ঢাকা, সোমবার 6 February 2017, ২৪ মাঘ ১৪২৩, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার : বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য এবং সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আর নেই। গতকাল রোববার ভোরে ৪টা ২৯ মিনিটে তিনি রাজধানী ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একান্ত সচিব কামরুল ইসলাম জানান, তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। হাসপাতালে তাকে লাইফসাপোর্টে রাখা হয়েছিল। গতকাল ভোর ৪ টা ২৯ চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

আজ সোমবার সুনামগঞ্জের দিরাই আনোয়ারপুরে নিজ বাড়ির পাশে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে সোমবার সকাল ৯টায় রাজধানী ঢাকা থেকে তার লাশ সিলেটে নেয়া হবে। সকাল ১০টায় সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। বেলা ১১টায় মরদেহ যাবে সুনামগঞ্জ। এরপর সেখান থেকে লাশ তার নির্বাচনী এলাকা দিরাই ও শাল্লাতে নেয়া হবে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী দিরাইয়ে নিজ গ্রামে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

এদিকে আওয়ামী লীগের এ নেতার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী শোক প্রকাশ করেছেন। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া,জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতবৃন্দ শোক জানিয়েছে। 

গতকাল দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে বর্ষীয়ান এই নেতার মরদেহ জাতীয় সংসদ চত্বরে আনা হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবনী পাঠ করেন সংসদের ক্ষমতাসীন দলের চিফ হুইফ আসম ফিরোজ। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে তার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত। এরপর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়।

গার্ড অব অনার শেষে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । এরপর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ সভাপতির নেতৃত্বে দলের নেতৃবৃন্দ, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টিও নেতৃবৃন্দ এবং পরে ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিভিন্ন সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এর আগে বেলা ১২ টার দিকে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। এ সময়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

এ সময়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাইদ খোকন, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য মুকুল বোস,তার মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়াও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিযার পক্ষ্য থেকে সুরঞ্জিত সেনের মরদেহে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এর আগে সকাল ৯ টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মরদেহ তার জিগাতলার বাসভবনে নেয়া হয়। তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে অসংখ্য শোকার্ত মানুষ বাসভবনে ছুটে আসেন। 

আওয়ামী লীগের প্রবীণ এই নেতার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা সংসদ সদস্য (এমপি) সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। রোববার এক শোক বার্তায় তিনি বলেন, 'সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো একজন বিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুর খবর শুনে আমি দারুণভাবে মর্মাহত হয়েছি।'

এরশাদের শোক : সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুতে দেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তা পূরণ হওয়ার নয়। তার মৃত্যুতে জাতীয় রাজনীতিতে এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হলো। শোকবার্তায় পরলোকগত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের আত্মার শান্তি কামনা এবং তার শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এইচএম এরশাদ।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী : বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৪৬ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের আনোয়ারাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য সুরঞ্জিতের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বামপন্থী রাজনীতির মধ্য দিয়ে। স্বাধীন দেশের প্রথম সংসদসহ তিনি সাত বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তুখোড় এই পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন বর্তমান সংসদে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও পরে ঢাকা সেন্ট্রাল ‘ল’ কলেজ থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ‘ল’ পাসের পর কিছু দিন তিনি আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ভিপি প্রার্থী হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) পিকিং ও মস্কো ধারায় দুই ভাগ হলে মওলানা ভাসানীর পক্ষ ত্যাগ করে সুরঞ্জিত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশে যোগ দেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে ন্যাপ থেকে বিজয়ী হন। পরে ন্যাপের ভাঙনের পর গণতন্ত্রী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ ও ১৯৯১- এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।

পঞ্চম সংসদের সদস্য থাকাকালেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে প্রথমে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেন ভোটে হেরে গেলেও পরে হবিগঞ্জের একটি আসনে উপ-নির্বাচন করে তিনি বিজয়ী হন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন তিনি।

২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সুরঞ্জিতকে আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান। পরে ২০১১ সালের ২৮ নবেম্বর রেলমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন সুরঞ্জিত। সর্বশেষ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলন তিনি পুনরায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে তিনি আবারও আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

এদিকে আজ সোমবার নিজের হাতে রোপণ করা চন্দন গাছের কাঠ দিয়ে দাহ করা হবে বর্ষীয়ান রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে। ইতোমধ্যেই চন্দন গাছটি কাটা হয়েছে এবং কাঠ আকারে বানানো হয়েছে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সুজিত রায় বলেন, চৌদ্দ-পনের বছর আগে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজের হাতেই বাড়ির আঙ্গিনায় এই চন্দন গাছটি রোপণ করেছিলেন। যখনই তিনি দিরাই এর এই বাড়িতে যেতেন, নিজের হাতেই গাছটির পরিচর্যা করতেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ