ঢাকা, সোমবার 6 February 2017, ২৪ মাঘ ১৪২৩, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সংঘাতমুক্ত কাশ্মীর প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘকে এগিয়ে আসতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার: সংঘাতমুক্ত কাশ্মীর প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্টজনরা। গতকাল রোববার ঢাকার সাউথ এশিয়া ইয়ুথ ফর পিস এন্ড প্রসপারিটি সোসাইটি (এসএওয়াইপিপিএস) সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘কাশ্মীরে মানবাধিকার ইস্যু: যুব সমাজের ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা একথা বলেন। 

সংগঠনের চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এন. এম. সাজ্জাদুল হকের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক মো. সাইফ, এসএওয়াইপিপিএস এর গবেষক জুনাইদ আল মামুন, এ কে. এম. যায়েদ উদ্দিন, হাসান আল মাহমুদ প্রমুখ । এছাড়াও এ বৈঠকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এ বিষয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য ও মতামত তুলে ধরেন। বৈঠকে বক্তারা কাশ্মীরের মানবাধিকার লংঘন বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ করেন। 

অধ্যাপক ড. দিলারা ইসলাম বলেন, ভারতের উচিত অনতিবিলম্বে আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট এর অধীনে সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক কাশ্মীরে মানবাধিকার লংঘন বন্ধ করা। তিনি বলেন, এটি শুধু কাশ্মীরের যুব সমাজকে ভীত করছে না বরং তাদের দৃষ্টিতে ভারতকে নিয়মিতভাবে নিন্দার পাত্রে পরিণত করছে। যুদ্ধরত সৈন্যদের বুঝা উচিত সশস্ত্র সংঘাত কোন সমাধান কিংবা স্বাধীনতা কোনটাই এনে দিতে পারে না। ভারতীয় সেন্যদের উপলদ্ধি করা উচিত যে নির্মমতা, পাশবিকতা কখনোই হৃদয় জয় করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট সরকার এবং রাজনীতিবিদদের উচিত এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করা যা কাশ্মীরের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ করবে। ভারত ও পাকিস্তানকে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে একযোগে কাজ করতে হবে এবং ভারতীয় প্রশাসনকে বুলেট ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, যা কিনা কাশ্মীরীদের অন্ধ করে দিচ্ছে। 

মো. সাইফ কাশ্মীরের ইতিহাসের কালো দিবসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এছাড়াও তিনি ১৯৬৪ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারির কথা উল্লেখ করেন যা ছিল কাশ্মীরের অধিবাসীদের জন্য অত্যন্ত শোকাবহ একটি দিন। তিনি বলেন, কাশ্মীরকে ভারতের একটি প্রদেশ এবং ভারতীয় ইউনিয়নের একটি অখ- অংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বিল পাসের কারণে ১৯৬৪ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি ভারতের জন্য একটি অত্যন্ত লজ্জাজনক দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তিনি আরও বলেন, ১৯৪৭ সালের ২৭শে অক্টোবর থেকে ভারত ক্রমাগত কাশ্মীরের অধিবাসীদের মৌলিক অধিকার হরণ করে চলেছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে যখন সমগ্র বিশ্ব মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং সক্রিয়, তখন ভারতের এভাবে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাওয়া কোনভাবেই কাম্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

গবেষক জুনাইদ আল মামুন বলেন, কারফিউ, অবৈধ আটক, খুন, সুপরিকল্পিত হত্যা, অবরোধ, বসতবাড়িতে আগুন, নির্যাতন, গুম, ধর্ষণ, মুসলিম নারীদের উপর নির্যাতন এবং নকল এনকাউন্টারের মাধ্যমে হত্যা কাশ্মীরের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে উঠেছে। তিনি তথ্য উল্লেখ করে আরও বলেন যে, ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক লাখের বেশি নিরীহ কাশ্মীরী প্রাণ হারিয়েছেন; ৬,৯৬৯ জনের অধিককে জেল হাজতে হত্যা করা হয়েছে; গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় দুই লাখ কাশ্মীরীকে এবং লক্ষাধিক বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী বর্বরোচিতভাবে ১,০৭,৩৫১ জন শিশুকে পিতৃহীন করেছে, বিধবা করেছে ২২,৭২৮ জনের অধিক নারীকে এবং গণধর্ষণ করেছে প্রায় দশ হাজার নারীকে। এসব মৃত্যু এবং নির্যাতন বন্ধের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজ এবং জাতিসংঘের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এ. কে. এম. যায়েদ উদ্দিন মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীল শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দ্রুত কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের কথা বলেন এবং সেখানে যুব সমাজের দুর্দশা ও তাদের উপর সশস্ত্র বাহিনীর নির্মমতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কাশ্মীরে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক কাজের জন্য ভারতকে দায়ী করেছে এবং নিন্দা জানিয়েছে।

হাসান আল মাহমুদ বলেন যে, কাশ্মীরের অধিবাসীদের শান্তি ও যথার্থ স্বায়ত্ত্বশাসনের অধিকার প্রদানের মাধ্যমে তাদের মধ্যে প্রকৃত অধিকারবোধ জাগ্রত করা প্রয়োজন। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য দৃঢ় সংকল্প হওয়ায় ভারত সেখানকার সমস্যা সমূহ সমাধানে আন্তরিক নয়। তিনি আরও বলেন যে, সভ্য সমাজ এটি আর মেনে নিতে পারে না। কাশ্মীরের অধিবাসীদের নিজ নিজ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রয়েছে। তাদের এ অধিকার লঙ্ঘনের কোন সুযোগ ভারতের থাকতে পারেনা। এ ছাড়াও যুব সমাজের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা কাশ্মীরে মানবাধিকার লংঘনের দ্রুত সমাপ্তি ও সমাধান দাবি করে তাদের বক্তব্য রাখেন। মানবাধিকার সংরক্ষণের তাগিদে তারা জাতিসংঘকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহবান জানান। 

গোলটেবিল আলোচনার সভাপতি এন. এম. সাজ্জাদুল হক বলেন, সভ্য বিশ্বায়নের এই যুগে যখন সমগ্র বিশ্ব উন্নতি এবং ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে চলেছে তখনও কাশ্মীরের অধিবাসীদের বিরতিহীন ভাবে তাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকারের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। তিনি কাশ্মীরের সংঘাতকে দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার লংঘনের অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেন এবং বলেন এটি হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি সার্ককে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে জাতিসংঘকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ