ঢাকা, শুক্রবার 3 February 2017, ২১ মাঘ ১৪২৩, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ

আখতার হামিদ খান : প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা এদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে আসছে সুদীর্ঘকাল ধরে। আর এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে নারায়ণগঞ্জ বন্দরই হচ্ছে চালিকাশক্তি। কালের স্রোতের বন্দরের গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশীদের শিল্প-কারখানা, বিভিন্ন স্তরের ব্যবসা-বাণিজ্যকে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে ব্রিটিশ আমল থেকেই নারায়ণগঞ্জ বন্দর  মুখ্য ভূমিকা রেখে আসছিল। এর অস্তিত্ব কেন বিলোপের প্রক্রিয়ায় নিমজ্জমান, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে নানা চিত্র। কয়েকশ’ বছরের প্রাচীন জনপদ নারায়ণগঞ্জ শহর, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর জীবনধারা ও গতিময় রূপ লাবণ্যই নারায়ণগঞ্জ বন্দরের প্রাণ। এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সুদীর্ঘকালের সাধনা, পরিশ্রম এবং কঠোর কর্মযজ্ঞের ফলেই বন্দরটির পত্তন হয়। বন্দর সৃষ্টির পর থেকে এদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই শুধু নয়, আধুনিক নগর সভ্যতা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রভূত ভূমিকা রাখে। পাট, সুতা, হোসিয়ারিসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার পাশাপাশি এ বন্দর স্থাপনের মধ্যদিয়ে বিগত অর্ধ-শতাব্দীতে জাতীয় অগ্রগতির প্রসারতা লাভ করে। নারায়ণগঞ্জ বন্দর কেবল স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে তা নয়, বন্দরের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটা কেন্দ্রস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। কালক্রমে তথা বর্তমান অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ বন্দরটির জীবন প্রদীপ ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। বন্দরের কার্যক্রমে নেমে এসেছে অকল্পনীয স্থবিরতা। বন্দরের অচলাবস্থা রীতিমত ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ধস নামার উপক্রম হয়ে পড়েছে। ভাবতেই অবাক লাগে যে, এককালে এ বন্দর দিনের চব্বিশ ঘণ্টায়ই মালামাল উঠানামায় কর্মব্যস্ত থাকত। আর বর্তমানে বন্দরটি নিষ্প্রাণ অবস্থায় রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক বছরে এ বন্দরের জেটিতে একটিও বিদেশী কোন জাহাজ মালামাল নিয়ে আসেনি। মাসের পর মাস বন্দরের জেটিগুলোতে কোন মালামাল উঠানামা করছে না। বন্দরের আয় অস্বাভাবিকরূপে কমে এসেছে।

নারায়ণগঞ্জ শহরের মাঝখান দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী প্রবাহিত। নদীর পূর্ব পাড়ে শহরের বন্দর এলাকা। যাকে বলা হয় নারায়ণগঞ্জের প্রাচীন নগরী। পশ্চিম পাড়ে আধুনিক শহর। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় ঘেঁষে নদী বন্দর অবস্থিত। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে নদীর পূর্ব দিকে শহর গড়ে উঠার পাশাপাশি নদী পার ঘেঁষে পাট ও বস্ত্র শিল্পের ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠে। কালক্রমে এ দুটি শিল্পের প্রসার ঘটে নদীর পশ্চিম পাড়ের শীতলক্ষ্যা নামক স্থানে। সারাদেশ থেকে পাট আসতে থাকে এখানে। পাটের বড় মোকাম গড়ে উঠে। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে সুতা, রং, হোসিয়ারি ব্যবসার প্রসার ঘটে। ফলে ১৯৫৮ সালে আইডব্লিউটিএ প্রতিষ্ঠার পর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠা হয় নারায়ণগঞ্জ বন্দর কর্তৃপক্ষ। ‘বন্দর কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠার পর নারায়ণগঞ্জ বন্দরই এদেশের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে রূপ নেয়। তৎকালীন চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর থেকে নদী পথে সিংহভাগ বিদেশী মালামাল আসত এ বন্দরে। এখান থেকে সড়ক পথে সরবরাহ হত সারা বাংলাদেশে। অন্যদিকে পাটের মূল ব্যবসাস্থল এ বন্দর দিয়েই বিদেশে পাট রফতানির কাজ হত। নারায়ণগঞ্জ বন্দরের অধীন বন্দর ভবনটি ছিল ব্রিটিশ আমল থেকে যাতায়াতের কেন্দ্রস্থল। নারায়ণগঞ্জ টার্মিনালের জেটিগুলো থেকে প্রতিদিন ৪টি বড় স্টিমারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েক শত লঞ্চ ছেড়ে যেত। স্টিমারগুলো ছিল ভারতের পথে এদেশের যাত্রীদের একমাত্র উপায়। সারাদেশ থেকে লোকজন ট্রেনে চড়ে নারায়ণঞ্জ এবং নারায়ণঞ্জ থেকে স্টিমারে চড়ে গোয়ালন্দ হয়ে ভারতে যেত। এ ব্যবস্থা বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ছিল। এরপর হতে নারায়ণঞ্জ বন্দর থেকে স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে বন্দর থেকে যাত্রী চলাচলের লঞ্চ সার্ভিসও কমে যায়। অন্যদিকে একই কারণে নারায়ণগঞ্জ থেকে দূরপাল্লার ৮টি ট্রেন সার্ভিসও বন্ধ হয়ে যায়। কমে যায় নারায়ণঞ্জ বন্দরের উপার্জন। দেশ স্বাধীনের পরও আশির দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত নারায়গঞ্জ বন্দরের জমজমাট অবস্থা ছিল।

নারায়ণগঞ্জ বন্দরের অবস্থান ২৭ কিলোমিটার শীতলক্ষ্যা নদীর দক্ষিণ দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের গোপনগর থেকে উত্তরে ডেমরা ঘাট তথা শীতলক্ষ্যা সেতু (কাঁচপুর সেতু) পর্যন্ত এই ২৭ কিলোমিটার নদী বন্দরের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্দরে রয়েছে সর্বমোট ১০টি জেটি। এর মধ্যেকার বন্দর ভবনে ১টি যাত্রী উঠানামা, ১টি মধ্যেকার জেটি এবং পাঁচ নম্বর ঘাটে অন্যত্র শীতলক্ষ্যা নদী ঘিরে এবং নারায়ণগঞ্জের প্রাচীন ও আধুনিক ঐতিহ্য ও সভ্যতাকে ঘিরে গড়ে উঠা বন্দরের রয়েছে একটি সুবিশাল অফিস। রয়েছে দুশ’র মত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য স্টাফ। ৬টি পন্টুন বর্তমানে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় বন্দরের বিভিন্ন স্থানে পড়ে রয়েছে। দুটি গুদামের ভেতর কোন মালামাল নেই। ৫টি ফেরি ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে।

বন্দরের বর্তমান কাজকর্মের খোঁজ নিয়ে বন্দর ভবন অফিসে গিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ বন্দরের কাজকর্ম অনেকটা নেই বললেই চলে। গত এক বছরে এখানে বিদেশী কোন মালামাল নিয়ে জাহাজ কিংবা কার্গো আসেনি। ভারতীয় চাল, কয়লা নিয়ে এক বছর আগে একটি কার্গো এসেছিল। এরপর কোন বিদেশী কার্গো বা জাহাজের নোঙর এখানে বন্দর থেকে সার, চাল কিংবা অন্যান্য মালামাল নিয়ে ছোটখাটো নৌ-যানের আগমন ঘটে। দেশে সার কারখানা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ ধরনের নৌযানও কমে গেছে। এক সময় সারাদেশ থেকে পাট আসত এখানে। এখন নৌকায় এসব পাট আসা প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। বিদেশী জাহাজ তেল নিয়ে কিছু কিছু তেলের ট্যাংকার ভিড়ছে গোদনাইল জেটিতে। নারায়ণগঞ্জ বন্দর যেন এখন নীরব এক আস্তানা। মালামাল পরিবহনের কোন হুলুস্থুল পরিবেশ নেই। বন্দর কর্তৃপক্ষের কাজ কমে গেছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, এককালের ডান্ডি বলে খ্যাত নারায়ণগঞ্জ বন্দরের এই অনাকাক্সিক্ষত অবস্থা সংশ্লিষ্ট সকলকেই পীড়া দিচ্ছে। যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে ছিল স্টিমার ও বড় বড় লঞ্চ এবং রকেট সার্ভিস। এগুলোর সার্ভিস ১৯৮০ সালের দিকেই বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে বন্দর ভবন থেকে চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লায় বেশ কয়েকটি লঞ্চ চলাচল করে। এ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু কিছু আয় হচ্ছে। তাও যাত্রী পরিবহনের ঘাটতি লিজ দিয়ে দেয়া হয়।

বন্দরের ৫টি পন্টুন অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পাঁচ নম্বর ঘাটে দেখা গেল। এর মধ্যেকার তিনটি পন্টুনর অবস্থা খুবই করুণ। এগুলো বিগত কয়েক বছরে ব্যবহৃত হয়নি বলে একজন কর্মচারী এগুলোর শরীরে গত দু’দশকে কোন ধোয়ামোছা কিংবা রঙের প্রলেপ পড়েনি। মরীচিকায় সয়লাব। ১০টি জেটির মধ্যেকার ৮টির অস্তিত্ব অনেকটা নড়বড়ে। ৪টিতে ভাঙন ধরেছে। এগুলোতে কবে কখন জাহাজ নোঙর করেছে কেউ বলতে পারে না। একটি জেটি বস্তিবাসীদের বসতবাড়ী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দুটি জেটির অংশ বিশেষ ভেঙ্গে গেছে। এ দু’টির জেটির অংশ বিশেষ ভেঙ্গে গেছে। এ দু’টি জেটির নিচেও ছিন্নমূল, বস্তিবাসীরা ঘরদোর বানিয়ে বসবাস করছে। একটি জেটির খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় সেটির অংশবিশেষ পানিতে ঝুলে পড়েছে। বন্দরের পাঁচ নম্বর ঘাটের কাছে একটি জেটিতে বর্তমানে কোন রকমে কাজকর্ম চলছে। এ জেটির একজন কর্মচারী এ প্রতিবেদককে জানায়, এ জেটিতেই মাঝেমধ্যে ছোটখাটো কার্গো কিছু কিছু মালামাল নিয়ে নোঙর করছে। অন্যান্য জেটিগুলোর কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। তিনি জানান, বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে এক সময় প্রায় ৪ হাজার কুলি প্রতিদিন মালামাল উঠানামায় কাজ করত। এখন এদের সংখ্যা একশ’র বেশি হবে না। হাজার হাজার কর্মচারী, শ্রমিক বন্দর থেকে কর্মহীন হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। এদের বেশির ভাগই অন্য পেশায় প্রবেশ করেছে।

অনেকেই বলেছেন নারায়ণগঞ্জ বন্দর এলাকায় নানা ধরনের চোরাকারবারীর দৌরাত্ম্যের কারণেই এখানকার ঐশ্বর্য ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে। বন্দরের অধীনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনকালেই সন্তোষজনক ছিল না। চোরাচালানির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়ার ফলশ্রুতিতে এক পর্যায়ে বড়বড় আমদানি-রফতানিকারকরা মালামাল অন্যপথে সরবরাহের কথা ভাবতে থাকে। অনেক ব্যবসায়ী এপথে বাণিজ্যও বন্ধ করে দেয়। বিভিন্ন সূত্র জানায়, বন্দরে সবচেয়ে বেশি চোরাচালানের শিকার হয়েছে গম, সার, চাল ও জ্বালানি সম্পদ। এক সময় দেশের ভেতরে আসা বৈদেশিক চাল, গম, সার ও তেলের প্রায় ৯০ ভাগই নারায়ণগঞ্জ বন্দর দিয়ে আসত। শত শত কোটি টাকার তেল পাচার, গম পাচার, সার ও চাল পাচারের অসংখ্য খবর বিগত পঁচিশ বছর জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এসব মালামাল পাচার করে চোরাচালানিরা রাতারাতি টাকার কুমিরে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র নরায়ণগঞ্জেরই এধরনের শতাধিক ব্যক্তি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছে। বন্দরের কাছে শীতলক্ষ্যার অর্থের মালিক হয়েছে। বন্দরের কাছে শীতলক্ষ্যার পূর্ব পাড়ের সরকারি সিএসডি গুদাম থেকেও চাল-গমের পাচারের খবর নারায়ণঞ্জের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হত। এই গুদামটি এখন নামেমাত্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে। হাজার হাজার টন চাল-গম পাচারের সঙ্গে তৎকালে বন্দর সিএসডি গুদাম এবং ব্যবসায়ীরা জড়িত ছিল। বন্দরে এখনও বিশেষ করে তেল ও সারের চোরাচালানি অব্যাহত রয়েছে। অনেকের ভাষ্য যে, নারাণগঞ্জ বন্দরের ঐতিহ্যকে অনেকটা ম্লান করে দিয়েছে চোরাকারবারিরা। বন্দরের পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকা বছর কয়েক আগেও চোরা তেল, সার এবং সিএসডি এলাকা চাল-গমের চোরা ব্যবসার স্বর্গরাজ্যে পরিণত ছিল। পাঁচ নম্বর ঘাটে সরকারের আমদানি করা জ্বালানি তেলের ব্যবসার শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এসবের কিছু কিছু এখনও রয়েছে। ক’বছর আগে এ এলাকায় চোরা গম ও সাবের আন্ডারগ্রাউন্ড কয়েকটি গুদাম আবিষ্কৃত হয়। তার পরই এখান থেকে ব্যবসায়ীরা চাল, গম, সার, তেল খালাসের ব্যবসা উঠিয়ে নেয়। সূত্র জানায়, এসব চোরা ব্যবসার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ বন্দরের একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারী এমনকি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ও সংস্থার কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন। এভাবেই নারায়ণগঞ্জ বন্দরের সুদীর্ঘকালের সুনাম ও ঐতিহ্যকে লুটিয়ে দেয়ার কারণে বন্দরটি বর্তমানে কর্মহীন বন্দরের দিকে এগিয়ে চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ