ঢাকা, শুক্রবার 3 February 2017, ২১ মাঘ ১৪২৩, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অর্থনীতি মুক্তির পথ : তরুণ যুবদের সমসাময়িক শিক্ষা

মো. আবুল হাসান/খন রঞ্জন রায় : তারুণ্য নিয়ে উচ্ছ্বাস ও আশাবাদ আমাদেরকে প্রবলভাবে নাড়া দিচ্ছে। তরুণেরা সমাজের বল-ভরসা। বাংলাভাষার প্রধান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আহ্বান  জানিয়ে বলেছিলেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা..../ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ছিলেন তারুণ্যের প্রতীক-‘আমরা শক্তি আমরা বল / আমরা ছাত্রদল, মোদের চরণতলে মূর্ছে তুফান/উর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল’ আমাদের উদ্দীপনার উৎস। জীবনের সতত বহমান নদী বাঁক নেয় মূলত তিন ঘাটে। যৌবনে জীবন নদীতে জোয়ার আসে, আবেগের বর্ষণে আসে স্রোত। জোয়ার ও স্রোতের মিলিত টানে জীবন বাঁক নেয়। যৌবনের প্রারম্ভে ও পূর্ণতায় যা সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে, দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে দেয় জীবনকে। তিন কালের জীবনে শ্রেষ্ঠ হলো যৌবনকাল । শিশু ও বৃদ্ধকালের জোয়ার স্রোত কোনোটাই  থাকে না বলে এ সময় জীবন নদীতে কোনো ঢেউও থাকে না। জীবনযুদ্ধ শুরু হয়ে যৌবন কালে। যে যুদ্ধে জয়ী হবার একমাত্র শক্তি তারুণ্য বা যৌবন। ‘এখন  যৌবন যার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তার।’ 

 যৌবনকালের আবার দুটো ভাগ রয়েছে; একটি ‘তের থেকে ত্রিশ, অন্যটি ত্রিশ থেকে তেপ্পান্ন।’ প্রথম ভাগের রয়েছে আবার দুটি পর্ব; প্রথম পর্ব তের থেকে উনিশ এবং দ্বিতীয়টি বিশ থেকে ত্রিশ। প্রথম পর্ব হলো যৌবনের প্রারম্ভিক সময় এবং দ্বিতীয় পর্ব যৌবনের পূর্ণতার সময়। যৌবনের প্রথম ভাগে জীবন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হয় এবং দ্বিতীয় ভাগে যুদ্ধে নামতে হয়। যৌবনের প্রারম্ভে জোয়ার কম থাকলেও আবেগের স্রোত বেশি থাকে। কারণ এ সময় তারা বিবেক তাড়িত না হয়ে আবেগ তাড়িত হয়। 

পরিপূর্ণ জীবনের যৌবনকাল ও উন্নতির সুযোগ রংধনুর মতো আসে এবং অল্প সময় পরেই চলে যায়। বাংলাদেশের সামনে যুব তারুণ্য নিয়ে এরকম সুযোগ দফায় দফায় এসেছিল। বর্তমানে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন পপুলেশন ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যা-সুবিধা। কোনো দেশে যখন কাজ করা মানুষের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কমে যায়, তখন সেই দেশ জনসংখ্যার দিক থেকে দারুণ সুবিধাজনক জায়গায় চলে যায়। বাংলাদেশে এখন প্রতি তিনজনে দুজনই উপার্জনক্ষম। নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা, বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জাতীয় সঞ্চয় বাড়ে, কেনাকাটা বাড়ে, অর্থনীতি সবল হয়। 

বাংলাদেশে এখন ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা পৌনে পাঁচ কোটি। এর সঙ্গে ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী যুব জনসংখ্যাকে ধরলে বলা যায়  জনসংখ্যার তিন ভাগের দুই ভাগই টগবগে তরুণ। ঠিক এ রকম জনসংখ্যা-সুবিধা নিয়েই ১৯৬৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে পূর্ব এশীয় ‘টাইগার’ অর্থনীতির দেশগুলো উন্নতি করেছিল। চীন বিপ্লবের পরের উত্থানও ছিল অনেকটা তরুণদেরই রক্ত ও ঘামের ফসল। স্বাধীনতার পরের জাগ্রত বাংলাদেশ, আশির দশকের প্রতিবাদী বাংলাদেশ, নব্বইয়ের দশকের গণতান্ত্রিক আত্মবিশ্বাসের বাংলাদেশে এ রকম সুযোগের রংধনু দেখা গিয়েছিল এবং যথারীতি হেলাফেলার কারণে সেই রংধনু ক্ষণকালেই বিলীন হয়েছে। এখন এসেছে নতুন আশাবাদের মৌসুম; জনসংখ্যা-সুবিধার সুযোগ। শিক্ষা প্রশিক্ষণ প্রযুক্তি সন্নিবেশন করে কর্মক্ষম যুবগোষ্ঠীকে প্রত্যাশিত কাজে সম্পৃক্ত করাই বড় চেলেঞ্জ। 

যে কোনো দেশেই এমন একটি সময়পর্ব আসে, যখন মোট জনসংখ্যায় তরুণ-যুবকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে দেখা যায়। সাধারণত এ পর্বের ব্যাপ্তি থাকে ৪০। বর্তমানে বাংলাদেশও এ কালপর্ব অতিক্রম করছে। এখন দেশে ৩০ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠী যুবক। বিশাল এ যুবশক্তিকে সার্বিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে সহজেই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, এমনকি প্রত্যাশিত সময়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া অসম্ভব হবে না। কিন্তু এ বিপুলসংখ্যক তরুণ সমাজকে কাজে লাগানোর জন্য কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার নজরদারি বাড়াতে হবে। 

জনসংখ্যা সুবিধা থেকে ফল পেতে হলে তরুণদের কর্মজীবন ও আয়ুষ্কাল দুটোই বাড়াতে হবে। কিন্তু ডিপ্লোমা শিক্ষায় বরাদ্দ কম বলে আমাদের তরুণরা দক্ষ কম। কম দক্ষ বলে দেশে বা বিদেশে তাদের অস্বাস্থ্যকর ও কঠিন ধরনের কাজ করতে হয়। তাতে করে তাদের স্বাস্থ্য ও আয়ু দুটোই ধ্বংস হয়। তাদের কর্মজীবন ছোট হয়ে আসে। অল্প বয়সেই তারা বুড়িয়ে যান। 

ইতিবাচক দিকেরও নেতিবাচক দিক আছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর ‘উন্নতি করার’ তীব্র ইচ্ছা যেমন একটা সামাজিক-পুঁজি, তেমনি হতাশা অসন্তোষকে যুবসমাজকে প্রতিনিয়তই মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দেশের বেকার পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো বেকার ৪ কোটি মানুষ। বাংলাদেশ ১৫-২৯ বছর বয়সী ৪ কোটি ১৮ লাখ মানুষের ৪১ শতাংশ জীবন গঠনের সব উপকরণ থেকে বঞ্চিত। ফলে তারা উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় থাকছে। না পারছে সমাজিক স্তরে নিজের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে, না পারছে দেশের উন্নয়নের সহযোগী হতে। বিপুল সংখ্যক তরুণদের পরিকল্পিত উপায়ে শিক্ষা কাঠামোতে সম্পৃক্ত করতে পারলে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতো।  

তের থেকে ঊনিশ বছরের মধ্যে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এসএসসি পরীক্ষা পাশের পর কতজন তরুণ ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয় তার উপর কর্মক্ষেত্রের যুদ্ধ নির্ভর করে। ডিপ্লোমা শিক্ষা জীবনযাপনের উপায় এবং অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যম। যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে পণ্যের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে এবং পুরনো পেশার পদ্ধতিতে পরিবর্তন ও নতুন পেশার উদ্ভব হচ্ছে, সে কারণে ডিপ্লোমা শিক্ষার শুধু সম্প্রসারণ নয়, সেখানে সংযোজনেরও প্রয়োজন হচ্ছে। 

ডিপ্লোমা শিক্ষাকে সময়োপযোগী এবং চাহিদা মেটানোর মতো সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার জন্য প্রায় নিয়মিতভাবে শিক্ষার সংস্কারের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। উন্নত দেশগুলোতে বহু দিন থেকেই গবেষণালব্ধ জ্ঞানের ওপর এবং বাজারের চাহিদা সামনে রেখে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোই পাঠ্যসূচি এবং বিষয়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারলে আজকের শিক্ষার্থীরা দায়িত্ব নিতে পারবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের। কিছু কিছু ঘটনাকে শুধু বর্তমানের মধ্যে সীমিত ভাবলে ভুল ভাবা হয়। ডিপ্লোমা শিক্ষার মতো ক্রমবিকাশমান ক্ষেত্রটির বেলায় একথা শতভাগ প্রযোজ্য। কারণ এক্ষেত্রে বাধা-বিপত্তি, ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্যে ভবিষ্যতের বিপদ-আশঙ্কা লুকায়িত থাকে। ডিপ্লোমা শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার কার্যকর সংযুক্তি জরুরি। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অনুপাতে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কম। বিদ্যমান প্রশিক্ষক ও অবকাঠামো দুর্বলতাও দূর করতে হবে। সর্বোপরি এসএসসি পাশ তরুণদের ডিপ্লোমা শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে এ বিশাল জনশক্তিকে রফতানির মাধ্যমে বাইরের শ্রমবাজারে কাজে লাগাতে হবে। তবেই বিদ্যমান জনমিতিক ডিভিডেন্ডের পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ