ঢাকা, সোমবার 6 February 2017, ২৪ মাঘ ১৪২৩, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মেয়র মিরুসহ দু’জন আ.লীগ থেকে বহিষ্কার

স্টাফ রিপোর্টার : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে মেয়রের গুলীতে সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল হত্যার ঘটনায় এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র হালিমুল হক মীরু এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কে এম নাসির উদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল রোববার সকালে দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এদিকে পৌরসভার মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা হালিমুল হক মিরুকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। গত শুক্রবার দুপুর থেকেই তিনি এলাকা ছাড়া। এমনকি তার মোবাইল ফোনও বন্ধ। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পরপরই পুলিশের ছত্রছায়ায় মীরু গাঢাকা দেয়। তবে পুলিশ বলছে, তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বিদেশে যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য বিমানবন্দরসহ ইমিগ্রেশনে সতর্ক বার্তা পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাও সতর্ক রয়েছে। আত্মগোপনে থাকা মীরু যেকোনো সময়ে গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

অন্যদিকে মীরুর পাসপোর্ট ও আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করেছে পুলিশ। এছাড়া শিমুল হত্যা মামলার আটক ৫ জনকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠালে শুনানির দিন ধার্য করে তাদের জেলহাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের স্থানীয় শাখা কাউকে সাময়িক বহিষ্কার করতে পারে। এরপর কেন স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে না সে বিষয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠানো হয়। আর তার বক্তব্যের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী বৈঠকে। মীরুকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজাদ। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিবুর রহমান স্বপন বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, হত্যার মত অপরাধের সাথে যুক্ত থেকে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার অভিযোগ এনে মিরুকে এবং কে এম নাসির উদ্দিনকে বহিষ্কার করা হয়। শিমুল হত্যার ঘটনায় মিরুসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখপূর্বক আরও ২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে মামলা করেছেন শিমুলের স্ত্রী নুরুন্নাহার। এরই মধ্যে মেয়রের দুই ভাইসহ বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শুক্রবারই জানিয়েছেন, মিরুর বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া হবে। শনিবার সিরাজগঞ্জ থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম সাংবাদিক শিমুলের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীকে বিচারের আশ্বাস দেন। তাকে একটি চাকরি দেয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন নাসিম। 

পাসপোর্ট ও আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ : গতকাল বিকেল পৌনে ৪টার দিকে পৌর শহরের মনিরামপুর রোডে মীরুর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তার দুটি পাসপোর্ট, ভোটার আইডি কার্ড ও তিনটি চেক বই জব্দ করেছে পুলিশ। শাহজাদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে মিরুর দুটি পাসপোর্ট, তিনটি ব্যাংক লেনদেনের চেকবই ও একটি জাতীয় সনদপত্র জব্দ করা হয়। এ সময় মিরুর স্ত্রী শাহজাদপুর মওলানা সাইফুদ্দিন এহিয়া ডিগ্রি কলেজের সহকারী শিক্ষক জেবুন্নেসা বেগম পিয়ারী উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বৃহস্পতিবার মিরুর লাইসেন্স করা একটি শটগান, একটি ব্যবহৃত গুলীর খোসা এবং ৪৩ রাউন্ড তাজা গুলী জব্দ করে পুলিশ। এদিকে, সিরাজগঞ্জের এসপি মিরাজউদ্দিন আহমেদ জানান, মীরু যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য সব এয়ারপোর্ট ও স্থল বন্দরে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

আটক ৫ জনকে জেলহাজতে প্রেরণ : সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল হত্যা মামলার আটক ৫ জনকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। গতকাল দুপুরের দিকে শাহজাদপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুল হক এ আদেশ দেন। এরা হলেন, শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কে এম নাসিরুদ্দিন (৪৮), একই উপজেলার বারাবেরি গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে আলমগীর, নলুয়া গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে আরশাদ আলী, একই গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে নাজমুল ও শক্তিপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে জহির। শাহজাদপুর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) কমল সিং জানান, দুপুরে আটকদের বিরুদ্ধে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরে আদালত আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি রিমান্ড আবেদন শুনানির দিন ধার্য করে তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে শনিবার মেয়র হালিমুল হক মিরুর ছোট ভাই মিন্টুকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

মীরুর যত অপকর্ম : স্থানীয়দের কাছে এক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হালিমুল হক মীরু। একাধারে সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র। দুইয়ে মিলে তার অবস্থান ছিল পোয়াবারো। বিশেষ করে সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল হত্যায় অভিযুক্ত মীরু আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর তার ও তার পরিবারের নানা অপকীর্তির কথা এখন ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। 

নিজস্ব বলয় তৈরি করে সবসময় এলাকায় তার বাহিনী নিয়ে দাপট দেখাতেন। তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেতো না। কেউ প্রতিবাদ করলে তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে তাকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিতো। যার সর্বশেষ প্রমাণ শাহজাদপুর কলেজ শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি বিজয় মাহমুদ। পৌরসভার নিম্নমানের কাজের প্রতিবাদ করায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মেয়র তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে বেদম মারপিট করে দুই পা এবং এক হাত ভেঙে দেয়। এ সময় বিজয়ের পাশে মীরুর অপরিচিত সন্ত্রাসী অবৈধ পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরে বিজয়কে রিকশায় তুলে পথিমধ্যে ফেলে রেখে চলে যায় তারা। বর্তমানে বিজয় ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অবস্থা এখনও শংকটাপন্ন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে মেয়র মীরু বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। মেয়র নির্বাচনের আগ থেকে তার বাড়িতে ২৫-৩০ জনের একজন সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এর বেশির ভাগ সন্ত্রাসী অন্য জেলার। তাদের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্বে ছিল তার দুই ভাই পিন্টু ও মিন্টু। হাসিবুল হক মিন্টু পাবনা জেলার জাসদের সাধারণ সম্পাদক। সন্ত্রাসী দলটি গত শুক্রবার পর্যন্ত মেয়রের বাসায় অবস্থান করছিল। বড় ভাই মেয়র হওয়ায় পৌরসভার টেন্ডার পিন্টু ও মিন্টুই নিয়ন্ত্রণ করতো। উন্নয়নের নামে কাজের কাজ কিছুই হতো না। ঠিকাদার দায়সারা কাজ দেখিয়ে লুটে নিতো টাকা। ফলে এসব উন্নয়ন থেকে পৌরবাসী কোনো সুফল পেতো না।

স্থানীয়রা জানান, মীরু নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করলেও কোথায় কোন অঞ্চলে যুদ্ধ করেছেন তা কেউ জানে না। মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, পাবনা শহরে থাকলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে তাকে কেউ চিনতো না। স্বাধীনতার পর সবাই তাকে চিনতে শুরু করে জাসদ গণবাহিনীর লোক হিসেবে। আর সুবিধাবাদী এই নেতা নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে তার অবস্থান পোক্ত করেন। শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে এর আগেও বহিষ্কারও করা হয়েছিল তাকে। তবে সেসব ঘটনা সামাল দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি তৃণমূল থেকে মনোনয়ন না পেলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের ম্যানেজ করে মেয়র পদের মনোনয়ন বাগিয়ে নেন। আর নির্বাচিত হন এলাকায় অস্ত্রের মহড়া দিয়ে ভোটারদের ভয় ভীতি দেখিয়ে। এলাকাবাসী জানান, মীরু হলেন শাহজাদপুরের চরাঞ্চল নলুয়া এলাকার বাসিন্দা। কিন্তু তার বেড়ে ওঠা পাবনায়। শিক্ষাজীবনও শুরু হয় সেখানে। পরে শাহজাদপুর কলেজে পড়তে আসেন তিনি। সাংবাদিক শিমুল হত্যায় যুক্ত থাকার কারণে এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে মিরুকে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। 

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি) আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের সময় সমকাল উপজেলা প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মিরুর শটগানের গুলীতে আহত হন। পরের দিন দুপুরে বগুড়া থেকে ঢাকা নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। ঘটনার পর থেকে মীরু গাঢাকা দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ