ঢাকা, শুক্রবার 3 February 2017, ২১ মাঘ ১৪২৩, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নিষ্ঠুর অমানবিকতা

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্ষমতা মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর, নির্লজ্জ ও বেপরোয়া করতে পারে তারই দুটি নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে দেশের দুটি পৃথক এলাকায়। একটি চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলার নীলকমল হাই স্কুলের মাঠে। দ্বিতীয়টিও এক হাই স্কুলের মাঠেই, তবে সেটা জামালপুর জেলার মেলান্দহের মাহমুদপুরে। বৃহস্পতিবার দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সচিত্র রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রথম ঘটনার নায়ক হাইমচর উপজেলার ‘নির্বাচিত’ চেয়ারম্যান এবং বিশিষ্ট ‘জনপ্রতিনিধি’ নূর হোসেন পাটোয়ারী। গত ৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের এই দুর্দান্ত দাপুটে নেতা স্থানীয় নীলকমল হাই স্কুলে গিয়েছিলেন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিয়োগিতার প্রধান অতিথি হিসেবে। সে অনুষ্ঠানে ক্রীড়ার নাম করে স্কুলের শিশুদের তিনি সেতু বানিয়েছেন। তার নির্দেশে শিশুরা দুটি লাইনে দাঁড়িয়ে অন্য শিশুদের উপুড় করে এমনভাবে ধরেছে যাতে ওই শিশুদের পিঠের ওপর দিয়ে চেয়ারম্যান সাহেব হেঁটে যেতে পারেন। হাঁটতে গিয়ে তিনি যাতে পড়ে না যান সে জন্য লাইনে দাঁড়ানো শিশুদের পেছনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে রেখেছে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাগরেদরা। তাদের হাত ধরেই শিশুদের পিঠের ওপর দিয়ে বীর দর্পে হেঁটে সেতু পার হয়েছেন চেয়ারম্যান পাটোয়ারী। পারও হয়েছেন নৃত্যের তালে ও ছন্দে। শুধু তা-ই নয়, শিশুদের দিয়ে হুকুমে তৈরি সেতুটির নামকরণও করেছেন তিনি। বলেছেন, এটা নাকি তাদের স্বপ্নের ‘পদ্মা সেতু’! 

ওদিকে স্তম্ভিত করার মতো দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে হাইমচরের আগের দিন, গত ২৯ জানুয়ারি। মেলান্দহের এ নায়কও একজন বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা। তবে তিনি পাটোয়ারী সাহেবের মতো উপজেলা চেয়ারম্যান হতে পারেননি। জানা গেছে, দলের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি নাকি বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এই কীর্তিমানের নাম দিলদার হুসেন প্রিন্স। তিনিও স্কুল ছাত্রদের দিয়ে সেতুই বানিয়েছেন। কিন্তু পার্থক্য হলো, হাইমচরের চেয়ারম্যানের মতো পিঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যাননি তিনি, বুক ফুলিয়ে হেঁটে গেছেন শিশু ছাত্রদের কাঁধের ওপর দিয়ে। প্রিন্স সাহেবকে সম্ভাব্য পতনের পরিণতি থেকে রক্ষার জন্যও দু’পাশে দলীয় লোকজন হাত বাড়িয়ে থেকেছে। তাদের হাত ধরে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। ছবিতে বাঁশের সাঁকোর মতো হাত দিয়ে ধরার জন্য বেঁধে রাখা বাঁশও দেখা গেছে। অর্থাৎ সবদিক থেকেই প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল যাতে শিশুদের কাঁধের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগ নেতা দিলদার হুসেন প্রিন্সকে পড়ে যেতে না হয়। তার যাতে হাত বা ঠ্যাং না ভাঙে! এ ব্যাপারে মাহমুদপুর হাই স্কুলের শারীরিক শিক্ষক হাফিজুর রহমানও নাকি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। অন্যদিকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছেন, স্কুলে তখন এক সঙ্গে দুটি অনুষ্ঠান চলছিল বলে প্রিন্স সাহেবের সেতু বানানো এবং শিশুদের কাঁধের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার বিষয়ে তিনি নাকি কিছুই জানেন না! 

এ ধরনের সাফাই বা ব্যাখ্যায় অবশ্য কোনো লাভ হয়নি। স্কুলের শিশুদের দিয়ে সেতু বানিয়ে তাদেরই পিঠ ও কাঁধের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ঘটনা দুটি সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে। মানুষ স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিন্দা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। দেশের দুই প্রান্তের দুই আওয়ামী লীগ নেতাকেই ধিক্কার দিয়েছেন সকলে। বলেছেন, অমানুষের বাচ্চা। অনেকে এ দু’জনকে এমনকি বানর জাতীয় পশুর সঙ্গে তুলনা করতেও সম্মত হননি। তুলনা করলে কুকুরকেও নাকি অসম্মান করা হবে ধরনের মন্তব্যও করেছেন কেউ কেউ। সারকথায় দু’জনের বিরুদ্ধেই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সকলে। 

আমরাও চাঁদপুর জেলার হাইমচর এবং জামালপুর জেলার মেলান্দহের ঘটনা দুটির তীব্র নিন্দা জানাই। বর্তমান যুগে কোনো জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দলের নেতা এতটা জঘন্য পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারেন তা ভাবা যায় না। কিন্তু সবই সম্ভব হচ্ছে মূলত সরকারের দলবাজি নীতির কারণে। আওয়ামী লীগ করলেই সাত খুনও মাফ বলে কথাটা সম্ভবত অকারণে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে না। আমরা আশা করতে চাই, পানি বেশি ঘোলা হওয়ার আগেই সরকার ঘটনা দুটির ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠবে এবং লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠনের পরিবর্তে দু’জনকেই আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেয়ার পদক্ষেপ নেবে। আমরা চাই, দেশের আর কোথাও কোনো উপলক্ষেই শিশুদের যাতে অমানবিক নিষ্ঠুরতার শিকার না হতে হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ