক অবস্থা এমনই সংকীর্ণ হয়ে যায় যে, ১৮৬৯-তে দুই ঞযধষবৎ-এর জন্যে তাকে ওভার কোট এবং পরিধানের শেষ সার্টটি পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয়েছে।
আনার পীড়াপীড়িতে তিনি দেশে ফিরে এলেন। দেশে যাবার পর তাঁর বেশ নাম হয়। বই বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি ঋণমুক্ত হলেন। একটি বাড়িও কিনলেন। এই বাড়িতে তাঁর পরিবার গ্রীষ্মকাল কাটালেও স্বাস্থ্যগত কারণে এই সময়টা তাঁকে অন্যত্র কাটাতে হয়েছে (১৮৭৪-৮০)।
দেশে ফিরে এলে তাঁর আরও দু’টি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। প্রথম ছেলে ফিদোর (জুলাই, ১৮৭৫) এবং দ্বিতীয় আলেক্সি (আগস্ট, ১৮৭৯)। আমেক্সি তাঁর খুব প্রিয়। কিন্তু বড়ই আফসোস, তিন বছরেই শিশুটির অকাল মৃত্যু ঘটে।
তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠে। দ্বিতীয় আলেজকান্ডারকে দু’বার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। শুধু তাই নয়, সরকারি, আমলাদের উপরও প্রচ- আঘাত হানা হয়।
আগেই উল্লেখ করেছি, সাইবেরিয়া থেকে ফিরে এসেই তিনি বিপ্লবী মতবাদ পরিহার করেন। ১৮৭২-এর দিকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিপ্লব থেকে জীবনের আরও গভীরে অনুপ্রবেশ করে। গভীর ধর্মবোধ তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
১৮৭৬-এর প্রকাশিত একটি মাসিক রিভিয়ুতে ((The diary of a writer) তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার অভিব্যক্তি ঘটে। তাঁর সমস্ত আবেগ ও চিন্তা-ভাবনা সমগ্র রাশিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। স্লাভ ও পাশ্চাত্য এই দুই প্রভাব হতে সম্পূর্ণ বিমুক্ত হয়ে রাশিয়াকে একান্তভাবে রুশদেশীয় হতে হবে। ১৮৮০-তে পুশকিনের স্মৃতি অর্পণ করতে গিয়ে তিনি এ কথা সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন।
ধীরে ধীরে তাঁর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটে। ১৮৮০-এর জুনে দস্তয়েভস্কি যখন ‘ব্রাদার্স কারামোজভে’র উপর কাজ করেন তার সে সময়কার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বন্ধু স্ট্রাখভ : দস্তয়েভস্কি অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে গেছেন। তাঁর অত্যন্ত ক্লান্ত মনে হয়। তাঁর শরীর এত দুর্বল হয়ে গেছে যে, তিনি সামান্য আঘাতে শেষ হয়ে যেতে পারেন। প্রচ- মানসিক শক্তির অধিকারী হয়েও সামান্য কাজ করতেও তিনি বেশ ক্লান্তি বোধ করেন।
১৮৮১-র প্রথমে এমফাইসেথা (ফুসফুসের এক প্রকার ভয়ংকর রোগ)-র দ্বারা ভয়ঙ্করভাবে আক্রান্ত হলেন। ফলে, তাঁর ফুসফুসে সর্দিরোগ হয়। ২৮ শে ফেব্রুয়ারি গলা দিয়ে রক্তপাত শুরু হয়। মৃত্যু আসন্ন ভেবে তিনি তওবা করতে চাইলেন। যে বাইবেলটি তিনি কারাগারে পড়তেন, সেটি স্ত্রীকে উচ্চস্বরে পড়ার জন্য দিলেন। স্ত্রী ম্যাথু থেকে পড়লেন, But John held him back and said, it is I that should be baptised and said unto him, “Detain me not; for this it beloves us to fulfil a great truth.” স্ত্রী যখন পাঠ করছেন, তখন তিনি বললেন, “শুনছো, আমাকে আর আটকে রেখো না, আমার শেষ যাত্রার সময় হয়ে গেছে”। কয়েক ঘণ্টা পর ফুসফুসের একটি ধমনী ছিদ্র হয়ে তিনি অনন্ত জীবনের পথে পাড়ি জমালেন (২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ১৮৮১)। কেউ তাকে আটকে রাখতে পারল না।
দস্তয়েভস্কি বেঁচে থাকতে দারিদ্র্যের অভিশাপে অহর্নিশ জ্বলে-পুড়ে মরেছেন। অথচ, মৃত্যুর পর দারুণ সমারোহে তাঁর শেষকৃত্য সম্পাদিত হয়। সমগ্র রাশিয়া যেন দস্তয়েভস্কির এই শেষকালায় অংশগ্রহণ করে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ রেখেও আমি এ কথা বলছি যে, আজ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বে কোন বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকের এরূপ অন্ত্যেষ্টির সৌভাগ্য খুব কমই দেখা যায়। একেই বলা হয়, ভাগ্যের পরিহাস!
দস্তয়েভস্কি বেঁচে থাকতে নয়, মরে গেলেই রুশবাসী উপলব্ধি করতে সমর্থ হয় যে, তিনি কত মহৎ এবং তাদের কত অন্তরঙ্গ। ভলস্তয়ের জবানীতে সমগ্র  রুশবাসীর মনোভাব সুস্পস্ট হয়ে উঠেছে :
“আমি কখনও তাঁকে দেখিনি। তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ কোনও সম্পর্ক ছিল না। তবুও তিনি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করলে, আমি উপলব্ধি করলাম যে, তিনি আমার কত প্রিয়, কত অন্তরঙ্গ, আমার জন্যে কতখানি অপরিহার্য্য”।
তলস্তয়ের মত সমগ্র রুশবাসী একই উপলব্ধিতে পৌঁছেন। কিন্তু বড় বিলম্বে। কারণ, তখন তিনি সকল ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মানের ঊর্ধ্বে উঠে অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। এই বিশ্ব বরেণ্য সাহিত্যিক দস্তয়েভস্কি সারা জীবন ধরে বাউন্ডেলের জীবনযাপন করেছেন। নিছক বেঁচে থাকার তাগিদে তাকে সকল শক্তি নিয়োজিত করতে হয়েছে। দুর্ভাগ্য তাঁকে নির্মমভাবে তাড়া করেছে। স্থায়ী রোগে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। অথচ, এই বিরূপ পরিবেশ তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে কখনও এক মুহূর্ত ও অবদমিত করতে পারে নি। তাই তো দস্তয়েভস্কি যথার্থই লিখেছেন, “In spite of all this I feel as if I were only just beginning to live. It is curious, isn’t it? I have the vitality of a cat.” তাঁর অদম্য প্রাণশক্তির কথা তিনি ব্রাদার্স কারামোজভে দিমিত্রি কারামোজভ ওরফে মিটিয়ার মাধ্যমে ও ব্যক্ত করেছেন, I can bear anything, any suffering, if I can only keep on saying to myself : “ I live, I am in a thousand torments, but I live!” মিটিয়ার মাধ্যমে তিনি নিজের কথাই উচ্চারণ করেছেন।
সব চাইতে বড় কথা হচ্ছে, ট্র্যাজেডির নায়কের মতই তিনি বিরূপ ভাগ্যকে মেনে নেননি। বরং অদম্য প্রাণশক্তি বলে ভাগ্যের বিরুদ্ধে অবিরত সংগ্রাম করেছেন। সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি সৃষ্টিকার্যে নিয়োজিত থেকেছেন। দস্তয়েভস্কি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসিকের মর্যাদা লাভ করেছেন। তাই তো আমরা দস্তয়েভস্কিকে বলে থাকি, “ঔপন্যাসিকের ঔপন্যাসিক”।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ