ঢাকা, সোমবার 6 February 2017, ২৪ মাঘ ১৪২৩, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উজানে বাঁধের প্রভাবে ছয় শতাধিক নদ-নদী বিলুপ্ত

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি, দুই ধার উুঁচু তার, ঢালু তার পারি’। কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা এটি। তার এ কবিতা রচিত হয়েছিল স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে, তৎকালীন পূর্ববঙ্গের আত্রাই নদীর পাশে তার কুটিবাড়ি নাগর নদীর তীরে বসে। ঐ কবিতাকে এক সময় পাঠ্যসূচিও করা হয়েছিল। যেন শিশুকাল থেকেই এদেশের কিশোর-কিশোরীরা জানবে আমাদের নদীগুলোতে বৈশাখ মাসেও পানি থাকে। কালের বিবর্তনে আজ এই কবিতাকে আজগুবি বলে মনে হবে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, জালের মতো বিছিয়ে থাকা এদেশে অতীতে হাজারের বেশি নদী থাকলেও এখন তা শুধুই ইতিহাস। গবেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের ছয় শতাধিক নদ-নদী পানির অভাবে শুকিয়ে মরে গেছে। এমনকি অনেক নদীর অস্তিত্বও বিলীন হয়ে গেছে। উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহে প্রতিবেশী দেশ ভারত অসংখ্য বাঁধ দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী গত ৪৫ বছরে দেশে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার নদীপথ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে দেশে কোন নদী পথের অস্তিত্বই থাকবে না বলে আশংকা তাদের। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক নদী শুকিয়ে মরে গেছে গত ৪৫ বছরে। ছিল ১৩০০-র মতো। পানির অভাবে শুকিয়ে এখন তার সংখ্যা নেমে এসেছে ৭০০তে। প্রকৌশলী জাবের আহম্মেদ ও মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন-এর যৌথভাবে উপস্থাপিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশকে ১৩০০ নদ-নদী থেকে এখন মাত্র ৭০০তে নেমে এসেছে তো বটেই, বেঁচে থাকা নদ-নদীর মধ্যেও প্রবাহমান নদীর সংখ্যা অর্ধেক। নদ-নদী সংকটে আসন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে কিছু জরুরি পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে- ঢাকার আশপাশের এলাকার মাত্রাতিরিক্ত দূষণ রোধে জরুরি ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া দরকার। এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এগুলি বাস্তবায়ন করা জরুরি। নদী রক্ষায় সরকারের কাছে মোট ১৬টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের পক্ষ থেকে। স্বল্পমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে আছে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, কৃত্রিম লেক বা সমুদ্র সৈকতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার পোড়া মবিল, তেল, গৃহবর্জ্য ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন-সহ অপচনশীল বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া। এ জন্য জনসচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়। এছাড়া অবৈধ দখল থেকে নদীকে রক্ষা করতে, দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে শিল্পবজ্যের দূষণ থেকে নদী রক্ষায় শিল্পকারখানায় ২৪ ঘণ্টা এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান (ইটিপি) চালু রাখা, বিভিন্ন হাওড়-বাওড়-বিল ও পতিত নদী-নালাগুলোর উৎসমুখের বাঁধাগুলো সরিয়ে নিম্নভূমিতে পানির প্রবাহ সচল রাখার ব্যবস্থা করা। 

আরেক হিসেবে দেখা যায়, পর্যাপ্ত পানি বা প্রবাহ না থাকায় বিলীন হওয়ার পথে দেশের এক-তৃতীয়াংশ নদী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে-কলমে দেশে বর্তমানে ৩১০টি নদীর অস্তিত্ব রয়েছে। তবে এদের মধ্যেও প্রায় ১শ’ নদীতে বছরের বেশিরভাব সময়ই পানি থাকে না। এর মধ্যে অনেক নদী ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে কালের সাক্ষী হয়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক নদীতে বর্ষা মওসুমে প্রবাহ কিছু থাকলেও শুষ্ক মওসুমে নদী বলে মনে হয় না। নদীতে চলে নানা ধরনের চাষাবাদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র ফারাক্কার প্রভাবেই পদ্মা নদীর অনেক শাখা নদী বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া তিস্তায় পানি না থকায় উত্তরাঞ্চলের ছোট-বড় ৩৩ নদী ভরাট হয়ে গেছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে পদ্মা-যমুনার পানি কমে অনেক স্থানেই মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। যমুনার বুকে জেগে উঠেছে শত শত চর। এ কারণেই উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় মরুভূমিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। নদীতে পানি না থাকায় ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্ত পানির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। প্রতিবছর আশঙ্কাজনকহারে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে।

শুধু ফারাক্কার প্রভাবই নয়, উজানে বিভিন্ন নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া, প্রতিবছর বর্ষায় বিলিয়ন টন পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণেও ভরাট হয়ে প্রবাহশূন্য হয়ে পড়ছে নদীগুলো। স্বাধীনতার পর গত তিন দশকের বেশি সময়ে নদীগুলো বেশি করুণ অবস্থার শিকার হয়েছে। তবে মূলত ফারাক্কা বাঁধের কারণেই নদীগুলো এত তাড়াতাড়ি মরতে বসেছে। এছাড়া নদীতে প্রতিবছর এত পরিমাণ পলি জমছে যে তা পানির অভাবে বহন করে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের ১২৫ কিলোমিটারের তিস্তার অববাহিকায় নদী ভিত্তিক জীবনযাত্রা ও জীববৈচিত্র আজ ধ্বংসের সম্মুখীন। মুখ থুবরে পড়েছে দেশের সবচেয়ে বড় সেচ এ প্রকল্পের। এর আওতাধীন ৬ হাজার ৫শ’ হেক্টর বোরো চাষের জন্য নেই কোন পানি। 

এক সময়ের প্রমত্ত পদ্মায়ও এখন ধুধু বালুচর। খরস্রোতা করতোয়ার অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। গবেষণায় দেখা গেছে, পদ্মায় পানি না থাকাতে শুধু পাবনা জেলাতেই শুকিয়ে গেছে ২০ নদী। এসবের মধ্যে কিছু কিছৃু নদী একেবারে বিলীন হয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম নিয়েছে। পদ্মার পাশাপাশি পানি না থাকায় যমুনার বুকে জেগে উঠেছে শত শত ডুবোচর। পদ্মা-যমুনায় পানির প্রবাহ না থাকায় এককালের সিরাজগঞ্জের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত শাখা নদী করতোয়া, ইছামতি, বাঙালী নদী, ফুলজোড়, দইভাঙ্গা, হুরাসাগর ও বড়াল শুকিয়ে আবাদী জমিতে পরিণত হয়েছে। কুড়িগ্রামের ১৬টির মধ্যে ১০টি নদীই শুকিয়ে গেছে। বাকি নদীগুলোর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদীতে বিশাল চর জেগে সেচ সুবিধা হুমকির মুখে পড়েছে। তিস্তায় পানি না থাকায় বগুড়ার অসংখ্য খাল, বিল পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। অস্তিত্ব হারিয়েছে অনেক নদী। জয়পুরহাটের ওপর দিয়ে প্রবাহিত চারটি নদীই এখন ভরাটের সম্মুখীন। নওগাঁর এক সময়ে খরস্রোতা আত্রাই এখন মৃতপ্রায়। ঠাকুরগাঁও জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৪টি নদীর মধ্যে ১১টি নদী এখন মৃত। পানির অভাবে এসব নদী শুকয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। টাঙ্গর, নাগর, কুলিক ও তীরন নদীর মাঝখান দিয়ে নালার মতো পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পাবনা জেলাতে বিলীন হয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে কমলা, শাসসাডাঙ্গী, ইছামতি করতোয়া, ভাঙ্গুরা, রতœবাড়ি, টেপাবাড়ি নদী। অস্তিত্ব সঙ্কটে ঐতিহাসিক চলনবিল। একই কারণে আজ হুমকির সম্মুখীন কুষ্টিয়ায় অবস্থিত অন্যতম সেচ প্রকল্প জিকে প্রজেক্টের। একের পর এক উজানে বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ৮ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত সব নদীই এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। লালমনিরহাটের ১৩টি নদী ও খাল বিল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ইরিবোরো চাষ ব্যহত হচ্ছে।

এছাড়া মানিকগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ধলেশ্বরী, পুরাতন ধলেশ্বরী, কালিগঙ্গা, ইছামতি ও কান্তাইপতি নদী আজ মৃতপ্রায়। বর্ষা মওসুম ছাড়া এসব নদী বছরের অধিকাংশ সময় পানিশূন্য থাকে। উজানে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় শুকিয়ে গেছে ফেনী নদী। হুমকির মুখে পড়েছে ফেনীর প্রায় তিনশত কোটি টাকা ব্যয়ে মুহুরী সেচ প্রকল্প। এর প্রভাব পড়েছে শাখা নদীগুলোতেও। পানির অভাবে গত কয়েকবছর এই অঞ্চলে চাষাবাদ হচ্ছেনা। পানির প্রবাহ না থাকায় খুলনা বিভাগের হামকুড়া, সাতক্ষীরার মরিচাপ, কুষ্টিয়ার হিসনা, যশোরের মুক্তেশ্বরী ও হরিহর নদ হারিয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নদী গবেষণায় ইনস্টিটিউটের জরিপের হিসাব অনুযায়ী শুষ্ক মওসুমে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের ১৯টি নদীর পানিই শুকিয়ে যায়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরের দেশে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার নদীপথ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নামকাওয়াস্তে টিকে রয়েছে বড় বড় অনেক নদীপথ। আর ছোট-ছোট বহু শাখা নদী এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার অনেকগুলো বিলুপ্তির পথে। তারা বলছেন, নদ-নদীর এই অপমৃত্যুর কারণে বাড়ছে নদীভাঙ্গন, জলোচ্ছ্বাস, কমছে আবাদী জমি, বাড়ছে জলাবদ্ধতা। নদীভিত্তিক অর্থনীতি বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এতে করে বাংলাদেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে। বাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয়। বাস্তুহারা ও অভিবাসী হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাবে আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে উপকূলীয় ১২টি জেলার প্রায় দুই কোটি মানুষ অভিবাসী হয়ে যেতে পারে।

বিশিষ্ট পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও নদী গবেষক ড. এসআই বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে প্রথম জরিপে নদীপথ ছিল ৩৭ হাজার কিলোমিটার যা ২০০২ সালে কমে ৬ হাজার কিলোমিটারে নেমে আসে। ২০১০ সালে কমে আসে ৪ হাজার কিলোমিটারে। আর শুষ্ক মওসুমে দেশের নদীপথ নেমে এসেছে মাত্র দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটারে। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৫০ সালে দেশে কোন নদীপথ অবশিষ্ট থাকবে কী না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

বাপার সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী নদ-নদী রক্ষায় তার দৃঢ় প্রত্যয় বার বার প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নদী রক্ষায় প্রশাসনিক কোনো কাজ বা সাফল্য নেই। ২০০৯ সালে দেশের উচ্চ আদালত থেকে নদী রক্ষায় একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করা হয়েছে। যাতে নদী রক্ষার প্রথম কাজ হিসেবে নদীর সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করতে বলা হয়েছে। নদী রক্ষার লক্ষ্যে নদী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্স গত ৫,৬ বছরে একটি নদীও দখলদারমুক্ত করতে পারেনি। বরং ঢাকার চারদিকের নদীর বিশাল আয়তনের জমি ছেড়ে দিয়ে ভুল স্থানে খুঁটি বসিয়ে দখলদারদের বৈধতা দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ একটি নদী রক্ষা কমিশনও গঠন করা হয়েছে। যার কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। মতিন আরো বলেন, নদীর সকল সমস্যায় করণীয় হিসেবে জাতিসংঘে দীর্ঘ দেড় যুগ আলোচনার পর ২০১৫ সালে গৃহীত হয়েছে জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ আইন ১৯৯৭। এটির সকল দিক-নির্দেশনার বাস্তবায়নের ভিত্তিতেই আভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নদীসমূহের সকল প্রকার সংকট নিরসন সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার উক্ত জাতিসংঘ আইনটিতে অনুস্বাক্ষর করেনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ